ফিরতে চেয়েছিলেন, আক্ষেপ নিয়েই চলে গেলেন অভিনেতা শামস সুমন

· Prothom Alo

‘আমাকে কেউ ডাকে না, তাই অভিনয় তেমন করা হয় না’—আক্ষেপভরা এই কথাগুলো শামস সুমনের। নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় এই অভিনেতা জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত ক্যামেরার সামনে ফেরার স্বপ্ন বুকে লালন করে গেছেন; কিন্তু সেই সুযোগ যথাযথ আসেনি। অপূর্ণ সেই আকাঙ্ক্ষা নিয়েই ৬১ বছর বয়সে তিনি জীবনযাত্রার ইতি টানলেন।

গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা যান জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেতা শামস সুমন। তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। আজ বুধবার সকাল ১০টায় চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে রাজশাহীতে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।

Visit orlando-books.blog for more information.

‘মধ্যবয়সী শিল্পীদের চাহিদা কমে গেছে’

একসময় মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র—সব মাধ্যমেই ছিল তাঁর সরব উপস্থিতি। আবৃত্তিকার হিসেবেও ছিল আলাদা পরিচিতি। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি সরে যান আলোচনার বাইরে। সেই সরে যাওয়া ছিল না ইচ্ছার, ছিল সময় ও শিল্প–বাস্তবতার নির্মম ফল।

কয়েক বছর আগে এক সাক্ষাৎকারে নিজের অভিনয়জীবনের স্থবিরতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শামস সুমন বলেছিলেন, ‘মধ্যবয়সী শিল্পীদের চাহিদা কমে যাওয়াই এর একটি বড় কারণ। মাথায় টাক পড়লে হয়তো বাবা চরিত্রে ডাক পেতাম, কিন্তু সেটাও হয়নি।’ তিনি বলেছিলেন, কেউ ডাকলেই আবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে প্রস্তুত।

অভিনেতা শামস সুমন মারা গেছেন

‘ক্যামেরাকে ভুলতে পারব না’

সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারার কথাও অকপটে স্বীকার করেছিলেন এই অভিনেতা। বদলে যাওয়া নাট্যধারা, নতুন মাধ্যম ও নতুন ভাষার সঙ্গে নিজের দূরত্বটাও তিনি বুঝতেন।

শামস সুমনের ভাষায়, ‘বর্তমানে যে টিভি, ওটিটি ও ইউটিউবকেন্দ্রিক নাট্যচর্চা, সেগুলোর সঙ্গে আমি নিজেকে অ্যাডাপ্ট করতে পারছি না। না সংলাপ, না চরিত্র, না কাহিনি—কোনোটার সঙ্গেই নিজেকে খুঁজে পাই না। তবে আমি চেষ্টা করছি, কীভাবে ফিরে আসা যায়। ক্যামেরাকে ভুলতে পারব না।’ কিন্তু সেই ‘ফিরে আসা’ আর হয়নি। তাঁর জন্য অপেক্ষা করেনি সময়, কিংবা শিল্পের বদলে যাওয়া স্রোত।

আন্দোলন থেকে শিল্পে

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবৃত্তি সংগঠন ‘স্বনন’-এর মাধ্যমে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পথচলা শুরু শামস সুমনের। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। শিল্পের পাশাপাশি সমাজ-রাজনীতির প্রতিও ছিল তাঁর গভীর সংবেদনশীলতা।
জীবনের শেষ সময়েও সেই সচেতনতা অটুট ছিল। ২০২৪ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলন প্রসঙ্গে এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে তরুণদের নিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম এরা ফেসবুক যুগে থাকে, দেশ নিয়ে ভাবে না। কিন্তু গত ২০ দিনে আমার ধারণা বদলে গেছে—এরা দেশ নিয়ে ভাবে, ইতিহাস জানে।’

অভিনেতা শামস সুমন

রেডিও থেকে পর্দা

স্কুলজীবনে রাজশাহী বেতারে অভিনয়ের মাধ্যমে শুরু শামস সুমনের যাত্রা। পরে রেডিও নাটক, উপস্থাপনা ও সংবাদপাঠ—সব ক্ষেত্রেই নিজের কণ্ঠের শক্তি দিয়ে জায়গা করে নেন। সেই ভরাট, মায়াময় কণ্ঠই একসময় তাঁকে নিয়ে আসে টেলিভিশনের পর্দায়।

নব্বইয়ের দশকে টিভি নাটকে হয়ে ওঠেন পরিচিত ও প্রিয় মুখ। ‘অহংকার’, ‘অনুরাগ’, ‘যদি ভালোবাসো’, ‘এই তো আমাদের বাড়ি’, ‘রাতের অতিথি’, ‘অতন্দ্র প্রহর’, ‘খোঁজ’সহ বহু নাটকে অভিনয় করেছেন শামস সুমন। তৎকালীন জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটকেও ছিল তাঁর উপস্থিতি।

চলচ্চিত্রেও ছিল শামস সুমনের বিচরণ। ‘জয়যাত্রা’, ‘বিদ্রোহী পদ্মা’, ‘আয়না কাহিনি’, ‘প্রিয়া তুমি সুখী হও’, ‘চোখের দেখা’, ‘মন জানে না মনের ঠিকানা’—এমন একাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। শহিদুল ইসলাম খোকনের ‘স্বপ্নপূরণ’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য পেয়েছিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।

অভিনয় থেকে দূরে, জীবিকার টানে

জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় তাঁকে কাটাতে হয়েছে অভিনয়ের বাইরে। রেডিও ভূমিতে স্টেশন চিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি একটি ট্রেডিং ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

নাটকের দৃশ্যে শামস সুমন

তবে অভিনয়ের প্রতি টান কখনোই কমেনি, কিন্তু কাজের সুযোগ না পাওয়াটাই ছিল শামস সুমনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ। শিল্পী হিসেবে নয়, বরং একজন পেশাজীবী হিসেবেই কাটাতে হয়েছে জীবনের দীর্ঘ সময়।

শিক্ষক হতে চেয়েছিলেন—হতে পারেননি। আবৃত্তিকার হতে চেয়েছিলেন—সেটিও পূর্ণতা পায়নি। অভিনয়ই ছিল শামস সুমনের সবচেয়ে বড় পরিচয়, অথচ সেই পথেও রয়ে গেল অপূর্ণতার দীর্ঘ ছায়া। অপূর্ণ সেই স্বপ্নগুলো সঙ্গী করেই তিনি ফিরছেন নিজের শহর রাজশাহীতে, যেখান থেকে শুরু হয়েছিল তাঁর পথচলা। পদ্মাপারের সেই সবুজ মাটিতেই চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন তিনি, যেন জীবনের শেষ অধ্যায়ে আবার ফিরে যাওয়া শিকড়ে, নিজেরই গল্পের শুরুতে।

Read full story at source