ইরানে জানুয়ারির বিক্ষোভ–হত্যাকাণ্ডে তাহলে কি মোসাদই নেতৃত্বে ছিল

· Prothom Alo

বিক্ষোভের নেতৃত্ব দেওয়া অনেক নেতা হঠাৎ হাওয়ায় মিলিয়ে যান। সাধারণ পথচারীদের গুলি করতে বিদেশি অস্ত্রের ব্যবহার দেখা গেছে। এমন সব বিষয় বিক্ষোভকারীদের মনে প্রশ্ন জাগিয়ে দিচ্ছে, তাঁরা কি ইসরায়েলি এজেন্ট মোসাদের সরাসরি তৎপরতা দেখছিলেন?

ইরানিদের কাছে মনে হচ্ছে, জানুয়ারি মাস যেন বহু যুগ আগের কথা। সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ওপর সরকারের দমন–পীড়নের যে ভয় ছিল, তা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গত এক মাসের অবিরাম হামলা এবং আসন্ন স্থল অভিযানের হুমকির ভিড়ে ঢাকা পড়ে গেছে।

Visit newsbetting.cv for more information.

তবু বিক্ষোভের সেই দিনগুলোতে ঘটে যাওয়া কিছু অদ্ভুত ও অমীমাংসিত ঘটনার স্মৃতি অনেকের মনে এখনো খচখচ করছে।

এক ইরানি নাগরিক বলেছেন, তিনি পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ছদ্মবেশে এক ব্যক্তিকে দেখেছিলেন, যিনি হঠাৎ পকেট থেকে রিভলবার বের করে একটি শান্ত গলির মধ্যে দুই তরুণীকে গুলি করে।

অন্যরা মনে করছেন, ব্ল্যাক ব্লক বা একই ধরনের পোশাক পরা কিছু সুসংঘবদ্ধ দল বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিচ্ছিল। আবার এমন কিছু মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, যাঁদের শরীরে এমন সব অস্ত্রের আঘাত পাওয়া গেছে, যা সাধারণত ইরানের সরকারি বাহিনী ব্যবহার করে না।

চলতি বছরের শুরুতে ইরানে দেশব্যাপী এই সর্বশেষ বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। মুদ্রাস্ফীতির প্রতিবাদে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে শুরু হওয়া এই আন্দোলন দ্রুত দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। পুরো ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে তা জনগণের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশে পরিণত হয়।

বিক্ষোভ চলাকালে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং ইসরায়েলের ঐতিহ্যবিষয়ক মন্ত্রী আমিচাই এলিয়াহুর মতো ব্যক্তিরা বলেছিলেন, বিক্ষোভকারীদের মধ্যে মোসাদের এজেন্টরা উপস্থিত ছিল।

নিউইয়র্ক টাইমসে ২২ মার্চ প্রকাশিত এক খবরে জানা গেছে, সাম্প্রতিক যুদ্ধের আগে মোসাদপ্রধান ইসরায়েলি ও মার্কিন কর্মকর্তাদের বলেছিলেন, ইরানে তাঁর এজেন্টরা নতুন গণ–অভ্যুত্থান ঘটাতে পারে। ভেতর থেকে তারা সরকার উৎখাত করতে সক্ষম।

মিডল ইস্ট আই স্বতন্ত্রভাবে এসব দাবির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ, সরকারি বিবৃতি এবং আগের প্রমাণগুলো এমন একধরনের ছকের দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা মাঠপর্যায়ে বিদেশি প্রভাবের কথা জানান দেয়।

মোসাদ বছরের পর বছর ধরে ইরানে এজেন্ট পরিচালনা করছে, নাশকতামূলক কাজ করছে এবং পারমাণবিক বিজ্ঞানী, সামরিক কমান্ডার এমনকি হামাসের রাজনৈতিক নেতা ইসমাইল হানিয়াকেও হত্যা করেছে।

গত বছরের জুনে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েলের ১২ দিনের সংঘাতের সময় দেখা গিয়েছিল, ইসরায়েল ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ স্তরে অনুপ্রবেশ করেছে এবং মাঠপর্যায়ে তাদের বেশ কয়েকজন এজেন্ট ছিল।

এবার ইরানি কর্তৃপক্ষ বলছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তারা বিভিন্ন শহর থেকে অন্তত ৪৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের বিরুদ্ধে ‘গোয়েন্দাগিরি’ এবং ‘শত্রু রাষ্ট্রের সঙ্গে যোগসাজশ’-এর অভিযোগ রয়েছে।

ছদ্মবেশী বন্দুকধারী

কয়েক দিনের অস্থিরতার পর ৮ জানুয়ারি থেকে ইরানি কর্তৃপক্ষ শক্ত হাতে বিক্ষোভ দমন করতে শুরু করে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সহিংসতায় বিক্ষোভকারী, নিরাপত্তা বাহিনী এবং সাধারণ পথচারীসহ ৩ হাজার ১১৭ জন নিহত হয়েছেন।

বিরোধী দলগুলো বলছে, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ-এর দাবি অনুযায়ী, মৃত্যুর সংখ্যা অন্তত ৭ হাজার ১৫ জন।

ইরানের পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, রেভোল্যুশনারি গার্ড (আইআরজিসি) এবং আধা সামরিক বাহিনী বাসিজ এর আগেও বিক্ষোভ দমনে কঠোরতা দেখিয়েছে, যার বড় উদাহরণ ২০২২ সালের মাসা আমিনির মৃত্যুকে ঘিরে বিক্ষোভ। তবু জানুয়ারি মাসের নিহত ব্যক্তির সংখ্যা তাদের নিজেদের মানদণ্ডেও অনেক বেশি ছিল।

ইরানে অস্থিরতার জেরে দাউ দাউ করে জ্বলছে সারি সারি গাড়ি। ৯ জানুয়ারি ২০২৬, ইসফাহান

সরকার পক্ষ জোর দিয়ে বলছে, কিছু হত্যাকাণ্ডের জন্য মোসাদের সঙ্গে যুক্ত এজেন্টরা দায়ী ছিল। সরকারের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেহেদি খারাতিয়ান এসব হত্যাকাণ্ডকে ২০২৪ সালে লেবাননের সেই পেজার হামলার সঙ্গে তুলনা করেছেন, যেখানে ইসরায়েল হাজার হাজার হিজবুল্লাহ যোদ্ধার ব্যবহৃত ডিভাইস বিস্ফোরিত করেছিল।

খারাতিয়ান বলেন, ‘ইরানে লেবাননের পেজারের মতো একটি বড় ধাক্কার প্রয়োজন ছিল। বিশ্ব জনমতকে প্রভাবিত করতে এবং সামরিক হামলার পথ প্রশস্ত করতে ইরানে রক্ত ঝরানোর প্রয়োজন ছিল।’

‘ব্ল্যাক ব্লক’ বা একই রঙের পোশাক পরা অজ্ঞাতপরিচয় দল

জানুয়ারির বিক্ষোভে অংশ নেওয়া সূত্রগুলো ‘মিডল ইস্ট আই’কে এমন সব ঘটনার কথা জানিয়েছে, যা ইরানের আগের কোনো অভ্যুত্থানে দেখা যায়নি।

একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, তেহরানের উপকণ্ঠে তিনি এমন কিছু মানুষকে দেখেছিলেন, যারা স্পষ্টতই ‘অস্বাভাবিক’ প্রকৃতির ছিলেন এবং তাঁরা স্থানীয় বাসিন্দা ছিলেন না। তিনি এক ব্যক্তির কথা বলেন, যিনি একটি বড় সড়ক আটকে বিক্ষোভকারীদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন।

সেই প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘আমাদের এলাকায় সাধারণত তেমন কিছু হয় না। তাই এত মানুষ বিক্ষোভ করছে দেখে খুব অবাক হয়েছিলাম। তারা সড়কের সাইনবোর্ড ছিঁড়ে ফেলছিল এবং ময়লার বক্সে আগুন দিচ্ছিল। তাদের নেতা আমাকে বললেন, সড়ক বন্ধ এবং আমি গাড়ি নিয়ে যেতে পারব না। আমি যখন জিজ্ঞেস করলাম, গলি দিয়ে বাড়ি যাওয়া যাবে কি না। তিনি জানেন না বলে জানান এবং তিনি এই এলাকার লোক নন।’

বিক্ষোভ চলাকালে একটি সড়ক অবরোধের দৃশ্য। ইরানের রাজধানী তেহরানে, ৯ জানুয়ারি ২০২৬

অন্য এক প্রত্যক্ষদর্শী ৮ জানুয়ারি পূর্ব তেহরানের বিক্ষোভের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, মাস্ক পরা একটি ছোট দল একসঙ্গে চলাফেরা করছিল এবং স্লোগান দিয়ে মানুষজনকে নেতৃত্ব দিচ্ছিল। তারা অনেকটা ‘ব্ল্যাক ব্লক’–এর (অজ্ঞাতপরিচয় মানুষ যাঁরা একই রঙের পোশাক পরা) মতো আচরণ করছিল। এটি মূলত ইউরোপ-আমেরিকার এক প্রতিবাদী কৌশল, যেখানে বিক্ষোভকারীরা একই রঙের কাপড় পরে নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে রাখে। ইরানে এমন বিক্ষোভ সচরাচর দেখা যায় না।  

ওই প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘সংঘর্ষ শুরু হওয়া মাত্রই তারা চোখের পলকে উধাও হয়ে যায়।’

উদ্দেশ্যহীন হত্যাকাণ্ড

পশ্চিমা বিশ্বভিত্তিক এইচআরএএনএ এবং অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেই বিক্ষোভকারী বা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ছিলেন না। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, অজানা আততায়ীরা সাধারণ পথচারীদের লক্ষ্য করে উদ্দেশ্যহীনভাবে গুলি চালিয়েছে।

সরকারি বাহিনীও অনেক মানুষ হত্যা করেছে। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তাঁরা যা দেখেছেন তা সাধারণ নিরাপত্তা বাহিনীর কাজের মতো ছিল না।

উত্তর ইরানের কাস্পিয়ান সাগরের কাছের একটি শহরের এক বাসিন্দা বলেন, ৯ জানুয়ারি তিনি ছাদ থেকে দেখছিলেন, দুজন তরুণী বিক্ষোভের মূল কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে একটি গলি ধরে হাঁটছিলেন। হঠাৎ এক ঝাড়ুদার পকেট থেকে পিস্তল বের করে তাদের গুলি করে। মেয়ে দুটি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

তেহরান থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূরে কাজভিন শহরেও একই ধরনের একটি ঘটনার খবর আইআরজিসির সূত্র নিশ্চিত করেছে। সেখানে মা ও তার ছোট ছেলে এমন এক সড়কে নিহত হয়েছেন, যেখানে কোনো বিক্ষোভই ছিল না। যে অস্ত্র দিয়ে তাদের মারা হয়েছে, সেটি ইরানের কোনো বাহিনীর অস্ত্র নয়।

ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় পুড়িয়ে দেওয়া একটি সরকারি ভবনের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন কয়েকজন নারী। ২১ জানুয়ারি ২০২৬, তেহরান

মোসাদ কেন সাধারণ মানুষকে লক্ষ্যহীনভাবে হত্যা করবে সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া না গেলেও, সেই সময় ইরানে তাদের সক্রিয় থাকার অনেক ইঙ্গিত পাওয়া যায়। মোসাদের সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচিত একটি ফার্সি এক্স (টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে ২৯ ডিসেম্বর পোস্ট করা হয়—‘চলুন সবাই একসঙ্গে রাজপথে নামি। সময় এসেছে। আমরা আপনাদের সঙ্গে আছি। শুধু দূর থেকে বা কথায় নয়, আমরা আপনাদের সঙ্গে মাঠপর্যায়েও আছি।’

ইরানে বিক্ষোভের সময় হাজার হাজার মানুষকে আসলে হত্যা করল কারা

ইসরায়েলের মন্ত্রী আমিচাই এলিয়াহুও সে সময় জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি আপনাদের আশ্বস্ত করছি, আমাদের লোকেরা এখন সেখানে কাজ করছেন।’

একইভাবে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও লিখেছিলেন, ‘রাজপথে থাকা প্রত্যেক ইরানিকে নববর্ষের শুভেচ্ছা। আর তাঁদের পাশে হাঁটতে থাকা প্রতিটি মোসাদ এজেন্টকেও...।’

ইরানি কর্মকর্তারাও বিভিন্ন সময় উচ্চ হতাহতের জন্য মোসাদকে দায়ী করেছেন। তবে বিক্ষোভকারীদের অধিকাংশ এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

কোনো কিছুই নিশ্চিত নয়

তেহরানের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এক অধ্যাপক বলেন, এসব দাবি বর্তমান বিশৃঙ্খলার মধ্যে এখনো অপ্রমাণিত। তিনি বলেন, ‘আমরা এমন এক সমাজের কথা বলছি, যারা বিক্ষোভ এবং এখন যুদ্ধের গভীর ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে। সরকার সহিংসতার চক্রকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে, এসব দাবি সত্য হলেও মানুষ তা বিশ্বাস করবে না।’

তেহরানে শিক্ষার্থীদের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ

২০ বছরের বেশি সময় ধরে শিক্ষকতা করা ওই অধ্যাপক বলেন, ‘১৯৯৯, ২০০৯, ২০১৭, ২০১৯ বা ২০২২ সালের তুলনায় বর্তমান ক্ষোভের মাত্রা অনেক বেশি। এখনকার তরুণেরা প্রতিশোধ ছাড়া আর কিছুই বোঝে না। তাঁদের সঙ্গে যুক্তি দিয়ে কথা বলা অসম্ভব।’

ইরানে বিক্ষোভে কমপক্ষে ৩ হাজার ১১৭ জন নিহত, প্রথমবার জানাল রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম

Read full story at source