কেন শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর বেশি প্রিয়

· Prothom Alo

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের তুলনায় আল্লাহর নিকট অধিক উত্তম ও অধিক প্রিয়। তবে উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে। যা তোমার উপকারে আসে, তা অর্জনের জন্য আগ্রহী হও, আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করো এবং দুর্বলতা প্রদর্শন কোরো না। যদি কোনো বিপদ আসে, তবে এ কথা বলো না—“যদি আমি এমন করতাম, তবে এমন হতো।”

বরং বলো, “আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন এবং যা ইচ্ছা করেছেন, তাই ঘটেছে।” কারণ “যদি” শব্দটি শয়তানের কুমন্ত্রণার দরজা খুলে দেয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৬৬৭)

Visit asg-reflektory.pl for more information.

হজরত আবু হোরাইরা (রা.) বর্ণিত এই হাদিসটি মানবজীবনের আত্মিক শক্তি, মানসিক দৃঢ়তা এবং কর্মমুখর জীবনের এক অনন্য দিকনির্দেশনা প্রদান করে। এতে রাসুল (সা.) একজন মুমিনের প্রকৃত শক্তির উৎস, তাঁর জীবনদৃষ্টি, ব্যর্থতার প্রতি মনোভাব এবং আল্লাহর প্রতি নির্ভরতার সঠিক রূপ তুলে ধরেছেন।

হাদিসটির মূল বার্তা হলো—একজন শক্তিশালী ইমানদার ব্যক্তি আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়, তবে দুর্বল ইমানদারও কল্যাণ থেকে বঞ্চিত নয়। এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ বক্তব্য।

যখন মানুষ বারবার ব্যর্থ হয় এবং হতাশায় নিমজ্জিত হয়, তখন আল্লাহর দিকে ফিরে আসাই তার জন্য সবচেয়ে বড় আশ্রয়।

প্রথমত, এই হাদিসে ‘শক্তিশালী মুমিন’ ধারণাটি তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে শক্তি বলতে কেবল শারীরিক শক্তি বোঝানো হয়নি; বরং মানসিক দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাস, সংকল্প এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাসকে বোঝানো হয়েছে।

একজন মুমিন যখন তাঁর ইমানকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করেন, তখন তাঁর ভেতরে এক ধরনের আত্মিক শক্তি জন্ম নেয়, যা তাঁকে হতাশা, ভয় এবং দুর্বলতা থেকে মুক্ত রাখে। এই শক্তিই তাঁকে জীবনের প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে সাহায্য করে। অন্যদিকে দুর্বল মুমিনও সম্পূর্ণভাবে অকল্যাণকর নয়; তাঁর মধ্যেও ভালোত্ব আছে, কিন্তু সে নিজের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারে না।

দ্বিতীয়ত, রাসুল (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, ‘যা তোমার উপকারে আসে, তা অর্জনের জন্য আগ্রহী হও’। এই বাক্যটি ব্যাপক অর্থবহ। এটি দুনিয়া ও আখেরাত উভয় ক্ষেত্রের কল্যাণকে অন্তর্ভুক্ত করে। একজন মানুষকে তাঁর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে উপকারী বিষয়গুলোর প্রতি মনোযোগী হতে হবে এবং সেগুলো অর্জনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।

এখানে কেবল ইচ্ছা নয়, বরং কার্যকর প্রচেষ্টা ও কর্মতৎপরতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি মানুষের অলসতা ও নিষ্ক্রিয়তার বিপরীতে এটি একটি সুদৃঢ় আহ্বান।

ধৈর্যকে অভ্যাসে পরিণত করার একটি সহজ কৌশল

তৃতীয়ত, হাদিসে আল্লাহর সাহায্য কামনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। মানুষ যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তার ক্ষমতা সীমিত। তাই তার প্রত্যেক প্রচেষ্টার সঙ্গে আল্লাহর সাহায্য কামনা করা আবশ্যক। এই নির্ভরতা মানুষকে একদিকে বিনয়ী করে, অন্যদিকে তাঁকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।

কারণ সে জানে, তার পেছনে সর্বশক্তিমান আল্লাহর সহায়তা রয়েছে। বিশেষ করে যখন মানুষ বারবার ব্যর্থ হয় এবং হতাশায় নিমজ্জিত হয়, তখন আল্লাহর দিকে ফিরে আসাই তার জন্য সবচেয়ে বড় আশ্রয়।

চতুর্থত, হাদিসে ‘দুর্বলতা প্রদর্শন কোরো না’—এই নির্দেশনার মাধ্যমে মানসিক দুর্বলতা বা ‘অর্জিত অক্ষমতা’-এর বিরুদ্ধে সতর্ক করা হয়েছে। অনেক সময় মানুষ একাধিক ব্যর্থতার কারণে নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে এবং মনে করে যে সে আর সফল হতে পারবে না।

ফলে সে চেষ্টা করা ছেড়ে দেয় এবং ব্যর্থতার কাছে আত্মসমর্পণ করে। এই মানসিকতা ইসলাম সমর্থন করে না। বরং ইসলাম মানুষকে সব সময় আশাবাদী হতে, নতুন করে চেষ্টা করতে এবং নিজের সক্ষমতার ওপর আস্থা রাখতে উৎসাহিত করে।

ব্যর্থতার পর ‘যদি’ শব্দ ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছে। ‘যদি আমি এমন করতাম, তাহলে এমন হতো’—এই ধরনের চিন্তা মানুষকে অতীতের মধ্যে আটকে রাখে এবং তার মানসিক শান্তি নষ্ট করে।

পঞ্চমত, এই হাদিসে আত্মমর্যাদাবোধের গুরুত্বও তুলে ধরা হয়েছে। ‘শক্তিশালী মুমিন’ শব্দবন্ধটি একজন মুমিনের আত্মপরিচয়কে ইতিবাচকভাবে নির্মাণ করে। এটি তাঁকে তাঁর নিজের মূল্য উপলব্ধি করতে শেখায়। 

যখন একজন ব্যক্তি নিজেকে মূল্যবান মনে করেন এবং বিশ্বাস করেন যে তিনি আল্লাহর কাছে প্রিয়, তখন তাঁর ভেতরে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। এই আত্মবিশ্বাস তাঁকে জীবনের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাহসী করে তোলে এবং তাঁকে সাফল্যের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।

ষষ্ঠত, হাদিসে ব্যর্থতার পর ‘যদি’ শব্দ ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছে। ‘যদি আমি এমন করতাম, তাহলে এমন হতো’—এই ধরনের চিন্তা মানুষকে অতীতের মধ্যে আটকে রাখে এবং তার মানসিক শান্তি নষ্ট করে। এটি শয়তানের একটি কৌশল, যার মাধ্যমে মানুষকে হতাশা ও দুশ্চিন্তার মধ্যে নিমজ্জিত করা হয়। এর পরিবর্তে একজন মুমিনকে বলা হয়েছে—‘আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন এবং যা ইচ্ছা করেছেন, তাই ঘটেছে।’

এই বিশ্বাস মানুষকে মানসিক প্রশান্তি দেয় এবং তাঁকে বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।

‘যে ব্যক্তি মিতব্যয়ী হয়, সে কখনো অভাবে পড়ে না’

সপ্তমত, এই হাদিসে কদর বা তাকদিরের প্রতি বিশ্বাসের গুরুত্বও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। মানুষ তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পরও যদি কাঙ্ক্ষিত ফল না পায়, তাহলে তাকে বুঝতে হবে যে এটি আল্লাহর ফয়সালা। আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাবান; তিনি যা করেন, তা অবশ্যই কোনো না কোনো কল্যাণের জন্য। এই বিশ্বাস একজন মানুষকে হতাশা থেকে রক্ষা করে এবং তাঁকে ধৈর্যশীল ও সন্তুষ্ট থাকতে শেখায়।

অষ্টমত, এই হাদিসে একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনদৃষ্টির শিক্ষা দেওয়া হয়েছে—যেখানে একদিকে রয়েছে কর্মপ্রচেষ্টা, অন্যদিকে রয়েছে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ নির্ভরতা। এটি মানুষকে কর্মবিমুখ করে না, আবার কেবল নিজের শক্তির ওপর নির্ভর করতেও বলে না। বরং এটি শেখায়—মানুষ তার সাধ্যের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে এবং ফলাফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেবে।

রাসুল (সা.) নিজেও অক্ষমতা, অলসতা ও দুর্বলতা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। এর মাধ্যমে তিনি উম্মতকে শিখিয়েছেন যে এই দুর্বলতাগুলো থেকে মুক্তি পেতে দোয়া করা গুরুত্বপূর্ণ।

নবমত, রাসুল (সা.) নিজেও অক্ষমতা, অলসতা ও দুর্বলতা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। এর মাধ্যমে তিনি উম্মতকে শিখিয়েছেন যে এই দুর্বলতাগুলো থেকে মুক্তি পেতে দোয়া করা গুরুত্বপূর্ণ। এই দোয়া মানুষের আত্মাকে শক্তিশালী করে এবং তাঁকে নেতিবাচকতা থেকে দূরে রাখে।

এই হাদিসটি একজন মুমিনের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন প্রদান করে। এতে আত্মবিশ্বাস, কর্মপ্রচেষ্টা, আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা, আশাবাদ, ধৈর্য এবং তাকদিরের প্রতি সন্তুষ্টি—এই সবকিছুর সমন্বয় ঘটেছে।

এটি মানুষকে শেখায় যে জীবনে সফল হতে হলে তাঁকে শক্তিশালী হতে হবে—শরীরের শক্তিতে নয়, বরং ইমানের শক্তিতে; তাঁকে চেষ্টা করতে হবে, ব্যর্থতায় ভেঙে পড়া যাবে না; এবং সবশেষে আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকতে হবে।

এই হাদিসের আলোকে একজন মুমিন কখনো নিজেকে অক্ষম মনে করবেন না। বরং সে জানবে, তার মধ্যে অসীম সম্ভাবনা রয়েছে, যা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও নির্ভরতার মাধ্যমে বিকশিত হতে পারে। সে অতীতের ব্যর্থতায় আটকে না থেকে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে, আশাবাদী হবে এবং প্রতিটি পরিস্থিতিতে আল্লাহর হেকমতের ওপর আস্থা রাখবে।

আল্লাহর ওপর ভরসা করা কেন ইমানের অপরিহার্য অংশ

Read full story at source