জ্বালানি আমদানিতে বাড়তি ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার
· Prothom Alo

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেল আমদানি নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সরবরাহ সংকটের কারণে তেলের দাম বাড়ছে। এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার গ্রীষ্মকালের প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানির জন্য বিভিন্ন ঋণদাতা সংস্থার কাছ থেকে বাড়তি ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করছে।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
বিষয়টি নিশ্চিত করে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাণিজ্য অর্থায়ন হিসেবে ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকে (আইএসডিবি) ২ দশমিক ১ বিলিয়ন বা ২১০ কোটি এবং বিশ্বব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনে (আইএফসি) দশমিক ৫০ বিলিয়ন বা ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ অনুমোদন হয়ে আছে। এই অর্থ জ্বালানি আমদানিতে আমরা ব্যবহার করতে পারব।’
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাজেট সহায়তা হিসেবে আমাদের আগামী জুলাইয়ে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন বা ১৩০ কোটি ডলার ছাড় করার কথা। সেটি আমরা জুনের মধ্যে দিতে বলব। এ ছাড়া এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) আমাদের ৫০০ মিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা হিসেবে অনুমোদন দিয়ে রেখেছে। সেটি আরও ২৫০ মিলিয়ন থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার বাড়াতে এডিবিকে অনুরোধ করব আমরা।’
জ্বালানি বিভাগ সূত্র বলছে, দেশের জ্বালানি তেলের প্রায় শতভাগই আমদানিনির্ভর। এর মধ্যে অপরিশোধিত জ্বালানির পুরোটা আসে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে। তবে পরিশোধিত জ্বালানি আসে বিভিন্ন দেশ থেকে। এ ছাড়া দেশের গ্যাসের চাহিদার ৩৫ শতাংশ পূরণ করে আমদানি করা এলএনজি, যার বেশির ভাগ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। ইরানও পাল্টা জবাব দেয়। এর জেরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এতে প্রায় অচল হয়ে গেছে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম পথ ইরানের হরমুজ প্রণালি। জ্বালানিসমৃদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে জ্বালানি সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটছে। উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। পরে ১০০ ডলারের নিচে নামলেও আবার বেড়ে যায়।
অবশ্য ১৮ মার্চ ভোরে বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র ইরানের সাউথ পার্সে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। ইরানের পাশাপাশি কাতারও সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রটির অংশীদার। মূলত গ্যাসক্ষেত্রটি দুই ভাগে বিভক্ত। ইরানের অংশটি সাউথ পার্স আর কাতারের অংশটি নর্থ ডোম নামে পরিচিত। সাউথ পার্সে হামলার কয়েক ঘণ্টা পর কাতার জানায়, ইরানের হুমকির পর কাতারের রাস লাফান শিল্প এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এখানে নর্থ ডোম থেকে উত্তোলিত গ্যাস প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এই খবর গণমাধ্যমে প্রকাশের পর গত বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে যায়।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী জ্বালানি নিয়ে অস্থিরতার এই সময়ে আমরা ত্রিমুখী জ্বালানি নীতি নিয়ে এগোচ্ছি। প্রথমত, আমরা বহুবিধ উৎস থেকে জ্বালানি কেনার চেষ্টা করব। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি আমদানির অর্থায়নের জন্য বিভিন্ন ঋণদাতা সংস্থা থেকে ঋণ নেব। তৃতীয়ত, দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানির দাম বাড়াব না। এ ছাড়া আমরা বিশ্বব্যাংকের কাছেও বাজেট সহায়তা চাইব।’
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘জ্বালানির জন্য আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার কারণ হচ্ছে আমরা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেব না।’ তিনি আরও বলেন, স্বল্প মেয়াদে জ্বালানি আমদানির জন্য অর্থায়ন নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। অবশ্য মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে ভিন্ন কথা।
জ্বালানি বিভাগের একটি সূত্র বলছে, চলতি মাসে মোট ১৮টি জাহাজ আসার কথা। এর মধ্যে ৭টি জাহাজ এসে গেছে। সেগুলো থেকে তেল খালাস করা হয়েছে। আগামী সপ্তাহে আরও ৫টি জাহাজ আসার সময়সূচি নিশ্চিত হয়েছে। এর মধ্যে চারটিতে ডিজেল ও একটিতে ফার্নেস তেল থাকবে। তবে আরও পাঁচটি জাহাজের সময়সূচি এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আর একটি এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে আসতে পারে। এগুলো পিছিয়ে গেলে মজুত নিয়ে শঙ্কা তৈরি হবে। বিকল্প উৎস থেকে সরাসরি জ্বালানি তেল কিনতে আলোচনা করছে সরকার। সৌদি আরব থেকে ১ লাখ টন ডিজেল ও ২৫ হাজার টন অকটেন কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কাজাখস্তান থেকে ২ লাখ টন ডিজেল আনার প্রক্রিয়া চলছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার খরচ করে। যার মধ্যে রয়েছে অপরিশোধিত তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ও কয়লা। এলএনজি আমদানিতে দেশের জ্বালানি ব্যয় বাড়ছে। গত ২০২৫ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার খরচ করে ১০৯ কার্গো এলএনজি আমদানি করেছে। ২০২৪ সালে ৮৬টি কার্গো এলএনজির জন্য খরচ হয়েছিল প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার।