আগ্রাবাদ যেভাবে চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠল

· Prothom Alo

১৬৬৫ সালে চট্টগ্রাম মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর মোগল সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশ এ অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে। ইতিহাসবিদদের ধারণা, সেই সময় আগ্রাবাদ এলাকায় বসতি গড়া কোনো মোগল সৈনিক নিজ জন্মভূমি আগ্রার স্মৃতিকে ধারণ করতেই এই এলাকার নাম করেন ‘আগ্রাবাদ’। সময়ের পরিক্রমায় সেই আগ্রাবাদই আজ বন্দরনগরের বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র।

দেশভাগের আগে আগ্রাবাদ ছিল একেবারেই একটি গণ্ডগ্রাম। কাঁচা রাস্তা, ছড়ানো-ছিটানো বসতি আর সীমিত জনজীবন—এ–ই ছিল তৎকালীন আগ্রাবাদের চিত্র। কিন্তু পাকিস্তান আমলে পরিকল্পিত নগরায়ণের হাত ধরে আগ্রাবাদ দ্রুত আধুনিক শহরাঞ্চলে রূপ নিতে শুরু করে। স্বাধীনতার পর সেই ধারাবাহিকতা আরও জোরালো হয়। বর্তমানে এটি বাণিজ্যিক এলাকা।

Visit betsport24.es for more information.

বিভিন্ন ইতিহাস গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ১৯৫০-এর দশকে এ অঞ্চলের পরিকল্পিত উন্নয়ন শুরু হয়। ১৯৮০-এর দশক থেকে দ্রুত নগরায়ণের ফলে আগ্রাবাদ আধুনিক শহরাঞ্চলে রূপ নেয়, হয়ে ওঠে বন্দরনগরের বাণিজ্যিক কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু। গবেষক ও ইতিহাসবিদ আবদুল হক চৌধুরী তাঁর গ্রন্থ বন্দর শহর চট্টগ্রাম–এ আগ্রাবাদকে বন্দরনগরের বাণিজ্যিক এলাকার প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষায়, চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক স্পন্দনের বড় অংশই আগ্রাবাদকেন্দ্রিক। বর্তমানে আগ্রাবাদজুড়ে আমদানি–রপ্তানি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বহুজাতিক কোম্পানির প্রধান কার্যালয়, বাণিজ্য সংগঠন, বিমাপ্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি কোম্পানি ও বড় বিপণিবিতানের অবস্থান। দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর আঞ্চলিক কার্যালয়, আন্তর্জাতিক শিপিং ও লজিস্টিকস কোম্পানি, পোশাক ও শিল্প খাতের গুরুত্বপূর্ণ অফিসগুলো এখানে গড়ে উঠেছে। ফলে প্রতিদিন হাজারো মানুষের কর্মজীবন আবর্তিত হচ্ছে আগ্রাবাদকে কেন্দ্র করে।

আগ্রাবাদের উত্তরে চৌমুহনী, দক্ষিণে বারিক বিল্ডিং মোড়, পূর্বে মোগলটুলী ও মাদারবাড়ি এবং পশ্চিমে হালিশহর। এলাকাটির সঙ্গে যুক্ত বাদামতলী মোড়, ঢাকা ট্রাংক রোড, শেখ মুজিব সড়কসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। স্ট্র্যান্ড রোড ও সদরঘাটের নিকটবর্তী অবস্থান আগ্রাবাদকে বন্দর ও বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত করেছে।

বন্দর পেরিয়ে বাণিজ্য এলাকা

চট্টগ্রাম বন্দরের ১ নম্বর গেট থেকে বের হয়ে বারিক বিল্ডিং মোড়ের ডান দিকে স্ট্র্যান্ড সড়ক। সেখানে একসময় কাস্টমসের প্রধান অফিস ছিল। বারিক বিল্ডিং থেকে সোজা গেলেই আগ্রাবাদ মোড় বা বাদামতলী মোড়। এর আশপাশের অন্তত এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা। অন্তত ২৫টি ব্যাংকের কার্যালয় এখানে আছে।

আগ্রাবাদের বাদামতলী ও ব্যাংকপাড়াকেন্দ্রিক এলাকায় ঐতিহাসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থাপনার উপস্থিতি আশপাশের জমি ও ভবনের মূল্য বাড়িয়েছে। জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘর, সরকারি করপোরেশনের দপ্তর এবং হোটেল আগ্রাবাদ—এসব ল্যান্ডমার্ক এলাকাটিকে একটি স্বীকৃত করপোরেট ঠিকানায় পরিণত করেছে। বিশেষ করে ১৯৬৯ সালে নির্মিত চার তারকা হোটেল আগ্রাবাদ করপোরেট অতিথি ও ব্যবসায়িক ইভেন্টের কেন্দ্র হওয়ায় আশপাশের বাণিজ্যিক স্থাপনার চাহিদা স্থায়ীভাবে ধরে রেখেছে।

৫০ বছর ধরে এই এলাকার বাসিন্দা আবদুল জলিল। আগ্রাবাদ সরকারি কমার্স কলেজের পাশে তাঁর বাড়ি। তিনি জানান, স্বাধীনতার পর থেকে ব্যবসাক্ষেত্রে আগ্রাবাদ এলাকার গুরুত্ব অনেক। আগ্রাবাদের এক কিলোমিটার এলাকার মধ্যে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর। পাশে সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশন, জীবন বীমা অফিস, চেম্বার ভবনসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। চট্টগ্রামে ব্যবসা পরিচালনা করতে হলে একবার হলেও এখানে আসতে হবে।

চট্টগ্রামে ব্যবসা পরিচালনা করতে হলে একবার হলেও আগ্রাবাদে আসতে হবে

বাণিজ্য থেকে সরকারি দপ্তর

চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকেই পরিচালিত হয় বাংলাদেশে আমদানি-রপ্তানির সিংহভাগ। আর এই বন্দরের কাছেই দেশের একমাত্র বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র। শেখ মুজিব সড়ক থেকে কমার্স কলেজের দিকে সোজা এগিয়ে গেলেই ২১ তলা ভবনটি চোখে পড়বে। ২০১৬ সালে উদ্বোধন করা হয় এই ওয়ার্ল্ড ট্রেন্ড সেন্টার। তুলনামূলক নতুন ভবন হলেও যে সংগঠনের অধীন এটি প্রতিষ্ঠা হয়েছে, শতবর্ষ আগে সেটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

ওয়ার্ল্ড ট্রেন্ড সেন্টারের পরিচালন সংগঠন দি চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি। চট্টগ্রামে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ এই সংগঠন স্থাপিত হয়েছে ১৯০৬ সালে। পুরোনো দ্বিতল চেম্বার ভবনটি আগ্রাবাদ মোড় লাগোয়া। ১৪ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান এই চেম্বারের সঙ্গে সংযুক্ত। এর মধ্যে তৈরি পোশাক কারখানা, ট্রেডিং কোম্পানি, রাসায়নিক কোম্পানি, যন্ত্রাংশ এবং গাড়ি আমদানি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।

আগ্রাবাদ মোড় থেকে এক্সেস সড়ক ধরে এগোলে বাণিজ্য পাড়া পেরিয়ে শুরু হয় সরকারি পাড়া। এখানেই চট্টগ্রামের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কার্যভবন। এই দুই ভবনে কমপক্ষে ৩০টি সরকারি দপ্তরের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন, সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরসহ বন্দর, শিল্প, রাজস্ব ও প্রশাসনসংশ্লিষ্ট একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর। পাশাপাশি ১০টি সরকারি কলোনি রয়েছে।

সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম নগরের বাণিজ্যিক মানচিত্রে আগ্রাবাদ একটি আলাদা স্থান দখল করে আছে। ইতিহাস, বন্দরনির্ভর অর্থনীতি ও দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত নগরায়ণের ধারাবাহিকতায় এ এলাকা আজ রিয়েল এস্টেটের দৃষ্টিতে চট্টগ্রামের সবচেয়ে স্থিতিশীল ও মূল্যবান বাণিজ্যিক অঞ্চল। জমির ব্যবহার, ভবনের ধরন ও বিনিয়োগের নিরাপত্তা—সব দিক থেকেই আগ্রাবাদকে একটি পরিণত বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে বিবেচনা করছেন নগরবিশেষজ্ঞ ও রিয়েল এস্টেট বিশ্লেষকেরা।

ইকুইটি প্রপার্টি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী আইনুল হক বলেন, আগ্রাবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা হলেও ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা ভাসমান দোকানপাট এর সৌন্দর্য ও শৃঙ্খলা নষ্ট করছে। এ এলাকাকে সত্যিকার অর্থে আধুনিক বাণিজ্যিক কেন্দ্রে রূপ দিতে হলে এসব সমস্যার সমাধান জরুরি। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা ও কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। এতে আবাসন খাতের বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হবেন।

ঈদের ছুটিতে উত্তরবঙ্গে যাবেন? রইল কিছু বেড়ানোর জায়গা আর রিসোর্টের খোঁজ

Read full story at source