ঢাকা থেকে রিগা: একটি অপেক্ষার যাত্রা

· Prothom Alo

ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এমিরেটসের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে টিকিট হাতে অবাক হয়েছিলাম। ডেস্টিনেশন: রিগা। কিন্তু রুটটা যেন এক ধাঁধা—প্রথমে দুবাই, তারপর সাত ঘণ্টার ট্রানজিট, তারপর শেষ ফ্লাইট। বিমানের টিকিটে প্রিন্টেড শব্দগুলো বারবার পড়লাম: ঢাকা–দুবাই–রিগা। মনের ভেতর একধরনের উদ্বেগ আর উত্তেজনার মিশ্রণ। এমিরেটসের সেই লাল-সাদা লোগো যেন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে এক অবিস্মরণীয় যাত্রার।

Visit casino-promo.biz for more information.

ফ্লাইট EK-585, একটি বিশাল বোয়িং–777। জানালার পাশে বসে দেখলাম বাংলার সবুজ মাঠ, নদী, নলখাগড়ার বন ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে সাদা মেঘের নিচে। কিন্তু মনের কোথায় তখনো রয়ে গেছে উত্তর ইউরোপের এক অজানা শহরের ছবি। পাঁচ ঘণ্টার ফ্লাইটে সময় কাটল সিনেমা দেখে, খাওয়াদাওয়া করে আর ভাবতে ভাবতে—লাটভিয়া আসলে কেমন হবে?

দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামতেই সময় যেন থমকে দাঁড়াল। এয়ারপোর্টটাই যেন এক স্বপ্নিল শহর। গোল্ডেন স্ট্রিপ, ডিউটি ফ্রি শপিং, শত শত গেট—আর আমি? আমার কাছে শুধু পরের ফ্লাইটের জন্য সাত ঘণ্টা অপেক্ষা।

এমিরেটস লাউঞ্জে ঢুকেই নিশ্বাস আটকে গেল। বিশাল জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে রানওয়েতে দাঁড়িয়ে থাকা দানবাকার বিমানগুলো। ভেতরে সুবিশাল আরামদায়ক সোফা, লাইভ কুকিং স্টেশন থেকে বের হওয়া গরম গরম খাবারের গন্ধ, শ্যাম্পেনের ফোয়ারা। কিন্তু সবচেয়ে মোহনীয় ছিল সেই দৃশ্য—বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ, নানা ভাষা, নানা গন্তব্য, সবাই এই লাউঞ্জে একসূত্রে বাঁধা। কেউ যাচ্ছে নিউইয়র্ক, কেউ সিডনি, কেউ জোহানেসবার্গ। আর আমি? আমি অপেক্ষা করছি রিগার ফ্লাইটের, যে গেট এখনো স্ক্রিনে দেখায়নি।

ঘড়ির কাঁটা যেন ইচ্ছা করে আগে বাড়ছে না। এক কাপ আরবিক কফি হাতে, জানালার পাশে বসে দেখতে থাকলাম রানওয়েতে বিমান ওঠানামা। মনের ভেতর অদ্ভুত এক দ্বন্দ্ব—একদিকে এই লাউঞ্জের বিলাসিতা উপভোগ করার ইচ্ছা, অন্যদিকে রিগার জন্য তীব্র ব্যাকুলতা। স্ক্রিনে পাঁচ মিনিট পরপর চেক করছি: ‘Riga–Gate A15–Boarding 22:45’।

শেষ পর্যন্ত ঘণ্টাখানেক বাকি থাকতে উঠে পড়লাম। গেট A15–এর দিকে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, এই যে দীর্ঘ করিডর, এর শেষ প্রান্তে অপেক্ষা করছে আমার উত্তর ইউরোপিয়ান স্বপ্ন। গেটে পৌঁছে দেখি মাত্র কয়েকজন যাত্রী। বেশির ভাগই লাটভিয়ান, তাদের শান্ত, গণতান্ত্রিক চেহারা, নরম কথা বলা। তাদের কথোপকথনের আওয়াজ শুনে প্রথমবারের মতো লাটভিয়ান ভাষার মিষ্টি, তরল সুর শুনলাম।

বোর্ডিং শুরু হলো। Fly Dubai বোয়িং 737-8, Max ছোট্ট কিন্তু আরামদায়ক কেবিন। জানালার বাইরে দুবাইয়ের আলোকচ্ছটা মিটমিট করছে। বিমান উড়াল দিল। আকাশে উঠে যখন নিচের শহরটা ঝলমলে গহ্বরের মতো দেখাল, তখন মনে হচ্ছিল—এই দুবাইয়ের আলোকসজ্জা ছেড়ে আমি যাচ্ছি এক ভিন্ন আলোর শহরে, যেখানে সূর্য অস্ত যায় না প্রায়, আর ইতিহাস জড়িয়ে আছে প্রতিটি পাথরে।

পাঁচ ঘণ্টার ফ্লাইট। এবার রিগার গাইড বই খুললাম। ছবিতে দেখা ওল্ড টাউন, ডাউগাভা নদী, আর্ট নুভেউ স্থাপত্য—সবই এখন শুধু কয়েক ঘণ্টার দূরত্বে। ট্রাফিক কন্ট্রোলের কারণে বিমান একটু দেরি করে নামল। যখন চাকাগুলো রানওয়ে স্পর্শ করল, তখন রিগার আকাশ ছিল ধূসর-নীল মিশেলে, ভোর চারটা আর আলো ঝলমল করছে।

কাস্টমস পার করে বের হওয়ামাত্রই এক ঠান্ডা, সতেজ বাতাস মুখে লাগল। রিগা। আমি পৌঁছেই গেছি। কিন্তু এই যে দীর্ঘ, সাসপেন্স ভরা যাত্রা—দুবাই লাউঞ্জের সেই উদ্বেগ-উত্তেজনার মুহূর্তগুলো—সেগুলোই তো আসল যাত্রার প্রথম অধ্যায় ছিল। কারণ, ভালো কিছু পেতে হলে, তার জন্য অপেক্ষাও তো এক রোমাঞ্চ। আর এই অপেক্ষার প্রতিটি মুহূর্ত রিগার রূপকে আরও রহস্যময়, আরও কাঙ্ক্ষিত করে তুলেছিল।

২. রিগা: সাত দিন যেন সাত রঙের রূপকথা

প্রথম দিনের সন্ধ্যা। ডাউগাভা নদীর পাশে দাঁড়িয়ে দেখছি, রিগার পুরোনো শহরটা যেন কোনো রাজপুত্রের চুমু খেয়ে জেগে ওঠা সোনালি স্বপ্ন। রাতের আলোয় গথিক স্থাপত্যগুলো সোনালি আভায় ভাসছে আর আমি ভাবছি—এই তো শুরু।

দ্বিতীয় দিন। ওল্ড টাউনের সরু গলিতে হারিয়ে যাওয়ার আনন্দ। ক্যাথিড্রাল স্কয়ারের মুখরতা, সেন্ট পিটার্স চার্চের চূড়ায় উঠে পুরো শহরটাকে পায়ের নিচে নেওয়া। সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে পায়ের মাসল চিৎকার করছে, কিন্তু ওপরে উঠে যখন চোখের সামনে লাল ইটের সমুদ্র দুলতে থাকে, সব ক্লান্তি মুছে যায়। এক দোকানদার, ধূসর চোখের বৃদ্ধ, হাতে তুলে দিলেন এক টুকরা রাই পাউরুটি। ভাষা বোঝা না গেলেও তাঁর হাসি বলছে, ‘স্বাগত’।

তৃতীয় দিন। আর্ট নুভেউ স্থাপত্যের রাজা আলবার্ট স্ট্রিটে সময় কাটিয়ে দেওয়া। প্রতিটি বাড়ির ফ্যাসাদ যেন জমাট বাঁধা কবিতা, রহস্যময় মুখ, উদ্ভট ফুল, লতাপাতা। স্থানীয় এক গাইড বললেন, এসব অলংকরণ শুধু সৌন্দর্য নয়, এগুলো প্রতিবাদ—রাশিয়ার শাসনের বিরুদ্ধে লাটভিয়ান পরিচয়ের জয়গান।

চতুর্থ দিনে হারিয়ে গেলাম সেন্ট্রাল মার্কেটে। পাঁচটি জেপেলিন হ্যাঙ্গারে গড়া এই বিশাল বাজারে গন্ধের সমাহার—স্মোকড মাছ, তাজা পনির, বনবেরির মিষ্টি গন্ধ। এক বিক্রেতা মা আমাকে টেস্টিং করতে দিলেন লাটভিয়ান চিজ, তারপর ছোট্ট একটা কাগজে লিখে দিলেন রেসিপি। ভাষার বাধা? না, মমতার ভাষা সর্বজনীন।

পঞ্চম দিন। অ্যাডভেঞ্চার! ইতিহাসের আঁচে পুড়ে যাওয়া রিগা গেটো ও ওকলাগ্রসের যুদ্ধ জাদুঘর। বিষাদ ঝরে পড়ছে দেয়ালে দেয়ালে। কিন্তু তারপরও, প্রতিরোধের গল্প, মানবতার জয়গান। একজন স্বেচ্ছাসেবী বললেন, ‘আমরা ভুলিনি, কিন্তু ক্ষমাও করেছি। এগিয়ে চলেছি।’

ষষ্ঠ দিন। কিছুটা কঠিন। বৃষ্টি নামল হুড়মুড়িয়ে। জুতা ভিজে কাদা হয়ে গেল, গন্তব্য হারিয়ে ফেললাম কেমেরিগালিস পার্কে। ঠিক তখন এক তরুণী, নিজের ছাতা আমার মাথার ওপর ধরে, ইংরেজিতে বলল, ‘আমিও যাচ্ছি স্টেশনে, চলুন একসঙ্গে।’ পথ চলতে চলতে জানলাম, তার নাম ইভা, ছাত্রী। বলল, ‘আমাদের এখানে বলে, অপরিচিত মানুষ আসলে পরিচয়ের অপেক্ষায় থাকা বন্ধু।’

সপ্তম দিন। শেষ সূর্যাস্ত দেখব বলে গেলাম ইউরাস্মালা সৈকতে। বাল্টিক সাগরের ঢেউয়ে পা ডুবিয়ে বসে রইলাম। মনে হচ্ছিল, এই সাত দিনে শুধু একটা শহর দেখিনি, দেখেছি এক জাতির হৃদয়—যারা দুঃখ জেনেও হাসতে জানে, ইতিহাসের ভার বইতেও এগিয়ে যায় অকুতোভয়ে। লাটভিয়ার মানুষ তাদের শীতল আবহাওয়ার বিপরীতে এতটাই উষ্ণ, এতটাই আন্তরিক যে বিদায়ের সময় মনে হচ্ছিল, বাড়ি ফিরছি না, বাড়ি থেকে বের হয়ে আসছি।

যাত্রা শেষ। কিন্তু রিগা থেকে নিয়ে আসা সেই রাই পাউরুটির টুকরা, ইভার দেওয়া ছোট্ট ম্যাপ আর অজস্র অকৃত্রিম হাসি—এগুলো এখন আমার ব্যাকপ্যাকে নয়, মনে গাঁথা থাকবে। কারণ, কোনো ভ্রমণই শেষ হয় না, যখন তা হৃদয়ে দাগ কেটে যায়। রিগা সেটাই করল—সাত দিনে সাত রঙের অনন্ত ছাপ রেখে গেল আমার ভ্রমণস্মৃতির ক্যানভাসে।

৩. রিগা–হেলসিঙ্কি–দোহা–ঢাকা: চার শহরের এক বিস্মৃতির গল্প

বিদায়ের মুহূর্তে রিগার আকাশ ছিল একটু বিষণ্ন। ডাউগাভা নদীর ওপর সূর্য তখন অস্ত যাচ্ছে না, বরং গড়িয়ে পড়ছে ধীরে ধীরে—যেন এ শহরও বুঝেছে, আমি ফিরে আসব কি না সেটা নিশ্চিত নয়। সেন্ট পিটার্স চার্চের চূড়ায় শেষ আলোটা লেগে আছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি টার্মিনালের সামনে। ভেতরে ফিনএয়ারের কাউন্টার। গন্তব্য হেলসিঙ্কি, তারপর দোহা, তারপর ঢাকা। খুব দীর্ঘ পথ। আর এ পথেই ঘটবে এক অদ্ভুত নাটক—যার কেন্দ্রে ছিল এক টুকরা কাঠের পাখি আর আমার সমস্ত অস্তিত্ব।

৪. রিগা টু হেলসিঙ্কি—এক স্বপ্নের বিদায়

ফিনএয়ারের ফ্লাইট AY-108। সকাল সাড়ে ১০টা। ছোট্ট একটি এম্ব্রায়ার জেট। বিমান যখন বাল্টিক সাগরের ওপর দিয়ে উড়ছে, নিচে সবুজ দ্বীপপুঞ্জ আর নীল জল। দুই ঘণ্টার ফ্লাইট। পাশের সিটে এক ফিনিশ নারী—পেশায় আর্কিটেক্ট। তিনি বললেন, হেলসিঙ্কিতে তাঁর অফিস। আর আমি? আমি বললাম, শুধু এক ট্রানজিট যাত্রী। তিনি হাসলেন, ‘ট্রানজিট মানে শুধু অপেক্ষা নয়, এটা শহর দেখার আরেক সুযোগ।’

হেলসিঙ্কি ভান্টা বিমানবন্দরে নামলাম দুপুর ১২টায়। সাদা-নীল সাইনবোর্ড, ফিনিশ ভাষার অদ্ভুত শব্দ, কাঠ আর কাচের স্থাপত্য। পাঁচ ঘণ্টার ট্রানজিট। সময় অনেক। তাই বেরিয়ে পড়লাম শহর দেখতে—শুধু একটু, খুব তাড়াতাড়ি।

ট্রেনে চড়ে সেন্ট্রাল স্টেশন। আউটডোর মার্কেটে গেলাম—সেনাতোরিনটোরি, উস্পেনস্কি ক্যাথেড্রাল। বাল্টিক হেরিং, ক্লাউডবেরি জ্যাম, রেনডিয়ারের মাংসের স্টল। একজন বিক্রেতা এক টুকরা স্যামন দিয়ে বললেন, ‘ইট দিজ। ইট উইল মেক ইউ হ্যাপি।’ সত্যি, খেয়ে ভালো লাগল। কিন্তু ঘড়ি তো আর থেমে নেই। বিকেল সাড়ে চারটায় ফিরতে হবে বিমানবন্দরে।

ফিরলাম। চেক-ইন। বোর্ডিং পাস হাতে। পরবর্তী ফ্লাইট: হেলসিঙ্কি টু দোহা—ফিনএয়ারের কোডশেয়ার, কাতার এয়ারওয়েজের অপারেটেড ফ্লাইট QR-302। বোর্ডিং গেট ২২।

৫. হেলসিঙ্কি টু দোহা—সন্ধ্যার দেশ থেকে রাতের দেশ

বিমানটা ছিল কাতার এয়ারওয়েজের এয়ারবাস A350। আরামদায়ক সিট। জানালার পাশে বসলাম। উড়াল দিলাম স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে। নিচে হেলসিঙ্কির আলোগুলো ছোট ছোট সোনালি বিন্দুর মতো জ্বলছে। সেগুনমুড়ি দ্বীপপুঞ্জ, তারপর বাল্টিক, তারপর ইউরোপের মূল ভূখণ্ড—সব আস্তে আস্তে পিছিয়ে পড়ছে।

পাঁচ ঘণ্টার ফ্লাইট। পাশের সিটে এক মধ্যবয়স্ক ফিনিশ দম্পতি, তাঁরা যাচ্ছেন ব্যাংকক। স্ত্রী বললেন, ‘আমাদের ছেলে ব্যাংককে থাকে। আমরা প্রতিবছর যাই। এই রুটে চল্লিশ বছর ধরে যাচ্ছি।’ তাঁদের হাতে এক টুকরা কাঠের পাখি দেখলাম—ঠিক আমার ব্যাগে থাকা পাখিটার মতো। কাকতালীয়? নাকি কিছু বলতে চায়?

রাত দেড়টায় দোহার হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামলাম। মরুভূমির ওপর জ্যোৎস্না গড়ানো। এবার ট্রানজিট পাঁচ ঘণ্টার। ঢাকার ফ্লাইট ভোর ৬টা ৪০ মিনিটে।

৬. দোহা—যেখানে সময় থমকে গিয়েছিল

বিমানবন্দরটা বিশাল। প্রথম আধা ঘণ্টা কেটে গেল ঘুরে ঘুরে। এক কাপ কড়া আরবিক কফি, এক টুকরা বাকলাভা। তারপর একটু ঘোরার সিদ্ধান্ত। ঘুরতে ঘুরতে গিয়ে পৌঁছালাম উত্তর টার্মিনালের একেবারে শেষ প্রান্তে। সেখানে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। যাত্রী কম। দোকানপাট বন্ধ। শুধু মৃদু আলো আর নিরবচ্ছিন্ন এসি বাতাস।

হঠাৎ মোবাইলটা ভাইব্রেট করে উঠল। স্ক্রিনে বার্তা—কাতার এয়ারওয়েজ: আপনার ফ্লাইট QR-878–এর গেট পরিবর্তন করা হয়েছে। নতুন গেট: C53।

সি-৫৩? চারপাশ তাকালাম। আমি আছি ই-সেক্টরে। সি-গেট মানে অন্তত পঁচিশ মিনিটের পথ। ঘড়িতে তখন সকাল ৫টা ১০ মিনিট। বোর্ডিং শুরু ৫টা ৪৫-এ। সময় খুব কম।

দৌড় শুরু করলাম। প্রথমে দ্রুত পায়ে হাঁটা, তারপর জগিং, তারপর একেবারে ছুট। মুভিং ওয়াক বেয়ে ছুটছি। মনে পড়ছে রিগার সেই সকাল—যেদিন পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম আর এক অচেনা মানুষ ছাতা ধরে এগিয়ে দিয়েছিল স্টেশন পর্যন্ত। এই বিমানবন্দরটা যেন সে পথেরই আরেক রূপ। বিশাল, অচেনা, উদাসীন।

শেষ মুভিং ওয়াক পার হতেই সি-সেক্টরের সাইনবোর্ড। ঘড়িতে ৫টা ৩৫। একটু নিশ্বাস ফেলতে পারি ভাবলাম। কিন্তু তখনই টের পেলাম—হাতটা খালি।

ব্যাগটা নেই। ছোট্ট হ্যান্ডব্যাগ—যেখানে পাসপোর্ট, বোর্ডিং পাস, মানিব্যাগ আর সেই লাটভিয়ান বৃদ্ধা আলদার দেওয়া ছোট্ট কাঠের পাখি—ব্যাগটা নেই।

মুহূর্তে বুকটা ধড়াস করে উঠল। রিগা থেকে নিয়ে আসা স্মৃতি, দোহায় শেষ হওয়ার পথে? কোথায় ফেললাম? ই-সেক্টরে? কফি শপে? ওয়াশরুমে? কিছুই মনে নেই।

পেছনে ছুটলাম। খুঁজলাম প্রতিটি সিট, প্রতিটি ওয়াশরুম, প্রতিটি কাউন্টার। কোথাও নেই। সময় বালুর মতো ঝরছে। ফোনে কাতার এয়ারওয়েজ হেল্পলাইনে কল—ব্যস্ত। আবার কল—ব্যস্ত। তৃতীয়বার—ব্যস্ত।

৫টা ৫২। বোর্ডিং শেষ হওয়ার সময় ৬টা ১০। আমি দাঁড়িয়ে আছি সি-৫৩ গেট থেকে ৫০০ মিটার দূরে একেবারে স্তব্ধ। পাসপোর্ট নেই। বোর্ডিং পাস নেই। টাকাপয়সা নেই। শুধু পকেটে এক টুকরা টিস্যু আর অর্ধেক খাওয়া চকলেট বার।

একজন এয়ারলাইনসকর্মী এগিয়ে এলেন। ইউনিফর্ম দেখে কাতার এয়ারওয়েজের গ্রাউন্ড স্টাফ। বললাম, ‘আই'ভ লস্ট মাই ব্যাগ। পাসপোর্ট, বোর্ডিং পাস—এভরিথিং।’ তিনি শুনলেন, মুখে একটুও বিচলিত হলেন না। শুধু বললেন, ‘ইয়োর বোর্ডিং পাস নম্বর মনে আছে?’ মনে নেই। ‘ই-টিকিট?’ সেই ফোনে ছিল, ফোন তো আছে। খুঁজে বের করলাম। তিনি ট্যাবে কিছু টাইপ করলেন। বললেন, ‘ইউ আর লাকি। ইওর নেম ইন দ্য সিস্টেম। আই’ম প্রিন্টিং ইওর বোর্ডিং পাস।’

কিন্তু পাসপোর্ট?

তিনি বললেন, ‘লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ডে একবার চেক করেছেন?’ না, করিনি। দৌড়ে গেলাম লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড। সেই টেবিলের ওপাশে এক আরব ভদ্রমহিলা হাসিমুখে এগিয়ে দিলেন আমার ছোট্ট ব্যাগটা। খুলে দেখি—পাসপোর্ট আছে, বোর্ডিং পাস আছে, টাকা আছে আর সেই কাঠের পাখিটা হাসছে।

দৌড়ে ফিরলাম সি-৫৩ গেটে। তখন সময় ৬টা ৫ মিনিট। শেষ যাত্রী ঢুকছে। ব্রিজটা প্রায় খালি। আমি হাতে বোর্ডিং পাস নিয়ে সিটে বসলাম। নিশ্বাস ফিরে পেলাম।

৭. দোহা টু ঢাকা—অবশেষে বাড়ি

বিমান ছাড়ল ঠিক ৬টা ৪০-এ। কাতার এয়ারওয়েজের বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার। সিটে হেলান দিয়ে চোখ বুজলাম। পাশের সিটে এক বাংলাদেশি পরিবার—বাবা, মা, দুই ছোট মেয়ে। ছোট মেয়েটি জানালা দিয়ে তাকিয়ে বাবাকে প্রশ্ন করল, ‘আমরা কি এখন বাড়ি যাচ্ছি?’ বাবা বললেন, ‘হ্যাঁ, মা। বাড়ি।’

বিমান যখন ঢাকার আকাশে নামল, তখন দুপুর। বর্ষা শেষের মেঘগুলো ভেসে যাচ্ছে সাদা তুলোর মতো। চাকাগুলো রানওয়ে ছুঁল। আমি হাতে শক্ত করে ধরে রইলাম কাঠের পাখিটা—রিগার শেষ উপহার, হেলসিঙ্কির স্বপ্ন, দোহার কাছ থেকে পাওয়া দ্বিতীয় সুযোগ।

ভ্রমণের শেষ হয় না। কেবল বিরতি দেয়। এই বিরতিতে আমি বুঝেছি, পথই গন্তব্য নয়। পথের প্রতিটি বিপন্নতা, প্রতিটি দৌড়, প্রতিটি অচেনা মুখের হাসি—সেগুলোই সঞ্চিত হয়। তারপর সারা জীবন ধরে সেই সঞ্চয় থেকে বাঁচি আমরা।

ফিরতি যাত্রা শেষ। কিন্তু রিগা এখনো আমার সঙ্গে আছে। হেলসিঙ্কি এখনো আমার সঙ্গে আছে। দোহা এখনো আমার সঙ্গে আছে। আর এই ঢাকা, এই ভিজে মেঘের শহর, আমাকে আবার ডাকবে নতুন কোনো গন্তব্যে।

তত দিন অপেক্ষা। কাঠের পাখিটা জানালায় রাখা। রিগার সেই সকাল এখনো ডানা মেলে আছে—চার শহর পেরিয়ে, স্মৃতির ভেতর।

Read full story at source