সুইডেনের নতুন অভিবাসন নীতি: স্থায়ী বসবাসের পথ সংকুচিত, না নতুন বাস্তবতার সূচনা
· Prothom Alo

সুইডেনের পার্লামেন্ট সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস করেছে, যা দেশটির অভিবাসন ও আশ্রয়নীতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে। নতুন আইনের মাধ্যমে ভবিষ্যতে শরণার্থী, বিকল্প সুরক্ষাপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট কিছু শ্রেণির মানুষের জন্য স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা পার্মানেন্ট রেসিডেন্সের সুযোগ কার্যত বন্ধ করা হচ্ছে। আইনটি ১২ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে।
Visit mchezo.co.za for more information.
এ সিদ্ধান্তকে অনেকেই সুইডেনের অভিবাসন ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে সুইডেন ইউরোপের সবচেয়ে উদার আশ্রয়নীতির দেশগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত ছিল। এখন সেই নীতির ভিত্তিতেই একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত হচ্ছে।
আগে কী ছিল
বর্তমান এবং পূর্ববর্তী ব্যবস্থায় একজন ব্যক্তি শরণার্থী বা আন্তর্জাতিক সুরক্ষার ভিত্তিতে সুইডেনে বসবাসের অনুমতি পেলে প্রথমে অস্থায়ী অনুমতি পেতেন। পরবর্তী সময়ে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে তিনি স্থায়ী বসবাসের অনুমতি অর্জনের সুযোগ পেতেন। অর্থাৎ অস্থায়ী অনুমতি ছিল স্থায়ী বসবাসের দিকে অগ্রসর হওয়ার একটি ধাপ।
নতুন আইনে কী পরিবর্তন হলো
নতুন আইন অনুযায়ী ভবিষ্যতে যেসব ব্যক্তি আশ্রয় বা সুরক্ষার ভিত্তিতে বসবাসের অনুমতি পাবেন, তাঁরা আর স্থায়ী বসবাসের অনুমতির জন্য আবেদন করতে পারবেন না। পরিবর্তে তাঁরা নির্দিষ্ট মেয়াদের অস্থায়ী অনুমতি পাবেন এবং প্রয়োজনে তা নবায়ন করতে হবে।
সরকারের যুক্তি হলো, এই পরিবর্তনের মাধ্যমে সুইডেনের আইনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন অভিবাসন ও আশ্রয়কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হবে। একই সঙ্গে অভিবাসনব্যবস্থাকে আরও নিয়ন্ত্রিত এবং দীর্ঘমেয়াদে আরও টেকসই করা সম্ভব হবে।
বর্তমান স্থায়ী বাসিন্দাদের কি উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ আছে
না।
আইনটি মূলত ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যাঁদের ইতিমধ্যে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি রয়েছে, তাঁদের সেই মর্যাদা এ আইনের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করা হচ্ছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে যে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে, তার অনেকটাই বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
শিক্ষার্থী, গবেষক ও কর্মীদের ক্ষেত্রে কী হবে
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
এ আইন মূলত আশ্রয় এবং আন্তর্জাতিক সুরক্ষাভিত্তিক অভিবাসনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। বিদেশি শিক্ষার্থী, গবেষক এবং কর্মসংস্থানভিত্তিক অনুমতি নিয়ে আসা ব্যক্তিদের জন্য আলাদা বিধান বিদ্যমান রয়েছে।
বরং সাম্প্রতিক সময়ে সুইডিশ সরকার গবেষক, পিএইচডি শিক্ষার্থী এবং উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক কর্মীদের জন্য কিছু ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগও নিয়েছে। ফলে একজন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী বা গবেষকের ক্ষেত্রে এই আইন সরাসরি সেই প্রভাব ফেলবে না, যেটি একজন শরণার্থী বা সুরক্ষাপ্রাপ্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে ফেলবে।
ইউরোপের অন্যান্য দেশের সঙ্গে এর মিল কোথায়?
সুইডেনের এ সিদ্ধান্তকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে ভুল হবে। গত এক দশকে ইউরোপের বহু দেশ অভিবাসন নীতি পুনর্মূল্যায়ন করেছে। ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রিয়া এবং আরও কয়েকটি দেশ দীর্ঘমেয়াদি বা স্থায়ী বসবাসের পরিবর্তে অস্থায়ী অনুমতি এবং নিয়মিত পুনর্মূল্যায়নের দিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
সুইডেনের নতুন নীতিও একই প্রবণতার অংশ। অর্থাৎ আশ্রয় প্রদান করা হবে, কিন্তু সেই আশ্রয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থায়ী বসবাসে রূপ নেবে না।
বিতর্ক কোথায়
সমর্থকদের মতে, এ আইন অভিবাসনব্যবস্থাকে আরও সুসংগঠিত করবে এবং ইউরোপীয় মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনবে। তাঁদের যুক্তি, স্থায়ী মর্যাদার পরিবর্তে নাগরিকত্বই হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদি অন্তর্ভুক্তির প্রধান পথ।
অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করলে মানুষের সামাজিক সংহতি, মানসিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাঁরা আশঙ্কা করছেন, অস্থায়ী অনুমতির ধারাবাহিকতা অনেক মানুষের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা তৈরি করবে।
একটি বড় নীতিগত পরিবর্তন
এ আইনকে শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি সুইডেনের অভিবাসন দর্শনের পরিবর্তনের প্রতিফলন। দীর্ঘদিন ধরে যে ধারণা ছিল, আশ্রয় পাওয়া অনেক ক্ষেত্রে স্থায়ী বসবাসের দিকে নিয়ে যেতে পারে, নতুন আইন সেই ধারণাকে পরিবর্তন করছে।
বার্তাটি স্পষ্ট। সুইডেন ভবিষ্যতেও সুরক্ষা প্রদান করবে, কিন্তু সুরক্ষা পাওয়া এবং স্থায়ীভাবে বসবাসের অধিকার অর্জন করা আর একই বিষয় হিসেবে বিবেচিত হবে না।
এই পরিবর্তন কেবল সুইডেনের জন্য নয়, সমগ্র ইউরোপের অভিবাসন নীতি কোন দিকে এগোচ্ছে, সেই বৃহত্তর আলোচনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
সুইডেনে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্য এ আইনের প্রকৃত পরিধি বোঝা জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সময় এমনভাবে খবর উপস্থাপন করা হয়, যেন সুইডেনে স্থায়ীভাবে বসবাসরত সব বিদেশির অধিকার হঠাৎ করেই পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। বাস্তবে বিষয়টি এতটা বিস্তৃত নয়।
এ আইন মূলত ভবিষ্যতে আশ্রয় ও আন্তর্জাতিক সুরক্ষাভিত্তিক বসবাসের অনুমতি পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কর্মসংস্থান, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা বা পারিবারিক ভিত্তিতে সুইডেনে অবস্থানরত অধিকাংশ বাংলাদেশির ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন সরাসরি প্রযোজ্য নয়। যাঁদের ইতিমধ্যে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রেও এ আইনের মাধ্যমে সেই মর্যাদা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করা হচ্ছে না।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট। সুইডেনের অভিবাসন নীতি এখন আগের তুলনায় আরও কঠোর এবং শর্তনির্ভর হয়ে উঠছে। ভাষাজ্ঞান, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, সমাজে অংশগ্রহণ এবং আইন মেনে চলার বিষয়গুলো আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। সুইডিশ পার্লামেন্ট (Riksdagen) কর্তৃক গৃহীত আইন এবং সুইডিশ মাইগ্রেশন এজেন্সির (Migrationsverket) ব্যাখ্যার ভিত্তিতে নাগরিকত্বের নতুন নিয়মও সেই একই প্রবণতার অংশ।
তাই উদ্বিগ্ন হওয়ার চেয়ে বাস্তবতা বোঝা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যাঁরা দীর্ঘমেয়াদে সুইডেনে নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে চান, তাঁদের জন্য শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মজীবন, ভাষা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তিই আগের মতোই সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর পথ।
*লেখাটি সুইডিশ পার্লামেন্ট (রিক্সদাগ) কর্তৃক গৃহীত আইন, সুইডিশ সরকারের অফিশিয়াল ব্যাখ্যা এবং সাম্প্রতিক প্রকাশিত নীতিগত নথির ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে।
*লেখক: রহমান মৃধা, সুইডেন