বনের পাপিয়া কেন চোখ গেল বলে ডাকে
· Prothom Alo
সুবীর নন্দী একদা গেয়েছিলেন-
Visit afrikasportnews.co.za for more information.
‘যে কথা হৃদয়ে আকুল আলপনা আঁকে
স্মৃতির পাপিয়া চোখ গেল বলে ডাকে…’
পাপিয়া কি চোখ গেল বলে ডাকে? ডাকে; তবে প্রশ্ন হচ্ছে, কোন পাপিয়া?
বাংলাদেশে কয়েক প্রজাতির পাপিয়া আছে। এর মধ্যে আছে বউ কথা কও, চোখ গেল, করুণ পাপিয়া, চাতক বা পাকড়া পাপিয়া, শ্যামাপাপিয়া, খয়রা পাখা পাপিয়া, বেগুনি পাপিয়া, তামাপাপিয়া, মেটে পাপিয়া ইত্যাদি।
অর্থাৎ একধরনের পাপিয়ার নাম চোখ গেল। সব পাপিয়া চোখ গেল নয়। এদের ডাক শুনলে মনে হয় ‘চোখ গেল, চোখ গেল…’ বলে চিৎকার করছে। আবার একটু ভালো করে শুনলে মনে হয় ‘পিউ কাহা, পিউ কাহা…’ বলে ডাকছে। আসলে দুটোই ঠিক। পাখিরা মানুষের মতো হুবহু অর্থবোধক শব্দ উচ্চারণ করতে পারে না। তাই একই পাখির ডাক একেকজনের কাছে একেক রকম মনে হয়।
শুনতে যেমনই হোক, পাখিদের ডাক নিয়ে কত রূপকথা,কত গল্প আছে!
বৈসাবি উৎসবের নাম এসেছে যে ফুল থেকেসবচেয়ে পরিচিত গল্পটাই নাহয় শুনি। বউ-শাশুড়ির দ্বন্দ্ব। বউকে জব্দ করতে হবে। শাশুড়ি একটা ফন্দি আঁটে। দুপুরের রান্না শেষ। চুলার গনগনে কয়লার নিচে লুকিয়ে রাখে একটা কাঁচা বেল৷ পাকা বেলের মতো কাঁচা বেলে শরবত হয় না। তবে চুলোর আগুনে পুড়িয়ে দিলে বেশ লাগে খেতে৷ কিন্তু শাশুড়ির অন্য ধান্দা৷ বেল লুকিয়ে বউকে বলে, ‘ও লো বউ, আমি গোসল করতে যাচ্ছি। চুলার ভেতর একটা দামি জিনিস আছে। মিনিট দশেক পর ওটা বের কোরো।’
বউ ভাবে, কী না কী রেখেছে শাশুড়ি! বলা যায় না, দেরি হলে কী ক্ষতি হয়ে যায়! শাশুড়ি তখন অনর্থ করে বসবে! ঠিক ১০ মিনিট পর লাকড়ি দিয়ে কয়লার আগুন খুঁচিয়ে দেখার চেষ্টা করে। অমনি পোড়া বেল ‘দম’ করে ফেটে ছিটকে পড়ে চারপাশে। গরম বেলের ছিটা এসে লাগে বউয়ের চোখে। চোখ জ্বলে যায়, বউ ছটফট করে চোখের জ্বালায়। ততক্ষণে শাশুড়ি গোসল সেরে ফিরেছে। বউয়ের অবস্থা দেখে খুশি হয়। কিন্তু পাছে লোকনিন্দে হয়, তাই কিছুই না জানার ভান করে বলে, ‘ও বউ, তোমার কী হলো?’
জবাবে বউ বলে, ‘চোখ গেল!’
বারবার শাশুড়ি একই প্রশ্ন করে, বউ আসল কথা না বলে শুধু ‘চোখ গেল…চোখ গেল’ করে। শাশুড়ি তখন বলে, ‘বউ, কথা কও!’
বউয়ের ওই একই জবান, চোখ গেল!
প্রাণীরা যোগাযোগ করে কীভাবেশাশুড়ি ভাবে, বউয়ের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। একই জবাব দিচ্ছে, কিন্তু আসল কথা বলছে না। তারও আসলে মাথা খারাপ হয়। বারবার আওড়ায়, বউ কথা কও…বউ কথা কও!
বউ বলে, চোখ গেল…চোখ গেল। এভাবে চোখের যন্ত্রণা সইতে না পেরে পাখি হয়ে উড়ে যায় বউ। শাশুড়িও তখন পাখি হয়ে উড়তে উড়তে বউ পাখির পিছু নেয়। পেছন থেকে ‘বউ কথা কও’ বলে হাঁক ছাড়ে। বউও উড়তে উড়তে ‘চোখ গেল… চোখ গেল’ বলে ডাক ছাড়ে। এভাবে দেশের দুই অতি পরিচিত পাখি এই দুই ধরনের ডাক পেয়েছে। তাই এদের নামটাও এসেছে ওই ডাক থেকে; চোখ গেল ও বউ কথা কও।
গল্প তো গল্পই, শত শত বছর ধরে সমাজে এসব গল্প ঘুরে বেড়ায় পল্লিবাংলায়।
এদের ডাক সবচেয়ে বেশি শোনা যায় বসন্তকালে। বসন্তকালেই এই দুই পাখির প্রজনন মৌসুম শুরু হয়। বউ–শাশুড়ির গল্পের সঙ্গে আসলে এদের ডাকের কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ, এই শব্দে ডাকে শুধু পুরুষ পাখিরা।
বসন্তকালে খুব উঁচু ডালে বসে পুরুষ পাখি ‘পিউকাহা’ বা ‘চোখ গেল’ বলে ডাকে। উঁচু ডাল থেকে সেই ডাক ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে, বাতাসে ঢেউ কেটে। স্ত্রী পাখিরা সেই ডাকে আকৃষ্ট হয়ে পুরুষের কাছে ছুটে আসে।
জেন–জেডরা অতিরিক্ত খুশি হলে কান্নার ইমোজি ব্যবহার করেবউ কথা কও পাপিয়াঅন্যদিকে বউ কথা কও পুরুষ পাখি নিজেকে লুকিয়ে রাখে ঘন ডালপালার আড়াল থেকে। গুরুগম্ভীর অথচ মিষ্টি কণ্ঠে ওরা কিছুক্ষণ পরপর ডেকে চলে ছন্দ মেনে। ডাক শুনে ছুটে আসে স্ত্রী পাখি। সুতরাং ডাকে পুরুষ পাখিরাই। তাই বউ বা শাশুড়ি হওয়ার কোনো সুযোগ এদের নেই।
এই বসন্তে তুমি যদি গাঁয়ে থাকো, তাহলে শুনতে পাবে ‘পিউ কাহা’ কিংবা ‘চোখ গেল’ সুরে মুখর করে তুলেছে পাপিয়ার পুরুষ পাপিয়ার দল। তবে বউ কথা কও পাখির ডাক শোনা ভাগ্যের ব্যাপার।
কোকিলগোত্রীয় এই দুই পাখি দেখতে অনেকটা এক রকম। বউ কথা কওয়ের পেটের নিচের ক-সারি ডোরা দেখে এদের আলাদা করে চেনা যায়।
এক টুকরা পিৎজার ভেতর লুকিয়ে থাকা ইতিহাস