এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগে আর কোনো ভুল নয়

· Prothom Alo

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে একাধিকবার গুরুত্বসহকারে উচ্চারিত হয়েছে। ইতিমধ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই নিয়োগ সামনে রেখে অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দেরও ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। যোগ্যতা, দক্ষতা ও উপযুক্ততার ভিত্তিতে সঠিক ব্যক্তিকে নিয়োগের মাধ্যমে এই বিপুল মানবসম্পদকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হলে দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা এক নতুন গতিশীলতা লাভ করবে। তবে ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে দেয় যে অযোগ্য ও অদক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত দুর্বলতার জন্ম দেয়।

Visit syntagm.co.za for more information.

বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে অতীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হলো কমিউনিটি ক্লিনিক কর্মসূচি। প্রতি ছয় থেকে আট হাজার মানুষের জন্য একটি করে কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে দূরদর্শী ছিল। বর্তমানে দেশে ১৪ হাজারের বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এই বিশাল অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ ক্লিনিক কার্যকর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। এর পেছনে রয়েছে দুটি ঐতিহাসিক ভুল সিদ্ধান্ত।

এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ কেবল একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়, এটি একটি নীতিগত মোড় পরিবর্তনের সুযোগ। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে

প্রথমত, জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে জমি অধিগ্রহণের পরিবর্তে স্থানীয় ব্যক্তিদের দানকৃত জমিতে কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করা হয়। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে ক্লিনিকের অবস্থান নির্ধারিত হয়েছে স্থানীয় জমিদাতাদের পছন্দ ও সুবিধাকে কেন্দ্র করে; জনগণের সহজ প্রবেশগম্যতা ও ভৌগোলিক সুবিধার বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। দ্বিতীয়ত, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী—যেমন নার্স, মিডওয়াইফ বা মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়োগের পরিবর্তে সাধারণ শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা প্রদানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। বাস্তবে দেখা গেছে, মাত্র তিন মাসের প্রশিক্ষণের ভিত্তিতে তাঁদের ৩০টির বেশি ওষুধ, এমনকি একাধিক অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ফলে প্রতিরোধমূলক ও সহায়ক সেবার পরিবর্তে অনেক কমিউনিটি ক্লিনিক ‘ওষুধ বিতরণ কেন্দ্র’-এ পরিণত হয়েছে, যা গুরুতর জনস্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করেছে।

এ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ সফল করতে হলে প্রথম শর্ত হলো—একটি সমন্বিত ও বাস্তবসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা। বর্তমানে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা তিনটি পৃথক ধারা—স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর ও কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্যসহায়তা ট্রাস্টের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এই বিভাজন সেবার মান কমানোর পাশাপাশি সম্পদের অপচয় ঘটায়। তাই সময় এসেছে এই তিন ধারাকে একীভূত করে একটি সমন্বিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা–কাঠামো গড়ে তোলার। সেখানে সহায়ক, প্রতিরোধমূলক ও প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা—সবকিছু একটি সুসংগঠিত রেফারেল ব্যবস্থার আওতায় পরিচালিত হবে।

এ ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পর্যায়ের পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র ও সাব-সেন্টারকে ‘ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র’ হিসেবে উন্নীত করা, কমিউনিটি ক্লিনিককে ‘উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র’ হিসেবে কার্যকর করা এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা সহকারীদের মাধ্যমে ডোমিসিলিয়ারি (বাড়িভিত্তিক) সেবার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

উল্লেখ্য, উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে এমনভাবে সক্ষম ও সুসজ্জিত করতে হবে, যাতে স্বাস্থ্য সুরক্ষা সহকারীরা বাড়িভিত্তিক সেবা প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ ও সরঞ্জাম সেখান থেকে নিয়মিত সংগ্রহ করতে পারেন। পাশাপাশি সেখানে ব্রেস্ট ও ওরাল ক্যানসার স্ক্রিনিংসহ বিভিন্ন ধরনের প্রাথমিক স্ক্রিনিং সেবা এবং সীমিত পরিসরে প্রতিকারমূলক (কিউরেটিভ) সেবাও প্রদান করা সম্ভব হয়।

তবে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ডোমিসিলিয়ারি সেবার পাশাপাশি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকেও প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা না গেলে, সেটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য আরেকটি ঐতিহাসিক ভুল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এ প্রেক্ষাপটে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ডোমিসিলিয়ারি সেবার একটি কার্যকর ও ভবিষ্যৎ–মুখী অর্গানোগ্রাম প্রণয়ন অপরিহার্য। বিদ্যমান স্বাস্থ্যকর্মীদের—যেমন স্বাস্থ্য সহকারী, পরিবারকল্যাণ সহকারী, উপস্বাস্থ্য পরিদর্শক, স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও পরিবারকল্যাণ পরিদর্শক—পুনঃপ্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। তবে এখানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো বেতনকাঠামোর অসামঞ্জস্য, যা দীর্ঘদিন ধরে এই কর্মী বাহিনীর মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। এই বৈষম্য দূর না করলে নতুন কাঠামো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে।

নগর এলাকায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য একটি কার্যকর মডেল দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন, যা ক্ষেত্রবিশেষ সরকারি ব্যবস্থাপনা, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ অথবা স্ট্র্যাটেজিক পারচেজিংয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হতে পারে। তবে সেবার মান ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতার ক্ষেত্রে গ্রাম ও শহরের মধ্যে কোনো বৈষম্য থাকা উচিত নয়।

উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত আরবান প্রাইমারি হেলথকেয়ার প্রকল্পের আওতায় স্থানীয় সরকার পরিচালিত কেন্দ্রগুলোকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে এনে সেবা প্রদানের একটি উদ্যোগ প্রক্রিয়াধীন। এটি ইতিবাচক দিক হলেও মনে রাখতে হবে, প্রকল্পভিত্তিক উদ্যোগের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে। তাই শুরু থেকেই এ উদ্যোগকে কীভাবে একটি স্থায়ী, টেকসই ও জাতীয় কর্মসূচিতে রূপান্তর করা যায়, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট নকশা ও অর্থায়ন কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।

স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যোগ্যতা, পেশাগত দক্ষতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা। বর্তমানে দেশে প্রায় ৪০ হাজারের বেশি নার্স, ৮ হাজারের বেশি মিডওয়াইফ এবং উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্যারামেডিক ও হেলথ টেকনোলজিস্ট কর্মসংস্থানের বাইরে রয়েছেন। তাই নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই মানবসম্পদকে অগ্রাধিকার দেওয়াই হবে অধিকতর যৌক্তিক, ব্যয়সাশ্রয়ী এবং কার্যকর পদক্ষেপ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বর্তমানে স্বাস্থ্য খাতে যে ইতিবাচক পরিবর্তনের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, তাকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো। সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারীসহ নীতিনির্ধারক, প্রশাসন এবং ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন স্তরে একটি সমন্বিত আগ্রহ, সদিচ্ছা ও সংস্কারমুখী মনোভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।

সুতরাং এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ কেবল একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়, এটি একটি নীতিগত মোড় পরিবর্তনের সুযোগ। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে। পরিকল্পনা, নিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে পেশাদারি, জবাবদিহি এবং জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

  • ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আহ্বায়ক, অ্যালায়েন্স ফর হেলথ রিফর্মস, বাংলাদেশ

Read full story at source