‘ঘটনা মনে পড়লে চোখে পানি আইসা যায়, বাঁচার তো কথাই ছিল না’
· Prothom Alo
‘সেদিন নাইট ডিউটিতে ছিলাম। কাজ করছিলাম নয়তলা বিল্ডিংয়ের সাততলায়। রাত একটা বাজার কিছুক্ষণ আগে বিল্ডিং ধসে পড়ে। জ্ঞান ফিরার পর দেখি আমার হাত আটকা পড়ছে। সামনে–পিছনে অনেকের লাশ ছিল। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে আমারে বাইর করছিলো। এরপর সিএমএইচে নিয়ে যায়, সেখানে অপারেশন কইরা বাঁ হাতের কনুই থেকে কেটে ফেলে। ঘটনা মনে পড়লে চোখে পানি আইসা যায়। বাঁচার তো কথাই ছিল না।’
Visit moryak.biz for more information.
বলছিলেন ঢাকার সাভারের পলাশবাড়ী এলাকায় স্পেকট্রাম সোয়েটার ইন্ডাস্ট্রিজের নিটিং অপারেটর ও মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার বাসিন্দা মো. নূরে আলম (৫০)। ২০০৫ সালের ১১ এপ্রিল ধসে পড়েছিল স্পেকট্রাম সোয়েটার ইন্ডাস্ট্রিজের নয়তলা ভবন। ওই ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন অন্তত ৬৪ জন শ্রমিক। আহত হন নূরে আলমসহ অনেকে।
মো. নূরে আলম বলেন, ‘১০ এপ্রিল দিনের বেলা বেতন দিছে। ওই বেতন আমার পকেটে ছিল। বিল্ডিং ধইসা পড়ে চাপা পড়ার পর আমার জ্ঞান ছিল না। জ্ঞান ফিরার পর দেখি আমার হাত আটকা পড়ছে। ডান পাশে কামাল হোসেন নামের একজন জীবিত ছিল। সে কান্নাকাটি করতেছিল। সামনে–পিছনে অনেকের মরদেহ ছিল। সকাল ১০টার দিকে আমার কাছে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন আসে।’
সেদিনের পরিস্থিতির বর্ণনা করে এই শ্রমিক আরও বলেন, ‘কিন্তু কেমনে বাইর করব, আমার উপরে আরও ৩টা ছাদ ধইসা পইড়া রইছে। আমি বলছি ছাদ কাইটা, নইলে আমার হাত কাইটা আমারে বাইর করেন। পরে ডাক্তার হাত কাটার জন্য আইসা দেখে পজিশন ভালো না। তাই বলছিল ছাদ কাটা ছাড়া বাইর করা সম্ভব না। পরে ছাদ কাইটা বেলা সাড়ে চারটার দিকে আমারে বাইর করছিল।’
আহত এই শ্রমিক আক্ষেপ করে বলেন, কাজে যোগদানের ২৪ দিনের মাথায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছিল। এখন একটা দোকানে ৮ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করেন। এই আয় দিয়ে সংসার চলে না। এখন যদি জীবন চলার মতো একটা চাকরি পেতেন, তাহলে আর চিন্তা থাকত না। ঘটনার পর কারখানার মালিক, বায়ার গ্রুপ আর বেসরকারিভাবে সব মিলিয়ে ৬-৭ লাখ টাকার মতো সাহায্য পেয়েছিলেন।
২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর সাভারের আশুলিয়ার ইয়ারপুর ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুর এলাকায় তাজরীন ফ্যাশনসের ভয়াবহ আগুন এবং ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় রানা প্লাজা ধসের পর স্পেকট্রাম ধসের স্মৃতি এখন অনেকটাই ধূসর। তবে এ ঘটনায় আহত শ্রমিক ও নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা স্পেকট্রাম ধসের ঘটনা এখনো ভয়ে শিউরে ওঠেন, যন্ত্রণায় গুমরে কাঁদেন।
ভবনের ৬ তলায় লিংকিং সেকশনের অপারেটর ছিলেন মো. ফরিদুল ইসলাম। তাঁর ঠিক ওপরের ৭ তলায় কাজ করতেন তাঁর চাচাতো ভাই নিটিং অপারেটর আব্দুল আলিম। সেদিনের ঘটনায় মারা যান আলিম।
ঘটনার ভয়াবহতা তুলে ধরে মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘আত্মীয়স্বজন মিলে ১১ জন কাজ করতাম স্পেকট্রামে। শিপমেন্টের কাজ থাকায় আমরা রাত ১২টা পর্যন্ত কাজ করে বাসায় চলে যাই। তবে নাইট শিফটে কাজের জন্য ফ্যাক্টরিতে ছিল আব্দুল আলিম। বাসায় আইসা খাইতে বসছি এমন সময় হঠাৎ করে বিকট শব্দ শুনতে পাই। বারান্দা থিকা তাকাইয়া দেখি বিল্ডিং নাই। নয়তলা ভবন নাই। চারদিকে ধুলাবালিতে আচ্ছন্ন। দৌড়াইড়া গেলাম ফ্যাক্টরির সামনে। গিয়ে দেখি যে পুরা ৯ তলা বিল্ডিংটা একদম মাটির সাথে মিশে গেছে।’
ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘দুই দিন পর আলিমের লাশটা ছাদ কেটে বের করা হয়। তাঁর বুকের উপর একটা মেশিন পড়া ছিল। উদ্ধারের সময় কারও হাত, কারও পা কেটে বের করতে হইছে। ঘটনাটা সবাই ভুলে গেছে। আমরা চাই এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হোক এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক।’
দায়ীদের বিচারসহ ৪ দফা দাবিতে মানববন্ধন
স্পেকট্রাম গার্মেন্টস ভবন ধসের ঘটনায় দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে আজ শনিবার বেলা ১১টার দিকে আশুলিয়ার বাইপাইল মোড়ে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ইউনিটি এ মানববন্ধনের আয়োজন করে।
জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ইউনিটির কেন্দ্রীয় সভাপতি ফরিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন আশুলিয়া থানা কমিটির সভাপতি নাজমুল হক। বক্তব্য দেন বিপ্লবী গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি অরবিন্দু ব্যাপারী, বাংলাদেশ প্রগতিশীল গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশন আশুলিয়া থানা শাখার সভাপতি মাসুদ রানা সুলতান, স্পেকট্রাম গার্মেন্টস ভবন ধসের নিহত আব্দুল আলিমের মা রাবেয়া বেগম প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, স্পেকট্রাম গার্মেন্টস ভবন ধস বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ইতিহাসের এক মর্মান্তিক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ৬৪ জন শ্রমিক প্রাণ হারান এবং কয়েক শতাধিক শ্রমিক আহত হয়ে অনেকেই স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। তদন্তে উঠে আসে ৬ তলা ফাউন্ডেশনের ওপর অবৈধভাবে অতিরিক্ত ৩ তলা নির্মাণ, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং ভবনের ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত ভারী যন্ত্রপাতি স্থাপনের কথা। এসব গুরুতর অনিয়মই এই ধসের মূল কারণ ছিল। দুর্ঘটনার শিকার অনেক শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার এখনো ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন থেকে বঞ্চিত। এ ছাড়া মামলার বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতার কারণে আজও নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে।
কর্মসূচিতে স্পেকট্রাম গার্মেন্টস ভবন ধসের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি ও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা, সব ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন, পোশাকশিল্পে ভবন নির্মাণ ও নিরাপত্তা নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানানো হয়।