হামে প্রতিদিন গড়ে সাতজনের মৃত্যু
· Prothom Alo

হামে শিশুমৃত্যু ৫০০ ছাড়িয়েছে। প্রতিদিন গড়ে সাতজনের বেশি মৃত্যু হচ্ছে। প্রতি মাসে মৃত্যু আগের মাসের চেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের প্রতিদিনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পর্যালোচনা করে এ চিত্র পাওয়া যায়।
Visit grenadier.co.za for more information.
গতকাল শনিবার সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নতুন করে ১৩ জনের মৃত্যুর তথ্য দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে আর নিশ্চিত হামে মারা গেছে ১ জন। এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে হামে ৫১২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
হামের উপসর্গ নিয়ে বা নিশ্চিত হামের তথ্য প্রকাশ করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে কোন বয়সের, কোন আর্থসামাজিক শ্রেণির মানুষ তারা, হামে আক্রান্ত হওয়ার কত দিন পর তাদের মৃত্যু হচ্ছে, মৃত্যুর আগে তাদের কোন ধরনের চিকিৎসা হয়েছিল—তার কোনো তথ্য প্রকাশ করছে না।
হামের বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষের করণীয় বিষয়ে সরকারের পক্ষে কোনো প্রচার–প্রচারণাও নেই। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হামের রোগীদের চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিয়েছে বলে দাবি করছে। যদিও হামে মৃত্যু কমছে না। জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, কিছু ব্যবস্থা নিলে মৃত্যু কমানো সম্ভব হতো।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা শুনেছি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হাসপাতালে কয়েকটি ভেন্টিলেটর দেওয়া নিয়ে বেশ প্রচারে নেমেছে। মৃত্যু কমাতে হলে হাসপাতালে রোগীর চাপ কমাতে হবে। শুধু ভেন্টিলেটর শিশুদের বাঁচাতে পারবে না।’
তিন দিন আগে সংবাদ সম্মেলন করে ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেছিলেন, হামে আক্রান্তদের পাঁচজনের মধ্যে চারজনের বয়স পাঁচ বছরের নিচে। অন্যদিকে দুই সপ্তাহ আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সাবেক প্রধান শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা প্রথম আলোকে বলেছিলেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের ৮–১০ শতাংশের ডায়রিয়া দেখা দেয়, কান পাকে ২০ শতাংশ শিশুর আর নিউমোনিয়া দেখা দেয় ৫ শতাংশের। এই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুরাই বেশি মারা যাচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতি
এ বছর হামে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে। আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২ এপ্রিল থেকে হামের তথ্য গণমাধ্যমে পাঠাচ্ছে। ২ এপ্রিল পর্যন্ত হামের উপসর্গ ও হাম নিয়ে মোট ৪০ জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মৃত্যু ছিল ১৩ জনের আর হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ছিল ২৭ জনের।
হাম চিকিৎসাযোগ্য রোগ। ধারণা করা হয়েছিল মৃত্যু বেশি বাড়বে না। উপযুক্ত চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা মৃত্যু ঠেকাতে বা কমাতে পারবে। বাস্তবে তা হলো না। ১ মে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেখা যায়, এক মাসের ব্যবধানে হামে মৃত্যু বেড়ে ২৮০ হয়েছে। এর মধ্যে হামের উপসর্গে ৩২১ জনের এবং নিশ্চিত হামে ৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এ তথ্য থেকে দেখা যায়, ১৫ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৪০ জনের। ৩ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত মারা গেছে ২৪০ জন। আর মে মাসের প্রথম ২২ দিন মারা গেছে ২৩২ জন। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ৭০ দিনে ৫১২ জনের মৃত্যু হয়েছে, অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে সাতজনের মৃত্যু হচ্ছে হামে।
সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত ৬২ হাজার ৫০৭ জন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছে। এদের মধ্যে অনেকে চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। অনেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। গতকাল ৪ হাজার ৩৭৮ রোগী হাসপাতালে ভর্তি ছিল।
সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে
সরকার শুরু থেকে দাবি করছে তারা হামের রোগীর চিকিৎসার সব ব্যবস্থা নিয়েছে, নিচ্ছে। ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে বেশ কয়েকটি ভেন্টিলেটার নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে দেওয়ার কথাও বলেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখা জানিয়েছে, সারা দেশের সরকারি হাসপাতালে ১ হাজার ৩৭২টি আইসিইউ শয্যা আছে। এর বড় অংশ হামের রোগীদের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে সব আইসিইউ শিশুদের জন্য উপযুক্ত নয়।
এ ছাড়া আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী আহমেদ জুবায়ের চিশতির উদ্ভাবিত বাবল–সিপ্যাপ বেশ কয়েকটি হাসপাতালে ব্যবহার করা হচ্ছে। বাবল-সিপ্যাপ একধরনের সরল প্রযুক্তি যার মাধ্যমে শিশুরা সহজে অক্সিজেন নিতে পারে। দেশের সব সরকারি হাসপাতালে হামের রোগীর জন্য পৃথক ওয়ার্ড খোলা হয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালকে ওয়ার্ড খুলতে বলা হয়েছে।
প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর ৫ এপ্রিল ১৮ জেলার ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় হামের টিকা দেওয়া শুরু হয়। এরপর ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকা দেওয়া শুরু করে ১২ এপ্রিল। এর আট দিন পর ২০ এপ্রিল সারা দেশে টিকা দেওয়া শুরু হয়।
সরকার ছয় মাস বয়স থেকে পাঁচ বছর বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। ২২ মে পর্যন্ত টিকা দেওয়া হয়েছিল ১ কোটি ৮৪ লাখ ৩১ হাজার ১৪৯ জনকে, অর্থাৎ নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে বেশি শিশু হামের টিকা পেয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ বলেছে, পাঁচ বছরের বেশি বয়সী কিছু শিশু টিকা পাওয়ায় নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে বেশি শিশু টিকা পেয়েছে।
সংক্রমণ ও চিকিৎসা পরিস্থিতির বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক জাহিদ রায়হান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সংক্রমণ কমতে শুরু করেছে। আশা করছি, মৃত্যুও কমে আসবে। সারা দেশের আইসিইউতে যত রোগী, তাদের কার কী অবস্থা, তা সঠিক করে বলা মুশকিল।’
এমন পরিস্থিতিতে তিনটি কাজ করা জরুরি বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, হাসপাতালে আইসিইউ থাকাই যথেষ্ট নয়। সেগুলোকে শিশুদের ব্যবহার যোগ্য করতে হবে, অর্থাৎ আইসিইউগুলোকে শিশু আইসিইউতে রূপান্তর করতে হবে। বেসরকারি খাতের আইসিইউগুলোকে এখন অধিগ্রহণ করতে হবে। এর আগে হাসপাতালে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
মুশতাক হোসেন বলেন, অনেকের আইসিইউয়ের দরকার নেই, শুধু অক্সিজেনই প্রয়োজন। তবে তারও আগে দরকার কমিউনিটি আইসোলেশন। হামে আক্রান্ত শিশুকে বাড়িতে না রেখে উপজেলা বা শহরে পৃথক কোনো স্থানে রেখে চিকিৎসা দিতে হবে। পাশাপাশি আক্রান্ত দরিদ্র পরিবারকে সরকারি সহায়তা দিতে হবে।