ভবানীপুরে মমতা–শুভেন্দু: নন্দীগ্রামের লড়াই এবার কলকাতায়
· Prothom Alo

দক্ষিণ কলকাতার পুরোনো এলাকা ভবানীপুর। সংকীর্ণ গলি, ব্যস্ত বাজার আর রাজনৈতিক ইতিহাসের ভারে নুয়ে থাকা এক জনপদ—এবার হয়ে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত মঞ্চ। এখানে মুখোমুখি দুই চেনা প্রতিদ্বন্দ্বী—রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিরোধী বিজেপির নেতা শুভেন্দু অধিকারী।
Visit mwafrika.life for more information.
২০২১ সালের নন্দীগ্রামের উত্তাপ যেন নতুন করে ফিরে এসেছে ভবানীপুরের রাস্তায়। তবে এবার লড়াইয়ের মঞ্চ বদলেছে, বদলায়নি প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
পূজার মধ্য দিয়ে প্রচারের শুরু, প্রতীকী বার্তা
গতকাল সকালেই ভবানীপুরে প্রচারে নামেন শুভেন্দু অধিকারী। প্রচার শুরুর আগে তিনি কালীঘাট কালীমন্দিরে পূজা দেন।
কিছুক্ষণ পরেই একই পথে হাঁটেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। সন্ধ্যায় কালীঘাটের বগলামুখী মন্দিরে পূজা দিয়ে তিনিও শুরু করেন প্রচার।
দুই শিবিরের এই ধর্মীয় আচার কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়—এ যেন ভোটের আগে প্রতীকী শক্তি প্রদর্শনও।
নন্দীগ্রাম থেকে ভবানীপুর: প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধারাবাহিকতা
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ১ হাজার ৯৫৬ ভোটে হারিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। সেই ফলাফল ছিল রাজ্যের রাজনীতিতে বড় মোড়।
পরে ভবানীপুরের উপনির্বাচনে জিতে মুখ্যমন্ত্রীর পদ ধরে রাখেন মমতা।
এবার সেই ভবানীপুরেই আবার মুখোমুখি দুই নেতা। তবে শুভেন্দু শুধু এখানেই নয়, নিজের পুরোনো আসন নন্দীগ্রাম থেকেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন—দুটি আসনেই লড়ছেন তিনি।
পুরো পশ্চিমবঙ্গেই এখন নির্বাচনী উত্তাপ। শাসক তৃণমূল ইতিমধ্যে ২৯৪টির মধ্যে ২৯১টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে।
অন্যদিকে বিজেপি ২৫৫ জন, বামফ্রন্ট ২২৪ জন এবং এসইউসিআই ২৩০ জন প্রার্থী ঘোষণা করেছে।
গতকাল সকালেই ভবানীপুরে প্রচারে নামেন শুভেন্দু অধিকারী। প্রচার শুরুর আগে তিনি কালীঘাট কালীমন্দিরে পূজা দেনকংগ্রেস এখনো প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করেনি। তবে জানা গেছে, নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী বহরমপুরে লড়বেন।
তবে এই সংখ্যার হিসাবের ভিড়ে সবচেয়ে আলোচিত হয়ে উঠেছে ভবানীপুর। কারণ, এখানে লড়াইটা শুধু একটি আসনের নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতীকী শক্তির।
ভবানীপুর আসনে তীব্র লড়াইয়ের একটি সম্ভাবনা আছে। আর সেই সম্ভাবনার কারণেই আসনটি ঘিরে মানুষের এত আগ্রহ। এ আসনে ৩০ থেকে ৩৪ শতাংশ অবাঙালি ভোট আছে। যার সিংহভাগ বিজেপির দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দুটি ওয়ার্ডে মুসলিম ভোটের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। সেই ভোট তৃণমূলের দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ভবানীপুরে বেশ কিছু বস্তি এলাকাও রয়েছে। সেখানেও তৃণমূলের প্রভাবই বেশি। কিন্তু ভবানীপুরে ঠিক একইভাবে মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত ভোটার, অভিজাত বহুতলবাসী ভোটারের সংখ্যাও যথেষ্ট। তাঁদের অধিকাংশই অশান্তি এড়াতে ভোটের দিনে ভোটকেন্দ্রমুখী হন না। এবার নির্বাচন কমিশনের কঠোর ভূমিকার জেরে অশান্তি তৈরি করা তৃণমূলের পক্ষে কঠিন হবে। তার ওপর আবার বহুতলবাসীদের সুবিধার জন্য বেশ কিছু আবাসন চত্বরের ভেতরেই বুথ তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে বহুতলের বাসিন্দাদের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। আর এই বহুতলবাসীদের সিংহভাগ ভোট দিতে নামলে ভবানীপুরের ভোটচিত্র অনেকটাই বদলে যেতে পারে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে এসআইআর। ইতিমধ্যেই ভবানীপুরের ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৪৮ হাজার নাম বাদ পড়েছে। আরও ১৪ হাজারের মতো নাম বাদ পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। এই মৃত এবং অস্তিত্বহীন ভোটারদের নাম বাদ পড়ার ফলে ভুয়া ভোট দেওয়ার সুযোগ খুবই কমে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে ভবানীপুরের যুদ্ধ এবার তৃণমূলের জন্য আর মোটেই মসৃণ নেই।
প্রচারে জাতীয় নেতাদের ভিড়
নির্বাচনী প্রচারকে তুঙ্গে তুলতে আবারও পশ্চিমবঙ্গে আসছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
এর আগে তিনি কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে মহাসমাবেশসহ একাধিক জনসভা করেছেন। এবার ৩০ মার্চের পর শুরু হতে পারে তাঁর নতুন প্রচারপর্ব, যেখানে প্রায় ১৪টি জনসভা ও রোড শো করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিজেপির প্রচারে আরও থাকছেন অমিত শাহ, জে পি নাড্ডা, যোগী আদিত্য এবং অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী।
আত্মবিশ্বাস বনাম পাল্টা দাবি
তৃণমূলের দাবি, টানা চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করবে তারা এবং আগের ২১৩ আসনের চেয়েও বেশি আসন পাবে।
অন্যদিকে বিজেপি বলছে, এবার বাংলায় ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার গড়বে তারা—অর্থাৎ কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের শাসন।
প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পর থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয়েছে জোর প্রচার। দেয়াললিখন, পোস্টার, ব্যানারে ঢেকে যাচ্ছে শহর ও মফস্সল।
কিন্তু এই সামগ্রিক চিত্রের মধ্যেও ভবানীপুর যেন আলাদা—এখানে প্রতিটি গলি, প্রতিটি মোড় এখন দুই নেতার লড়াইয়ের গল্প বলছে।