গণতন্ত্রের যাত্রাপথ আরও মসৃণ হোক
· Prothom Alo

আজ ১ বৈশাখ, বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিন। অতীতের গ্লানি-দুঃখ-জরা মুছে ফেলে নতুন বছর সবার জন্য আনন্দ ও মঙ্গলের বার্তা নিয়ে আসবে, এটাই প্রত্যাশিত।
বাংলা নববর্ষ আমাদের জাতীয় উৎসব, সর্বজনীন উৎসব। প্রতিবছরের মতো এবারও সর্বস্তরের মানুষ বাংলা নববর্ষ বরণ করতে অধীর অপেক্ষায় আছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা–উপজেলা পর্যায়ের শহরগুলোতে মেলা, শোভাযাত্রা, যাত্রাপালা, সংগীতানুষ্ঠানসহ নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পয়লা বৈশাখ উদ্যাপন করার সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে বেলা ১১টায় বের হবে ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী শোভাযাত্রা। ইউনেসকোর ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’র তালিকায় নববর্ষের শোভাযাত্রা যুক্ত হওয়ায় সেটি আমাদের জন্য বাড়তি আনন্দের বিষয়। এবারের শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’। আমরা আশা করি, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন দেশে যে গণতান্ত্রিক আবহ তৈরি করেছে, তার ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।
Visit sportbet.rodeo for more information.
পাকিস্তান আমলে বৈরী পরিবেশে ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট রমনার বটমূলে ঐতিহ্যবাহী সংগীতানুষ্ঠানের মাধ্যমে বর্ষবরণ শুরু করে। সে সময় পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের অংশ হয়ে উঠেছিল ছায়ানটের বর্ষবরণ। ১৯৬৭ সালে ছায়ানট বর্ষবরণের যে ধারা শুরু করেছিল, সেটাই এখন ছড়িয়ে পড়েছে দেশের পাড়ায়, মহল্লায়, গ্রামে–গঞ্জে সর্বত্র। তবে ২০০১ সালে রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসবে বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছিল। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে প্রথম আলো, ডেইলি স্টার–এর সঙ্গে ছায়ানট ও উদীচীতে সন্ত্রাসী হামলা চালায় উগ্রবাদী গোষ্ঠী। এমন ভয়াবহ হামলার পরও তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর ঘটনা আমাদের আশাবাদী করে তোলে।
বর্ষবরণের উৎসবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। নিরাপদ পরিবেশে নগরবাসী যাতে নববর্ষ উদ্যাপন করতে পারে, সে জন্য ডিএমপি নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে নিরাপত্তার বাড়াবাড়িতে যেন উৎসবের স্বতঃস্ফূর্ততা নষ্ট না হয়, সেদিকেও লক্ষ রাখা প্রয়োজন।
বাংলা নববর্ষ আমাদের কৃষিভিত্তিক সভ্যতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মোগল সম্রাট আকবরের সময় খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য বাংলা নববর্ষ চালু হয়েছিল। নববর্ষকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ীরা সারা বছরের হিসাব-নিকাশ করে থাকেন, হালখাতা খোলেন। ক্রেতারা বকেয়া শোধ করেন। শত শত বছর ধরে এই ধারা চলে আসছে। সময়ের সঙ্গে উৎপাদন সম্পর্ক পরিবর্তন হওয়ায় হালখাতার সেই ঐতিহ্য নিবু নিবু টিকে আছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে বৈশাখী অর্থনীতি বেশ চাঙা হয়ে উঠেছে। উৎসবের পাশাপাশি নববর্ষ ঘিরে ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারিত হয়েছে।
বাংলা নববর্ষ ঘিরে আশা ও ইতিবাচকতার বিপরীতে কিছু হতাশার চিত্রও আছে। গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এ বছরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে বর্ষবরণ ঘিরে নানা গোষ্ঠীকে নেতিবাচক প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে। এ ধরনের নেতিবাচক প্রচারণা সামাজিক বিভক্তিতে উসকে দেয়। এর প্রভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন করে আনন্দ শোভাযাত্রা করা হয়; বর্তমান সরকার সেটিকে বৈশাখী শোভাযাত্রা নাম দিয়েছে।
নামের বিতর্কে না গিয়ে যে কথাটি বলা প্রয়োজন, তা হলো শোভাযাত্রার মূল উদ্দেশ্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের বার্তা, অগণতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের বার্তা, অশুভর বিরুদ্ধে শুভবার্তায় দেশবাসীকে যুক্ত করা। কেবল শোভাযাত্রা নয়; মেলা, সংগীতের মূর্ছনায় দেশের সর্বস্তরের মানুষ আজ সাদরে নববর্ষকে বরণ করবে।
বাংলা নববর্ষের সঙ্গে চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, মারমা, ত্রিপুরাসহ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোর বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ উৎসবকে আরও বর্ণিল ও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। এটা সহিষ্ণু, উদার ও বহুত্ববাদী বাংলাদেশের সমাজের প্রতিচ্ছবি। নববর্ষ উৎসব একটি উদার গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতিকেই আমাদের সামনে নিয়ে আসে।
নতুন বছর সবার কল্যাণ ও সমৃদ্ধি বয়ে আনুক। স্বাগত ১৪৩৩।