শুধু বিজেপি নয়, রাষ্ট্রীয় নীলনকশার বিরুদ্ধেও যেভাবে লড়ছে তৃণমূল
· Prothom Alo

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন শুধু তৃণমূল কংগ্রেস আর ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) মধ্যে সাধারণ রাজনৈতিক লড়াই ছিল না।
এই নির্বাচন এক অন্যরকম পরিস্থিতির ছবি দেখিয়েছে। এখানে রাজ্যের নির্বাচিত সরকারের শাসক দল তৃণমূলকে একসঙ্গে দু’দিক থেকে লড়তে হয়েছে। দলটির একদিকে আছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। আর অন্যদিকে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা, কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং আদালতের একাধিক সিদ্ধান্ত মিলিয়ে এই নির্বাচনকে স্বাধীনতার পর, বিশেষ করে জরুরি অবস্থার পর সবচেয়ে বেশি হস্তক্ষেপপূর্ণ নির্বাচনগুলোর একটি বলে মনে করা হচ্ছে।
এই হস্তক্ষেপের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ছিল ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া, যাকে বলা হয় স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর। এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ৯০ লাখ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এটি মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ। এর মধ্যে ৬০ লাখের বেশি মানুষকে অনুপস্থিত বা মৃত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আর ২৭ লাখ মানুষের বিষয় ট্রাইব্যুনালে ঝুলে আছে।
এই তালিকা থেকে বাদ পড়া বা যাচাইয়ের মধ্যে থাকা মানুষের বড় অংশই মুসলিম—প্রায় ৬৫ শতাংশ। পাশাপাশি নমশূদ্র হিন্দু, বিশেষ করে মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষজনও এতে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছেন। গরিব পরিবারের নারীরাও এই প্রক্রিয়ার শিকার হয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন: জ্ঞানেশ ‘বুনো ওল’ তো মমতা ‘বাঘা তেঁতুল’নির্বাচন কমিশন একে সাধারণ নিয়মিত তালিকা হালনাগাদ করার কাজ বলে দাবি করেছে। কিন্তু বাস্তবে পশ্চিমবঙ্গকে আলাদা করে দেখা হয়েছে। এখানে ৩০ জন পর্যবেক্ষক পাঠানো হয়েছে, যেখানে উত্তরপ্রদেশে পাঠানো হয়েছে মাত্র ৪ জন। পশ্চিমবঙ্গে ৮ হাজার মাইক্রো-পর্যবেক্ষক রাখা হয়েছে। এটি অন্য কোথাও দেখা যায়নি। এমনকি সারা দেশের ৯৫ শতাংশ অফিসার বদলি হয়েছে শুধু এই এক রাজ্যে।
এগুলোকে শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বলে ব্যাখ্যা করা কঠিন। এগুলোর পেছনে রাজনৈতিক কারণই বেশি স্পষ্ট।
এই প্রক্রিয়া গণতন্ত্রের একটি মূল ধারণাকেই বদলে দিয়েছে। সাধারণভাবে নিয়ম হলো—প্রত্যেক নাগরিকই ভোটার হিসেবে ধরা হয়, যতক্ষণ না প্রমাণ হয় তিনি অযোগ্য। কিন্তু এখানে বিষয়টা উল্টো হয়ে গেছে। এখন ভোটারদেরই প্রমাণ করতে বলা হচ্ছে যে তারা সত্যিই ভোট দেওয়ার যোগ্য।
তথ্য বলছে, নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় এই প্রভাব আরও স্পষ্ট। নন্দীগ্রামে মুসলিম জনসংখ্যা ২৫ শতাংশ হলেও সেখানে বাদ পড়া নামের ৯৫ শতাংশই মুসলিম। আবার ভবানীপুরে মুসলিম ভোটার ২০ শতাংশ হলেও বাদ পড়াদের মধ্যে ৪০ শতাংশ মুসলিম।
এই প্রক্রিয়াকে যাঁরা রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, তাঁদের বক্তব্যেও নিরপেক্ষতার অভাব স্পষ্ট। কেন্দ্রীয় সরকারের এক বিজেপি নেতা সরাসরি বলেছেন, এক কোটি মুসলিম ‘অনুপ্রবেশকারী’কে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, নির্বাচন কমিশন এই প্রক্রিয়ার কাঠামো তৈরি করেছে। আর বিজেপি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) সেই প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন: নাগরিক হয়েও আমরা কেন ভোট দিতে পারলাম নাএসআইআর: সংবিধানের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া এক উদ্যোগ
এসআইআরের কোনো স্পষ্ট আইনি ভিত্তি নেই। ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ শব্দটি জনগণের প্রতিনিধিত্ব আইনে কোথাও উল্লেখই নেই। এই আইনের ২১ নম্বর ধারার তৃতীয় উপধারা অনুযায়ী বিশেষ সংশোধন করা যেতে পারে, কিন্তু তা কেবল একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্র বা তার অংশের জন্য—পুরো একটি রাজ্যের জন্য নয়।
এই প্রক্রিয়ায় যে নির্ধারিত তারিখ ব্যবহার করা হয়েছে, তারও কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন তদারকির বিস্তৃত ক্ষমতা দিলেও তা সীমাহীন নয়। যেখানে আইন রয়েছে, সেখানে কমিশনকে সেই আইনের মধ্যেই কাজ করতে হয়। আর আইন নীরব থাকলেই কেবল স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। এখানে জনগণের প্রতিনিধিত্ব আইন নীরব নয়, কিন্তু এসআইআর সেই আইনকে উপেক্ষা করেছে।
যুক্তির দিক থেকেও এই প্রক্রিয়ায় বড় অসঙ্গতি রয়েছে। নির্বাচন কমিশন বলেছে, গত ২০ বছরে জনসংখ্যার পরিবর্তনের কারণে এই সংশোধন দরকার ছিল। কিন্তু সেই কাজ করা হলো কয়েক সপ্তাহের মধ্যে, নির্বাচনের ঠিক আগে। আইন এবং সাধারণ জ্ঞানবুদ্ধি—দুটোই বলছে, এমন কাজ অনেক আগেই করা উচিত ছিল।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটের হাওয়া দিদি না মোদির দিকে গেল?এই প্রক্রিয়ার ভেতরে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’ নামে একটি অস্পষ্ট শ্রেণি রাখা হয়েছিল। যাদের কাগজপত্র ঠিক থাকলেও, প্রশাসনের চোখে কোনো অসামঞ্জস্য ধরা পড়লে তাদের নাম বাদ দেওয়ার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এখানে কোনো স্পষ্ট প্রমাণের মানদণ্ড ছিল না।
ফলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে যদি কোনো কর্মকর্তা মনে করেন কিছু অসঙ্গতি আছে, তাহলে বৈধ নথিও একজন ভোটারের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যেতে পারে। আর সেই অভিযোগ ভুল প্রমাণ করার দায়িত্বও পড়েছে ভোটারের ওপর। অথচ হওয়ার কথা ছিল উল্টোটা।
এটাও মনে রাখা জরুরি, জনগণের প্রতিনিধিত্ব আইন কেবল একজন ব্যক্তির সাধারণ বাসস্থানের বিষয়টি নির্ধারণ করে, নাগরিকত্ব নয়। কিন্তু এখানে ভোটারদের কাছে নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য বংশগত সংযোগ ও নানা নথির শৃঙ্খল চাওয়া হয়েছে। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন এমন একটি নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া চালিয়েছে, যার কোনো আইনি অধিকার তাদের নেই।
এই কারণে বলা যায়, এসআইআর আসলে শুধু ভোটার তালিকা সংশোধন ছিল না। এটি অন্য নামে একটি নাগরিকপঞ্জি তৈরির মতোই—যা কিনা পরিকল্পনা, নকশা এবং বাস্তবায়ন করেছে এককভাবে নির্বাচন কমিশনই।
একদিকে লাখ লাখ নাম অত্যন্ত সূক্ষ্ম যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে বাদ দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে কয়েক লাখ নাম কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই যুক্ত করা হয়েছে।টার্গেট করে নাম বাদ দেওয়ার হিসাব-নিকাশ
২০২১ সালের নির্বাচনে যেসব আসনে খুব অল্প ভোটের ব্যবধানে ফল নির্ধারিত হয়েছিল, সেগুলোর সঙ্গে এই বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রভাব আশ্চর্যভাবে মিলে যাচ্ছে। মোট ৫৭টি আসনে ৮ হাজার ভোটের কম ব্যবধানে ফল হয়েছিল—এর মধ্যে ২৯টি আসনে জিতেছিল তৃণমূল কংগ্রেস, আর ২৮টি আসনে বিজেপি।
এর মধ্যে ১৯টি আসনে ব্যবধান ছিল ৩ হাজার ভোটেরও কম। সেই আসনগুলোর মধ্যে বিজেপি ১২ টিতে জয়ী হয়েছিল।
উদাহরণ হিসেবে কুলটি আসনে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান ছিল মাত্র ৬৭৯ ভোট, অথচ সেখানে ৩৮ হাজার ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে—যা জয়ী ব্যবধানের প্রায় ৫০ গুণ। নন্দীগ্রামে ব্যবধান ছিল ১,৯৫৬ ভোট, সেখানে বাদ পড়েছে ১৪,৪৬২ জন ভোটার। দান্তন আসনে ব্যবধান ছিল ৬২৩ ভোট, ঘাটালে ৯৬৬ ভোট, আর বাঁকুড়ায় ১,৪৬৮ ভোট।
এছাড়া ভোটার তালিকা যাচাইয়ের আগেই দেখা যায়, প্রায় ১১১টি বিধানসভা এলাকায় এমন সংখ্যক ভোটারকে যাচাইয়ের আওতায় আনা হয়েছিল, যা ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে সেই সব আসনের জয়-পরাজয়ের ব্যবধানের চেয়েও বেশি।
এই প্রক্রিয়া কার্যত এমন জায়গাগুলোতেই বিজেপিকে কৌশলগত সুবিধা দিতে পারে, যেখানে ভোটের ব্যবধান খুব কম এবং ফল যেকোনো দিকে যেতে পারে। তবে একই সঙ্গে একটি প্রশ্নও থেকে যায়—যাদের নাম এখনো বাদ পড়েনি, তাদের মধ্যে কি নাগরিকত্ব হারানোর ভয় তৈরি হয়ে আত্মরক্ষার তাগিদে তারা তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারেন? এই সম্ভাবনার বাস্তব প্রভাব এখনো সময়ই বলবে।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচনে ভোট দেওয়ার পর একজন ভোটার।নতুন ভোটার যুক্ত করার অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া
এই অসমতার আরেকটি দিক হলো হিসাবের অন্য পাশের ঘটনা। ভোটের ঠিক আগে নির্বাচন কমিশন নীরবে প্রায় ৭ লাখ নতুন ভোটার যুক্ত করেছে। এর মধ্যে প্রথম ধাপের জন্য ৩ লাখ ২২ হাজার এবং দ্বিতীয় ধাপের জন্য ৩ লাখ ৮৮ হাজার ভোটার যোগ করা হয়।
কিন্তু এই নতুন ভোটারদের বিষয়ে কোনো ধরনের জনতাত্ত্বিক তথ্য বা বিস্তারিত বিভাজন প্রকাশ করা হয়নি। একদিকে লাখ লাখ নাম অত্যন্ত সূক্ষ্ম যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে বাদ দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে কয়েক লাখ নাম কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই যুক্ত করা হয়েছে।
এই ৭ লাখ নতুন ভোটার কারা, এবং কেন তাদের যুক্ত করার ক্ষেত্রে সেই স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়নি যা নাম বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে দাবি করা হয়েছিল—এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।
আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের ভোট নিয়ে বাংলাদেশের ভাবনার কারণ কীট্রাইব্যুনাল: প্রতিকার পাওয়ার এক ভ্রান্ত ধারণা
আপিল প্রক্রিয়াটি ছিল এক নিষ্ঠুর রসিকতার মতো। কয়েক লাখ মামলা মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করার কথা ছিল। কিন্তু প্রথম ধাপের সময় মাত্র ১৩৯ জন ভোটারের শুনানি গ্রহণ সম্ভব হয়েছিল, আর দ্বিতীয় ধাপের আগে শুনানি হয়েছিল মাত্র ১,৪৭৪ জনের। প্রায় সবাই শেষ পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত হলেও ২৭ লাখেরও বেশি মানুষকে একেবারেই শুনানির আওতায় আনা হয়নি।
এই ভোটাররা অনুপস্থিত বা মৃত ছিলেন না। তাঁরা যথাযথ নথিপত্র জমা দিয়েছেন, শুনানিতে উপস্থিত হয়েছেন, এমনকি পাসপোর্টও দেখিয়েছেন। তবু তাদের আপিলের কোনো শুনানিই হয়নি। শুধু গরিব বা প্রান্তিক মানুষ নয়, সমাজের বিভিন্ন স্তরের ভোটাররাই এই অব্যবস্থার শিকার হয়েছেন।
নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহিহীন ক্ষমতা
নির্বাচন কমিশনের আচরণকে কেবল পরিসরের দিক থেকে নয়, বরং জবাবদিহিহীন ক্ষমতার দিক থেকেও আলাদা করে দেখাতে হয়। এই ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন দুই ধাপে গোপনে প্রায় ১,৩০০ জনের একটি তালিকা তৈরি করে। সেখানে মূলত তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মী এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা ছিলেন। এর মধ্যে কাউন্সিলর, পঞ্চায়েত সদস্য, বিধায়ক এবং সংসদ সদস্যরাও অন্তর্ভুক্ত।
এই তালিকার ভিত্তিতে ভোটের আগে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়। এই বিষয়েই কলকাতা হাইকোর্ট প্রশ্ন তোলে—নির্বাচন কমিশন কি আদৌ কাউকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিতে পারে? আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, নির্বাচন কমিশন কি মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে পারে? তারা কি একজন ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব নিজে পালন করতে পারে? দেশের অন্য কোথাও এমন ঘটনা ঘটছে না, কেবল পশ্চিমবঙ্গেই এমনটা দেখা যাচ্ছে।
এই গ্রেপ্তার তালিকা, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা যেমন ইডি, এনআইএ ও সিবিআইয়ের মাধ্যমে তৃণমূল নেতাদের ওপর অভিযান, এবং ভোটারদের মতামত দেওয়ার আগেই বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা—সব মিলিয়ে আইনগত কাঠামোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের একটি চিত্র তৈরি করেছে।
আচরণবিধি চলাকালীন নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো আপিল করার সুযোগ নেই। কমিশনের পর্যবেক্ষকেরা প্রায় বিচারিক ক্ষমতার মতো ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। তাদের নির্দেশ রাজ্য সরকারের ক্ষমতার ওপরেও প্রাধান্য পায়। নির্বাচিত না হয়েও এবং প্রায় কোনো বিচারিক নজরদারির বাইরে থেকে নির্বাচন কমিশন কার্যত পশ্চিমবঙ্গের এক ধরনের ‘সুপার সরকার’-এর ভূমিকায় কাজ করছে।
তৃণমূল কংগ্রেস এমন একটি দল, যাঁরা দুইবার সংসদে নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিশংসনের প্রস্তাব এনেছে। তাদের অভিযোগ ছিল, নির্বাচন কমিশনার বিজেপির পক্ষপাত করছেন। আধুনিক সময়ে এমন ঘটনা বিরল, এবং এটি নির্বাচন কমিশনের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার গভীর সংকটকেই নির্দেশ করে।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোটের আগের দিন (২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল) কলকাতার ভবানীপুর কেন্দ্রে টহল দিচ্ছে কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা।এক প্রকার বলপূর্বক দখল: কেন্দ্রীয় বাহিনী ও রাজ্য পুলিশের প্রান্তিকীকরণ
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে ভারতের নির্বাচন কমিশন ২৪০৭টি কোম্পানি কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করে যা প্রায় দুই লাখ চল্লিশ হাজার নিরাপত্তাকর্মীর সমান। এই সংখ্যা ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মোতায়েন করা সাত শ পঁচিশটি কোম্পানির তুলনায় তিন গুণেরও বেশি এবং ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে রাজ্যে থাকা নব্বই হাজার নিরাপত্তাকর্মীর তুলনায় প্রায় তিনগুণ।
দেশের পাঁচটি প্রধান আধাসামরিক বাহিনী—কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনী, সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী, কেন্দ্রীয় শিল্প নিরাপত্তা বাহিনী, সশস্ত্র সীমান্ত বল এবং ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশ—দেশজুড়ে তাদের স্বাভাবিক দায়িত্বস্থান থেকে সরিয়ে এনে একটি মাত্র রাজ্যে কেন্দ্রীভূত করা হয়। অথচ এখানে কোনো সক্রিয় বিদ্রোহ বা অভ্যন্তরীণ সংঘাতের পরিস্থিতিও নেই। তাদের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রধারী অবস্থায়, ছদ্মবেশী পোশাকে, সাঁজোয়া যানবাহনে চলাচল করতে দেখা যায়। এমনকি এই পাঁচ বাহিনীর প্রধানদের নিয়ে একটি সমন্বিত যৌথ কমান্ড কলকাতায় গঠন করা হয়। এটি কোনো রাজ্য নির্বাচনের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা।
এর পাশাপাশি রয়েছে সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর স্থায়ী উপস্থিতি। কেন্দ্রীয় সরকার ২০২১ সালে এই বাহিনীর এখতিয়ার ১৫ কিলোমিটার থেকে বাড়িয়ে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত করে বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর। এর ফলে মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তর চব্বিশ পরগনা ও নদীয়ার বিস্তীর্ণ অংশ কার্যত কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে চলে আসে যা সম্পূর্ণভাবে রাজ্য সরকারের নজরদারির বাইরে।
এর বিপরীতে রাজ্য পুলিশের অবস্থান কার্যত দুর্বল করে ফেলা হয়। নির্বাচন কমিশন রাজ্যের মুখ্য সচিব, পুলিশ মহাপরিচালক, কলকাতা পুলিশ কমিশনার এবং স্বরাষ্ট্র দপ্তরের প্রধান সচিবকে সরিয়ে দেয়। একই সঙ্গে আঠারো জন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাকে বদলি করা হয় এবং প্রথম ধাপের ভোটের আগের রাতেই আরও বারো জন সিনিয়র কলকাতা পুলিশ কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
ভোটের দিন কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা শুধু কাঠামোগত প্রভাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা কার্যত হস্তক্ষেপের রূপ নেয়। সুজাপুরের প্রার্থী সাবিনা ইয়াসমিন অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় বাহিনী দীর্ঘ সময় ধরে পরিচয়পত্র যাচাইয়ের নামে ভোটারদের আটকে রেখে ভোটদানের গতি ইচ্ছাকৃতভাবে ধীর করেছে যাতে মানুষ ক্লান্ত হয়ে ভোট কম দেয়। তিনি এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ হিসেবে নথিভুক্ত করেন।
এরপর দ্বিতীয় ধাপের ভোটের ঠিক আগের শেষ প্রচারদিনে একটি জনসভায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেন, দিদির লোকজনকে নিয়ে চিন্তার কিছু নেই, কারণ নির্বাচন কমিশন সর্বত্র কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করেছে। তিনি আরও জানান, নির্বাচন শেষে বিজেপি ক্ষমতায় এলেও কেন্দ্রীয় বাহিনী আরও ষাট দিন রাজ্যে থাকবে।
পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের নির্বাচনে ‘বাংলাদেশ ফ্যাক্টর’এই বক্তব্যের সাংবিধানিক তাৎপর্য গভীর। কারণ নির্বাচনের সময় কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নির্বাচন কমিশনের হাতে থাকলেও ভোট শেষ হলেই তার নিয়ন্ত্রণ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ফিরে যায়। অর্থাৎ কার্যত যিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তিনিই এই বাহিনীর ভবিষ্যৎ অবস্থান ঘোষণা করছেন।
নির্বাচন শেষে প্রায় পাঁচ শ কোম্পানি, অর্থাৎ প্রায় পঞ্চাশ হাজার নিরাপত্তাকর্মী রাজ্যে থেকে যাবে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়। একটি রাজনৈতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে একজন দলীয় নেতা হিসেবে তিনি কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভবিষ্যৎ মোতায়েনের ঘোষণা দেন, যেসব বাহিনীর ওপর তারই মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
এখানে রাষ্ট্র ও দলের মধ্যে আর কোনো স্পষ্ট বিভাজন থাকে না। এটি নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি নয়, বরং এক ধরনের স্থায়ী সামরিক উপস্থিতির ঘোষণা, যা নির্বাচনের ফল যাই হোক না কেন অব্যাহত থাকবে।
এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ছিল কেবল নির্বাচনী সময়ের একটি আবরণ। ভোট শেষ হওয়ার পর সেই আবরণও আর থাকবে না—এমন ইঙ্গিতই এই পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দেয়।
সংবিধানের কেন্দ্রীয় ঝোঁককে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার
এই প্রশ্নটা এড়ানো কঠিন—ভারতের সংবিধানে কেন্দ্রের ক্ষমতা রাজ্যের তুলনায় অনেক বেশি। তাই প্রশ্ন ওঠে, এই ধরনের পরিস্থিতি কি ওই কাঠামো ছাড়া ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গে সম্ভব হতো?
কেন্দ্রীয় আইন অনেক ক্ষেত্রে রাজ্যের চেয়ে শক্তিশালী, রাজ্যপাল নিয়োগ করে কেন্দ্র, আর জরুরি ক্ষমতার ব্যবস্থাও এমন যে অনেক সময় রাজ্যের স্বায়ত্তশাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। সুপ্রিম কোর্টও একাধিকবার ভারতকে এমন একটি রাষ্ট্র হিসেবে বর্ণনা করেছে, যেখানে কেন্দ্র শক্তিশালী এবং রাজ্য তুলনামূলকভাবে দুর্বল।
এই পরিস্থিতিতে ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গে দেখা যায়, সেই কেন্দ্রীয় ক্ষমতার বিভিন্ন দিক একসঙ্গে সক্রিয় করা হয়েছে—রাজ্যপালকে রাজনৈতিক চাপের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, বদলি করা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ আইপিএস কর্মকর্তাদের। আর নির্বাচন কমিশনকে কার্যত পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রক হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে।
সংবিধানের এই কেন্দ্র-ঝোঁক মূলত এমন ব্যবহারের জন্য তৈরি হয়নি, কিন্তু বাস্তবে সেটিকেই এখন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
বিজেপির প্রচার: বিদ্বেষ ছড়ানো কর্মসূচি
এই সময়ে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি কার্যত তাদের প্রচার ও রাজনৈতিক সক্রিয়তার বড় অংশ নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর ওপর ছেড়ে দিয়েছে বলেই মনে হয়। একই সঙ্গে বিজেপি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের রাজনৈতিক এজেন্ডা ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় এজেন্ডার রূপ নিচ্ছে।
বিজেপির মূল প্রচার ঘুরে দাঁড়িয়েছে এই দাবিকে কেন্দ্র করে যে বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারীরা পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার চরিত্র বদলে দিচ্ছে এবং কর্মসংস্থান কেড়ে নিচ্ছে। তাদের নির্বাচনী কর্মসূচির কেন্দ্রে রয়েছে ‘চিহ্নিত করা, তালিকা থেকে বাদ দেওয়া এবং বহিষ্কার করা’।
২০২৫ সালের আগস্টে লালকেল্লা থেকে স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী একটি “জনসংখ্যা মিশন” চালুর কথা ঘোষণা করেন। এর উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়—অনুপ্রবেশের মাধ্যমে ভারতের জনসংখ্যার চরিত্র বদলে দেওয়ার কথিত ষড়যন্ত্র ঠেকানো।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ধরনের পদক্ষেপ তখনই বাস্তবে শুরু হয়ে যায় বলে অভিযোগ ওঠে। একই বছর কেন্দ্রীয় সরকার কোনো পূর্ণাঙ্গ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই কিছু বাঙালি মুসলিমকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়।
আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের ভোট নিয়ে বাংলাদেশের ভাবনার কারণ কীআবার অমিত শাহ এক নির্বাচনী সভায় বলেন, ৪ মে-র পর পশ্চিমবঙ্গ থেকে সব অনুপ্রবেশকারীকে শনাক্ত করে সরিয়ে দেওয়া হবে।
এই সব বক্তব্য ও পদক্ষেপ মিলিয়ে দেখা যায়, রাজনৈতিক দল এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা একসঙ্গে একটি নির্দিষ্ট জনসংখ্যাভিত্তিক কর্মসূচির দিকে এগোচ্ছে।
এই মিলনের একটি নাম রয়েছে। যখন কোনো শাসক দল রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ধর্মীয় ও জাতিগত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষভিত্তিক কর্মসূচি চালায়, এবং সেই কর্মসূচি রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য হয়ে যায়, তখন একে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের ভাষায় ফ্যাসিবাদ বলা হয়।
নির্বাচনী জয় ফ্যাসিবাদকে বৈধতা দেয় এবং রাষ্ট্রক্ষমতার দরজা খুলে দেয়। কিন্তু ফ্যাসিবাদ শুধু নির্বাচনে জয়ী হয় না, বরং এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করে যেখানে নির্বাচন-পরবর্তী ফলাফল ধীরে ধীরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। আগের গুজরাট মডেলের মতোই বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ মডেলও সেই দিকেই একটি পরীক্ষামূলক ধাপ।
‘অনুপ্রবেশকারী’ শব্দটি এখানে একধরনের কল্পিত জনশত্রুর প্রতীক—যাকে শনাক্ত করা যায় না, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে সর্বত্র উপস্থিত বলে দেখানো যায়। এই অদৃশ্য শত্রু বাস্তবে পশ্চিমবঙ্গের গ্রাম বা শহরে নয়, বরং বিজেপির রাজনৈতিক প্রকল্পের মধ্যেই তৈরি। কিন্তু এখন সেই ধারণাকেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পূর্ণ শক্তি দিয়ে অনুসরণ করা হচ্ছে।
নির্বাচনী জয় ফ্যাসিবাদকে বৈধতা দেয় এবং রাষ্ট্রক্ষমতার দরজা খুলে দেয়। কিন্তু ফ্যাসিবাদ শুধু নির্বাচনে জয়ী হয় না, বরং এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করে যেখানে নির্বাচন-পরবর্তী ফলাফল ধীরে ধীরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। আগের গুজরাট মডেলের মতোই বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ মডেলও সেই দিকেই একটি পরীক্ষামূলক ধাপ।
তবে প্রথম দফার ভোটের পর এই অনুপ্রবেশকারীর প্রচার কিছুটা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তার জায়গায় এসেছে নানা ধরনের কল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতি ও প্রশাসনিক সমালোচনা। স্পষ্টতই, এই ইস্যুটি মাঠপর্যায়ে প্রত্যাশিত সাড়া পায়নি। সম্ভবত যতটা জোর দিয়ে এটি তোলা হয়েছিল, ততটাই তার বিপরীত প্রতিক্রিয়াও তৈরি হয়েছে। তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের কার্যকারিতা মূল্যায়নের বদলে নির্বাচনকে নাগরিকত্বের প্রশ্নে পরিণত করা হয়েছে। এবং সেই যুক্তিতে দাঁড়িয়ে, যেন প্রতিটি বাঙালিই সন্দেহের তালিকায়—যতক্ষণ না সে নিজের পরিচয় প্রমাণ করতে পারে।
বিজেপি কেন মনে করেছিল এই কৌশল পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের আকৃষ্ট করবে, তা রাজনৈতিক বিশ্লেষণের পাশাপাশি এখন মনস্তত্ত্ববিদদের প্রশ্নও বটে।
বিচার বিভাগের পিছু হটা
সর্বোচ্চ আদালত এমন একটি প্রক্রিয়া বন্ধ করেনি, যদিও তারা নিজেরাই একে ত্রুটিপূর্ণ বলে স্বীকার করেছিল। বরং তারা অসন্তুষ্ট নাগরিকদের এমন ট্রাইব্যুনালের দিকে পাঠিয়েছে, যেখানে লাখ লাখ মামলা জমে গিয়ে কার্যত অচল হয়ে আছে। একই সঙ্গে যাদের আপিল এখনো চলমান, তাদের ভোট দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য কোনো অস্থায়ী নির্দেশও আদালত দেয়নি।
প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত পশ্চিমবঙ্গে এই ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে যে তীব্র বিতর্ক চলছে, তা নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দেশের অন্য কোথাও একই ধরনের প্রক্রিয়া নিয়ে এত বিতর্ক হয়নি। এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, আদালতের দৃষ্টিতে সমস্যাটা যেন পশ্চিমবঙ্গের প্রতিক্রিয়া, প্রক্রিয়াটির কঠোরতা বা সমস্যা নয়।
ফলে এমন ধারণা তৈরি হয় যে, আদালত যখন সাংবিধানিক প্রতিবাদকে বিরক্তির চোখে দেখে, তখন তারা আগেই একটি নির্দিষ্ট অবস্থান নিয়ে ফেলেছে।
পশ্চিমবঙ্গের বাইরে: ফেডারেল কাঠামোর সংকট
তীব্র প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বিজেপির জয় নিশ্চিত নয়। তবে যা নিশ্চিত, তা হলো—ক্ষমতায় থাকা কোনো ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক দল পুরোনো সাংবিধানিক সমঝোতা অনুসরণ নাও করতে পারে। তারা শুধু নির্বাচনী ফলাফলের ওপর নির্ভর নাও করতে পারে; বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঁচা প্রয়োগের মাধ্যমে ফল নিজেদের অনুকূলে আনার চেষ্টা করতে পারে।
বাস্তবে পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন এবং কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের অন্যান্য সংঘাত মিলিয়ে দেখা গেলে বোঝা যায়, লক্ষ্য শুধু নির্বাচন জেতা নয়, বরং রাজ্য সরকারের ধারণাকেই অপ্রাসঙ্গিক করে তোলা। নির্বাচিত পৌর সংস্থাগুলোর স্থগিতাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, মণিপুর ও কেরালায় রাজ্যপালের পদকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার—এবং এমনকি যে অঞ্চল আর রাজ্য হিসেবে বিদ্যমান নেই তার প্রসঙ্গ—সব মিলিয়ে একটি ধারাবাহিক প্রবণতা দেখা যায়।
বারবার সংবিধানের জরুরি ক্ষমতা সংক্রান্ত বিধান ব্যবহার করে বিরোধী রাজ্যগুলোকে চাপের মুখে রাখা হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে বোঝানো হচ্ছে যে রাজ্য সরকারগুলো কেন্দ্রের অনুগ্রহে টিকে আছে। একই সঙ্গে এটি একটি নতুন রাষ্ট্রীয় মনোভাবের ইঙ্গিত দেয়—যেখানে বিভিন্ন ধরনের আন্দোলন, শ্রমিক দাবি বা নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সবকিছুর প্রতিক্রিয়া প্রায়শই অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে।
রাষ্ট্র বনাম রাজনীতি
এই নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস শুধু বিজেপির বিরুদ্ধে লড়েনি, তারা মূলত ভারতের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও লড়েছে। নির্বাচন কমিশন অনেক ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ না থেকে এক পক্ষকে সুবিধা দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কেন্দ্রীয় বাহিনী রাজ্য পুলিশের জায়গা নিয়ে নিয়েছে, এবং ভোট শেষ হলেও তারা রাজ্যে থেকে যাবে।
ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় অনেক মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, আবার নতুন ভোটার যুক্ত করা হয়েছে—কিন্তু কেন বা কীভাবে করা হলো, তার পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
এভাবে সংবিধানের কেন্দ্রীয় ক্ষমতাকে নির্বাচনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে একটি রাজনৈতিক প্রচার চালানো হয়েছে, যেখানে একটি ধর্মীয় সংখ্যালঘুকে “জনসংখ্যাগত হুমকি” হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই ধারণার ভিত্তিতেই ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া, কিছু মানুষকে বাইরে রাখা এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে—যদিও তখনো ভোট শুরু হয়নি।
এই সব মিলিয়ে অনেকেই মনে করছেন, ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন শুধু একটি রাজ্য নির্বাচন নয়, বরং পুরো দেশের জন্য একটি পরীক্ষামূলক পরিস্থিতি। এখানে যে ধরনের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, ভোটার তালিকা নিয়ন্ত্রণ, কেন্দ্রীয় বাহিনীর স্থায়ী উপস্থিতি এবং তদন্ত সংস্থার চাপ দেখা যাচ্ছে, তা শুধু নির্বাচনে জেতার জন্য নয়—একটি স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরির দিকেও ইঙ্গিত করে।
এই কারণে বলা হচ্ছে, এই ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি হচ্ছে যা নির্বাচন যেই জিতুক না কেন, তা কাজ করতে থাকবে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেও পশ্চিমবঙ্গের মানুষ সীমিত সম্পদ নিয়ে প্রতিরোধ করছে। এই লড়াইয়ের শেষ কবে হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না—নির্বাচনের ফল যাই হোক না কেন।
শান্তনু সমাজ, রাজনীতি ও শিল্পবিষয়ক একজন বিশ্লেষক।
দ্য ওয়্যার থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ