শিকারির ফাঁদে আটকা পড়া বাঘিনীটি কেমন আছে
· Prothom Alo

বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার শরকির খাল লাগোয়া সুন্দরবন। এ বছরের ৩ জানুয়ারির ঘটনা। হরিণ শিকারের জন্য ফাঁদ পেতেছিল শিকারিরা। তাতে আটকা পড়ে একটি বাঘিনী। খবর পেয়ে বন বিভাগের একটি বিশেষায়িত দল পরদিন ৪ জানুয়ারি প্রাণীটিকে উদ্ধার করে।
পরে খুলনার বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসনকেন্দ্রে বাঘিনীটিকে হস্তান্তর করা হয়। গঠন করা হয় পাঁচ সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড। সেখানেই চলে চিকিৎসা। মাস পাঁচেক পরে এখন বাঘিনীটি সুস্থ হয়ে উঠেছে। বন বিভাগ বাঘিনীটিকে আবার সুন্দরবনে ফেরানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। সব ঠিক থাকলে আগামী জুনে বন্য প্রাণীটি আবার বনে ফিরতে পারে।
Visit h-doctor.club for more information.
প্রাণীটির চিকিৎসায় নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন বন অধিদপ্তরের ভেটেরিনারি চিকিৎসক হাতেম সাজ্জাত জুলকারনাইন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বাঘিনীটিকে চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে উদ্ধার করতে হয়েছিল। তখন প্রাণীটি ছিল নিস্তেজ, দুর্বল ও ক্ষীণকায়।
চিকিৎসক জুলকারনাইন বলেন, বাঘিনীটির সামনের বাঁ পায়ে ৩ ইঞ্চির মতো জায়গায় চামড়া, মাংশপেশি ও শিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ফাঁদের রশিতে টানাটানির কারণে ক্ষত হয়ে পচন ধরে গিয়েছিল। অ্যান্টিবায়োটিক ও নিয়মিত ড্রেসিংয়ে মার্চ মাসের দিকে ঘা শুকিয়ে আসে। ক্ষত হওয়া স্থানও ভরাট হয়ে লোম গজিয়েছে এখন।
ওজন বেড়েছে, ফিরেছে ক্ষিপ্রতা
বাঘের জীবনকাল সর্বোচ্চ ১৫ বছর পর্যন্ত হয়ে থাকে। এই বাঘিনীর বয়স ১০ থেকে ১১ বছর। বন অধিদপ্তরের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক ছানাউল্যা পাটওয়ারী প্রথম আলোকে বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে চিকিৎসার পর বাঘিনীটি হারানো ক্ষিপ্রতা ও গতি ফিরে পেয়েছে। এখন প্রাণীটির ওজন ৮০ কেজির মতো।
সুন্দরবনে ছেড়ে আসার পরও বাঘিনীটির ওপর কীভাবে নজর রাখা যায় এবং পর্যবেক্ষণ করা যায়, সেসব নিয়ে এখন বন কর্মকর্তারা চিন্তাভাবনা করছেন। ছানাউল্যা পাটওয়ারী বলেন, সেটি হতে স্যাটেলাইট কলার কিংবা মাইক্রোচিপের মতো কোনো কিছু।
আহত বাঘিনীটি দীর্ঘদিন শিকার ধরেনি। কাজেই এটির শিকারের সক্ষমতা স্বাভাবিকের তুলনায় কমে এসেছে। সেই সঙ্গে প্রাণীটির জীবনকাল শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে। কাজেই বন্য পরিবেশে অন্যান্য পশুর সঙ্গে লড়াইয়ে এটির পেরে ওঠার সম্ভাবনা বেশ কম। এ পরিস্থিতিতে সুস্থ হয়ে ওঠার পর বাঘিনীটিকে বুনো পরিবেশে ছেড়ে দেওয়ার পরিবর্তে যেকোনো সাফারি পার্কে রাখার পরামর্শ দেন ছানাউল্যা পাটওয়ারী।
ছানাউল্যা পাটওয়ারী, বন সংরক্ষক।দীর্ঘ সময় ধরে চিকিৎসার পর বাঘিনীটি হারানো ক্ষিপ্রতা ও গতি ফিরে পেয়েছে। এখন প্রাণীটির ওজন ৮০ কেজির মতো।শিকারির পাতা ফাঁদ থেকে উদ্ধার বাঘিনীটি কেমন আছে? কবে অবমুক্ত করা হতে পারেবাঘিনীটির ভবিষ্যৎ ঠিক করতে ২১ মে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন বাঘগবেষক, বন কর্মকর্তা, বন্য প্রাণী–বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বৈঠকে ছানাউল্যা পাটওয়ারীর মনোভাবের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেন অনেকে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট বন্য প্রাণী গবেষক এম এ আজিজ বলেন, বাঘিনীটি যদি মুক্ত অবস্থায় একদিনও বাঁচতে পারে, সেটা বড় পাওয়া। বাঘিনীটির নিজের বসতিতে বাঁচার ও মৃত্যুর অধিকার আছে। সাফারি পার্কে বন্দী রাখলে প্রাণীটি প্রাকৃতিক মৃত্যুর অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
যেহেতু বাঘিনীটি ফাঁদে আটকা পড়েছিল, বয়সও শেষের দিকে; তাই ছেড়ে আসার পর সেটির আবারও লোকালয়ে আসার আশঙ্কা রয়েছে। স্যাটেলাইট কলার লাগিয়ে প্রাণীটিকে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে—বলছিলেন বন্য প্রাণী–বিশেষজ্ঞ এম এ আজিজ। তিনি জানান, ভারতের সুন্দরবন অংশে এমন ছয়টি বাঘকে স্যাটেলাইট কলার দেওয়া হয়েছে।
এম এ আজিজ, বন্য প্রাণী–বিশেষজ্ঞ ও প্রাণিবিদ্যার অধ্যাপকবাঘিনীটি যদি মুক্ত অবস্থায় এক দিনও বাঁচতে পারে, সেটা বড় পাওয়া। স্যাটেলাইট কলার লাগিয়ে প্রাণীটিকে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।সুন্দরবনে উদ্ধার বাঘিনী খুলনায় নিবিড় পর্যবেক্ষণেকোথায় ছাড়া হতে পারে
বন অধিদপ্তরের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমদ বলেন, ২০২৪ সালে ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ে বাঘিনীটিকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তিনবার শনাক্ত করা হয়েছিল। সেই হিসাবে লোকালয় থেকে সবচেয়ে দূরের জায়গাটিতে এটিকে অবমুক্ত করার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।
যেহেতু বাঘিনীটিকে অবমুক্ত করার বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতামত উঠে এসেছে, তাই আরও কয়েকটি বৈঠক করে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান ইমরান আহমদ। তিনি বলেন, জুনের মধ্যে প্রাণীটিকে অবমুক্ত করার সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
বন বিভাগ বলছে, শিকার ধরতে চার ধরনের ফাঁদ ব্যবহার করছে চোরা শিকারিরা। সেগুলো হলো মালা ফাঁদ, ছিটকা ফাঁদ, হাঁটা ফাঁদ ও গলা ফাঁদ। সবচেয়ে বেশি পাতা হয় মালা ফাঁদ। এই বাঘিনীও মালা ফাঁদে আটকা পড়েছিল।
সুন্দরবনে হরিণশিকারিদের ফাঁদ থেকে উদ্ধার বাঘিনী ধীরে ধীরে সুস্থ হচ্ছেফাঁদ উদ্ধার, মামলা-গ্রেপ্তার
বন বিভাগের তথ্যানুযায়ী, সুন্দরবনের পূর্ব বন বিভাগের আওতাধীন শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে গত বছরের মে থেকে ডিসেম্বর সময়ে (৮ মাস) ৬১ হাজার ১০ ফুট মালা ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে। ছিটকা ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে ৩৮০টি। এ ছাড়া ২ হাজার হাঁটা ফাঁদ ও ২০ ফুট গলা ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে।
অন্যদিকে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগ জানিয়েছে, গত দুই বছরে ১ হাজার ২০০ ফুট মালা ফাঁদ এবং ১ হাজার ২০০ ফুট গলা ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে। হাঁটা ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে ৭৪৮টি।
ফাঁদ উদ্ধারের ঘটনায় ৬৯ জনকে আসামি করে মোট ২২টি মামলা করেছে পূর্ব বন বিভাগ। এসব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৬২ জনকে। অন্যদিকে পশ্চিম বন বিভাগ মামলা করেছে ৫০টি। আসামি করা হয়েছে ১৩০ জনকে। তাঁদের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন ১৯ জন।
গা ছম ছম করা রাতে যে বনে ডিসির পিছু নিয়েছিল শিকারি বাঘ