সার্কাসের দল থেকে ভ্যানচালক—‘হিরো’ সখার পরিপাটি চালচলন

· Prothom Alo

পোশাক-পরিচ্ছদ ও কথাবার্তার ধরন দেখে অনেকেরই চোখ আটকে যায়। অটোভ্যানের হাতল ধরে ছুটে চলেন তিনি। যাত্রীদের ডাকলেও অনেকে বিশ্বাস করতে চান না তিনি পেশাদার ভ্যানচালক কি না। এমনই এক অটো ভ্যানচালকের নাম সখা হোসেন (৬৩)। তিনি রাজশাহীর বাগমারার দ্বীপপুর ইউনিয়নের মিরপুর গ্রামের বাসিন্দা।

এলাকায় ‘হিরো’ নামেই বেশি পরিচিত সখা হোসেন। তাঁর এই পরিপাটির ভেতরে লুকিয়ে আছে অজানা এক গল্প। যাত্রা ও গানের দলের লোক হিসেবেই তাঁর এই চলন। সেখান থেকেই পরিপাটি হয়ে চলাফেরা করার অভ্যাস। প্রায় নিঃসঙ্গ সখা হোসেন এভাবেই আনন্দের মধ্যেই জীবন কাটাতে চান।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

শিশুকাল থেকেই ঘরছাড়া সখা। বাবা-মায়ের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ায় একসময় তিনি ‘কফিলের সার্কাস দল’ নামে পরিচিত একটি সার্কাস দলে যোগ দেন। আনন্দের মধ্যে থাকা ও পেট বাঁচানোর জন্য সেখানে যোগ দেন তিনি। প্রথমে ছোটখাটো কাজ করলেও একসময় কিছু শারীরিক কসরত শিখে নিজেকে পাকাপোক্ত করেন সার্কাস দলে। একসময় দল ভেঙে গেলে বেকার হয়ে পড়েন। কষ্টে পড়লেও নিজের মনের বিনোদন ধরে রাখেন। পরে বিভিন্ন যাত্রাদলের সঙ্গে যোগাযোগ করে অভিনয় শুরু করেন। ওই সময় গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন জাতীয় দিবসে আয়োজিত যাত্রাপালার সহশিল্পী হিসেবেও অভিনয় করতেন। একসময় নিজ এলাকায় একটি গানের দল গড়ার উদ্যোগ নেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে শিল্পী সংগ্রহ করে ‘বেহুলা গানের দল’ তৈরি করেন। অভিনয়ের পাশাপাশি দলে ঢোলও বাজাতেন। তবে একসময় শারীরিক সমস্যার কারণে দলের নেতৃত্ব ধরে রাখতে পারেননি। এক পায়ে সমস্যা থাকায় দলের দায়িত্ব এলাকার এক তরুণের হাতে তুলে দেন। তিনি প্রশিকা, ভার্ক, ব্র্যাকসহ বিভিন্ন সংগঠনের সামাজিক সচেতনতামূলক নাটিকায় অভিনয় করে সংসার চালাতেন।

সখা হোসেন বলেন, নিজেকে এভাবে রাখাতে শান্তি পান। এক ছেলে ও মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার পর এখন তিনি স্বাধীন। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর আর বিয়ে করেননি। হুলিখালী এলাকায় বাঁধের পাশে সরকারি জায়গায় ছোট একটি ঘর তৈরি করে সেখানে বসবাস করেন। সংসারের একমাত্র সদস্য তিনি। রান্নাসহ সংসারের সব কাজই তাঁকে করতে হয়। সংসারের কাজ শেষে সকালে অটোভ্যান নিয়ে বের হন রোজগারের জন্য। যা আয় হয়, তা দিয়েই নিজের খরচ চালান। কোনো সঞ্চয় বা পুঁজির চিন্তা নেই। তাঁর ভাষায়, সংসারের খরচ বাদে যা থাকে তা দিয়ে নিজের পোশাক ও প্রয়োজনীয় জিনিস কেনেন। সখা বলেন, ‘এভাবে আনন্দের মধ্যে থাকলে ভেতরের দুঃখ-কষ্ট ভুলে থাকা যায়। সব সময় নিজেকে গানের চরিত্রের মতো সুখী মনে হয়।’

ভ্যান চালিয়ে নিজের খরচ উঠলে শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ দেন না। কারণ, অসুস্থ হয়ে পড়লে দেখাশোনার কেউ নেই, ঘরেই অনাহারে থাকতে হবে—এমন ভেবে সতর্ক থাকেন। কখনো অসুস্থ হয়ে পড়লে ভ্যান চালাতে পারেন না তখন কষ্টে দিন কাটে। নিজের বাড়িঘর নেই, আপনজনও কেউ নেই। তবু এভাবেই নিজেকে সুখী মনে করেন তিনি। সখা জানান, নিজেকে পরিপাটি রাখার কারণে অনেক সময় যাত্রীরা ভ্যানে উঠতে সংকোচবোধ করেন। তিনি আদৌ ভ্যানচালক কি না—এ নিয়েও দ্বিধায় পড়েন অনেকে।

স্থানীয় বাসিন্দা শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমরা সখাকে হিরো নামেই ডাকি। তার অভাব, কষ্ট থাকলেও তা প্রকাশ করেন না, সব সময় নিজেকে গুছিয়ে রাখেন।’ মিরপুর গ্রামের সাইদুর রহমান বলেন, ‘সখা চাচাকে দেখলে সুখী মানুষ মনে হয়। তিনি কষ্টে থাকলেও কাউকে বুঝতে দেন না। ভালো ঢোল বাজাতে পারেন, এখনো রাতে মাঝেমধ্যে বাঁধের হাটে গানের আসর বসান। লোকজনকে আনন্দ দেন।’

Read full story at source