৭৭ হাজার কোটি রুপির সাম্রাজ্য, রাম চরণ-উপাসনার অবিশ্বাস্য উত্থান
· Prothom Alo

ভারতীয় চলচ্চিত্রজগতের অন্যতম জনপ্রিয় তারকা রাম চরণকে নিয়ে আলোচনা নতুন কিছু নয়। দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার এই তারকা অভিনয়, বক্স অফিস সাফল্য ও আন্তর্জাতিক জনপ্রিয়তার কারণে প্রায়ই শিরোনামে থাকেন। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেন তাঁর স্ত্রী উপাসনা কামিনেনি। তাঁর পরিচয় আরও বিস্তৃত। তিনি ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবসায়িক পরিবারের উত্তরাধিকারী, সফল করপোরেট নির্বাহী ও সমাজসেবী।
Visit tr-sport.click for more information.
সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকার এবং বিভিন্ন প্রতিবেদনের সূত্র ধরে আবারও আলোচনায় এসেছেন উপাসনা। কারণ, তিনি এমন এক ব্যবসায়িক পরিবারের সদস্য, যাঁর সাম্রাজ্যের মূল্য প্রায় ৭৭ হাজার কোটি রুপি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে শুধু উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া পরিচয় নয়, নিজের কর্মক্ষেত্রেও তিনি তৈরি করেছেন স্বতন্ত্র অবস্থান।
স্বাস্থ্যসেবা সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার
উপাসনার জন্ম ভারতের সুপরিচিত কামিনেনি পরিবারে। এই পরিবার দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্যসেবা, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যবিমা খাতের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর দাদা প্রতাপ সি রেড্ডি ভারতের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতের পথিকৃৎদের একজন। তাঁর হাত ধরেই গড়ে ওঠে অ্যাপোলো হসপিটালস, যা আজ ভারতের সবচেয়ে পরিচিত হাসপাতাল নেটওয়ার্কগুলোর একটি।
শৈশব থেকেই উপাসনা ব্যবসা, নেতৃত্ব ও সমাজসেবার পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন। পরিবারের ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি সেটিকে আরও এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই তিনি শিক্ষাজীবন শেষ করে পারিবারিক ব্যবসায় যুক্ত হন।
উপাসনার মা শোভনা কামিনেনি ভারতীয় করপোরেট জগতের অত্যন্ত পরিচিত মুখ। স্বাস্থ্যসেবা খাতের সম্প্রসারণে তাঁর অবদান ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। উপাসনা বহুবার বলেছেন, মায়ের কাজ ও নেতৃত্ব তাঁকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।
করপোরেট দুনিয়ায় নিজের অবস্থান
অনেক সময় তারকাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ধারণা তৈরি হয় যে তাঁরা কেবল পারিবারিক পরিচয়ের কারণেই আলোচনায় থাকেন। কিন্তু উপাসনার ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। তিনি জাইডাস গ্রুপের স্বাধীন পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বৈশ্বিক এই লাইফ সায়েন্সেস প্রতিষ্ঠানে হাজারো কর্মী কাজ করেন। একই সঙ্গে তিনি অ্যাপোলো ২৪/৭-এর বোর্ড সদস্য। ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা, অনলাইন ফার্মেসি ও চিকিৎসা পরামর্শসেবাকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে এই প্ল্যাটফর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
এ ছাড়া অ্যাপোলো হসপিটালসের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচির নেতৃত্বও দিচ্ছেন তিনি। সমাজের প্রান্তিক মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে তিনি সরাসরি যুক্ত।
ফ্যামিলি হেলথ প্ল্যান ইনস্যুরেন্স টিপিএর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবেও কাজ করছেন উপাসনা। স্বাস্থ্যবিমা খাতে তাঁর কাজ তাঁকে করপোরেট অঙ্গনে আলাদা পরিচিতি এনে দিয়েছে।
রাম চরণ ও উপাসনা। ইনস্টাগ্রাম থেকেসম্পদ নিয়ে বিরোধ নয়
ভারতের বহু ধনী পরিবারে উত্তরাধিকার ও সম্পদ বণ্টন নিয়ে দ্বন্দ্বের খবর প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু উপাসনার পরিবার এই সমস্যার সমাধানে অনেক আগে থেকেই একটি বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
উপাসনা জানিয়েছেন, তাঁদের পরিবারে একটি লিখিত ‘ফ্যামিলি কনস্টিটিউশন’ বা পারিবারিক সংবিধান রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের অধিকার, দায়িত্ব ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার নীতিমালা সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে।
এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য একটাই—সম্পদ যেন কখনো পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিরোধের কারণ না হয়।
উপাসনার মতে, অর্থ মানুষের জীবনকে সহজ করতে পারে, কিন্তু পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট করার কারণ হওয়া উচিত নয়। তাঁর দাদা এমন নীতিমালা তৈরি করেছিলেন, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারে।
পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে পরিবারের মেয়েদের অবস্থান
উপাসনার বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল নারী-পুরুষ সমতা নিয়ে তাঁর মন্তব্য। তিনি স্বীকার করেছেন যে একসময় তাঁদের পরিবারেও পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার কিছু প্রভাব ছিল। কিন্তু সেই পরিস্থিতি স্থায়ী হয়নি। পরিবারের মেয়েরা নিজেদের অধিকার নিয়ে সরব হয়েছেন এবং সমান অংশীদারত্ব দাবি করেছেন।
উপাসনার ভাষ্যে, পরিবারের নারীরা নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন বলেই আজ নারী ও পুরুষকে সমানভাবে দেখা হয়। ভারতের মতো সমাজে, যেখানে উত্তরাধিকার এবং পারিবারিক ব্যবসার নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে পুরুষদের হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল, সেখানে উপাসনার এই বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
সমাজসেবায় সক্রিয় ভূমিকা
করপোরেট দায়িত্বের পাশাপাশি সমাজসেবামূলক কাজেও সক্রিয় উপাসনা। স্বাস্থ্য সচেতনতা, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য এবং প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা বিষয়ে বিভিন্ন কর্মসূচির সঙ্গে তিনি জড়িত। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত অনেক উদ্যোগের লক্ষ্য হচ্ছে সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন করা।
এই অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে উপাসনা বিভিন্ন পুরস্কার অর্জন করেছেন। সমাজসেবা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে তাঁর অংশগ্রহণ তাঁকে করপোরেট জগতের বাইরেও পরিচিতি এনে দিয়েছে।
রাম চরণ: চলচ্চিত্র থেকে ব্যবসা
অন্যদিকে রাম চরণও শুধু অভিনেতা হিসেবে সীমাবদ্ধ নন। ভারতের অন্যতম সফল চলচ্চিত্র পরিবারের সদস্য হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায়। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি চলচ্চিত্র প্রযোজনার সঙ্গেও যুক্ত। তাঁর প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান একাধিক সফল ছবি নির্মাণ করেছে।
এ ছাড়া ঘোড়দৌড় ও অশ্বারোহণের প্রতি রাম চরণের বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। এই আগ্রহ থেকেই তিনি হায়দরাবাদ পোলো অ্যান্ড রাইডিং ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন। বিভিন্ন ব্যবসায়িক উদ্যোগেও তাঁর অংশীদারত্ব রয়েছে। ফলে রাম চরণ এবং উপাসনা—দুজনই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করেছেন।
মুক্তির আগেই ৩৫ কোটি আয়, এবারও কি ঝড় তুলবেন রামচরণবন্ধুত্ব থেকে জীবনের সঙ্গী
রাম চরণ ও উপাসনার সম্পর্কের গল্পটিও বেশ আকর্ষণীয়। কলেজজীবন থেকেই তাঁদের বন্ধুত্ব। দীর্ঘ সময় একে অপরকে জানার পর সেই সম্পর্ক প্রেমে রূপ নেয়। একসময় পড়াশোনা ও কাজের কারণে দুজন ভিন্ন দেশে থাকলেও সেই দূরত্বই তাঁদের বুঝতে সাহায্য করে যে তাঁরা একে অপরকে ছাড়া ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারছেন না।
অবশেষে ২০১২ সালে হায়দরাবাদে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে তাঁদের বিয়ে হয়। সেই বিয়ে ছিল ভারতের বিনোদন ও ব্যবসায়িক অঙ্গনের অন্যতম আলোচিত সামাজিক অনুষ্ঠান।
সংসারের সমীকরণ
রাম চরণ বহুবার মজা করে বলেছেন, তাঁদের সংসারের প্রকৃত ‘বস’ উপাসনা। একজন অভিনেতার জীবন অত্যন্ত অনিয়মিত। কখন কোথায় শুটিং, কখন কাজ শেষ হবে—সবকিছুই অনিশ্চিত। এমন জীবনে সংসার সামলাতে অনেক সমঝোতার প্রয়োজন হয়। রাম চরণের মতে, সেই ভারসাম্য রক্ষায় উপাসনার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে উপাসনাও সব সময় স্বামীর সাফল্যে গর্ববোধ করেন। একই সঙ্গে তিনি বিশ্বাস করেন, একটি সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মান, নিরাপত্তাবোধ এবং একে অপরের সাফল্যকে উদ্যাপন করার মানসিকতা।
নিজস্ব পরিচয়ের শক্তি
ভারতীয় তারকাদের পরিবারে অনেক সময় স্ত্রীদের পরিচয় কেবল তাঁদের স্বামীদের সাফল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু উপাসনা কামিনেনির গল্প আলাদা। তিনি যেমন একটি বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী, তেমনি নিজের দক্ষতা, নেতৃত্ব ও সমাজসেবামূলক কাজের মাধ্যমে আলাদা পরিচয় গড়ে তুলেছেন।
রাম চরণের জনপ্রিয়তা উপাসনাকে আলোচনায় এনেছে, কিন্তু তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে তাঁর নিজস্ব কাজ, দৃষ্টিভঙ্গি ও নেতৃত্বের ক্ষমতা। আধুনিক ভারতের করপোরেট ও সামাজিক পরিসরে উপাসনা এমন এক নারীর প্রতীক, যিনি উত্তরাধিকার পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সেই উত্তরাধিকারকে অর্থবহ করে তুলেছেন নিজের কর্মের মাধ্যমে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে