‘আপনাদের চেয়ে আমার এক্সপেরিয়েন্স (অভিজ্ঞতা) আরও খারাপ’

· Prothom Alo

নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা আশঙ্কাজনক হারে ঘটছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় অপরাধ কেন ঘটছে, সেদিকেও নজর দিতে হবে। নারী ও শিশুর প্রতি একের পর এক সহিংসতার ঘটনা নিয়ে নাগরিক ও অধিকারকর্মীদের এমন বক্তব্যের পর মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী আবু জাফর মো. (এ জেড এম) জাহিদ হোসেন আক্ষেপ করে বললেন, এ ব্যাপারে নিজ এলাকায় তাঁর অভিজ্ঞতা আরও খারাপ।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

আজ শনিবার রাজধানীতে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ আয়োজিত নাগরিক সংলাপ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন মন্ত্রী। সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নিজস্ব ভবনের ‘আনোয়ারা বেগম–মুনিরা খান’ মিলনায়তনে ‘নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও’ শিরোনামে এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।

জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আপনারা তো কিছু বললেন, এখানে মিডিয়া আছে; আমার এলাকায় যেগুলো হচ্ছে, আমার এক্সপেরিয়েন্স (অভিজ্ঞতা) আপনাদের চেয়েও খারাপ। আমাদের সমাজে স্টিগমা (লজ্জাজনক মনে করা), জিনিসকে লুকিয়ে রাখা এমন পর্যায়ে!...তালা মারা বাড়িতে মেয়েটা খুন হয়েছে, পাশে দাদি শুয়ে আছে। কোনো অবস্থাতে সে বাদীও হবে না, মুখও খুলবে না। পুলিশ বলল, “স্যার, আপনি একটু বলেন, আপনি একটু হেল্প (সাহায্য) করেন! আই ওয়াজ ট্রাইং, আই ফেইলড (আমি চেষ্টা করেছিলাম, ব্যর্থ হয়েছি)। এমন চারটি ঘটনা আছে গত চার মাসে, তারা (ভুক্তভোগীর পরিবার) আসে নাই।’

এ প্রসঙ্গে মন্ত্রী আরও বলেন, ‘শিশু নির্যাতনের একটি ঘটনায় আমি মামলাও করাতে পারিনি। শেষে পুলিশকে বলেছি, “তুমি বাদী হও।”...আইনের কিছু জিনিস আছে, ইচ্ছে করলে আপনি কাউকে ফাঁসি দিতে পারবেন না। দেয়ার ইজ সাম প্রসিডিউর (কিছু প্রক্রিয়া আছে)। ইউ নিড টু ফলো ইট (আপনাকে অনুসরণ করতে হবে)। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক আন্তরিকতা আছে।’

নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার পরিসংখ্যান নিয়ে জাহিদ হোসেন বলেন, ২০২৪, ২০২৫ এবং এ বছরের মে মাস পর্যন্ত পরিসংখ্যান থেকে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে সহিংসতা বেশি হয়েছে। মানুষের আশা ছিল, সহিংসতা কম হবে। তিনি বলেন, ‘যত কথাই বলেন, আইনকে নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে। আইনকে যখন কেউ বাধাগ্রস্ত করেছে, কেউ নিজের হাতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেছে...। আপনি কোনো কাজ করে মনে করেছেন, এটা করা সঠিক। দুষ্কৃতকাকারী, দুষ্টু লোক “দুষ্ট কাজ” করাকেও সঠিক মনে করেছে। আমি ভেরি মাচ শিওর (খুব নিশ্চিত) ২০২৬ সালে সহিংসতার ঘটনা আবার গ্র্যাজুয়েলি (ক্রমান্বয়ে) কমবে।’ কুইক রেসপন্স টিম কার্যক্রমের ব্যাপ্তি বাড়ানো হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, নারী ও শিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সবার সম্মিলিত উদ্যোগ লাগবে।

অনুষ্ঠানে মূল আলোচনায় অংশ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ আইনের যথাযথ প্রয়োগের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, খুব অল্প সময়ে বিচার শেষ করে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়ার মধ্যে কোনো ‘বাহবা’ নেই। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি তড়িঘড়ি করে দেওয়া সম্ভব নয়। পল্লবীর শিশু ধর্ষণ ও হত্যার আলোচিত রায় মাত্র কয়েক দিনে হওয়া প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন করেন, বিচারক কি মিডিয়ার ভয়, সরকারের চাপ, সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ বা ভালো পোস্টিংয়ের জন্য করেছেন? সর্বোচ্চ সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিতে বিচারকদের আইন যথাযথভাবে অনুসরণের আহ্বান জানান তিনি।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী সহিংসতা কমাতে সরকারকে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, সাইবার সহিংসতার বিরুদ্ধে কনটেন্ট তৈরির জন্য সরকার পুরস্কার দিতে পারে। মুঠোফোন অপারেটরদের এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে ইমামদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার সময় জুমার খুতবায় নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে কথা বলার অনুরোধ করা যেতে পারে ইমামদের। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য ধর্মীয় নেতাদের পুরস্কার দিতে পারে সরকার।

সম্মানিত বক্তা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, নারীকে এগিয়ে আনতে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে নারী কোটা ছিল। এটা এখন নেই। কোটা না থাকার বড় ধরনের প্রভাব পড়বে ভবিষ্যতে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক কৌশল নেওয়ার আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার ক্ষেত্রে দেশ এখন ‘দুর্যোগপূর্ণ’ সময়ে এসে দাঁড়িয়েছে। নারীর প্রতি ঘৃণা–বিদ্বেষ সৃষ্টি করা হচ্ছে। ভয় দেখিয়ে নারীদের ঘুরে ঢুকিয়ে দিতে চাইছে। তিনি বলেন, সহিংসতা প্রতিরোধে ধারাবাহিকভাবে কাজ করতে হবে।

‘পরিবার থেকে নজর দেওয়ার আহ্বান’

আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মেহজাবীন হক সহিংসতা প্রতিরোধে পরিবার থেকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, কোনো শিশু যদি পরিবারে মা বা কোনো সদস্যের প্রতি সহিংসতা হতে দেখে বা নিজে সহিংসতার শিকার হয়, সেই শিশু বড় হয়ে একই আচরণ করে। এ হার পুরুষদের ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ ও নারীদের ক্ষেত্রে প্রায় ৪২ শতাংশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মু. রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, সহিংসতার কোনো কোনো ঘটনা ঘিরে আলোচনা তৈরি হয়। কিন্তু এটা ভাবা হয় না যে সহিংসতার ঘটনা কেন ঘটল, কেন কারও ভেতর সহিংস আচরণ গড়ে উঠল। ধর্ষক একদিনে গড়ে ওঠে না, এর সঙ্গে মাদকের সংশ্লিষ্টতা, দীর্ঘদিন ধরে মামলা ঝুলে থাকা, হয়রানির ভয়ে ভুক্তভোগীর মামলা করতে সাহস না পাওয়ার বিষয় জড়িত। তিনি ঘটনা প্রমাণে শুধু ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে আসামির জবানবন্দির ওপর নির্ভর না করে ডিএনএ–সহ আধুনিক প্রক্রিয়া অনুসরণের পরামর্শ দেন।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীদের অধস্তন করে রাখা ও বৈষম্য টিকিয়ে রাখার যে অবস্থা চলছে, তা থেকেই সহিংসতা হচ্ছে। এর মধ্যে মামলা পরিচালনা ও রায় পেতে দীর্ঘসূত্রতা মানুষকে বিচারহীনতার মুখোমুখি করছে।

অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন মহিলা পরিষদের সম্পাদক (লিগ্যাল এইড উপপরিষদ) রেখা সাহা। এতে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা মহানগর পুলিশের উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের উপপুলিশ কমিশনার মোছা. লিজা বেগম, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক মো. কামাল উদ্দিন মজুমদার, বি-স্ক্যানের নির্বাহী পরিচালক সালমা মাহবুব, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের কোষাধ্যক্ষ মেইনথিন প্রমীলা। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আন্দোলন সম্পাদক রাবেয়া খাতুন।

Read full story at source