তেলের পেছনে যাচ্ছে সময়, দুশ্চিন্তায় রাইড শেয়ারের চালকেরা

· Prothom Alo

তেল নিতে প্রায় দুই ঘণ্টা রোদে দাঁড়িয়ে জাহির হাসান। তিনি দুই বছর ধরে রাজধানীতে উবারে রাইড শেয়ার করেন। তেল যেটুকু পেলেন, তাতে আগের মতো আয় তার হবে না।

রাজধানীর পরীবাগের ফিলিং স্টেশন মেঘনা মডেল সার্ভিসিং সেন্টারে আজ শনিবার দুপুরে বাইকারের ভিড়ের মধ্যে কথা হয় জাহির হাসানের সঙ্গে। রোদের মধ্যে থেমে থেমে নিজের মোটরসাইকেলটি টানতে টানতে ফিলিং স্টেশন পর্যন্ত আনতে হাঁপিয়ে উঠছিলেন তিনি। এই তেল ফুরিয়ে গেলে আবার যে ফিলিং স্টেশনে দাঁড়াবেন, সেখানে আবার অপেক্ষার ধাক্কা।

Visit een-wit.pl for more information.

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আঁচ এখন ভালোভাবে টের পাচ্ছেন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার হাজারো রাইড শেয়ারের চালক। জাহির হাসানের মতো দুশ্চিন্তায় এখন তাঁদের সবাই। এই যুদ্ধ বিশ্বের জ্বালানি তেলের বাজার অস্থির করে তোলায় সাশ্রয়ের পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন গতকাল শুক্রবার নিয়ম করে দিয়েছে, প্রতিটি মোটরসাইকেল দিনে একবারে ২ লিটারের বেশি তেল নিতে পারবে না।

এতেই বিপাকে পড়েছেন রাইড শেয়ারের চালকেরা। কারণ, প্রতিদিন তাঁদের ৬ থেকে ৮ লিটার তেল লাগে। সে হিসাবে এ তেল নিতে গেলে দিনের অর্ধেক সময় তাঁদের পাম্পে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ফলে তাঁদের আয় অর্ধেকে নেমে এসেছে। কারণ, যে পরিমাণ ভাড়া তাঁরা আগে পেতেন, সেটি এখন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ক্ষোভ–অসন্তোষ নিয়েই ফিলিং স্টেশনে বাড়ছে উৎকণ্ঠিত চালকদের ভিড়।

দীর্ঘ সময় ফিলিং স্টেশনে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা জাহির হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই সংকটটা তৈরি করেছি আমরা বাঙালিরা। অনেকে ট্যাংক ফুল করে নিয়ে বাসায় স্টক (মজুত) করছিলেন। ফলে পাম্পগুলোতে একধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। এটির বড় ভুক্তভোগী আমরা রাইডচালকেরা।’

রোজা রেখে তেল নিতে এসে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা রোদে দাঁড়িয়ে মোটরসাইকেলটিকে টেনে টেনে পাম্প পর্যন্ত আনতে অনেক ক্লান্ত হয়ে পড়েন জাহির। তিনি বলেন, ‘তেল নিতে যে কষ্ট হয়েছে, সামনে রাইডে ভাড়া নিয়ে গন্তব্যে যাওয়ায় আমার জন্য হয়তো কষ্ট হয়ে যাবে। অলরেডি হাঁপিয়ে গিয়েছি।’

অনেকটা সময় তেল নিতে কেটে যাওয়ায় আগের ভাড়ায় এখন পোষানো যাচ্ছে না বলেও জানান এই চালক। তিনি বলেন, ‘কারণ তেল নিতেই তো আমার চার থেকে ছয় ঘণ্টা চলে যায়। যে সময়টা আমার লস হয়ে যাচ্ছে, সে সময়টা তো আমাকে পোষাতে হবে। আজকে ২ লিটার তেল দিয়ে যতটুকু পারি ততটুকু চালাব, এরপর তো আবার লাইনে দাঁড়িয়ে তেল হয়তো নিয়ে চালানো সম্ভব হবে না।’

সামনে ঈদ, তা নিয়েও দুশ্চিন্তা জাহিরের। পরিবার নিয়ে রাজধানীর মগবাজারের ওয়্যারলেস মোড়ে থাকেন। তেল নিতে গিয়ে দীর্ঘ সময় চলে যাওয়ার ফলে ভাড়া কমে গেছে। এখন পরিবারের জন্য কীভাবে কী করবেন, তা নিয়ে চিন্তিত।

জাহির হাসান বলেন, ‘এ পরিস্থিতি দেখার পরে মাথায় ঠিক করে নিয়েছি যে আমাদের কোনো ঈদ নাই। ফ্যামিলিকেও বোঝাতে হবে, যে সামনে আমাদের জন্য ঈদ নেই। সামনে এই সংকট কেটে যাওয়ার পর দেখা যাবে আমাদের জন্য কোনো ঈদ আসে কি না?’

জ্বালানি তেলের জন্য দীর্ঘ লাইনে মোটরসাইকেলচালকেরা। আজ শনিবার সকালে, রাজধানীর তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে

ভরদুপুরে তপ্ত রোদের মধ্যে মালিবাগের হাজীপাড়া পেট্রলপাম্পে এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে তেল নেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন আরেক চালক মো. রবিউল ইসলাম। তিনি রাজধানীতে ১০ বছরের বেশি সময় ধরে মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ার করেন। মাত্র ২ লিটার তেলের জন্য এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

রবিউল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগে এক থেকে দুইবার তেল নিয়ে সারা দিন বাইক চালাতে পারতাম, সেখানে এখন চার থেকে পাঁচবার তেল নেওয়ার জন্য প্রায় পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টার মতো দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আবার কিছু কিছু পাম্প তেল দেয় না, তারা মজুত করে রেখে তেল দিচ্ছে না।’

প্রতিদিন শুধু তেল নেওয়ার জন্য যদি একজন চালকের ৬ ঘণ্টা সময় চলে যায়, তাহলে একজন চালক বাকি কতই বা ভাড়া পাবেন, সেই প্রশ্ন রাখেন রবিউল। তিনি বলেন, ‘৬ ঘণ্টা যদি তেলের জন্য দাঁড়িয়ে থাকি, বাকি ৬ ঘণ্টার ভাড়া দিয়ে কি আর আমাদের চলে? এর মধ্যে সব সময় ভাড়া থাকে না।’

তেল নেওয়ার জন্য আজ সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা যায় রাজধানীর পরীবাগের মেঘনা মডেল সার্ভিসিং সেন্টার পেট্রলপাম্পে। এই ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের লাইন কয়েক শ মিটার ছাড়িয়ে যেতে দেখা যায়।

জ্বালানি তেলের জন্য আজ শনিবার দুপুরে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেলচালকদের ভিড়

সেখানে দেড় ঘণ্টার বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকা চালক মাসুদুর রশিদের সঙ্গে কথা হয়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই ভোগান্তির কবে শেষ হবে জানি না। দেখা যাচ্ছে দুই-তিন শ টাকার তেল পাব, সেটার জন্য দুই-তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। দিনের অর্ধেক বেলা এই তেলের পেছনে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই সময়ে তো অনেকগুলো ভাড়া মারতে পারতাম। এ সময়টা আমার নষ্ট হয়ে গেল।’

এদিকে তেলসংকটের কারণে রাজধানীর বেশ কয়েকটি ফিলিং স্টেশন বন্ধ দেখা গেছে। কারণ হিসেবে এগুলোর মালিকেরা জানান, শুক্র ও শনিবার সরকারি ছুটির কারণে ডিপো থেকে তেল আসে না। ফলে এই দুই দিনের স্বাভাবিক চাহিদার আলোকে বৃহস্পতিবার ডিপো থেকে তেল নিয়ে থাকে ফিলিং স্টেশনগুলো। কিন্তু চাহিদা স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বেড়ে যাওয়ায় কিছু স্টেশন তেলশূন্য হয়ে পড়ে।

‘তেল নিতেই দিনের অর্ধেক পার, বাকি সময়ে কি আর পোষায়’

শনিবার বিকেলে রাজধানীর পরীবাগের ফিলিং স্টেশন পূর্বাচল ট্রেডার্সের সামনে একটি বোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়– “পেট্রোল/ অকটেন নেই”। এই ফিলিং স্টেশনের হিসাব রক্ষক জাফর আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুক্র ও শনিবার ছুটির কারণে ডিপো থেকে তেল আসে না। আমাদের কাছে যে তেল ছিল, সেটি গতকালই শেষ হয়ে গেছে। এখন আর কোনো তেল নেই। আগামীকাল ডিপো থেকে তেল আসলে তারপরে বিক্রি করতে পারব।’

তেল নিয়ে এই সংকটের কারণে ভোগান্তির অবসান চাইছেন রাইড শেয়ারের চালকেরা। সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে চালক মাসুদুর রশিদ বলেন, ‘আশা করি সরকার আমাদের দিকে নজর দেবে। আমাদের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আমাদের জন্য বেশি তেল নেওয়ার বিশেষ ব্যবস্থা যাতে করে, সেই দাবি জানাই।’

Read full story at source