আলাস্কার স্বচ্ছ নদীগুলোয় হঠাৎ কেন উজ্জ্বল কমলা রং দেখা যাচ্ছে

· Prothom Alo

আলাস্কার আর্কটিক অঞ্চলের নদীগুলো এখন একটি অদ্ভুত ও বড় সমস্যায় পড়েছে। সেখানকার এক সময়কার কাচের মতো স্বচ্ছ পানি লোহার কণার কারণে ঘোলাটে কমলা রঙে বদলে যাচ্ছে। বিষয়টি শুধু দেখতেই খারাপ নয়, এর ক্ষতিকর প্রভাব আরও অনেক বেশি। পানিতে মিশে থাকা এই লোহার কণাগুলো জলজ মাছের মৃত্যুর কারণ। এ ছাড়া নদীর ছোট ছোট পোকামাকড়দের মেরে ফেলছে। ফলে নদীর পুরো খাদ্যশৃঙ্খল ও প্রাকৃতিক পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে।

Visit mchezo.life for more information.

বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করছিলেন, উত্তর আলাস্কার দুর্গম ব্রুকস পর্বতমালাই এই দূষণের উৎস। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সেখানকার যুগ যুগ ধরে জমে থাকা বরফাবৃত মাটি গলতে শুরু করেছে এবং এ থেকেই এই সমস্যা তৈরি হচ্ছে। সম্প্রতি ‘কমিউনিকেশনস আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা এ ধারণাকে সত্যি বলে প্রমাণ করেছে। এ গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দুটি নির্দিষ্ট উপায় খুঁজে পেয়েছেন।

মূলত মাটির ভেতরের বরফ যখন গলে যায়, তখন ভেতরের লোহা বাইরে বেরিয়ে আসে। এরপর বৃষ্টির পানি বা ধসে যাওয়া কাদার সঙ্গে সেই লোহা ধুয়ে গিয়ে সোজা নদীর পানিতে মেশে। বাতাসে থাকা অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসামাত্রই লোহার কণাগুলোয় জং বা মরিচা ধরে যায়। ঠিক যেমন খোলা জায়গায় লোহা ফেলে রাখলে মরিচা ধরে। আর এই মরিচার কারণেই নদীর পানি টকটকে কমলা রঙের হয়ে যায়।

পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো নদী কোনটি

বিজ্ঞানীদের এই নতুন আবিষ্কারের ফলে এখন একটা দারুণ সুবিধা হয়েছে। তাঁরা মাটির তাপমাত্রা মেপেই আগে থেকে টের পেয়ে যাবেন, পরবর্তী সময় আর কোন কোন এলাকার বরফ গলতে পারে এবং কোন কোন নদীর পানি এমন কমলা বা দূষিত হয়ে যেতে পারে। ফলে সেই নদীগুলোকে বাঁচানোর জন্য আগে থেকেই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

এই রহস্য উদ্‌ঘাটনে বিজ্ঞানীরা ব্রুকস পর্বতমালার প্রায় ৬০০ মাইল এলাকা ওপর থেকে ধাপে ধাপে পর্যবেক্ষণ করেছেন

মাটির এই গলে যাওয়া নরম কাদা ঘরবাড়ি, রাস্তা ও পাইপলাইনের জন্য যেমন ঝুঁকি তৈরি করছে, তেমনি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র ট্রেসি আর্ম ফিয়র্ডের পরিবেশকেও হুমকির মুখে ফেলছে। পানিতে মিশে যাওয়া এই সূক্ষ্ম লোহার কণা বা মরিচা প্রায় ৬০ মাইল দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। এগুলো পানির নিচের শৈবাল বা শেওলাকে ঢেকে মেরে ফেলছে। পোকামাকড়ের ক্ষতি করছে এবং মাছের ফুলকায় আটকে এদের শ্বাসরোধ করছে। এর ফলে ডিম পাড়ার জন্য নদীর তলদেশের নুড়িপাথর ও খাবারের জন্য শৈবালের ওপর নির্ভরশীল স্যামন মাছের জীবন এখন বিপন্ন।

এই রহস্য উদ্‌ঘাটনে বিজ্ঞানীরা ব্রুকস পর্বতমালার প্রায় ৬০০ মাইল এলাকা ওপর থেকে ধাপে ধাপে পর্যবেক্ষণ করেছেন। গবেষণার অন্যতম লেখক রোমান ডায়াল জানান, মাঝারি উচ্চতার জঙ্গল এলাকায় তেমন পরিবর্তন না হলেও পাহাড়ের একদম উঁচুতে ও নিচের উপত্যকায় সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি কারণে এই দূষণ ঘটছে।

নদী কেন সোজা পথে না গিয়ে এঁকেবেঁকে চলেপ্রাকৃতিক নিয়মে শুরু হওয়া এই দূষণ সম্পূর্ণ থামানো মানুষের পক্ষে অসম্ভব

পাহাড়ের উঁচুতে এই সমস্যার প্রধান কারণ পাইরাইট নামের একধরনের খনিজ, যা দেখতে অনেকটা সোনার মতো বলে একে বোকার সোনা বলা হয়। পাহাড়ের মাটি এত বছর ধরে বরফ হয়ে জমে থাকায় পানি বা বাতাস এই পাইরাইট খনিজের কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় বরফ গলে মাটি আলগা হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে সেখানে শুরু হয়েছে অ্যাসিড রক ড্রেনেজ নামের একটি ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রক্রিয়া। যুগের পর যুগ ধরে লুকিয়ে থাকা খনিজ ও পাথরগুলো হঠাৎ বাতাস ও পানির সংস্পর্শে এসে নদীর পানির মান পুরোপুরি নষ্ট করে দিচ্ছে।

প্রাকৃতিক নিয়মে শুরু হওয়া এই দূষণ সম্পূর্ণ থামানো মানুষের পক্ষে অসম্ভব। তবে কোন নদীটি পরবর্তী সময় কমলা রঙে রূপ নিতে পারে, তা যদি আগে থেকে অনুমান করা যায়, তবে মাছ ও জলজ প্রাণীদের নিরাপদ জায়গাগুলো রক্ষা করা সম্ভব হবে। এই পূর্বাভাস স্থানীয় সাধারণ মানুষের জন্য খুবই জরুরি, যারা খাবারের জন্য এই নদীগুলোর ওপর নির্ভরশীল। এর মাধ্যমে নদীর অববাহিকায় থাকা মানুষদের যেমন আগে থেকে সতর্ক করা যাবে, তেমনি এখনো সুরক্ষিত থাকা নদীগুলোকে বাঁচাতে বাড়তি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

সূত্র: পপুলার সায়েন্সসমুদ্র নীল, নদী নীল নয় কেন

Read full story at source