বাংলাদেশে নারীর অগ্রগতি বনাম জেন্ডার ‘প্রতি–আঘাত’
· Prothom Alo

বাংলাদেশে নারীর অগ্রগতি দৃশ্যমান হলেও এর পাশাপাশি একটি কাঠামোগত জেন্ডার ‘প্রতি–আঘাত’ও তৈরি হয়েছে। লিখেছেন ফারহানা হাফিজ
Visit rouesnews.click for more information.
বাংলাদেশে নারীর অগ্রগতির গল্প উন্নয়ন সূচকে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত। গত তিন দশকে নারীদের শিক্ষায় অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, পোশাকশিল্পে নারীর শ্রমশক্তি অর্থনীতির কাঠামো বদলে দিয়েছে, মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে, ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে নারীর অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি বিস্তৃত হয়েছে এবং স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত নারীর উপস্থিতি দৃশ্যমান হয়েছে। জেন্ডার সূচকেও, বিশেষত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় তুলনামূলকভাবে এগিয়ে। তবে এই পরিসংখ্যানগত সাফল্যের আড়ালে একটি জটিল বাস্তবতা ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছে।
নারীর অধিকার ও দৃশ্যমানতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে একটি শক্তিশালী সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, যা ধীরে ধীরে একটি কাঠামোগত প্রতি–আঘাতে (ব্যাকল্যাশ) রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) অনুযায়ী, প্রায় ৭৬ শতাংশ নারী জীবদ্দশায় কোনো না কোনো নির্যাতনের শিকার হন—এর বেশির ভাগই প্রকাশ পায় না, যা নির্যাতনের সামাজিক স্বাভাবিকীকরণকে নির্দেশ করে। নির্যাতনকে অনেক ক্ষেত্রে ‘ব্যক্তিগত’ বা ‘পারিবারিক’ বিষয় হিসেবে দেখার প্রবণতা এই নীরবতাকে আরও শক্তিশালী করে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল সহিংসতার নতুন মাত্রা—অনলাইনে হুমকি, হয়রানি, ব্ল্যাকমেল, ছবির অপব্যবহার, যা তরুণী ও পেশাজীবী নারীদের প্রভাবিত করছে। ফলে নারীর দৃশ্যমানতা ও অংশগ্রহণ বাড়লেও, তার বিপরীতে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ডিজিটাল প্রতিরোধ তাঁদের নাগরিক অংশগ্রহণকে সীমিত করছে। এটা সামগ্রিকভাবে জেন্ডার প্রতি–আঘাতের একটি কাঠামোগত বাস্তবতা নির্দেশ করে।
অগ্রগতির সঙ্গে প্রতি–আঘাতের সহাবস্থান
নারীর ক্ষমতায়ন একমুখী প্রক্রিয়া নয়; শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও রাজনীতিতে নারীর প্রবেশ সামাজিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে চ্যালেঞ্জ করে, যা থেকে প্রতিরোধ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বাংলাদেশে এই প্রতি–আঘাত তিন স্তরে দেখা যায়—সামাজিক স্তরে নারীর চলাচল ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ; সাংস্কৃতিক স্তরে ‘সম্মান’, ‘নৈতিকতা’ ও ধর্মীয় পরিচয়ের মাধ্যমে নারীকে পুনঃসংজ্ঞায়ন এবং রাজনৈতিক স্তরে নীতি ও আইনের মাধ্যমে নারীর অধিকারকে সীমিত বা পুনর্ব্যাখ্যা করার চেষ্টা। এই তিন স্তর মিলেই নারীর স্বাধীনতা ও নাগরিক অংশগ্রহণকে প্রভাবিত করে একটি কাঠামোগত জেন্ডার প্রতি–আঘাত তৈরি করে।
রাজনৈতিক প্রতি–আঘাতের উত্থান
বাংলাদেশে জেন্ডার প্রতি–আঘাতের শিকড় ১৯৯০-এর দশকে, যখন এনজিওর নেতৃত্বাধীন উন্নয়ন কর্মসূচি নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে শুরু করে। এ সময় গ্রামীণ সমাজে, বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নোয়াখালীর মতো অঞ্চলে স্থানীয় প্রতিরোধ, অপপ্রচার ও সামাজিক চাপ তৈরি হয়। নারীর বাইরে কাজ করা বা সংগঠিত কার্যক্রমে অংশগ্রহণকে অনেক ক্ষেত্রে ‘সামাজিক শৃঙ্খলার বাইরে যাওয়া’ হিসেবে দেখা হতো। প্রতি–আঘাত তখন মূলত পরিবার ও স্থানীয় সমাজে সীমিত থাকলেও, নারীর ভূমিকাকে ঘিরে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।
এই সামাজিক প্রতিরোধ ২০১১-২০১৩ সময়ে রাজনৈতিক রূপ নেয়। জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিকে ঘিরে বিতর্ক এবং ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন নারী অধিকারের প্রশ্নকে সরাসরি রাষ্ট্রীয় নীতি ও রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করে। সমতা ও অধিকারের বিষয়গুলোকে ধর্ম, নৈতিকতা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সংঘর্ষে ফেলা হয়। ফলে নারী অধিকার একদিকে আইনি স্বীকৃতি পেলেও, এর সামাজিক বৈধতা ক্রমেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।
নারীর উপস্থিতি: নিয়ন্ত্রণ ও সহিংসতার রাজনীতি
বাংলাদেশে জেন্ডার প্রতি–আঘাত সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় পাবলিক স্পেসে নারীর উপস্থিতি ঘিরে। শহরের রাস্তা, বিশ্ববিদ্যালয় বা সাংস্কৃতিক আয়োজনে নারীর উপস্থিতি এখনো শর্তাধীন; যেখানে তাঁদের চলাচল সামাজিক নজরদারি, নৈতিক বিচার এবং কখনো সহিংসতার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। গত দুই বছরে কয়েকটি ঘটনা এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
২০২৫ সালে লালমাটিয়া এলাকায় এক নারী শিক্ষার্থীকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া হয়রানির ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়; প্রকাশ্য রাস্তায় নারীর নিরাপত্তা ও চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। একই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক প্রশাসনিক কর্মচারীর দ্বারা নারী শিক্ষার্থীর প্রতি যৌন হয়রানিমূলক আচরণের অভিযোগ ওঠে, যা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করে। এ ধরনের ঘটনাগুলো কেবল ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবে দেখা যায় না; বরং এগুলো দেখায় কীভাবে উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানসহ ‘আধুনিক’ স্পেসেও নারীর উপস্থিতি এখনো নিরাপদ বা স্বাভাবিক নয়।
পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে, উৎসব বা জনসমাগমে নারীর দৃশ্যমানতা বাড়ার পাশাপাশি তাঁদের পোশাক ও আচরণ নিয়ে সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও অনলাইন আক্রমণ বাড়ছে। এ ধরনের প্রতিক্রিয়া আসলে একটি বৃহত্তর সামাজিক কাঠামোর অংশ, যা নারীর চলাচল ও দৃশ্যমানতাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে পাবলিক স্পেস এখনো জেন্ডার নিরপেক্ষ নয়; বরং এটি এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে নারীর উপস্থিতি প্রতিনিয়ত নিয়ন্ত্রণের মুখে পড়ে। ফলে নির্যাতন ও নিয়ন্ত্রণ এখন আর কেবল ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়; এটি পাবলিক স্পেসেও স্বাভাবিক এক সামাজিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হচ্ছে, যা বৃহত্তর জেন্ডার প্রতি–আঘাতের অংশ।
নতুন প্রতি–আঘাত: অনলাইন সহিংসতা ও হেটস্পিচ
গত এক দশকে বাংলাদেশের জেন্ডার প্রতি–আঘাত ডিজিটাল স্পেসে আরও জটিল রূপ নিয়েছে। বিবিএস ও ইউএনএফপিএর প্রতিবেদন (২০২৪) অনুযায়ী, প্রায় ৮ দশমিক ৩ শতাংশ নারী অনলাইন সহিংসতার শিকার হন, যার মধ্যে হুমকি, ব্ল্যাকমেল, ছবির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়ায় হয়রানি অন্তর্ভুক্ত। একইভাবে ইউএন উইমেন জানায়, ৬০ শতাংশের বেশি নারী, বিশেষ করে তরুণী, সাংবাদিক ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় নারীরা কোনো না কোনোভাবে অনলাইন হেটস্পিচ বা হয়রানির মুখোমুখি হন। (ইউএন উইমেন এশিয়া প্যাসিফিক, ২০২৩–২৪ ডিজিটাল ভায়োলেন্স রিপোর্টস)
এই প্রবণতা একটি সংগঠিত নেটওয়ার্কভিত্তিক হয়রানির সংস্কৃতির ইঙ্গিত দেয়, যেখানে নারীর মতপ্রকাশ দমনে সমন্বিত ট্রলিং, ভুয়া তথ্য প্রচার, ছবি বিকৃতি ও ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের মতো কৌশল ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে নারী সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে একাধিক অনলাইন ক্যাম্পেইন দেখা গেছে; যেখানে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বা মতামতের পর তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ভুয়া তথ্য ছড়ানো, ছবি বিকৃত করা এবং সমন্বিত ট্রলিংয়ের মাধ্যমে চরিত্রহননের চেষ্টা করা হয়েছে। এটা বিভিন্ন প্রেস ফ্রিডম রিপোর্টেও উল্লেখ আছে। (রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস, ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স: বাংলাদেশ কান্ট্রি নোটস, ২০২২–২০২৪)
একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সামাজিক বা রাজনৈতিক বিষয়ে মতপ্রকাশের পর সংগঠিত ট্রলিং, হুমকি এবং ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। এটাকে বিভিন্ন গবেষণায় ‘ডক্সিং–লাইক হ্যারাসমেন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। (ডিজিটাল রাইটস বাংলাদেশ, ২০২৩; এক্সেস নাউ সাউথ এশিয়া রিপোর্ট, ২০২৪)
রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় নারীরা নির্বাচনের সময় ও সামাজিক আন্দোলনে সমন্বিত অপপ্রচার, যৌন হয়রানি ও ভয়ভীতির মুখে পড়ছেন, যা তাঁদের জনপরিসরে অংশগ্রহণ সীমিত করে। পাশাপাশি ইমেজভিত্তিক ব্ল্যাকমেল ও ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের ঘটনাও বেড়েছে, বিশেষ করে তরুণীদের মধ্যে। এই ডিজিটাল নির্যাতনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো ধর্মীয় ও নৈতিক বয়ানের ব্যবহার। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নারীদের ‘ফিতনা’ বা সমাজের অস্থিতিশীলতার উৎস বা নৈতিক অবক্ষয়ের কারণ হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এটা নির্যাতনকে সামাজিকভাবে বৈধতা দেয় এবং নারীর বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রণকে স্বাভাবিক করে তোলে।
এসব উদাহরণ থেকে স্পষ্ট, ডিজিটাল স্পেস একদিকে সুযোগ সৃষ্টি করলেও, অন্যদিকে এটি সংগঠিত জেন্ডার প্রতি–আঘাতের ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করছে।
রাজনৈতিকীকরণ: পরিচয়ের রাজনীতিতে নারী
বাংলাদেশে নারীর অধিকার প্রশ্নটি এখন সামাজিক বা ধর্মীয় বিতর্কের বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক বয়ান ও কৌশলের অংশে পরিণত হয়েছে, যেখানে নারী পরিচয়কে ‘সংস্কৃতি বনাম অধিকার’ কিংবা ‘ধর্ম বনাম আধুনিকতা’ দ্বৈততার মাধ্যমে পুনর্গঠন করা হয়। নির্বাচনী রাজনীতিতে নারীকে প্রায়ই মা, স্ত্রী বা পরিবারের রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ফলে তাঁর স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভূমিকা কম গুরুত্ব পায়। (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ অ্যান্ড সিপিডি, ইলেকশন ম্যানিফেস্টো অ্যানালাইসিস, ২০১৮–২০২৪)
এই প্রবণতা ২০১৩ সালের হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবিতে স্পষ্টভাবে দেখা যায়; যেখানে নারী উন্নয়ন ও সম–অধিকারকে ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। একইভাবে নির্বাচনী রাজনীতিতে, বিশেষত জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক নির্বাচনী ইশতেহারে নারীকে মূলত পরিবারকেন্দ্রিক ভূমিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে; যেখানে তাঁর স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিচয় তুলনামূলকভাবে অনুপস্থিত।
একইভাবে ইউএন উইমেন (২০২২–২০২৪) দেখায়, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ভাষ্যে নারীকে প্রায়ই ‘রিলেশনাল আইডেন্টিটি’, অর্থাৎ মা, স্ত্রী বা মেয়ে হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এটা নারীকে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক এজেন্ট হিসেবে দুর্বল করে। ফলে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়লেও, সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁর উপস্থিতি এখনো সীমিত এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রতীকী।
এই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো বাংলাদেশে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ ৩৬-৩৮ শতাংশ (বিশ্বব্যাংক, ২০২৩) হলেও রাজনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাঁদের উপস্থিতি কম। এই বৈষম্য কেবল সংখ্যাগত নয়, বরং বয়ানগত; যেখানে নারীর নাগরিক ও রাজনৈতিক এজেন্সিকে সম্পর্কভিত্তিক পরিচয়ে সীমিত করা হয়। এভাবেই জেন্ডার প্রতি–আঘাত একটি প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে নারীর দৃশ্যমানতা ও অংশগ্রহণকে দুর্বল করে।
নারী আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা ও আত্মসমালোচনা
নারী আন্দোলন প্রতি–আঘাত মোকাবিলার চেষ্টা করছে। তবে এটি কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হচ্ছে। বাংলাদেশে নারী আন্দোলন অনেক ক্ষেত্রেই শহুরে, মধ্যবিত্ত, এনজিওনির্ভর ও প্রকল্পভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে অবস্থান করছে। ফলে এটি গ্রামীণ, নিম্ন আয়ের ও ধর্মীয়ভাবে সংবেদনশীল নারীদের দৈনন্দিন বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি যুক্ত হতে পারছে না।
এই পরিপ্রেক্ষিতে নারী আন্দোলন প্রায়ই নীতিনির্ভর ও অধিকারভিত্তিক ভাষা ব্যবহার করছে, যা স্থানীয় সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও পারিবারিক নিরাপত্তা ধারণার সঙ্গে সীমিত সংযোগ তৈরি করছে। ফলে আন্দোলন ও জনমানসের মধ্যে একটি চলমান ‘যোগাযোগবিচ্ছিন্নতা’ তৈরি হচ্ছে, যা নারীর অধিকারবিষয়ক বয়ানকে আরও জটিল করে তুলছে।
ধর্মীয় বয়ানের ভেতরে সমতার ভাষা নির্মাণে দ্বিধা নারী অধিকারের অগ্রগতিকে সীমিত করছে। দক্ষিণ এশিয়ার গবেষণা দেখাচ্ছে যে ধর্মীয় ব্যাখ্যার মধ্যে সমতা ও ন্যায়ের ভাষা পুনর্গঠন না করা হলে তা প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি দ্বারা দখল হচ্ছে। বাংলাদেশে ধর্মীয় ওয়াজ-মাহফিল ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নারীর নেতিবাচক ভূমিকা নিয়ে শক্তিশালী নৈতিক বয়ান গড়ে উঠছে, যা অনেক ক্ষেত্রে নারী অধিকারের ভাষার চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে। ফলে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি সহজ ও পরিচয়ভিত্তিক ভাষা ব্যবহার করছে আর নারী আন্দোলন তুলনামূলকভাবে কাঠামোগত ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকছে।
সব মিলিয়ে নারী আন্দোলন এখন কাঠামোগত বৈষম্য মোকাবিলার পাশাপাশি ভাষা, কৌশল ও সাংস্কৃতিক সংযোগ পুনর্গঠন করছে। কারণ, এই ব্যবধান দীর্ঘায়িত হওয়ায় প্রতি–আঘাত আরও গভীরভাবে সমাজে শিকড় গেড়ে বসছে এবং নারী অধিকার ক্রমে একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।
অগ্রগতি ও প্রতি–আঘাতের একই বাস্তবতা
বাংলাদেশে নারীর অগ্রগতি দৃশ্যমান হলেও এর পাশাপাশি একটি কাঠামোগত জেন্ডার প্রতি–আঘাতও তৈরি হয়েছে, যা নারীর নাগরিক পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করে। অগ্রগতি ও প্রতি–আঘাত আলাদা সময় নয়; বরং একই প্রক্রিয়ার সমান্তরাল বাস্তবতা; যেখানে নারীর দৃশ্যমানতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে নারী অধিকার এখন কেবল উন্নয়নের সূচক নয়, বরং একটি চলমান রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগ্রাম।
এই পরিপ্রেক্ষিতে মূল প্রশ্ন হলো, নারীর সম–অধিকার কি শুধু উন্নয়নগত অগ্রগতি, নাকি এটি একটি অব্যাহত সামাজিক-রাজনৈতিক দর–কষাকষি—যেখানে প্রতিটি অগ্রগতির সঙ্গে নতুন প্রতিরোধও তৈরি হয়। এই বোঝাপড়াই ভবিষ্যৎ জেন্ডার ন্যায্যতার অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই পথ নির্ধারণ করবে।
ফারহানা হাফিজ জেন্ডার বিশ্লেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব