নতুন প্রজন্ম ও রবীন্দ্রনাথ: ভালোবাসা আছে, কিন্তু পড়া কি আছে?
· Prothom Alo

বৈশাখ–জ্যৈষ্ঠ এলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবিতে। কেউ দিচ্ছে ‘আমার সোনার বাংলা’র কয়েকটি লাইন, কেউ শেয়ার করছে ‘গীতাঞ্জলি’র কোনো বিখ্যাত পঙ্ক্তি, কেউবা প্রোফাইল পিকচার বদলে দিচ্ছে রবীন্দ্রনাথের চিরচেনা প্রতিকৃতিতে। ফেসবুকের নিউজফিড দেখলে মনে হয়, এই প্রজন্ম রবীন্দ্রনাথকে বুকে ধরে রেখেছে। কিন্তু প্রশ্নটা তখনই মাথায় আসে, এ ভালোবাসা কি শুধু উদ্যাপনের, নাকি পাঠেরও?
Visit somethingsdifferent.biz for more information.
একটু সৎ হলেই স্বীকার করতে হবে যে আমাদের নতুন প্রজন্মের বড় একটি অংশ রবীন্দ্রনাথকে চেনে মূলত কয়েকটি বিখ্যাত উদ্ধৃতি আর জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে। ‘গীতাঞ্জলি’ পড়েছে কতজন? ‘গোরা’ উপন্যাস শেষ করেছে কজন? ‘রক্তকরবী’ নাটকের মর্মবেদনা অনুভব করেছে কতটি তরুণ হৃদয়? এসব প্রশ্ন করলে অনেকেই চুপ হয়ে যায়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মাত্র আট বছর বয়সে কবিতা লিখতে শুরু করেছিলেন। তাঁর সাহিত্যজীবন বিস্তৃত ছিল প্রায় সাত দশকজুড়ে। দুই হাজারের বেশি গান, পঞ্চাশটির বেশি কাব্যগ্রন্থ, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, চিত্রকলা—এই বিশাল সৃষ্টিভান্ডারের কতটুকু আজকের তরুণেরা স্পর্শ করেছে? সত্যি বলতে, খুবই সামান্য।
তবে একটি কথা না বললেই নয়। এ প্রজন্মকে একেবারে দোষ দেওয়াটাও ঠিক হবে না। তাঁরা রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসে, তবে ভালোবাসার প্রকৃতি বদলে গেছে। আগের প্রজন্ম রবীন্দ্রনাথকে পড়ত বইয়ের পাতায়, এখনকার প্রজন্ম তাঁকে খোঁজে রিলসে, শর্ট ভিডিওতে, স্পটিফাইয়ের প্লেলিস্টে।
রবীন্দ্রসংগীত কিন্তু আজও তরুণদের কাছে জীবন্ত। অরিজিৎ সিং থেকে শুরু করে বাংলাদেশের অনেক তরুণ শিল্পী রবীন্দ্রনাথের গান নতুনভাবে গাইছেন, নতুন প্রজন্ম সেটি শুনছে, গুনগুন করছে। এটিও কি এক ধরনের পাঠ নয়? হয়তো তর্ক করা যায়। কিন্তু গান শোনা আর সাহিত্য পড়া —এ দুটো এক জিনিস নয়। রবীন্দ্রনাথের একটি ছোটগল্প পড়লে যে অনুভূতি হয়, একটি রিলস দেখে সেটি হওয়া সম্ভব নয়। ‘হৈমন্তী’র যন্ত্রণা, ‘কাবুলিওয়ালা’র বুকভাঙা মমতা, ‘নষ্টনীড়’-এর জটিল মানবসম্পর্ক—এ গভীরতা শুধু পাঠেই অনুভব করা যায়।
প্রজন্মের হৃদয়ে চিরজাগরূক রবীন্দ্রনাথএই দূরত্বের পেছনে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থারও একটা বড় ভূমিকা রয়েছে। স্কুলে রবীন্দ্রনাথকে পড়ানো হয় পরীক্ষার উত্তর মুখস্থ করানোর জন্য। ‘কবির জীবনী লেখো’— এই প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে শিক্ষার্থীরা রবীন্দ্রনাথকে একটি বিরক্তিকর পাঠ্যবিষয় হিসেবে চিনে নেয়। কবিতার মানে না বুঝিয়ে কবিতা গেলানো হয়। ফলে পরীক্ষার খাতায় রবীন্দ্রনাথ থাকেন, কিন্তু হৃদয়ে আর ঠাঁই পান না।
অথচ রবীন্দ্রনাথ নিজেই শিক্ষার এ যান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে ছিলেন। শান্তিনিকেতনে তিনি গাছের ছায়ায় পাঠদানের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তার মূলে ছিল আনন্দের মধ্য দিয়ে শেখা। সেই রবীন্দ্রনাথকেই আমরা আনন্দহীন পাঠ্যক্রমের শৃঙ্খলে বেঁধে রেখেছি।
রবীন্দ্রনাথের লেখায় মানুষের যে চিত্র আছে, তা এখনো প্রাসঙ্গিক। তাঁর নারী চরিত্রগুলো যেমন বিনোদিনী, চারুলতা, হৈমন্তী—আজকের সমাজেও কথা বলে। তাঁর প্রবন্ধে সমাজ ও রাজনীতির যে বিশ্লেষণ আছে, তা পড়লে অবাক হতে হয়; এক শ বছর আগের মানুষ এত গভীরভাবে ভাবতে পারতেন! তাঁর দর্শন, তাঁর মানবতাবাদ, তাঁর প্রকৃতিপ্রেম—এগুলো না পড়লে বাঙালি হিসেবে নিজেকে চেনার একটা বড় জানালা বন্ধ থেকে যায়।
তবে হতাশার মধ্যেও কিছু আলো দেখা যায়। ইউটিউবে রবীন্দ্রনাথের গল্পের অ্যানিমেশন বা পাঠ দেখে অনেক তরুণ আগ্রহী হচ্ছেন। অনলাইনে বাংলা বইয়ের পিডিএফ সহজলভ্য হওয়ায় অনেকে ঘরে বসেই পড়তে পারছেন। কিছু তরুণ লেখক ও ব্লগার রবীন্দ্রনাথকে সহজ ভাষায় নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরছেন। এসব উদ্যোগ ছোট, কিন্তু মূল্যবান। সবশেষে রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসা এবং রবীন্দ্রনাথকে পড়া— দুটো আলাদা বিষয়। ভালোবাসা থাকলেই পাঠ হয় না, কিন্তু পাঠ হলে ভালোবাসা আরও গভীর হয়। পঁচিশে বৈশাখে একটি স্ট্যাটাস দেওয়ার পাশাপাশি যদি একটি ছোটগল্পও পড়া হয়, তাহলে উদ্যাপনটা সত্যিকার অর্থে পূর্ণ হয়।
রবীন্দ্রনাথ একবার বলেছিলেন, সাহিত্য হলো জীবনের দর্পণ। সেই দর্পণে নিজেকে না দেখলে নিজেকে চেনা যায় না। নতুন প্রজন্ম যদি সেই দর্পণ একবার হাতে তুলে নেয়, হয়তো তারাও অবাক হয়ে আবিষ্কার করবে যে রবীন্দ্রনাথ এখনো কতটা তাদের কথাই বলেন।
শিক্ষার্থী, বাংলা সাহিত্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়