অলিম্পিকে বাংলাদেশের পতাকা ওড়াতে চান খই খই

· Prothom Alo

‘ছোটবেলায় দূর থেকে টেবিল টেনিস খেলা দেখতে খুব মজা লাগত। মনে হতো কেউ যেন হেলেদুলে নাচছে আর খেলছে। ব্যাট হাতে যেন সেই শিল্পী হয়ে উঠছে খই খই মারমা,’ বলছিলেন টেবিল টেনিসের সাবেক জাতীয় চ্যাম্পিয়ন ও বর্তমান কোচ মোস্তফা বিল্লাহ। শিষ্যকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জ্বলজ্বল করছিল তাঁর চোখ। রাঙামাটির মেয়ে খই খই মারমার বেড়ে ওঠাটা যে তাঁর নিজের চোখে দেখা।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

২০১৮ সালে কোয়ান্টাম কসমো স্কুলের হয়ে জাতীয় পর্যায়ে খেলতে এসে প্রথম নজর কাড়েন খই খই। স্কুলের দলের সঙ্গে আসতেন, খেলে আবার দলের সঙ্গেই চলে যেতেন। আবাসিক কোয়ান্টাম স্কুলের সেটাই ছিল নিয়ম। এই স্কুলেই খই খই মারমার বড় হওয়া। দুই মেয়েকে পড়াশোনা করানোর মতো সামর্থ্য কৃষক পরিবারের ছিল না। ফলে তাদের দুই বোনকে কোয়ান্টাম কসমো স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছিল। কারণ সেখানে পড়াশোনা, থাকা–খাওয়া যেমন ফ্রি; তেমনি আছে খেলাধুলারও সুযোগ। খই খইয়ের পড়াশোনাতেই আগ্রহ ছিল, টেবিল টেনিসটা শখের বশে খেলতেন। কিন্তু সেই ব্যাট-বলই যে একসময় জীবনের অংশ হয়ে উঠবে, সেটা হয়তো তখনো ভাবতে পারেনি আট বছরের খই খই।

কোয়ান্টাম স্কুলের হয়ে জাতীয় পর্যায়ে খেলতে নিয়মিতই ঢাকা আসা হতো। উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য সেখান থেকে বাছাই করে চারজনের দায়িত্ব নেয় টেবিল টেনিস ফেডারেশন। একাডেমির তত্ত্বাবধানে শুরু হয় প্রশিক্ষণ। বান্দরবান থেকে তাঁদের নিয়ে আসা হয় ঢাকার বিকেএসপিতে। একসঙ্গে চারজন আসায় বিকেএসপিতে মানিয়ে নিতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। আর এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছেন কোচ আর বড় আপুরা। ‘একটা সময় মৌ আপু, সোমা আপুর খেলা দেখতাম। বিকেএসপিতে আসার পর নিয়মিত ট্রেনিংয়ে তাদের পেতাম। তারা আমাকে ছোট বোনের মতো আদর করে।’

প্যারাসিটামল নিয়ে যা জানা উচিত

২০২৩ সালে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে জুনিয়রে চ্যাম্পিয়ন হন খই খই। আর সিনিয়রের কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে যান সাদিয়া রহমান মৌয়ের কাছে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০২৬ সালে এসে জুনিয়র আর সিনিয়র দুই জায়গাতেই শিরোপা নিজের করে নিয়েছেন তিনি। সেটাও সাদিয়া রহমান মৌকে হারিয়ে। ৪০তম জাতীয় টিটি চ্যাম্পিয়নশিপে আটটি ইভেন্টে অংশ নিয়ে আটটিতেই পদক জিতেছেন, গড়েছেন ছয় সোনা, একটি করে রুপা ও ব্রোঞ্জ জয়ের বিরল কীর্তি।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলো ছড়িয়েছেন খই খই। মালদ্বীপে জুনিয়র ওয়ার্ল্ড র‍্যাঙ্কিংয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা খেলোয়াড়ের সঙ্গে তাঁর খেলা দেখে কে বলবে বিদেশের মাটিতে এটাই তাঁর প্রথম খেলা। তবে পদক পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে ২০২৫ পর্যন্ত। রৌপ্যপদক জিতেছেন মিশ্র দ্বৈতে জাভেদ আহমেদের সঙ্গে জুটি করে। মজার ব্যাপার হলো, জাভেদ আহমেদের সঙ্গে এর আগে খেলা দূরে থাক, ঠিকঠাক কথাও হয়নি। আসলে টেনিস ফেডারেশন তাঁদের ওপরে একটা বাজি ধরেছিল। আর সেই বাজি খুব ভালোভাবেই জিতে যান দুজন। মাঠেই নিজেদের সেরাটা খুঁজে নিয়েছেন, জুটি করে বাংলাদেশকে এনে দিয়েছেন আন্তর্জাতিক পদক ও সম্মান।

কোচ মোস্তফা বিল্লাহর সঙ্গে খই খই

অথচ একটা সময় ছিল, দুই মেয়ের জন্য বাবাকে টিটকারি সহ্য করতে হয়েছে। অনেকেই বলতেন, ছেলে নেই। বুড়ো হলে কে খাওয়াবে। ‘আমাকে যখন কোয়ান্টামে ভর্তি করা হয়, তখন অনেক কথা আমাদের শুনতে হয়েছে। ছেলে হলে কাজ করতে পারতাম, মেয়ে বলে পারব না, এমনটাও শুনতে হয়েছে। তখন থেকেই ইচ্ছা জীবনে এমন কিছু একটা করে দেখিয়ে দেব, যা বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাবে।’ খই খই মারমার অর্জন তাঁদের মুখে শুধু হাসিই ফোটায়নি, নতুন বাড়ি গড়ার প্রতিশ্রুতিও আদায় করে ছেড়েছে। প্রতিশ্রুতিটা দিয়েছেন রাজস্থলী উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদ অফিসার। সেই লক্ষ্যে কাজও শুরু হয়েছে।

তেহরানে থাকা বাংলাদেশির অভিজ্ঞতা: আকাশের দিকে তাকালে দেখা যায়, একের পর এক মিসাইল ছুটে যাচ্ছে

এত কিছুর পরও নিজের অতীতকে ভোলেননি খই খই। তাই তো তাঁর কণ্ঠে তাঁর মতো হাজারো খেলোয়াড়কে বের করে আনার আহ্বান, ‘আমি হয়তো কোয়ান্টাম স্কুলে ছিলাম বলে, ঢাকায় খেলতে এসেছি বলে উঠে আসতে পেরেছি। কিন্তু বাকিদের সেই সুযোগ নেই। বিশেষ করে মেয়েদের। জাতীয় পর্যায় থেকে যদি নিয়মিত খেলোয়াড় তুলে আনা হতো তাহলে হয়তো আমাদের মতো অনেকেই উঠে আসত।’

সামনেই সাউথ এশিয়ান গেমস, তার প্রস্তুতি চলছে। সেই সঙ্গে ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকেও খই খইয়ের নজর। আগের অলিম্পিকে বাংলাদেশ থেকে বাছাইপর্ব খেলার সুযোগ হয়নি, তখন বয়স ছিল মাত্র ১৬। আগামী অলিম্পিকে সেই সুযোগটা হাতছাড়া করতে চান না।

Read full story at source