এলিয়েন অ্যাটাক - ১০

· Prothom Alo

সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের গোপন ইউএফও ফাইলগুলো প্রকাশ করেছে। এরপর থেকেই সারা বিশ্বে নতুন করে শুরু হয়েছে জল্পনাকল্পনা। এই বিশাল মহাবিশ্বে আমরা কি আসলেই একা? নাকি ভিনগ্রহে লুকিয়ে আছে বুদ্ধিমান কোনো প্রাণী? যদি সত্যিই তাদের অস্তিত্ব থাকে, তারা যদি হলিউড মুভির মতো হঠাৎ পৃথিবী আক্রমণ করে, তাহলে কী হবে? বিজ্ঞান কী বলে? সত্যিই কি ভিনগ্রহের প্রাণীরা আমাদের জন্য হুমকি হতে পারে?

এসব কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক উত্তর দিয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফিলিপ প্লেইট তাঁর ডেথ ফ্রম দ্য স্কাইজ!: দ্য সায়েন্স বিহাইন্ড দ্য এন্ড অব দ্য ওয়ার্ল্ড বইয়ে। সূক্ষ্ম রসিকতা ও নিখাদ বিজ্ঞানের দারুণ মিশেলে লেখা রোমাঞ্চকর এই বইয়ের কয়েকটি অধ্যায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। ভিনগ্রহীদের আক্রমণ নিয়ে লেখা এই অধ্যায়টি অনুবাদ করছেন কাজী আকাশ। আজ পড়ুন ষষ্ঠ অধ্যায়ের দশম পর্ব।

Visit afrikasportnews.co.za for more information.

আগের পর্ব

মহাকাশে কেউ আপনার চিৎকার শুনবে না!

মাঝে মাঝে আমি অবাক হয়ে কিছু কথা ভাবি। প্রাণের সম্ভাবনা, গ্যালাক্সি ঘুরে দেখার তুলনামূলক সহজ উপায়, এর জন্য প্রয়োজনীয় বিশাল সময়...এবং আমাদের গ্যালাক্সিতে এখনো পর্যন্ত অন্য কোনো প্রাণের সন্ধান না পাওয়ার বাস্তব সত্য, সব মিলিয়ে আরও একটি সম্ভাবনার কথা মাথায় আসে। তা নিয়ে একটু ভেবে দেখা দরকার।

একটু ভেবে দেখুন তো, প্রযুক্তিগত উন্নতির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে কোন জিনিসটি? যুদ্ধ!

যে আদিম ক্রো-ম্যাগনন মানুষটি প্রথম গাছের ডাল দিয়ে শত্রুর মাথায় আঘাত করেছিল, তার বেশি দিন বাঁচার এবং বংশবৃদ্ধি করার সম্ভাবনা অন্যদের চেয়ে বেশি ছিল। যাদের কাছে রাইফেল আছে, তারা সাধারণত বর্শাধারীদের সহজেই হারিয়ে দেবে। যাদের কাছে মিসাইল আছে, তারা কামানের সামনে জয়ী হবে। যাদের কাছে রিমোট-কন্ট্রোলড ড্রোন, গুপ্তচর স্যাটেলাইট এবং তাৎক্ষণিক যোগাযোগের ব্যবস্থা আছে, তারা অন্যদের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে থাকবে।

অর্থাৎ, পুরোনো সেই চিরায়ত আগ্রাসন বা যুদ্ধংদেহী মনোভাবের মতো আর কোনো কিছুই প্রযুক্তিকে এত দ্রুত এগিয়ে নিতে পারে না। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে মহৎ ঘটনাগুলোর একটি শুরু হয়েছিল মূলত স্নায়ুযুদ্ধের কারণে। আমি মানুষের চাঁদে যাওয়ার কথা বলছি। বিশাল ও শক্তিশালী এক অলিখিত শত্রুর সঙ্গে মহাকাশ প্রতিযোগিতার ফল ছিল এটি। মার্কিনিরা কল্পনা করেছিল, সোভিয়েতরা হয়তো পৃথিবীর কক্ষপথে বা চাঁদের বুকে মিসাইল ঘাঁটি বানাচ্ছে। তাদের সেই ভয় থেকেই চাঁদে যাওয়ার জেদ তৈরি হয়েছিল।

যে আদিম ক্রো-ম্যাগনন মানুষটি প্রথম গাছের ডাল দিয়ে শত্রুর মাথায় আঘাত করেছিল, তার বেশি দিন বাঁচার এবং বংশবৃদ্ধি করার সম্ভাবনা অন্যদের চেয়ে বেশি ছিল।

আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন বেশ বুদ্ধিদীপ্ত সায়েন্স ফিকশন গল্পগুলোতে একটা ব্যাপার খুব জনপ্রিয় ছিল। ধরে নেওয়া হতো, আমরা যেসব ভিনগ্রহীর দেখা পাব, তারা নিশ্চয়ই খুব বন্ধুবৎসল হবে। কারণ, কোনো যুদ্ধবাজ বা আগ্রাসী জাতি কখনোই নিজেদের ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচিয়ে মহাকাশ পাড়ি দেওয়ার মতো এতটা এগোতে পারবে না।

কিন্তু মানুষ এখন এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করার একেবারে দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে!

পুরো বিষয়টা মিলিয়ে দেখলে আমরা বুঝতে পারি, যুদ্ধবাজ জাতিগুলোর মহাকাশ ভ্রমণের প্রযুক্তি অর্জন করার সম্ভাবনা হয়তো আরও বেশি। যাদের জয়ের ইতিহাস আছে, তাদের কাছেই সেরা প্রযুক্তি থাকবে। আর তারা ভিনগ্রহীদের নিয়ে খুব সতর্ক থাকবে, এমনকি প্রকাশ্য শত্রুতাতেও জড়াতে পারে। আমাদের পৃথিবীর ইতিহাসই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

এই কল্পিত উন্নত সভ্যতাটি হবে জেনোফোবিক বা ভিনগ্রহীদের প্রতি প্রচণ্ড ভীত। আমরা আগেই দেখেছি, প্রযুক্তিগতভাবে আন্তঃনক্ষত্র মহাকাশযান তৈরি করা সম্ভব। এমনকি এমন যান বানানোও সম্ভব, যা গ্যালাক্সি খোঁজার কাজ দ্রুত করার জন্য নিজে নিজেই নিজেদের প্রতিলিপি বা কপি তৈরি করতে পারে।

এখন ভাবুন তো, চরম সন্দেহবাতিকগ্রস্ত কোনো জাতির হাতে যদি এমন মহাকাশযান বানানোর ক্ষমতা চলে আসে, তবে কী হবে?

প্রযুক্তিগতভাবে আন্তঃনক্ষত্র মহাকাশযান তৈরি করা সম্ভব। এমনকি এমন যান বানানোও সম্ভব, যা গ্যালাক্সি খোঁজার কাজ দ্রুত করার জন্য নিজে নিজেই নিজেদের প্রতিলিপি বা কপি তৈরি করতে পারে।

বিপদ!

এই অধ্যায়ের শুরুতে দেওয়া ছোট গল্পটিতে ঠিক এই দৃশ্যটাই তুলে ধরা হয়েছে। বিষয়টা আমার কাছে বেশ ভয়ংকর রকমের বাস্তব মনে হয়। এত আগ্রাসী কোনো ভিনগ্রহী জাতি চাইবে, তাদের শত্রুরা কোনো বিপদের কারণ হয়ে ওঠার আগেই যেন তাদের ধ্বংস করে দেওয়া যায়। আর এর সবচেয়ে সহজ উপায় হলো, গল্পের মতো ওই মহাকাশযান বা প্রোব তৈরি করা এবং সেগুলো ব্যবহার করে মহাকাশে যেখানে যত প্রাণ আছে, সব নির্মমভাবে মুছে ফেলা।

সত্যি সত্যিই আকাশ থেকে নেমে আসবে মৃত্যুদূত!

আমি এই ধারণাটা নিয়ে অনেক ভেবেছি। সত্যিই কি এমনটা হওয়া সম্ভব? তবে এখানে আমাদের জন্য একটা স্বস্তির জায়গাও আছে, যা ওই আগের যুক্তির মতোই। গ্যালাক্সির বয়সের তুলনায় এভাবে পুরো গ্যালাক্সি চষে বেড়াতে খুব বেশি সময় লাগার কথা নয়। তাই আগের যুক্তি অনুযায়ী, যদি সত্যিই এমন কোনো যুদ্ধবাজ সভ্যতার উত্থান হতো, তবে এত দিনে তারা আমাদের এখানে চলে আসত।

কিন্তু আমরা তো এখনো দিব্যি বেঁচে আছি। আমরা জানি, পৃথিবীতে কোটি কোটি বছর ধরে প্রাণ টিকে আছে। মাঝে মাঝে দু-একটা মহাজাগতিক দুর্যোগ হয়তো এসেছে, কিন্তু একদম অণুবীক্ষণিক স্তর পর্যন্ত আমাদের কখনো মুছে ফেলা হয়নি। অন্য অনেক প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো এই বিষয়টিও মহাকাশের কোনো ভয়ংকর ভিনগ্রহীর হাতে আমাদের ধ্বংস হওয়ার সম্ভাবনাকে অনেকটাই কমিয়ে দেয়। সোজা কথায়, তারা যদি সত্যিই ওখানে থাকত, তবে আমরা আজ এখানে থাকতাম না।১

আমরা জানি, পৃথিবীতে কোটি কোটি বছর ধরে প্রাণ টিকে আছে। মাঝে মাঝে দু-একটা মহাজাগতিক দুর্যোগ হয়তো এসেছে, কিন্তু একদম অণুবীক্ষণিক স্তর পর্যন্ত আমাদের কখনো মুছে ফেলা হয়নি।

মহাবিশ্বে আমরা সত্যিই একা কি না, তা আমি সততার সঙ্গেই বলছি—জানি না। আসলে কেউই জানে না। তবে মহাকাশের বিশালত্ব ও অনন্ত সময়ের কথা ভাবলে, আমাদের একা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। আর আমরা যদি সত্যি সত্যিই একদিন মহাকাশে পাড়ি জমাই, তবে ক্লিংগন, রোমুলান, ভোগন, রিভারস বা ড্যালেকের মতো (জনপ্রিয় সায়েন্স ফিকশনের বিভিন্ন ভিলেন ভিনগ্রহী জাতি) কোনো ভয়ংকর জাতির মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনাও প্রায় নেই বললেই চলে। হয়তো প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোই তখন আমাদের সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ হবে।

কিন্তু গ্যালাক্সিটা অনেক বড়। এখানে অনেক কিছুরই জায়গা হতে পারে। আমরা একা কি না, তা হয়তো আমি জানি না, তবে আমি অবশ্যই এই রহস্যের উত্তর খুঁজে বের করার সুযোগ পেতে চাই।

চলবে…ফিলিপ প্লেইট, ডেথ ফ্রম দ্য স্কাইজ!: দ্য সায়েন্স বিহাইন্ড দ্য এন্ড অফ দ্য ওয়ার্ল্ড অবলম্বনেটীকা১. এই ধারণাটি বিজ্ঞানের জগতে এবং সায়েন্স ফিকশনে বেশ জনপ্রিয়। চাইনিজ লেখক লিউ সিক্সিনের বিখ্যাত সায়েন্স ফিকশন ট্রিলজি দ্য থ্রি-বডি প্রবলেম-এ এটিকে ডার্ক ফরেস্ট থিওরি হিসেবে দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাবিশ্ব হলো একটি বিশাল ও অন্ধকার বন। আর প্রতিটি সভ্যতাই হলো সশস্ত্র শিকারি। নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্য অন্য কোনো সভ্যতার সন্ধান পাওয়ামাত্রই তাকে ধ্বংস করে দেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ উপায়। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, মানুষ এখনো এই ডার্ক ফরেস্টের কোনো শিকারির নজরে পড়েনি!এলিয়েন অ্যাটাক – ১এলিয়েন অ্যাটাক – ২এলিয়েন অ্যাটাক – ৩এলিয়েন অ্যাটাক – ৪এলিয়েন অ্যাটাক – ৫এলিয়েন অ্যাটাক – ৬এলিয়েন অ্যাটাক – ৭এলিয়েন অ্যাটাক – ৮এলিয়েন অ্যাটাক – ৯

Read full story at source