কভেন্ট্রি সিটির প্রিমিয়ার লিগে ফেরা: ২৫ বছরের অপেক্ষার অবসান
· Prothom Alo

২৫ বছর পর ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে ফিরল কভেন্ট্রি সিটি।
২০০১ সালের ৫ মে—অ্যাস্টন ভিলার কাছে ৩-২ গোলের হারে প্রিমিয়ার লিগ থেকে নেমে গিয়েছিল ক্লাবটি। এরপর কেটে গেছে ৯,১১৩ দিন। চ্যাম্পিয়নশিপ, অর্থাৎ দ্বিতীয় বিভাগ ফুটবলে ১১ বছর কাটানোর পর আবারও অবনমন ঘটে কভেন্ট্রির। নেমে যায় তৃতীয় বিভাগ, অর্থাৎ লিগ ওয়ানে। তীব্র আর্থিক সংকটে পড়ায় ২০১৩ সালে দেউলিয়া হওয়ারও শঙ্কায় ছিল কভেন্ট্রি।
Visit moryak.biz for more information.
সে সময় নর্থহ্যাম্পটন ও বার্মিংহামের সঙ্গে মাঠ ভাগাভাগি করে খেলা, মালিকপক্ষ সিসুর বিরুদ্ধে সমর্থকদের ঘৃণা, দফায় দফায় প্রতিবাদ, এমনকি পার্লামেন্টে আলোচনার মতো নাটকীয় সব ঘটনা ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। এই সবকিছু পেছনে ফেলে শীর্ষ লিগে ফেরার আশা সে সময় কভেন্ট্রির জন্য ছিল এক সুদূরপরাহত স্বপ্ন।
দীর্ঘ ১৩ বছর ক্লাবের মালিকানায় থাকা সিসু শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালে ডগ কিংয়ের কাছে মালিকানা বিক্রি করতে বাধ্য হন। এর মাঝে ২০১৭ সালে কভেন্ট্রি ৫৯ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো চতুর্থ স্তরের লিগে নেমে যায়। মালিকপক্ষের বিরুদ্ধাচরণ করতে গিয়ে সমর্থকেরা কখনো লংমার্চ করেছেন আবার কখনো প্রতিবাদ জানাতে ঢুকে পড়েছেন খেলার মাঠেও।
শেষ পর্যন্ত কভেন্ট্রি শীর্ষ পর্যায়ের লিগে ফিরল ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি মিডফিল্ডার ও কোচ ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের হাত ধরে। চ্যাম্পিয়নশিপে গতকাল রাতে ব্ল্যাকবার্ন রোভার্সের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে প্রিমিয়ার লিগে ফিরেছে ‘স্কাই ব্লুজ’রা।
কভেন্ট্রির খেলোয়াড়দের নিয়ে গর্বিত কোচ ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ড। গতকাল রাতে ম্যাচ শেষেকী করেছেন ল্যাম্পার্ড
কভেন্ট্রি সিটি আসলে নিজেরাই নিজেদের চমকে দিয়েছে। ক্লাবের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বিবিসিকে জানিয়েছে, মৌসুমের শুরুতে কিছুটা আশা থাকলেও এত দ্রুত এমন সাফল্য আসবে, সেটা তারা কল্পনাও করেনি।
২০২৪ সালের নভেম্বরে সমর্থকদের প্রিয় কোচ মার্ক রবিনসের স্থলাভিষিক্ত হন ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ড। দলের প্রথম গ্রীষ্মকালীন দলবদলের সময়টা দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছেন তিনি। ল্যাম্পার্ডের শান্ত ও ধীরস্থির ব্যক্তিত্ব দলের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, যা এই সাফল্যের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।
৩টি ক্লাবে ১০ বারের চেষ্টায়ও ‘সোনার হরিণ’ জেতা হলো না এমবাপ্পেরব্রাইটন থেকে ধারে যোগ দেওয়া গোলকিপার কার্ল রাশওয়ার্থ দলের পারফরম্যান্সে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন। গত মৌসুমের মূল দলে খুব বেশি পরিবর্তন করেননি ল্যাম্পার্ড। গত মৌসুমের হতাশা কাটিয়ে ল্যাম্পার্ড যেভাবে দলটিকে টেনে তুলেছেন, তাতে মুগ্ধ ক্লাবের শীর্ষ কর্তারা। চ্যাম্পিয়নশিপ পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে থাকা কভেন্ট্রি এখন শিরোপা জয়ের স্বপ্নও দেখছে। পাশাপাশি পয়েন্ট তালিকার শীর্ষ দুইয়ে থেকে মৌসুম শেষ করা নিশ্চিত হওয়ায় প্রিমিয়ার লিগে ওঠাও নিশ্চিত হয়েছে কভেন্ট্রির।
ল্যাম্পার্ড কোচের দায়িত্ব নেওয়ার সময় তাঁর ওপর পূর্ণ আস্থা ছিল মালিক ডগ কিংয়ের। তিনি নিজে নিয়মিত ট্রেনিং গ্রাউন্ডে সময় কাটান। সেখানকার সব স্টাফকে নামে চেনেন, সবার সঙ্গে নিজে গিয়ে কথা বলেন। এমনকি প্রায়ই ক্যানটিনে কফি বানাতে বা শেফের সঙ্গে আড্ডা দিতে দেখা যায় ডগ কিংকে। তারকা খেলোয়াড়দের জন্য সেখানে আলাদা কোনো জায়গা নেই; আর এই বৈষম্যহীন পরিবেশই ‘স্কাই ব্লুজ’দের মধ্যে একাত্মতার আবহ তৈরি করেছে।
ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ড মাঠে দক্ষ নাবিকের মতো পরিচালনা করেছেন কভেন্ট্রিকেচেলসির হয়ে প্রিমিয়ার লিগ ও চ্যাম্পিয়নস লিগজয়ী ল্যাম্পার্ডের ব্যক্তিগত ইমেজ ও প্রভাব কভেন্ট্রিতে এতটাই প্রবল যে অন্য ক্লাবের প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও অনেক ফুটবলার স্রেফ তাঁর কারণে এই ক্লাবে যোগ দিয়েছেন।
ল্যাম্পার্ডের কোচিং দর্শনের অন্যতম বড় দিক হলো দলের ভেতরের সমন্বয়। নতুন ফুটবলার হোক বা পুরোনো—যাঁরা ম্যাচ খেলার সুযোগ কম পাচ্ছেন, তাঁরাও যেন নিজেদের ব্রাত্য মনে না করেন, সেদিকে কড়া নজর রেখেছেন তিনি। সুফলও মিলেছে হাতেনাতে।
সব ঢেলে সাজাচ্ছে রিয়াল, আরবেলোয়ার ভাগ্য অনিশ্চিতফরোয়ার্ড ব্র্যান্ডন থমাস-আসান্টের কথাই ধরা যাক। গত বছর ব্ল্যাকবার্ন বা ডার্বি কাউন্টিতে চলে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও তিনি থেকে যান। ল্যাম্পার্ড এই ফরোয়ার্ডের পরিশ্রমী মনোভাব ও দায়বদ্ধতা দেখে তাঁর ওপর আস্থা রেখেছিলেন। আসান্টে গত মৌসুমের তুলনায় এবার দ্বিগুণ (৩০ ম্যাচে ১২ গোল) গোল করেছেন।
বিবিসিকে সূত্রগুলো জানিয়েছে, খেলোয়াড়দের ভেতর আত্মবিশ্বাসের স্ফূরণ ঘটাতে ল্যাম্পার্ড অপ্রতিদ্বন্দ্বী। সিনিয়র খেলোয়াড় জেক বিডওয়েল ও জেমি অ্যালেন মাঠে নিয়মিত না হলেও তাঁদের সব সময় মূল পরিকল্পনার অংশ করে রেখেছেন ল্যাম্পার্ড। এটি মানুষকে পরিচালনায় তাঁর দক্ষতাই ফুটিয়ে তোলে।
‘ভোগান্তিও আনন্দেরই অংশ’
খেলোয়াড়দের ওপর যেন প্রমোশনের বাড়তি চাপ ভর না করে, সেটি নিশ্চিত করাকেই নিজের অন্যতম প্রধান কাজ মনে করেন কভেন্ট্রি কোচ ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ড।
নিজের কৌশল নিয়ে ল্যাম্পার্ড বলেন, ‘আমি বিষয়গুলো সহজ ও সরাসরি রাখার চেষ্টা করি। খুব বেশি কথা বলা আমার পছন্দ নয়। ১৫ বছর আগে বড় কোনো ম্যাচে আমার যে অভিজ্ঞতা হতো, তা হয়তো বর্তমান খেলোয়াড়দের চেয়ে আলাদা। তবে দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অভিজ্ঞতা যখন কোচিংয়ে কাজে লাগানো যায়, সেটাই বড় ইতিবাচক দিক। কারণ, পরিস্থিতিগুলো আমি নিজে পার করে এসেছি।’
Three points, again. pic.twitter.com/kpvyhpvyCz
— Coventry City (@Coventry_City) November 8, 2025
কভেন্ট্রি এ মৌসুমে টানা দুই ম্যাচ হেরেছে মাত্র একবার। গত জানুয়ারিতে নরউইচ ও কিউপিআরের কাছে হেরে ১০ পয়েন্টের লিড খুইয়েছিল তারা। জানুয়ারির শেষে মিডলসবোরো যখন ৫৮ পয়েন্ট নিয়ে তাদের ধরে ফেলে, এমনকি ফেব্রুয়ারিতে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষেও উঠে যায়, তখন এই ল্যাম্পার্ডের দলই তাদের ৩-১ গোলে হারিয়ে শীর্ষ স্থানের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়। সর্বশেষ ১৩ ম্যাচে মাত্র ১টিতে হেরেছে কভেন্ট্রি, জিতেছে ৮টি।
পরিসংখ্যান বলছে, গত ৯৯ মৌসুমে কভেন্ট্রি টানা পাঁচ ম্যাচ জিততে পেরেছে মাত্র পাঁচবার। যার মধ্যে তিনটিই এসেছে ল্যাম্পার্ডের অধীনে—গত মৌসুমে একবার আর চলতি মৌসুমে দুবার। ল্যাম্পার্ড বলেন, ‘বছর দেড়েক আগে আমি, ক্রিস জোনস আর জো এডওয়ার্ডস যখন এখানে আসি, সব আমাদের কাছে নতুন ছিল। আমরা সময়টা উপভোগ করছি, কিন্তু মূল পরিশ্রমটা করেছে খেলোয়াড়রা।’
ল্যাম্পার্ডের কোচিংয়ে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা এসেছে কভেন্ট্রি সমর্থকদের মানসিকতায়। গত এক দশকে মাঠ ও মাঠের বাইরে নানা ধকল সইতে হয়েছে ক্লাবটিকে। আট বছরে তিনটি প্রমোশন পেলেও ভক্তদের মনে একধরনের হতাশা বা ‘নেতিবাচক চিন্তা’ স্থায়ী আসন গেড়েছিল। প্রিমিয়ার লিগে ফেরা সেই হতাশা দূর করেছে।
এ প্রসঙ্গে ল্যাম্পার্ড বলেন, ‘আমি নিজে ওয়েস্ট হামের ভক্ত হিসেবে বড় হয়েছি, সেখানেও এমন ছিল। আবার এভারটনেও একই অভিজ্ঞতা হয়েছে। এটা মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। হয়তো ব্রিটিশ সংস্কৃতির মধ্যেই আছে যে সামনে খারাপ কিছু ঘটতে যাচ্ছে, এমনটা ধরে নেওয়া।’
ল্যাম্পার্ড সবশেষে মনে করিয়ে দেন, ‘ভোগান্তিও আনন্দেরই অংশ। শুনতে হয়তো অদ্ভুত লাগছে, কিন্তু ভালো কিছু পেতে হলে আপনাকে একটু কষ্ট সইতেই হবে।’