বিজ্ঞানের গতিপথ বদলে দেওয়া বইগুলো

· Prothom Alo

বড় বড় বিপ্লব সব সময় অস্ত্রের জোরে হয় না। ইতিহাসের অনেক বিপ্লবের সূচনা হয়েছে স্রেফ একটা বইয়ের কারণে। সেই বিপ্লব মানুষের চিন্তাজগৎ পাল্টে দিয়েছে আমূলে। সভ্যতাকেও এগিয়ে নিয়ে গেছে আরও কয়েক ধাপ। বিশ্ব পাল্টে দেওয়া তেমন কিছু বিজ্ঞানের বই নিয়ে আজকের এই লেখা।

এলিমেন্টস

লেখক: ইউক্লিড

ভাষা: প্রাচীন গ্রিকপ্রথম প্রকাশ: আনুমানিক ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ

খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দে গ্রিক গণিতবিদ ইউক্লিড রচনা করেন এলিমেন্টস। জ্যামিতির আকরগ্রন্থ হিসেবে বইটি বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। বইটি মোট ১৩ খণ্ডে বিভক্ত। এখানে ইউক্লিড বিন্দু, রেখা এবং কোণের মতো মৌলিক ধারণা থেকে শুরু করে জটিল জ্যামিতিক প্রমাণগুলোকে চমৎকার যুক্তিতে সাজিয়েছেন। প্রায় দুই হাজার বছর ধরে এটিই ছিল গণিত শেখার প্রধান পাঠ্যবই। আজ আমরা যে জ্যামিতি শিখি, তার ভিত্তি তৈরি করেছে এই এলিমেন্টস বইটি। যৌক্তিক চিন্তা ও প্রমাণের যে কাঠামো ইউক্লিড এখানে দেখিয়েছেন, সেটাই আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

Visit newsbetting.cv for more information.

কিতাব আল জাবর ওয়াল মুকাবালা

লেখক: আল খোয়ারিজমি

ভাষা: আরবিপ্রথম প্রকাশ: ৮২০ খ্রিস্টাব্দ

নবম শতকের গণিতবিদ আল খোয়ারিজমির এই বইটি আধুনিক বীজগণিতের জন্মদাতা। অ্যালজেব্রা শব্দটিই এসেছে এই বইয়ের শিরোনাম (আল জাবর) থেকে। তিনি রৈখিক ও দ্বিঘাত সমীকরণ সমাধানের পদ্ধতিগুলো এখানে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তাঁর প্রবর্তিত ধাপে ধাপে সমস্যা সমাধানের প্রক্রিয়া থেকেই অ্যালগরিদম শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। এখনকার কম্পিউটার বিজ্ঞান এই অ্যালগরিদমের ওপর ভর করেই চলে। গণিত কেবল তাত্ত্বিক স্তরের বিষয় নয়, বৈষয়িক ও প্রতিদিনের সমস্যা সমাধানের হাতিয়ার হিসেবেও যে গণিত ব্যবহার করা চলে, সেটি আল খোয়ারিজমিই প্রথম সার্থকভাবে উপস্থাপন করেছিলেন।

কিতাব আল মানাজির

লেখক: ইবনে আল হাইসাম

ভাষা: আরবিপ্রথম প্রকাশ: ১০১১-১০২১

দশম শতকের বিজ্ঞানী ইবনে আল হাইসামের লেখা কিতাব আল মানাজির বইটি অপটিকস বা আলোকবিজ্ঞানের একটি ভিত্তিমূলক কাজ। আলো নিয়ে লেখা বইগুলোর মধ্যে এটিকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আল হাইসাম প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করেন, চোখ থেকে আলো বের হয় না, বরং বস্তু থেকে আলো আমাদের চোখে এসে পড়লেই কেবল আমরা দেখতে পাই। তিনি ক্যামেরার আদিরূপ পিনহোল ক্যামেরা নিয়েও কাজ করেছেন। আলোর প্রতিফলন ও প্রতিসরণের সূত্রগুলো চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির জনক হিসেবেও ইবনে আল হাইসামকে ধরা হয়। কারণ, তিনি এই বইয়ে প্রতিটি তত্ত্বকে পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণের ওপর জোর দিয়েছিলেন।

আল কানুন ফিততিব

লেখক: ইবনে সিনাবড় বড় বিপ্লব সব সময় অস্ত্রের জোরে হয় না। ইতিহাসের অনেক বিপ্লবের সূচনা হয়েছে স্রেফ একটা বইয়ের কারণে। সেই বিপ্লব মানুষের চিন্তাজগৎ পাল্টে দিয়েছে আমূলে। সভ্যতাকেও এগিয়ে নিয়ে গেছে আরও কয়েক ধাপ। বিশ্ব পাল্টে দেওয়া তেমন কিছু বিজ্ঞানের বই নিয়ে আজকের এই লেখা।

ভাষা: আরবিপ্রথম প্রকাশ: ১০২৫

একাদশ শতকে ইবনে সিনা রচিত এই গ্রন্থটি মধ্যযুগে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিশ্বকোষ হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রায় ১৭ শতক পর্যন্ত ইউরোপের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এটি মূল পাঠ্যবই হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এতে তিনি বিভিন্ন রোগের লক্ষণ, নিরাময় এবং ওষুধের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি ছোঁয়াচে রোগ বা সংক্রামক ব্যাধি সম্পর্কেও আধুনিক ধারণা দিয়েছিলেন। আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যায় যে ওষুধের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করা হয়, ইবনে সিনা তাঁর বইয়ে সে পদ্ধতিরই আদি রূপ তুলে ধরেছিলেন।

ডায়ালগ কনসার্নিং দ্য টু চিফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস

লেখক: গ্যালিলিও গ্যালিলি

ভাষা: ইতালিয়াপ্রথম প্রকাশ: ১৬৩২, ফ্লোরেন্স

১৬৩২ সালে প্রকাশিত এই বইটি জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক মহাবিপ্লব ঘটিয়েছিল। এতে গ্যালিলিও অ্যারিস্টটলের পৃথিবী-কেন্দ্রিক মতবাদের বিপরীতে কোপার্নিকাসের সূর্য-কেন্দ্রিক মতবাদকে জোরালোভাবে সমর্থন করেন। তিন বন্ধুর আলোচনার ঢঙে লেখা এই বইটি সে সময় চার্চের রোষানলে পড়েছিল এবং এটি লেখার কারণেই গ্যালিলিওকে গৃহবন্দী হতে হয়েছিল। তবে এই বইটির মাধ্যমেই আধুনিক পর্যবেক্ষণমূলক জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপিত হয়। মহাবিশ্বে পৃথিবীর সঠিক অবস্থান সম্পর্কে মানুষের দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা চিরতরে বদলে দিয়েছে এই বই।

ফিলোসফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা

লেখক: আইজ্যাক নিউটন

ভাষা: লাতিনপ্রথম প্রকাশ: ১৮৬৭, ইংল্যান্ড

১৬৮৭ সালে প্রকাশিত এই বইটি পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত। নিউটন এতে গতির তিনটি বিখ্যাত সূত্র এবং মহাকর্ষের সর্বজনীন সূত্র প্রদান করেন। তিনি প্রমাণ করেন, একটি আপেল যেভাবে মাটিতে পড়ে, ঠিক একই কারণে গ্রহগুলো সূর্যের চারদিকে ঘোরে। ক্যালকুলাস ব্যবহার করে নিউটন প্রকৃতির নিয়মগুলোকে গণিতের ভাষায় প্রকাশ করেছিলেন। এই বইটিই আধুনিক বলবিদ্যা ও প্রকৌশলবিদ্যার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে। এখনো দৃশ্যমান ব্যবহারিক ক্ষেত্রে প্রিন্সিপিয়ার নীতি প্রয়োগ করা হয়। এই বইয়ের সূত্রের ওপর ভর করেই মানুষ আজও মহাকাশে রকেট পাঠায়।

অন দ্য অরিজিন অব স্পিসিস

লেখক: চার্লস ডারউইন

ভাষা: ইংরেজিপ্রথম প্রকাশ: ১৮৫৯, যুক্তরাজ্য

১৮৫৯ সালে প্রকাশিত ডারউইনের এই বইটি জীববিজ্ঞানের চিরচেনা রূপটাই বদলে দিয়েছিল। এতে তিনি প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তনের যুগান্তকারী ধারণা দেন। ডারউইন দেখান, জীবন কোনো স্থির বিষয় নয়; বরং কোটি কোটি বছর ধরে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় নতুন নতুন প্রজাতির উদ্ভব ঘটে। এই বইটির প্রকাশ তৎকালীন ধর্মীয় ও সামাজিক চিন্তাধারায় প্রবল আলোড়ন তুলেছিল। কিন্তু আধুনিক জীববিজ্ঞানের প্রতিটি শাখা আজ এই বিবর্তনবাদের ওপরই শক্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে।

অসনভি খিমি

লেখক: দিমিত্রি মেন্দেলিভ

ভাষা: রুশপ্রথম প্রকাশ: ১৮৬৮, রাশিয়া 

১৮৬৯ সালে রুশ রসায়নবিদ দিমিত্রি মেন্দেলিভ এই বইটি রচনা করেন। এটি রসায়নের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোর একটি। কারণ, এর মাধ্যমেই পর্যায় সারণির ভিত্তি স্থাপিত হয়। মেন্দেলিভ মৌলগুলোকে এদের পারমাণবিক ভরের ক্রমানুসারে সাজিয়ে একটি সুশৃঙ্খল ছক তৈরি করেন। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, তিনি তখনো পর্যন্ত অনাবিষ্কৃত কিছু মৌলের বৈশিষ্ট্যও নিখুঁতভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। রসায়নকে একটি অগোছালো বিষয় থেকে সুশৃঙ্খল বিজ্ঞানে রূপান্তর করতে এই বইটির ভূমিকা অসাধারণ। ইংরেজিতে বইটির নাম দ্য প্রিন্সিপালস অব কেমিস্ট্রি

রিলেটিভিটি: দ্য স্পেশাল অ্যান্ড দ্য জেনারেল থিওরি

লেখক: আলবার্ট আইনস্টাইন

ভাষা: জার্মানপ্রথম প্রকাশ: ১৯১৬, জার্মানি

১৯১৬ সালে প্রকাশিত আইনস্টাইনের এই বইটিতে আপেক্ষিকতার বিশেষ ও সার্বিক তত্ত্ব আলোচিত হয়েছে। এতে তিনি সময়ের ধীর হয়ে যাওয়া, দৈর্ঘ্যের সংকোচন এবং মহাকর্ষকে স্থান-কালের জ্যামিতিক বক্রতা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। আইনস্টাইন দেখিয়েছিলেন, ভর এবং শক্তি পরস্পর রূপান্তরযোগ্য। নিউটনের চিরাচরিত বলবিদ্যা যেখানে বিশাল ভরের বস্তুর ক্ষেত্রে অচল, সেখানে আইনস্টাইনের এই তত্ত্ব মহাবিশ্বকে বোঝার নতুন এক ভাষা তৈরি করেছে। তিন খণ্ডের এই বই একদম সাধারণ ধারণা দিয়ে শুরু করে গভীর আলোচনার মধ্যে প্রবেশ করেছে। স্থান-কালকে জ্যামিতিক বক্রতা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে নিউটনের মহাকর্ষীয় সীমাবদ্ধতা দূর করেছেন আইনস্টাইন। প্রসঙ্গ কাঠামো থেকে শুরু করে মহাবিশ্বের প্রকৃতি ও ভরের আপেক্ষিকতা পর্যন্ত সব বিষয় বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে এই বইয়ে। এটি আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের এক অনন্য দলিল।

দ্য ডাবল হেলিক্স

লেখক: জেমস ডি. ওয়াটসন

ভাষা: ইংরেজিপ্রথম প্রকাশ: ১৯৬৮, যুক্তরাষ্ট্র

১৯৬৮ সালে প্রকাশিত হয় দ্য ডাবল হেলিক্স। এই বইয়ে ডিএনএর ডাবল হেলিক্স আবিষ্কারের রোমাঞ্চকর কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে। জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিকের এই আবিষ্কার ছিল আধুনিক জীববিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় মাইলফলক। বইটি কেবল বৈজ্ঞানিক তথ্যে ভরপুর নয়, এটি গবেষণাগারের রেষারেষি, সংশয় এবং সাফল্যের এক ব্যক্তিগত দিনলিপিও বটে। ডিএনএর এই কাঠামো উন্মোচনের মাধ্যমেই বংশগতিবিদ্যার রহস্য মানুষের সামনে পরিষ্কার হয়েছে। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের নতুন দিক উন্মোচনের কৃতিত্ব দেওয়া হয় এই বইয়ের লেখককে।

কসমস

লেখক: কার্ল সেগান

ভাষা: ইংরেজিপ্রথম প্রকাশ: ১৯৮০, যুক্তরাজ্য

কার্ল সেগানের এই বইটি ১৯৮০ সালে প্রকাশিত হয়। এই বই লিখে সেগান তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ও বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের একজনে পরিণত হন। কসমস বইয়ে সেগান মহাবিশ্বের ১৫ বিলিয়ন বছরের বিবর্তন নিয়ে আলোচনা করেছেন। পাশাপাশি মহাবিশ্বের ইতিহাসের সঙ্গে মানবসভ্যতার ইতিহাসের সম্পর্ক মিলিয়ে বর্ণনা করেছেন। সাগান এখানে জ্যোতির্বিজ্ঞান, জীববিদ্যা এবং দর্শনের আলোচনার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন, আমরা আসলে নক্ষত্রের ধূলিকণা দিয়েই তৈরি। মহাবিশ্বের বিশালতার তুলনায় মানুষের অস্তিত্ব কতটা ক্ষুদ্র, আবার আমাদের অনুসন্ধিৎসা কত অসীম; কাব্যিক ভাষায় সেগান সেটিই বর্ণনা করেছেন। বিজ্ঞানের প্রতি সাধারণ মানুষের ভালোবাসা তৈরিতে এই বইটি এক অনন্য সৃষ্টি।

আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম

লেখক: স্টিফেন হকিং

ভাষা: ইংরেজিপ্রথম প্রকাশ: ১৯৮৮, যুক্তরাজ্য

১৯৮৮ সালে প্রকাশিত এই বইটি আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় করে তুলেছে। স্টিফেন হকিং এই বইয়ে মহাবিশ্বের সৃষ্টি, কৃষ্ণগহ্বর এবং সময়ের প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। বিষয়গুলো গাণিতিকভাবে জটিল হলেও হকিং গণিতের ব্যবহার কমিয়ে অত্যন্ত সহজ ভাষায় স্থান-কাল ও আপেক্ষিকতার ধারণা ব্যাখ্যা করেছেন। বইটির মূল উদ্দেশ্য ছিল মহাবিশ্বের একটি সমন্বিত তত্ত্ব খোঁজা। বিজ্ঞান মানেই কঠিন, এই প্রথাগত ধারণা বদলে দিয়ে সাধারণ পাঠকের মনে মহাকাশ নিয়ে গভীর কৌতূহল তৈরিতে এ বই অনন্য ভূমিকা রেখেছে।

Read full story at source