ম্রো জনগোষ্ঠীর প্রথম বিদ্যালয়, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নাম

· Prothom Alo

একসময় দুর্গম পাহাড়ে ম্রো জনগোষ্ঠীর শিশুদের হাতে বই নয়, দেখা যেত জুমচাষের সরঞ্জাম। অভিভাবকেরাও সন্তানেরা স্কুলে পাঠানোর বিষয়ে সচেতন ছিলেন না। তবে এখন এর সে দিন নেই। ১৯৮০ সালে বান্দরবানের সুয়ালকে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ম্রো আবাসিক বিদ্যালয়’।

চার দশকের বেশি সময় পর বিদ্যালয়টি ম্রো জনগোষ্ঠীর কাছে ‘মাইতং’—অর্থাৎ জাগরণের আলোকবর্তিকায় পরিণত হয়েছে। শূন্যের কোঠায় থাকা ম্রো জনগোষ্ঠীর শিক্ষার হার আজ পৌঁছেছে ১৫ থেকে ২০ শতাংশে। সমাজের নেতৃত্ব, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়াঙ্গনে যাঁরা ম্রো জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছেন, তাঁদের অনেকেরই যাত্রা শুরু হয়েছিল এই বিদ্যালয় থেকে। আর এই বিদ্যালয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নাম। তাঁর নির্দেশেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিদ্যালয়টি।

Visit saltysenoritaaz.com for more information.

বান্দরবান জেলা শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে বান্দরবান-চট্টগ্রাম সড়কের সুয়ালকের অবস্থান। ওই এলাকার মাঝেরপাড়ায় সুয়ালক ম্রো আবাসিক বিদ্যালয়। চারদিকে সবুজ পাহাড় ও বনাঞ্চলঘেরা মনোরম পরিবেশে ১৯৮০ সালের ১ জানুয়ারি বিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। নাম ম্রো আবাসিক বিদ্যালয় হলেও এখানে খুমি জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরাও পড়ার সুযোগ পায়। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ৩০০ শিক্ষার্থী রয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭ জন ম্রো ও ১৩ জন খুমি। ১৯৮৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মাধ্যমিক (এসএসসি) পরীক্ষায় ৮৩৮ জন অংশ নিয়ে ৪৯১ জন উত্তীর্ণ হয়েছে।

সম্প্রতি বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের একটি পুকুর পুনঃখননের কাজের উদ্বোধন করতে গিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য সাচিংপ্রু জেরী বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠার পেছনের ইতিহাস তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বান্দরবান সফরে এলে তাঁর বাবা, তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী অংশৈপ্রু চৌধুরী, ম্রো জনগোষ্ঠীর শিক্ষা বঞ্চনার বিষয়টি রাষ্ট্রপতির নজরে আনেন। তখন জেলার দ্বিতীয় বৃহত্তম পাহাড়ি জনগোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও ম্রোদের শিক্ষার হার ছিল শূন্য। বিষয়টি জেনে রাষ্ট্রপতি বিস্মিত হন। তখন তিনি একটি আবাসিক বিদ্যালয়সহ ম্রো কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। পরের বছর বিদ্যালয়টি চালু হয়। ১৯৮১ সালের ১৬ জানুয়ারি তিনি আবার সুয়ালকে এসে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিদর্শন করেন।

সম্প্রতি বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের একটি পুকুর পুনঃখননের কাজের উদ্বোধন করতে গিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য সাচিংপ্রু জেরী বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠার পেছনের ইতিহাস তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বান্দরবান সফরে এলে তাঁর বাবা, তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী অংশৈপ্রু চৌধুরী, ম্রো জনগোষ্ঠীর শিক্ষা বঞ্চনার বিষয়টি রাষ্ট্রপতির নজরে আনেন। তখন জেলার দ্বিতীয় বৃহত্তম পাহাড়ি জনগোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও ম্রোদের শিক্ষার হার ছিল শূন্য। বিষয়টি জেনে রাষ্ট্রপতি বিস্মিত হন। তখন তিনি একটি আবাসিক বিদ্যালয়সহ ম্রো কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। পরের বছর বিদ্যালয়টি চালু হয়। ১৯৮১ সালের ১৬ জানুয়ারি তিনি আবার সুয়ালকে এসে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিদর্শন করেন।

বিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী ও থানচি উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান খামলাই ম্রো জানান, বিদ্যালয়টি চালুর সময় ৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তির লক্ষ্য ছিল, কিন্তু শিক্ষার্থী পাওয়া যাচ্ছিল না। অভিভাবকেরা সন্তানদের পাঠাতে রাজি হতেন না। তাঁদের ধারণা ছিল, পড়াশোনা শিখলে সন্তানেরা নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি ভুলে যাবে এবং আর সমাজে ফিরে আসবে না।

খামলাই ম্রো বলেন, অনেক ক্ষেত্রে সমাজের মুরুব্বিদের সহযোগিতায় পরিবারগুলোকে রাজি করাতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ৪৫ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও ছুটি শেষে তাদের প্রায় অর্ধেক আর বিদ্যালয়ে ফিরে আসেনি। দুর্গম এলাকা থেকে আসা শিশুরা বাংলা ভাষা বুঝত না, আবাসিক পরিবেশ ও খাবারের সঙ্গেও অভ্যস্ত ছিল না। ফলে শুরুটা ছিল অত্যন্ত কঠিন।

বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় পাওয়া ট্রফি সাজিয়ে রাখা হয়েছে বিদ্যালয়ে । সম্প্রতি বান্দরবানের ম্রো আবাসিক বিদ্যালয়ে

শিক্ষার জাগরণ

ম্রো সমাজের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সুয়ালক ম্রো আবাসিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে তাদের শিক্ষার হার ছিল শূন্য। এই বিদ্যালয় থেকেই শুরু হয়েছে শিক্ষার জাগরণ। এখানকার শিক্ষার্থীরা পরবর্তী সময়ে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

মৌজাপ্রধান রাংলাই ম্রো, জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য সিংইয়ং ম্রো, সিয়ং খুমি, লেখক ও গবেষক ইয়াংঙান ম্রো, গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডধারী প্রেনচ্যুং ম্রোসহ অনেকেই এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁদের অনেকে শিক্ষকতা করেছেন, ছাত্রাবাস গড়ে তুলেছেন ও নতুন প্রজন্মের শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে ভূমিকা রেখেছেন।

থানচিতে আশার আলো ছাত্রাবাস ও আলীকদমে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় আলীকদম ম্রো কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠার পেছনেও এই শিক্ষিত প্রজন্মের অবদান রয়েছে। পরে শান্তিচুক্তির পর বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা ছোট ছোট বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করায় ম্রো শিশুদের শিক্ষার সুযোগ আরও বেড়েছে।

বান্দরবান জেলা শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে বান্দরবান-চট্টগ্রাম সড়কের সুয়ালকের অবস্থান। ওই এলাকার মাঝেরপাড়ায় সুয়ালক ম্রো আবাসিক বিদ্যালয়। চারদিকে সবুজ পাহাড় ও বনাঞ্চলঘেরা মনোরম পরিবেশে ১৯৮০ সালের ১ জানুয়ারি বিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। নাম ম্রো আবাসিক বিদ্যালয় হলেও এখানে খুমি জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরাও পড়ার সুযোগ পায়। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ৩০০ শিক্ষার্থী রয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭ জন ম্রো ও ১৩ জন খুমি। ১৯৮৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মাধ্যমিক (এসএসসি) পরীক্ষায় ৮৩৮ জন অংশ নিয়ে ৪৯১ জন উত্তীর্ণ হয়েছে।

ম্রো এলাকায় নেই উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ

২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে ম্রো জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ৫১ হাজার ৪৪৮। বান্দরবানের ১১টি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে মারমাদের পর তারাই দ্বিতীয় বৃহত্তম। বর্তমানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বহু ম্রো শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। একসময় যে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী পাওয়া যেত না, সেখানে এখন ভর্তি হতে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। এ কারণে ম্রোদের শিক্ষা জাগরণে অসামান্য ভূমিকা রাখা সুয়ালক ম্রো আবাসিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করার দাবি স্থানীয় বাসিন্দাদের। ম্রো আবাসিক বিদ্যালয় ম্রো পাড়ার বাইরে জেলা সদরের কাছাকাছি এলাকায় অবস্থিত। এটি ছাড়া ম্রো অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে আর কোনো উচ্চ বিদ্যালয় নেই। নেই কোনো কলেজও।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান

লেখক ও গবেষক ইয়াংঙান ম্রো এবং ম্রো স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তনয়া ম্রো বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও কোনো ম্রো পাড়ায় উচ্চবিদ্যালয় বা কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে শিক্ষার্থীদের আবাসিক বিদ্যালয়, ছাত্রাবাস কিংবা অনাথাশ্রমের ওপর নির্ভর করেই পড়াশোনা করতে হয়।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, এই বিদ্যালয় শুধু শিক্ষিত মানুষ তৈরি করেনি, নেতৃত্বও তৈরি করেছে। ম্রো সমাজের যাঁরা বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাঁদের বড় একটি অংশ এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। শিক্ষা, সংস্কৃতি, খেলাধুলা ও সামাজিক উন্নয়নে তাঁদের অবদান রয়েছে। একটি বিদ্যালয় একটি জনগোষ্ঠীর অগ্রগতির পথযাত্রায় কত বড় ভূমিকা রাখতে পারে, তার উজ্জ্বল উদাহরণ সুয়ালক ম্রো আবাসিক বিদ্যালয়।

Read full story at source