খুনিকে কি বিয়ে করা উচিত? তথ্যচিত্র ঘিরে তোলপাড়

· Prothom Alo

কখনো কি আপনি আপনার সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করেছেন—‘তোমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ কাজটা কী?’ এই প্রশ্ন থেকেই শুরু হয় এক অবিশ্বাস্য বাস্তব কাহিনি, যা এখন উঠে এসেছে নেটফ্লিক্সের তথ্যচিত্র ‘শুড আই ম্যারি আ মার্ডারার?’–এ।

জশ অ্যালোটের তিন পর্বের তথ্যচিত্র সিরিজটি ২৯ এপ্রিল থেকে নেটফ্লিক্সে স্ট্রিম হচ্ছে। এখানে এক নারী বর্ণনা করেছেন সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা—যখন তিনি জানতে পারেন, যাঁকে তিনি বিয়ে করতে যাচ্ছিলেন, তিনি আসলে একজন খুনি।

Visit newssport.cv for more information.

প্রেম, তারপর এক ভয়ংকর সত্য
এই কাহিনির কেন্দ্রে আছেন স্কটল্যান্ডের ফরেনসিক প্যাথলজিস্ট ক্যারোলিন মুরহেড। তাঁর বাগ্‌দত্তা অ্যালেক্সান্ডার ম্যাককেলার, যিনি ‘স্যান্ডি’ নামেই পরিচিত—তাঁর সঙ্গে পরিচয়ের কয়েক বছর আগেই একজন মানুষকে হত্যা করেছিলেন।

গ্লাসগো-ভিত্তিক মুরহেড ফরেনসিক প্যাথলজিস্ট জানান, মাত্র পাঁচ সপ্তাহের প্রেমেই ম্যাককেলার তাঁকে মুগ্ধ করে ফেলেছিলেন। বিয়ের আগে তিনি স্বাভাবিকভাবেই জানতে চেয়েছিলেন—তাঁর সঙ্গীর জীবনে কোনো গোপন বিষয় আছে কি না।
সেই প্রশ্নের উত্তরে ম্যাককেলার স্বীকার করেন—তিন বছর আগে তিনি একটি হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন এবং তখনো পলাতক ছিলেন। শুধু স্বীকারোক্তিই নয়, তিনি মুরহেডকে নিয়ে যান সেই জায়গায়, যেখানে তিনি মৃতদেহটি কবর দিয়েছিলেন।
সেই মুহূর্তে মুরহেডের সামনে দাঁড়ায় এক কঠিন সিদ্ধান্ত—ভালোবাসা বেছে নেবেন, নাকি আইনের পথে হাঁটবেন?

‘শুড আই ম্যারি আ মার্ডারার?’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

‘আমি ভাবতেই পারিনি এটা বাস্তব’
পরিচালক জশ অ্যালট বলেন, ‘প্রথম যখন ক্যারোলিনের গল্প শুনি, মনে হয়েছিল এটা কোনো সিনেমার কাহিনি। কিন্তু এটা বাস্তব। এমন এক দোটানা, যা কল্পনা করা যায় না—তবু নিজের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে ভাবা থেকে নিজেকে আটকানো যায় না।’
অ্যালট প্রশ্ন তোলেন—আপনার প্রিয় মানুষ যদি হঠাৎ বলেন, তাঁর ভয়ংকর এক গোপন অতীত আছে—আপনি কি সেটি লুকিয়ে রাখবেন, নাকি প্রকাশ করে সবকিছু ধ্বংস করবেন?

টিন্ডার থেকে বিয়ের স্বপ্ন
২০২০ সালের শুরুতে, কোভিড মহামারির সময়, ৩২ বছর বয়সী মুরহেড দিনে ময়নাতদন্ত করতেন, আর রাতে লড়তেন এক বিষাক্ত সম্পর্কের স্মৃতির সঙ্গে। ঠিক তখনই ডেটিং অ্যাপ টিন্ডারে পরিচয় হয় ৩১ বছর বয়সী ম্যাককেলারের সঙ্গে। তিনি মনে করেছিলেন ‘একটি মুক্তির পথ’—নিজের ভাষায় এমনই বলেছেন মুরহেড।
সম্পর্ক দ্রুত এগোতে থাকে। মাত্র এক মাসের মধ্যেই বিয়ের আলোচনা শুরু হয়। এই তথ্যচিত্রে তিনি বলেন, ‘ভাবুন, আপনি এমন একজনের প্রেমে পড়েছেন, যিনি আপনাকে সম্পূর্ণ মনে করান, ভালোবাসায় ভরিয়ে দেন…কিন্তু আপনি তখনো জানেন না, তাঁর সবটা।’

‘শুড আই ম্যারি আ মার্ডারার?’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

স্বীকারোক্তির রাত
২০২০ সালের নভেম্বরের এক সন্ধ্যায়, ভবিষ্যৎ নিয়ে সব সন্দেহ দূর করতে মুরহেড সরাসরি প্রশ্ন করেন—‘কিছু কি আছে, যা আমাদের ভবিষ্যৎকে বাধা দিতে পারে?’ ঠিক তখনই একটি পুলিশের গাড়ি পাশ দিয়ে যায়।

ম্যাককেলার আতঙ্কিত হয়ে পড়েন, শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। তারপর তিনি বলেন—তাঁর এক ‘ভয়ংকর’ গোপন কথা আছে। ‘আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম,’ সেই রাতের স্মৃতি মনে করে বলেন মুরহেড। তিনি যোগ করেন, ‘যাঁকে আমি সারা জীবনের সঙ্গী ভাবছিলাম, তিনি আমাকে জানালেন—তিনি একজন খুনি।’

২০১৭: এক দুর্ঘটনা, যা ছিল হত্যার সমান
এই গল্পের মূল ঘটনা ঘটে ২০১৭ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর। ম্যাককেলার ও তাঁর যমজ ভাই রবার্ট ম্যাককেলার স্কটিশ হাইল্যান্ডসে গাড়ি চালাচ্ছিলেন—মদ্যপ অবস্থায়, দ্রুতগতিতে। সেই সময় একই পথে ছিলেন টনি পার্সন্স—৬৩ বছর বয়সী এক প্রাক্তন রয়্যাল নেভি কর্মকর্তা, যিনি ক্যানসার থেকে বেঁচে যাওয়ার আনন্দে একটি দাতব্য সাইক্লিং অভিযানে ছিলেন। রাত ১১টার পর এক ভয়াবহ সংঘর্ষে ম্যাককেলারের গাড়ি তাঁকে ধাক্কা দেয়। কিন্তু সাহায্য করার বদলে, দুই ভাই তাঁকে ফেলে রেখে চলে যান। অনুমান করা হয়, ৩০ মিনিটের মধ্যেই পার্সন্স মারা যান—যদিও তখনো তাঁকে বাঁচানো সম্ভব ছিল।

প্রমাণ মুছে ফেলার চেষ্টায়
দুই ভাই পরে ফিরে এসে মৃতদেহ, সাইকেল ও সব জিনিস নিয়ে যান। নিজেদের জমির একটি পিট বগে কবর দেন, সাইকেল লুকিয়ে ফেলেন, ফোন ও সিম কার্ড ধ্বংস করেন, এমনকি ওয়ালেট ও হেলমেট পুড়িয়ে দেন।
গাড়ি মেরামতের সময় বলেন—একটি হরিণকে ধাক্কা দিয়েছিলেন। সবকিছু এমনভাবে গুছিয়ে ফেলা হয়, যেন কোনো ঘটনাই ঘটেনি।

‘শুড আই ম্যারি আ মার্ডারার?’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

এক মাসের নীরব প্রস্তুতি
স্বীকারোক্তির পরও সঙ্গে সঙ্গে পুলিশে যাননি মুরহেড। তিনি ধীরে ধীরে তথ্য সংগ্রহ করতে থাকেন। একদিন ম্যাককেলার তাঁকে নিয়ে যান কবরস্থানের কাছে। সেখানে তিনি গোপনে একটি রেড বুলের ক্যান ফেলে দেন—পরবর্তী সময়ে পুলিশের জন্য চিহ্ন হিসেবে। অবশেষে ২০২০ সালের ২৭ ডিসেম্বর তিনি পুলিশে অভিযোগ করেন। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে পার্সন্সের দেহ উদ্ধার হয়। দুই ভাইকে গ্রেপ্তার করা হয়—তাঁরা জানতেনই না, তথ্যদাতা ছিলেন মুরহেড নিজে।

ওসামা বিন লাদেনকে কীভাবে খুঁজে পাওয়া গেল, কীভাবে হত্যা, উঠে এল তথ্যচিত্রে

প্রেমিক থেকে ‘গোপন এজেন্ট’
অবাক করার মতো বিষয়—গ্রেপ্তারের পরও মুরহেড তাঁদের জামিন করান এবং একই বাড়িতে থাকতে থাকেন। তথ্যচিত্রে তিনি জানান, প্রায় ৯ মাস তিনি আন্ডারকভার থেকে পুলিশের জন্য প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন।
রেকর্ডিং করেছেন, তথ্য জোগাড় করেছেন। কিন্তু এর বিনিময়ে তিনি পাননি যথেষ্ট মানসিক সহায়তা। বরং তাঁকে বলা হয়েছিল—সহযোগিতা না করলে তিনিও আইনি ঝামেলায় পড়তে পারেন।

বিচার, সাজা ও নতুন জীবন
তিন বছর পর শুরু হয় বিচার। রবার্ট ম্যাককেলার হত্যাকাণ্ড আড়াল করার দায়ে ৫ বছর ৩ মাস কারাদণ্ড পান। অ্যালেক্সান্ডার ম্যাককেলার দোষ স্বীকার করে ১২ বছরের সাজা পান।

পার্সন্সের পরিবার জানায়, ‘আমরা কখনোই তাদের ক্ষমা করব না। তারা আমাদের প্রিয় মানুষটিকে কেড়ে নিয়েছে।’ অন্যদিকে ম্যাককেলারের আইনজীবী বলেন, তিনি তাঁর প্রাক্তন বাগ্‌দত্তার ওপর কোনো ক্ষোভ পোষণ করেন না।

‘এখন আমি আবার বাঁচতে শিখছি’
সবকিছু পেরিয়ে এখন নতুন করে জীবন শুরু করছেন ক্যারোলিন মুরহেড। তিনি বলেন, ‘আমি আমার জীবনকে আবার গড়ে তুলতে কঠোর পরিশ্রম করেছি। এখন আমি যথেষ্ট শক্ত হয়েছি, তাই আমার গল্প বলতে পারছি।’
মুরহেড আরও যোগ করেন, ‘আমি ভেবেছিলাম বিচারব্যবস্থা আমাকে সুরক্ষা দেবে। কিন্তু বাস্তবে তা পাইনি। আমি চাই, ভবিষ্যতে ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের জন্য আরও ভালো সুরক্ষা নিশ্চিত হোক—এবং মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায়।’

টাইম অবলম্বনে

Read full story at source