‘সমঝোতার শেষ সুযোগ’ নিয়ে যা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান

· Prothom Alo

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র বড় সামরিক প্রস্তুতি নিয়েছে। ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে এটিই সবচেয়ে বড় সমরাস্ত্র মোতায়েন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় যুদ্ধবিমানবাহী জাহাজ ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড এখন ভূমধ্যসাগরে রয়েছে। জাহাজটি আরও বড় নৌবহরের সঙ্গে যোগ দিতে এগোচ্ছে।

আকাশ নজরদারির জন্য ছয়টি ই–৩ সেন্ট্রি বিমানও মোতায়েন করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মোট এমন বিমান আছে ১৫টি। এই বিমানগুলোকে 'আকাশচোখ' বলা হয়। এগুলো দূর থেকে রাডার নজরদারি করতে পারে। সম্ভাব্য পাল্টা হামলা ঠেকাতে আকাশ প্রতিরক্ষা সমন্বয়ে এগুলোর বড় ভূমিকা আছে। এত সংখ্যায় এসব বিমান মোতায়েনের মানে, ওয়াশিংটন সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছে।

Visit catcross.org for more information.

একই সঙ্গে ইরানের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার জন্যও প্রস্তুত হচ্ছে। নীতিগতভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে হস্তক্ষেপের বিরোধী। ২০২৫ সালের মে মাসে রিয়াদে দেওয়া ভাষণেও তিনি এই অবস্থান জানান।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও ইরানের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ তাঁর দেশের ভেতরের কর্মসূচিকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। গাজায় যুদ্ধ বন্ধে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর ট্রাম্পের চাপ প্রয়োগও দেখায়, তিনি নতুন সংঘাত চান না।

যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ শুরু হলে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৯০ থেকে ২০০ ডলারে উঠতে পারে। তবু কিছু কারণ তাঁকে কঠোর সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিতে পারে। ট্রাম্প মনে করতে পারেন, ইরানের শাসনব্যবস্থা দুর্বল হলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন শক্তির ভারসাম্য তৈরি হবে।

তথাকথিত প্রতিরোধ অক্ষ ভেঙে গেলে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও সৌদি আরবকে কেন্দ্র করে নতুন আঞ্চলিক কাঠামো গড়া সম্ভব হতে পারে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, জরুরি আইন ব্যবহার করে ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্ক আরোপ অবৈধ ছিল। এটি তাঁর অর্থনৈতিক পরিকল্পনার জন্য বড় ধাক্কা। সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী উইলবার রস দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেন, এমন পরাজয়ের পর ট্রাম্প ইরান ইস্যুতে ‘দুর্বল’ হিসেবে থাকতে চাইবেন না।

নৌ সমাবেশের মধ্যেই ট্রাম্প তেহরানকে ১০ থেকে ১৫ দিনের সময় বেঁধে দিয়ে বলেন, অর্থবহ চুক্তি না হলে খারাপ কিছু ঘটবে। এমন বক্তব্য প্রশাসনকে চাপে ফেলেছে। আলোচনায় অচলাবস্থা থেকে পিছু হটা তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

ইসলামি প্রজাতন্ত্র-পরবর্তী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে বড় আকারের স্থলবাহিনী প্রয়োজন হতে পারে, যা আবার দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। ইরানের বিকেন্দ্রীভূত প্রতিরক্ষাকাঠামো এবং সশস্ত্র আদর্শিক নেটওয়ার্ক সম্ভাব্য নতুন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।

ইরানেও উত্তেজনা বিরাজ করছে তীব্র মাত্রায়। জানুয়ারিতে ব্যাপক বিক্ষোভ দমনের পর দেশজুড়ে অসন্তোষ রয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, হাজারো মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বক্তব্য এবং হস্তক্ষেপের হুমকি বিক্ষোভকে আরও বিতর্কিত করেছে। অর্থনীতি, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় ইরান এখন বিপর্যস্ত।

একটি নির্ভরযোগ্য ইরানি অর্থনৈতিক পত্রিকায় এসেছে, দেশটিতে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি তিন অঙ্ক ছুঁয়েছে। উন্মুক্ত বাজারে মুদ্রার দরপতন জানুয়ারির বিক্ষোভকে উসকে দেয়। এমন প্রেক্ষাপটে যুদ্ধ শুরু হলে তা শাসনব্যবস্থার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে। তবু সমঝোতায় না গিয়ে ইরানের নেতৃত্বের অনমনীয় অবস্থান লক্ষণীয়। ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ বলেন, চুক্তি না হলে সীমিত সামরিক হামলার বিকল্প আছে। তিনি ইঙ্গিত দেন, ওয়াশিংটন জানতে চায় কেন তেহরান নতি স্বীকার করছে না।

‘শহীদের শোকসভা’ ঘিরে ইরান আবারও সংকটের মুখে

৩৭ বছর ক্ষমতায় থাকা সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাজনৈতিক শক্তি টিকে আছে এমন এক আদর্শিক ভিত্তির ওপর, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ট্রাম্পের কাছে আত্মসমর্পণ করলে সেই বিপ্লবী পরিচয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং অভ্যন্তরীণ আনুগত্য দুর্বল হতে পারে। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, আত্মসমর্পণের রাজনৈতিক মূল্য সামরিক সংঘাতের ঝুঁকির চেয়ে বেশি হতে পারে।

চুক্তি না হলে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে দুটি সম্ভাব্য সামরিক কৌশল রয়েছে। প্রথমটির লক্ষ্য ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও লঞ্চারগুলো অকার্যকর করা। এতে তাৎক্ষণিক সাফল্য দেখিয়ে দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়ার পথ তৈরি হতে পারে। দ্বিতীয়টি, সীমিত হামলা থেকে পূর্ণাঙ্গ শাসন পরিবর্তনের অভিযান, যা ইরানের কঠোর পাল্টা হামলার ফলে ঘটতে পারে। কিন্তু তখন সামনে আসবে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন, পরবর্তী পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেওয়া হবে?

ইসলামি প্রজাতন্ত্র-পরবর্তী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে বড় আকারের স্থলবাহিনী প্রয়োজন হতে পারে, যা আবার দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। ইরানের বিকেন্দ্রীভূত প্রতিরক্ষাকাঠামো এবং সশস্ত্র আদর্শিক নেটওয়ার্ক সম্ভাব্য নতুন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। সব মিলিয়ে উভয় পক্ষেরই সমঝোতায় পৌঁছানো উচিত। তবে ইতিহাস বলছে, অনেক যুদ্ধ ভুল হিসাবের ফল।

সাম্প্রতিক আলোচনায় কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, শূন্য মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের দাবি তোলা হয়নি। বরং আলোচনার লক্ষ্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ রাখা। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও একটি প্রস্তাব বিবেচনা করছে বলে জানা গেছে। সে প্রস্তাবে সীমিত ও প্রতীকীভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ থাকতে পারে। তবে তাতে পারমাণবিক বোমা তৈরির পথ পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হবে।

আমার মতে, সর্বাত্মক যুদ্ধের চেয়ে একটি চুক্তির সম্ভাবনাই বেশি। উভয় পক্ষের জন্য যুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকিটা বেশ বড়। শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প হয়তো কৌশলগত অনিশ্চয়তার পথ নিচ্ছেন।

এটি এমন এক কৌশল, যেখানে নিজেকে কিছুটা অনিশ্চিত ও কঠোর হিসেবে তুলে ধরা হয়। এর উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে চাপের মুখে ছাড় দিতে বাধ্য করা।

এভাবে বোঝানো হয়, প্রয়োজনে তিনি কঠিন পদক্ষেপ নিতেও প্রস্তুত। কখনো কখনো এই কৌশল কার্যকর হতে পারে। তবে এর ঝুঁকিও কম নয়।

  • শাহির শাহিদসালেস ইরানি–কানাডীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক

    মিডিল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

    * মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source