দেখুন বিশ্বকাপের ১৭ পোস্টার, জেনে নিন কোনটির কী মানে
· Prothom Alo

প্রতিটি টুর্নামেন্টই আলাদা, প্রতিটি ভেন্যুও। বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ ও ভেন্যুগুলোর নিজস্বতা ফুটিয়ে তুলতে ১৯৯৮ বিশ্বকাপ থেকে পোস্টার প্রকাশ করে আসছে ফিফা। সংশ্লিষ্ট আয়োজক ও ভেন্যু কর্তৃপক্ষই স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে এসব শিল্পকর্ম তৈরি করে থাকে। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ঘিরেও তৈরি হয়েছে এমন পোস্টার।এবারের বিশ্বকাপে আয়োজক হিসেবে তিনটি দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। ৪৮ দলের এই বিশ্বকাপে ১০৪টি ম্যাচ হবে মোট ১৬টি ভেন্যুতে। প্রতিটি ভেন্যুর জন্য একটি করে ১৬টি এবং বিশ্বকাপের জন্য কেন্দ্রীভূত একটিসহ মোট ১৭টি পোস্টার তৈরি করা হয়েছে এবার। অনেক নির্মাতা তাঁদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে পোস্ট করে তাঁদের বিশেষ ডিজাইনের ধারণা এবং তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা দিয়েছেন।
অফিশিয়াল ২০২৬ বিশ্বকাপ পোস্টার
বিশ্বকাপের অফিশিয়াল পোস্টারের ডিজাইনার কারসন টিং, মিনার্ভা জিএম এবং হ্যাঙ্ক উইলিস থমাসবিশ্বকাপের অফিশিয়াল পোস্টারে তিন আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোর প্রতিনিধিত্ব বোঝাতে নীল, লাল এবং সবুজ রং ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে কানাডার অংশে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে একটি ম্যাপল পাতা এবং কানের টুপি পরা একটি ভালুক, সঙ্গে একটি মুজ (হরিণ বিশেষ)।
Visit fish-roadgame.online for more information.
মেক্সিকোর সবুজ অংশে আছে দর্শকের সমাগম, সঙ্গে একটি উড়ন্ত সোনালি ঈগল। যুক্তরাষ্ট্রের নীল অংশে দেশটির পতাকার তারা দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে। মাঝখানে আছে বল পায়ে এক খেলোয়াড়ের সিলুয়েট বা ছায়ামূর্তি। এই খেলোয়াড়ের চিত্রটি তিনটি দেশজুড়েই আছে, যা যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজনকেই বোঝায়। এই পোস্টারের ডিজাইন করেছেন তিন আয়োজক দেশের তিনজন।
আটলান্টা
আটলান্টার ডিজাইনার: জোসে হাদথিআটলান্টার পোস্টারটি একটি কার্টুনশৈলীর কোলাজ, যেখানে শহরের অনেক বিখ্যাত ভবন রয়েছে—ব্যাংক অব আমেরিকা স্কাইস্ক্র্যাপার থেকে শুরু করে জর্জিয়া স্টেট ক্যাপিটল ভবনের সোনালি গম্বুজ পর্যন্ত। সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো একটি পাকা, রসালো পিচ ফল (জর্জিয়ার একটি বিখ্যাত পণ্য) থেকে একটি বড় সোনালি ফুটবল বেরিয়ে আসছে, আর ডিজাইনের চারপাশে ফল এবং ফুলের সমারোহ।
বোস্টন
বোস্টনের ডিজাইনার জন রেগোক্ল্যাসিক টিনটিন কমিকের প্রচ্ছদের মতো দেখতে এই পোস্টারে বোস্টন হারবারে পানির নিচে একটি ফুটবল ম্যাচ চিত্রিত করা হয়েছে, যেখানে একদল মাছ গোলকিপারের ভূমিকায় থাকা একটি বিশাল গলদা চিংড়ির বিপক্ষে গোল করার চেষ্টা করছে। পোস্টারটি অদ্ভুত আর কাল্পনিক তো বটেই, পরাবাস্তবও।
ডালাস
ডালাসের ডিজাইনার ম্যাট ক্লিফলাল, সাদা আর নীল রঙের সমাহার এই পোস্টারে। লেদারের চ্যাপস (প্যান্টের ওপরের আবরণ) এবং বুট পরে একজন কাউবয় ওভারহেড কিকের মাধ্যমে ২০২৬ বিশ্বকাপকে টেক্সাসে স্বাগত জানাচ্ছেন। আছে উঁচু ভবন আর শহরের উপস্থিতি।
হিউস্টন
হিউস্টনের ডিজাইনার স্টেফানি লিয়ালটেক্সাসের হিউস্টন বিখ্যাত জনসন স্পেস সেন্টারের জন্য, যা নাসার মহাকাশচারী প্রশিক্ষণ কমপ্লেক্সের মূল কেন্দ্র। হিউস্টনের বিশ্বকাপ আয়োজনের পোস্টারে এই বিশেষত্বকেই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ভারী স্পেস স্যুট আর কাউবয় টুপি পরে বুক দিয়ে বল নিয়ন্ত্রণে মগ্ন এক মহাকাশচারী—পোস্টারের এই মূল চরিত্রটি যেন শহরের মহাকাশ ঐতিহ্যের প্রতি এক দারুণ শ্রদ্ধাঞ্জলি।
কানসাস সিটি
কানসাস সিটির ডিজাইনার জেডি আর্নেট‘উভেন টুগেদার’ শিরোনামের কানসাস সিটির পোস্টারটি শহরের একটি সাধারণ ম্যাচের দিনের উদ্দীপনা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কেউ সূর্যমুখীখেতের মধ্য দিয়ে, কেউ ক্রিস্টোফার এস বন্ড ব্রিজ পার হয়ে, কেউবা আবার বিখ্যাত ফোয়ারাগুলো ছাড়িয়ে কানসাস সিটি স্টেডিয়ামের গ্যালারির দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। কেন যাচ্ছেন, সেটা ‘ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ’২৬’–এ স্পষ্ট।
লস অ্যাঞ্জেলেস
লস অ্যাঞ্জেলেসের ডিজাইনার থিব দেলাপোর্তে-রিচার্ডগোধূলি বেলায় লস অ্যাঞ্জেলেসের স্কাইলাইনের একটি পরিচিত চিত্র এখানে সিলুয়েটে উপস্থাপন করা হয়েছে। সামনের অংশে একজন অজ্ঞাত ফুটবলার পাহাড়ের চূড়া থেকে পামগাছের মধ্য দিয়ে শহরের রাস্তার মাঝখানে একটি ফ্রি–কিক নিচ্ছেন—বেশ রোমাঞ্চকর একটি দৃশ্য।
মায়ামি
মায়ামির ডিজাইনার রুবেন রবিয়ার্বনিওন নীল এবং গোলাপি রঙে উজ্জ্বল মায়ামির পোস্টারটি। সৈকতে একদল মানুষ, তাদের মাথার ওপরে একটি ভাসমান বিশাল ফুটবল আর ফুটবলের ওপরে নৃত্যরত একটি ফ্ল্যামিঙ্গো। ফুটবল মোজা পরা এই পাখি আর বিচিত্র রঙের সেই ফুটবলের দিকে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে সৈকতে থাকা মানুষগুলো।
নিউইয়র্ক/নিউ জার্সি
নিউইয়র্ক/নিউ জার্সির ডিজাইনার রিচ তুনিউইয়র্ক শহর বোঝাতে স্ট্যাচু অব লিবার্টি যেন থাকারই কথা। এই নিউক্ল্যাসিক্যাল ভাস্কর্যটির আইকনিক তামাটে মশালের আগুনের শিখার মধ্যে একটি ফুটবল। পটভূমিতে এক জোড়া লুডুর ছক্কা লুকিয়ে আছে, যা সম্ভবত নিউ জার্সির জুয়া খেলার স্বর্গরাজ্য আটলান্টিক সিটির দিকে ইঙ্গিত করে।
ফিলাডেলফিয়া
ফিলাডেলফিয়ার ডিজাইনার নিক ম্যাকক্লিনটকফিলাডেলফিয়ার ল্যান্ডমার্কে ঠাসা এই পোস্টারটি যেন শহরটির এক জীবন্ত মানচিত্র। এতে ইনডিপেনডেন্স হল, লিবার্টি বেল সেন্টার এবং ফ্র্যাঙ্কলিন স্কয়ারের মতো ঐতিহাসিক স্থানগুলো শৈল্পিকভাবে ফুটে উঠেছে। তবে সব ছাপিয়ে নজর কাড়ে আইকনিক ‘রকি স্টেপস’। এটি ফিলাডেলফিয়া মিউজিয়াম অব আর্টের সেই বিখ্যাত সিঁড়ি, যেখানে ১৯৭৬ সালের কালজয়ী ‘রকি’ সিনেমায় সিলভেস্টার স্ট্যালোনকে দৌড়ে ওপরে উঠতে দেখা গিয়েছিল।
সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া
সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়ার ডিজাইনার লেরয়েড ডেভিডসহজ অথচ অসাধারণ এই পোস্টারে সান ফ্রান্সিসকো শহরের পরিচয় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এতে দেখা যায়, শহরটির বিখ্যাত দুই সেতু গোল্ডেন গেট ব্রিজ এবং ওকল্যান্ড বে ব্রিজ যেন বিশাল এক উচ্চতায় একে অপরের সঙ্গে ফুটবল হেডে জেতার লড়াইয়ে মেতেছে।
সিয়াটল
সিয়াটলের ডিজাইনার শোগো ওটাস্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে ফুটবলের মেলবন্ধন কীভাবে ঘটাতে হয়, তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত সিয়াটলের এই পোস্টার। এতে দেখা যায়, এলিয়ট বে-র নীল জলরাশি থেকে একটি বিশাল হাম্পব্যাক তিমি তার লেজ দিয়ে ফুটবলকে 'লং বল' দেওয়ার ভঙ্গিতে ভাসিয়ে দিচ্ছে।
দিগন্তে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে তুষারশুভ্র মাউন্ট রেইনিয়ার, আর পটভূমিতে সগৌরবে দৃশ্যমান শহরের আইকনিক 'স্পেস নিডেল'—যা সিয়াটলের স্থানীয় এমএলএস দল সিয়াটল সাউন্ডার্সেরও প্রতীক। সব মিলিয়ে পোস্টারটি যেন প্রশান্ত মহাসাগরীয় উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর ফুটবল উন্মাদনার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ।
টরন্টো
টরন্টোর ডিজাইনার ডেভিড মারেটরন্টোর এই পোস্টার কোনো গ্যালারির দেয়ালে বা কোনো উন্নতমানের স্পোর্টস বারের দেয়ালে মানিয়ে যাওয়ার মতো। এটি গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের কিউবিস্ট/মডার্নিস্ট আর্ট থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে কানাডার একজন আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়ের পোস্টার তৈরি করেছে, যা একটি সুন্দর ভগ্ন নান্দনিকতায় (ফ্র্যাকচার্ড অ্যাসথেটিক) চিত্রিত।
ভ্যাঙ্কুভার
ভ্যাঙ্কুভারের ডিজাইনার জামিন জুরোস্কিইউক্রেনীয়, পোলিশ এবং আদিবাসী (নামগিস ফার্স্ট নেশন) বংশোদ্ভূত শিল্পী জুরোস্কি তার এই পরিচ্ছন্ন ও ছিমছাম ডিজাইনে আদিবাসীদের শিল্পকলাকে তুলে ধরেছেন। পোস্টারটির মূল আকর্ষণ হলো একটি অরকা তিমি, যা সমুদ্রের উপসাগর দিয়ে সাঁতরে যাচ্ছে। তিমির ঠিক পেছনেই দেখা যাচ্ছে পোর্ট ম্যান ব্রিজ এবং অনেক দূরে ছবির মতো দাঁড়িয়ে আছে বিশাল নর্থ শোর পর্বতমালা।
গুয়াদালাজারা
গুয়াদালাজারার ডিজাইনার কুয়েমাঞ্চেগুয়াদালাজারার পোস্টারটি যেন মেক্সিকান এই শহরের সংস্কৃতিরই চিত্ররূপ। অনেক কিছুই আছে, তবে কোনোটিকেই বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এই ডিজাইনে আছে গুয়াদালাজারার যে মাঠে খেলা হবে, সেই আকন স্টেডিয়ামের ছাপ। আরও আছে স্থানীয় জালিস্কান খাবার, সংগীত, নৃত্য এবং সরকারি ভবন পালাসিও ডি গোবিয়ের্নোর রাজকীয় চূড়া। নানা রঙের ব্যবহারে একধরনের উৎসবের আবহ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
মন্টেরি
মন্টেরির ডিজাইনার কুয়েমাঞ্চেমেক্সিকান এই ত্রয়ী পোস্টারের আরেকটি হচ্ছে মন্টেরি। এটি শহরের নিজস্ব স্থানীয় ল্যান্ডমার্ক এবং সংস্কৃতির সংমিশ্রণে তৈরি নীল, লাল এবং সবুজ রঙের একটি ডিজাইন। মাঝখানে আছে এস্তাদিও মন্টেরির ঢেউখেলানো ছাদ, আর এর পাশে ক্যাথেড্রাল, সেরো দে লা সিলা পাহাড়, অ্যাকর্ডিয়ন সংগীত এবং ঝলসানো স্টেক বা মাংসের ছবি।
মেক্সিকো সিটি
মেক্সিকো সিটির ডিজাইনার কুয়েমাঞ্চেমেক্সিকোয় বিশ্বকাপ হবে তিনটি শহরে, তিনটির জন্যই পোস্টার বানিয়েছেন কুয়েমাঞ্চে। তাঁর পোস্টারগুলো লোকশিল্পশৈলীতে নির্মিত। মেক্সিকো সিটিতে আছে আজতেকা স্টেডিয়াম, ১১ জুন এ মাঠেই বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ। কুয়েমাঞ্চে পোস্টারে তুলে ধরেছেন গাছপালা, পশুপাখি, বাস, সংগীত, চিত্তাকর্ষক ‘অ্যাঞ্জেল অব ইনডিপেনডেন্স’ মূর্তি, বিখ্যাত জোচিমিলকো নৌকা, যা আবার লুচাডোর কুস্তিগিরদের দ্বারা পরিবেষ্টিত।