আবার প্রকাশ্যে এল হুমায়ুন-তাহসিনার ‘মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব’

· Prothom Alo

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ও সিলেট-২ (বিশ্বনাথ-ওসমানীনগর) আসনের সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর লুনার ‘মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব’ আবার প্রকাশ্যে এসেছে। গতকাল শুক্রবার বিকেলে বিশ্বনাথ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি সদ্যপ্রয়াত মোহাম্মদ সুহেল আহমদ চৌধুরীর মাগফিরাত কামনায় আয়োজিত ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠানে দ্বন্দ্বের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।

Visit salonsustainability.club for more information.

প্রয়াত সুহেল আহমদের পরিবারের উদ্যোগে এ কর্মসূচি পালিত হয়। এতে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় বিএনপির নেতারা অতিথির বক্তব্য দেন। স্থানীয় বিএনপির দুজন নেতা জানান, বিশ্বনাথ পৌর শহরে আয়োজিত কর্মসূচিতে হুমায়ুন কবির প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন। ব্যানারে প্রধান বক্তা হিসেবে তাহসিনা রুশদীর নাম থাকলেও তিনি সভায় ছিলেন না। তাঁর অনুপস্থিতির কারণে উভয়ের ‘মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের’ বিষয়টি সামনে এসেছে।

সুহেল আহমদ চৌধুরী স্থানীয়ভাবে হুমায়ুন কবিরের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি গত ৯ ফেব্রুয়ারি তাহসিনা রুশদীর নির্বাচনী জনসভায় যোগ দিতে গিয়ে হঠাৎ অসুস্থ হন। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।

এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে হুমায়ুন কবির ও তাহসিনা রুশদীর ‘দ্বন্দ্বের’ বিষয়টি প্রথম সামনে আসে। তখন উভয় পক্ষের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। নির্বাচনের আগে জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী উভয় পক্ষের কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে বৈঠক করে মনোমালিন্য দূর করে দেওয়ার পাশাপাশি ধানের শীষের পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশনাও দেন।

‘মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের’ বিষয়ে জানতে হুমায়ুন কবিরের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে যোগাযোগ করলে সংযোগ পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে তাহসিনা রুশদীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে সাড়া দেননি। তাই তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুই পক্ষের দুজন সমর্থক বলেন, হুমায়ুন কবির ও তাহসিনা রুশদীর লুনার দুটো বলয় সিলেট-২ আসনে তৎপর আছে। প্রকাশ্যে না হলেও ভেতরে-ভেতরে দুটো পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে সক্রিয়।

তাহসিনা রুশদীর লুনার এক ঘনিষ্ঠজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ‘তিনি (তাহসিনা) একাধিকবার সুহেল আহমদ চৌধুরীর বাড়িতে সহমর্মিতা জানাতে গিয়েছেন। তাঁর (সুহেল আহমদ) স্ত্রীর জন্য ঈদ উপহারও পাঠিয়েছেন। জাতীয় সংসদ অধিবেশন চলমান থাকায় গতকালের আয়োজনে তিনি (তাহসিনা) উপস্থিত থাকতে পারেননি। এখানে বলয়কেন্দ্রিক কোনো রাজনীতি বিষয় ছিল না।’

বিএনপির নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিলেট-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল ঢাকার বনানী থেকে ‘গুম’ হওয়ার পর আসনটিতে ধীরে ধীরে তৎপর হন তাঁর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর। স্বামীর জনপ্রিয়তা দিয়ে অল্পদিনেই স্থানীয় বিএনপিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। পান বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পদও। এর পর থেকে ওই আসনটিতে ‘একক প্রার্থী’ হিসেবে দলে আলোচনায় ছিলেন তাহসিনা রুশদীর।

তবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর লন্ডন থেকে দেশে ফিরে বিএনপির তৎকালীন আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির সিলেট-২ আসন থেকে নির্বাচন করার ইচ্ছা প্রকাশ করায় স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দেয়। এ সময় ১৩ বছর অনেকটা এককভাবে স্থানীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব দেওয়া তাহসিনা রুশদীর বিপরীতে হুমায়ুন কবিরের একটা বলয়ও তৈরি হয়। যদিও স্থানীয় পদধারী নেতা-কর্মীদের বেশির ভাগই তাহসিনা রুশদীর পক্ষে বেশি সরব।

স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা বলছেন, ইলিয়াস আলীর ‘গুমের’ পর তাহসিনা রুশদীরই সিলেট-২ আসনে একক নেতা ছিলেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ওই আসনে তাহসিনা রুশদীর বিএনপির মনোনয়ন পান। তবে তখন তাহসিনার প্রার্থিতা আদালতে স্থগিত হওয়ায় তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন গণফোরাম নেতা মোকাব্বির খান। এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তাঁকে ‘একক প্রার্থী’ হিসেবেই দলটির নেতা-কর্মীরা মনে করছিলেন। তবে হুমায়ুন কবির দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীর বিষয়টি জানানোয় নতুন আলোচনা তৈরি হয়।

একই সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, হুমায়ুন কবির দলীয় মনোনয়ন চাওয়ার পরই দৃশ্যপট বদলে যায়। এটি মেনে নিতে পারেননি ১৩ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে মাঠে থাকা তাহসিনা রুশদীর লুনার কর্মী-সমর্থকেরা। এমন সময় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে ‘সিলেট থেকে হুমায়ুন নির্বাচন করবেন’ বলে জানান। এরপরই মূলত সিলেট-২ আসনে তাহসিনা ও হুমায়ুন–পক্ষের কর্মী-সমর্থকদের পক্ষে-বিপক্ষে তৎপরতা বাড়ে। এরই জের ধরে গত ৯ অক্টোবর রাতে বিশ্বনাথ পৌর শহরে উভয় পক্ষের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হন।

এদিকে বিএনপির এক নেতা জানান, হুমায়ুন কবিরের বাড়ি ওসমানীনগর উপজেলার উমরপুর ইউনিয়নের হাবশপুর গ্রামে। শৈশবেই তিনি যুক্তরাজ্যপ্রবাসী হন। একে তো সিলেট-২ আসনে ‘গুম’ হওয়া নেতা ইলিয়াস আলীর স্ত্রী মনোনয়নপ্রত্যাশী, অন্যদিকে তারেক রহমানের ‘ঘনিষ্ঠজন’ হিসেবে পরিচিত হুমায়ুন কবিরও একই আসনে মনোনয়ন চান। এ অবস্থায় গেল ২২ অক্টোবর বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব (আন্তর্জাতিকবিষয়ক) মনোনীত হন হুমায়ুন কবির। তখনই স্থানীয়ভাবে চাউর হয়, সিলেট-২ আসনে তাহসিনা রুশদীর মনোনয়ন পাবেন বলেই হুমায়ুন কবিরকে দলে বৃহৎ পরিসরে যুক্ত করা হয়েছে। পরে আসনটিতে তাহসিনা রুশদীর দলের মনোনয়ন পান।

ওই নেতা আরও জানান, নির্বাচনের আগে ৩১ জানুয়ারি জেলা বিএনপির সভাপতি ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার সব আসনের সমন্বয়কের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী সিলেট-২ আসনের বিবদমান দুটি পক্ষকে নিয়ে বৈঠক করেন। বৈঠক থেকে ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত করতে দুই পক্ষকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রচার-প্রচারণা চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরে হুমায়ুন কবির ধানের শীষের পক্ষে কিছু সভায় যোগ দিলেও তাহসিনা রুশদীর লুনার উপস্থিতিতে আয়োজিত কোনো সভাতেই যোগ দেননি। নির্বাচনে তাহসিনা বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। বিএনপি সরকার গঠন করে হুমায়ুন কবিরকে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা করা হয়।

স্থানীয় বিএনপির সাতজন নেতা-কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিলেট-২ আসনে স্থানীয় বিএনপি এখন ‘উপদেষ্টা গ্রুপ’ ও ‘এমপি গ্রুপ’ নামে দুটি বলয়ে বিভক্ত। তুলনামূলকভাবে ‘এমপি গ্রুপ’ শক্তিশালী। তবে ‘উপদেষ্টা গ্রুপ’ও ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সাবেক অনেক জনপ্রতিনিধি উপদেষ্টা বলয়ে আছেন। বলয়-রাজনীতির অংশ হিসেবেই ৪ মার্চ ওসমানীনগরে ও ৫ মার্চ বিশ্বনাথে স্থানীয় বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত ইফতার মাহফিলে হুমায়ুন কবিরের অনুসারীদের দাওয়াত দেওয়া হয়নি বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।

তবে সিলেট-২ আসনে কোনো বলয় নেই বলে দাবি করেন জেলা বিএনপির সভাপতি ও সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিএনপিতে কোনো বিভেদ নেই। হুমায়ুন কবির প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তাহসিনা রুশদীর স্থানীয় সংসদ সদস্য। উভয়েই দলের প্রয়োজনে কাজ করছেন। কোনো কোন্দল কিংবা বিভেদ তাঁদের মধ্যে নেই। যাঁরা এমনটা বলছেন, সেটা সঠিক নয়।’

এদিকে গতকাল বিশ্বনাথে আয়োজিত অনুষ্ঠানে হুমায়ুন কবির প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, ‘আপনারা মনে করবেন না সাবেক এমপি ইলিয়াস আলী ও উপজেলা চেয়ারম্যান সুহেল আহমদ চৌধুরী বর্তমানে রাজনীতিতে অনুপস্থিত বলে আপনারা অভিভাবকশূন্য, আমি আছি আপনাদের পাশে। আর আপনারা আছেন আমার পাশে। আর তাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে চলমান সরকারের আমলে বিশ্বনাথ তথা সিলেট-২ আসনের উন্নয়ন থেমে থাকবে না। তবে ওসমানীনগরের চেয়ে আমি সব সময়ই বিশ্বনাথকে অগ্রাধিকার দেব।’

অনুষ্ঠানে তাহসিনা রুশদীর অনুপস্থিত থাকলেও আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে সিলেট-৬ (বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরী, কেন্দ্রীয় বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ্ সিদ্দিকী প্রমুখ বক্তব্য দেন। এতে সভাপতিত্ব করেন বিশ্বনাথ উপজেলার লামাকাজী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. কবির হোসেন ধলা মিয়া।

Read full story at source