সেচপাম্প চালু করতে বাধা, শুকিয়ে যাচ্ছে ১৮ বিঘা জমির ভুট্টাগাছ
· Prothom Alo

নওগাঁর আত্রাই উপজেলার চকশিমলা এলাকায় এক কৃষক তাঁর নিজের জমিতে অগভীর নলকূপ (সেচপাম্প) স্থাপন করে দীর্ঘদিন ধরে সেচ দিয়ে চাষাবাদ করে আসছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী ওই কৃষকের সেচপাম্পটি বন্ধ করে দেয়। এতে ওই কৃষকের ১৮ বিঘা জমিতে আবাদ করা ভুট্টাগাছ শুকিয়ে মরে যেতে বসেছে।
এ ঘটনায় উপজেলার হাটকালুপাড়া ইউনিয়নের চকশিমলা গ্রামের ভুক্তভোগী কৃষক মুনসুর রহমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও থানা পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাননি।
Visit saltysenoritaaz.com for more information.
ইউএনওর দায়িত্বে থাকা আত্রাই উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘আমি কয়েক দিন আগে ভারপ্রাপ্ত ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখে বিস্তারিত জানাতে পারব। সেচপাম্প চালু করতে বাধা দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা থাকলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
৯ ফেব্রুয়ারি ইউএনও বরাবর ভুক্তভোগী ওই কৃষকের দেওয়া অভিযোগ থেকে জানা যায়, মুনসুর রহমান উপজেলার হাটকালুপাড়া মৌজায় নিজের জমিতে শ্যালো ইঞ্জিন বসিয়ে ১৯৮৫ সাল থেকে পানি সেচ দিয়ে চাষাবাদ করে আসছেন। তাঁর ওই সেচ প্রকল্পে ৮০ বিঘা জমিতে সেচ দিয়ে চাষাবাদ হয়ে থাকে। সরকারি বিধি অনুযায়ী, একটি অগভীর নলকূপ থেকে আরেকটি পাম্প স্থাপন করতে সর্বনিম্ন ১০০০ ফুট (৩০০ মিটার) দূরত্ব থাকতে হবে। অথচ চকশিমলা গ্রামের বাসিন্দা আয়েন আলী সরকারের বিধি লঙ্ঘন করে মুনসুর রহমানের পাম্প থেকে মাত্র ২০০ ফুট দূরেই আরেকটি পাম্প স্থাপন করেন। ওই সেচপাম্প চালু হওয়ার পর মুনসুরের সেচপাম্প জোরপূর্বক বন্ধ করে দেওয়া হয়। পাম্প চালু করতে না পারায় মুনসুরের জমিতে লাগানো ১৮ বিঘা জমির ভুট্টাগাছ শুকিয়ে যাচ্ছে। এমনকি খেতের ভুট্টাগাছ বাঁচানোর জন্য পার্শ্ববর্তী পাম্প থেকে টাকা দিয়ে পানি সেচ নিতে চাইলেও মুনসুরের জমিতে পানি দেওয়া হচ্ছে না।
গতকাল শনিবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, পানির অভাবে কৃষক মুনসুরের কিছু ভুট্টাগাছ শুকিয়ে মরে গেছে। আবার কিছু গাছের পাতা অল্প বিস্তর সবুজ থাকলেও পানির অভাবে সেগুলোতে কোনো থোড়া বা ভুট্টার ফল আসেনি। আবার কোনো কোনো জায়গায় শুরু থেকেই একেবারে সেচ দিতে না পারায় ভুট্টাগাছ অঙ্কুরোদ্গমই হয়নি। কিছু গাছ পানির অভাবে বড় হতে পারেনি। মুনসুরের ১৮ বিঘা জমিতেই ভুট্টাগাছের চিত্র কমবেশি একই রকম। তাঁর নিজস্ব মালিকানাধীন জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য একটি সেচপাম্প বসানো আছে। কিন্তু চালাতে দেওয়া হচ্ছে না।
মুনসুর রহমান বলেন, ‘আমার সেচপাম্পের কাছাকাছি নিজস্ব ছয়–সাত বিঘা জমি আছে। এ ছাড়া আরও ১১ বিঘা জমি লিজ নিয়ে আবাদ করি। কিন্তু এবার আমার পাম্প চালু করতে না দেওয়ায় সব জমির ভুট্টাগাছ মরে গেছে। নিজের পাম্প থেকে সেচ দিয়ে চাষাবাদ করে যে আয় হয় তা দিয়ে আমার সংসার চলে। এবার এক ছটাক ভুট্টাও পাব না। এ অবস্থায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে পথে বসার উপক্রম হইছে।’
মুনসুর আরও বলেন, ‘ওরা (আয়েন আলী) আমার পাম্পের পাশে অবৈধভাবে পাম্প বসাইছে। ওই পাম্প যেন না বসে সে জন্য ইউএনওর কাছে লিখিতভাবে অভিযোগ করেছিলাম। কিন্তু তারপরেও আয়েন আলী পাম্প বসাইছে। পাম্প বসানোর পর উল্টো আমার সেচপাম্প জোর করে বন্ধ করে দেয়। আমি পাম্প চালু করতে গেলেই মারতে আসে। প্রাণনাশের হুমকি দেয়। বলে সে নাকি বিএনপির লোক, যা ইচ্ছে তাই করবে। আমি আমার পাম্প চালু করে যেন সেচ দিতে পারি, সে জন্য ইউএনও ও থানায় লিখিত অভিযোগ করেছিলাম। কিন্তু তারপরেও প্রশাসন ও পুলিশ কেউ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আয়েন আলী বলেন, ‘মুনসুর পাম্প বসায়ে অন্য সেচপাম্পের মালিকদের চেয়ে কৃষকদের কাছ থেকে বেশি টাকা নিত। তাই ওই মাঠের কৃষকেরা বসে মিটিং করে আমাকে ওই মাঠ পাম্প বসায়ে দিছে। কৃষকেরা কেউ মুনসুরের পাম্প থেকে পানি নেবে না। তাই মুনসুর আমার বিরুদ্ধে উল্টাপাল্টা অভিযোগ করে বেড়াচ্ছে। মুনসুরের সেচপাম্প আমি বন্ধ করেছি, এটা মিথ্যা কথা। ওর সেচপাম্প চালু করে নিজের জমিতে পানি দিতে কখনোই বাধা দেওয়া হয়নি।’
চকশিমলা গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, মুনসুরের ওপর অন্যায় করা হচ্ছে। নিজের জমিতে পাম্প বসানো আছে। অথচ সেই পাম্প চালু করতে দেওয়া হচ্ছে না। খবের আলী নামের একজন বলেন, ‘ওর (মুনসুর রহমান) খ্যাতের সব ভুট্টাগাছ সেচ দিতে না পারার কারণে মরে গেছে। এটা চরম অমানবিক একটা কাজ। গ্রামের সব মানুষ এ জন্য হায় হায় করছে। কিন্তু আয়েন আলী ও তাঁর সহযোগী আবদুল মান্নান, সাইফুল ও শফিকুলসহ কয়েকজন লোকের ভয়ে কেউ কিছু করতে পারে না। দলের প্রভাব খাটিয়ে ওরা যা ইচ্ছা তাই করতেছে।’