অতিবৃষ্টি ও শিলায় হাওরের বোরো ধান বিপদে
· Prothom Alo

কৃষক মনির উদ্দিন (৫২) এবার হাওরে চার একর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছেন। পুরো পরিবারের খাওয়াদাওয়া, বাচ্চাদের লেখাপড়াসহ সব খরচ আসে এই ধান থেকে। কিন্তু গত কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি, ঝড়, শিলাবৃষ্টি তাঁকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছে।
Visit milkshakeslot.com for more information.
মনির উদ্দিন বলেন, প্রথম দিকের হালকা বৃষ্টি ফসলের জন্য ভালো ছিল। পরে অতিবৃষ্টিতে হাওরে পানি জমে গেছে। শিলায় ক্ষতি হয়েছে। এখন যদি আরও বৃষ্টি হয়, বন্যা হয়, তাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।
শুধু মনির উদ্দিন একা নন, সুনামগঞ্জের হাওর এলাকার অনেক কৃষকই তাঁদের জমির ফসল নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন, অনেকে আতঙ্কে আছেন। ভারী বৃষ্টিতে অনেক ফসল রক্ষা বাঁধে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এতে ঝুঁকিতে পড়তে পারে হাওরের ফসল।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বলছে, আগামী এক সপ্তাহ সুনামগঞ্জে হালকা ও মাঝারি বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে। এতে নদ-নদীর পানি বাড়বে।
সুনামগঞ্জে গত কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাপক শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ে ক্ষতি হয়েছে বোরো ধানের।
কোনো কোনো হাওরে বাঁধ কেটে পানিনিষ্কাশনের চেষ্টা করছেন কৃষকেরা। আবার পাহাড়ি ঢল ও অকালবন্যার আশঙ্কায় হাওরের বাঁধ কাটতেও ভয় পাচ্ছেন অনেকে। কৃষকেরা বলেন, হাওরে বোরো ধানের গাছে এখনো থোড় (চাল) আসেনি। গাছগুলো এখনো নরম। এ অবস্থায় শিলাবৃষ্টিতে গাছের ক্ষতি হয়েছে বেশি। আবার ভারী বৃষ্টিতে পানি জমে হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দেওয়ায় ধানগাছের নিচটা পচে যেতে পারে।
কৃষক মনির উদ্দিনের বাড়ি সদর উপজেলার দেখার হাওরপারের ফতেপুর গ্রামে। দেখার হাওরেই তাঁর সব জমি। গত মঙ্গলবার সকালে হাওরপাড়ে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি নিজের জমির কাছে গিয়ে তাতে জমে থাকা বৃষ্টির পানি দেখান।
এ সময় গ্রামের আরেক কৃষক শামস উদ্দিন (৫০) বলেন, এই পানি খুবই ঠান্ডা। গাছের গোড়াতে বেশি দিন থাকলে গাছ পচে যাবে। শিলাবৃষ্টিতে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তিন-চার দিন গেলে পুরোটা বোঝা যাবে।
লালপুর গ্রামের কৃষক আবদুন নূর (৬০) হাওরে পাঁচ একর জমিতে বোরো আবাদ করেছেন। তিনি বলেন, ‘সব হাওরেই ডুবরা (জলাবদ্ধতা) আছে। যদি আরও বেশি মেঘ (বৃষ্টি) অয়, তাইলে ক্ষতি বাড়ব। এখন ডর বন্যা লইয়া।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অতিবৃষ্টিতে জেলার সদর উপজেলার জোয়ারভাঙা হাওর ও কানলার হাওর, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার করচার হাওর, শান্তিগঞ্জ উপজেলার খাই হাওর ও পাখিমারা হাওর, শাল্লা উপজেলার ছায়ার হাওর, জামালগঞ্জ উপজেলার হালির হাওর, তাহিরপুর উপজেলার শনির হাওরসহ বিভিন্ন হাওরে কমবেশি জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে জোয়ারভাঙা হাওরে পানিনিষ্কাশনের জন্য একটি বাঁধের কিছু অংশ কেটে দিয়েছেন কৃষকেরা।
ওই হাওরে গিয়ে ফসলের ক্ষতি ও বাঁধের অবস্থা দেখে এসেছেন ‘হাওর বাঁচাও আন্দোলন’ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায়। তিনি বলেন, হাওরে একদিকে পানি আছে, অন্যদিকে নেই। বাঁধের কাজও ভালো হয়নি। বৃষ্টিতে ফাটল দেখা দিয়েছে। কৃষকেরা চিন্তায় আছেন। বাঁধের কাজ সন্তোষজনক হয়নি। ফসলের ক্ষতি হলে এর দায় প্রশাসন ও পাউবোকে নিতে হবে।
হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন সুনামগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক বলেন, হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধের কাজের নির্ধারিত সময় শেষ হয়েছে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু এখনো কাজ শেষ হয়নি। অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের কারণেই কোনো কোনো হাওরে ফসল জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। সব উপজেলাতেই শিলাবৃষ্টিতে ধানের ক্ষতি হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানান, জেলায় এবার দুই লাখ ২৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। তাঁদের হিসাবমতে, জেলায় ৩৭০ হেক্টর জমি শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যেসব হাওরে পানিনিষ্কাশনের সুযোগ আছে, সেটি করে দিতে হবে। বৃষ্টি থেমে রোদ উঠলে পানি নেমে যাবে।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় এবার ১৪৫ কোটি ব্যয় ধরে ৭১০টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সংস্কার ও নির্মাণ হচ্ছে। কিন্তু এখনো বাঁধের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি।
সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগামী এক সপ্তাহ বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে। তবে ভারী বৃষ্টি কম হবে। আমরা বাঁধগুলো পর্যবেক্ষণে রাখছি। যেখানেই সমস্যা হচ্ছে, সেখানে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় কৃষক ও সাধারণ মানুষজনকে সচেতন থাকতে হবে।’