পাগল হাসানের বুকেতে দুঃখ সীমাহীন

· Prothom Alo

‘শত-সহস্র’ বছর ধরে বয়ে চলছে নদী সুরমা।

পাড়ে শিমুলতলা গ্রাম। উপজেলা ছাতক। জেলা সুনামগঞ্জ।

Visit sweetbonanza.qpon for more information.

এ গ্রামেই ১৯৮৫ সালের ১ জুন জন্ম নেন পাগল হাসান, যাঁর মূল নাম মো. মতিউর রহমান হাসান।

বয়স যখন অল্প, তখন হাসানের কৃষক বাবা দিলোয়ার হোসেন দিলশাদ মারা যান। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া হাসান সে বয়সেই জেনে যান, পুরো জীবনটাই গান, পুরো জীবনটাই সুর, যেন–বা এক দুঃখনদী।

এ-ও জানা হয়ে যায় হাসানের, গান লিখতে হলে বুকভরা পরম দুঃখের দরকার।

বাবা মারা যাওয়ার পর অভাব, অনটন আর দুঃখ সেই যে হাসানের সঙ্গী হয়েছিল; তা আর দূর হয়নি। ৩৯ বছর যে জীবন কাটিয়ে গেলেন, দুঃখ আর তাঁর পিছু ছাড়েনি। গানেও তাই বারবার দুঃখ এসেছে। একটা গানে তিনি লিখেছিলেন, ‘পাগল হাসানের বুকেতে দুঃখ সীমাহীন...’

যে আয়ু পেয়েছিলেন পাগল হাসান; এর ভেতর বাবা হারানোর বেদনা, টানাপোড়েন, প্রেমিকাকে না পাওয়ার দুঃখবোধ, প্রথম স্ত্রী লুৎফা বেগমের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ—সবই তাঁর ছোট্ট জীবনের অভিজ্ঞতার ঝুলিতে জমা হয়েছিল। সবকিছুকে পাশাপাশি রেখেই থিতু হন বাউলগানে। সেখানেই খুঁজে নেন জন্ম আর বেঁচে থাকার যাবতীয় মানে। পোড়-খাওয়া ‘জোড়াতালির জীবন’যাপনের অভিজ্ঞতায় দার্শনিক মন্তব্য বেরোয় তাঁর কণ্ঠে: ‘গান লিখতে হলে পরম দুঃখের দরকার। প্রয়োজন পরম সুখেরও...’

পাগল হাসানের জীবনে প্রকৃত সুখ কখনো এসেছিল কি না, জানা নেই। তবে তাঁর জীবনের পরতে পরতে আমৃত্যু স্রোতস্বিনী এক দুঃখনদী বয়ে গেছে, সেটা তাঁর বিভিন্ন সাক্ষাৎকার আর রচিত গান পাঠ করে বা শুনে সহজেই অনুমান করা যায়। দুঃখ-কষ্টে আকণ্ঠ নিমজ্জিত পাগল হাসান গানেই যে সুখ খুঁজে পেয়েছেন, সেটাও অনুভব করা যায় তাঁর আচার-আচরণে।

পাগল হাসান গানে এতটাই মোহাচ্ছন্ন থাকতেন, হয়তো সে কারণেই সন্ধ্যায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে ভাঙা হাতে প্লাস্টার বেঁধে রাতেই হাজির হাজারো দর্শক-শ্রোতার সামনে; গানের মজমায়, চিরচেনা রূপে। সুর-গানে নিমজ্জিত হাসান ভুলে যান কিছুক্ষণ আগে দুর্ঘটনায় হাড় ভেঙে যাওয়া হাতের যন্ত্রণা, ব্যথাকে পরোয়া না করে কণ্ঠে তুলে নেন তাঁরই লেখা বহুল প্রচলিত গান:

‘আন্ধাইরপুরীর মানুষ আমি
আন্ধাইরপুরীর মানুষ আমি, আন্ধাইর ঘরের বাসিন্দা
ও আল্লা ও আল্লা, আমি এক, আমি এক পাপিষ্ঠ বান্দা
ও আল্লা ও আল্লা, আমি এক, আমি এক পাপিষ্ঠ বান্দা।
রুহুটারে কবজা কইরা, আজরাইলে নিব ধইরা
রুহুটারে কবজা কইরা, আজরাইলে নিব ধইরা
শূন্য কায়া রইবে পইড়া, শূন্য কায়া রইবে পইড়া
কে শুনবে কার কান্দা গো!
ও আল্লা ও আল্লা আমি এক, আমি এক পাপিষ্ঠ বান্দা
ও আল্লা ও আল্লা আমি এক, আমি এক পাপিষ্ঠ বান্দা।

ও আন্ধাইর ঘরের রাস্তা সোজা, ঘাড়ে লইয়া পারের বোঝা
আন্ধাইর ঘরের রাস্তা সোজা, ঘাড়ে লইয়া পারের বোঝা
আল্লা রাসুল মুর্শিদ ভজা, আল্লা রাসুল মুর্শিদ ভজা
পাগল মনের ধান্ধা গো
ও আল্লা ও আল্লা, আমি এক, আমি এক পাপিষ্ঠ বান্দা
ও আল্লা ও আল্লা, আমি এক, আমি এক পাপিষ্ঠ বান্দা।

ও, তোমার লীলা তোমার খেলা, বোঝে না মোর মন পাগেলা
তোমার লীলা তোমার খেলা, বোঝে না মোর মন পাগেলা
পাগল হাসানের যায় বেলা, পাগল হাসানের যায় বেলা
সইয়া লোকের নিন্দা গো
ও আল্লা ও আল্লা, আমি এক, আমি এক পাপিষ্ঠ বান্দা
ও আল্লা ও আল্লা, আমি এক, আমি এক পাপিষ্ঠ বান্দা।

আন্ধাইরপুরীর মানুষ আমি
ওরে আন্ধাইরপুরীর মানুষ আমি
আন্ধাইর ঘরের বাসিন্দা
ও আল্লা ও আল্লা, আমি এক, আমি এক পাপিষ্ঠ বান্দা
ও আল্লা ও আল্লা, আমি এক, আমি এক পাপিষ্ঠ বান্দা।’

গানটি গাইবার আগে পাগল হাসান সেদিন বলেন, ‘শুধু গানের জগতেই না, যেকোনো সময়, ওয়ার্ড ইজ ওয়ার্ড। কথা দিলে যাইতে লাগব। ঘরো লাশ থইয়াও যাওয়া লাগে। তাই ভাঙা হাতেই আইছি।’

গানের প্রতি কী দরদ, শ্রোতাদের জন্য কী টান!

পাগল হাসানের জীবদ্দশায় ‘আন্ধাইরপুরীর মানুষ আমি’ গানটা যতটা প্রচার পেয়েছিল, মৃত্যুর পর তা আরও উজ্জ্বল ও বেগবান হয়। বাউলশিল্পীদের কণ্ঠে তো বটেই, ওয়াজ মাহফিলেও ইসলামি বক্তাদের কণ্ঠে এ গান মানুষের হৃদয়ে অনুরণন তোলে। তবে হাসান তাঁর জীবদ্দশায় এ গান গাইতে গিয়ে বিভিন্ন সময় পঙ্‌ক্তিতে সংযোজন-বিয়োজন করেছেন। যেমনটা করেছেন তাঁর লেখা আরও অনেক গানের ক্ষেত্রেও।

হাসান তাঁর একাধিক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে তিনি ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ গান লিখেছেন। তবে ৭০টার মতো প্রচার পেয়েছে। এ ছাড়া লিখে রাখা ‘হাজারো গানের’ একটা ডায়েরি তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। এমনিতে তিনি তেমন গান শুনতেন না। যদি রাতের বেলায় কোনো গান শুনতেন, তাহলে জহির পাগলার গান শুনে কাটাতেন। জহির পাগলার গায়কির তিনি ভক্ত ছিলেন। এ ছাড়া আবুল সরকারের গানও তিনি শুনতেন। তাঁর ভাষায়, ‘বাট্টি (খাটো) আবুল। তাইনর গান হুনি। ভালা লাগে আমার।’

পাগল হাসান
জীবদ্দশাতেই খ্যাতির চূড়া দেখে ফেলা পাগল হাসান প্রথম মঞ্চে গান গেয়েছেন ২০০৭ সালে। সুনামগঞ্জের জেলা শিল্পকলা একাডেমির এক অনুষ্ঠানে দুরুদুরু বুকে মঞ্চে উঠে মাইক্রোফোন হাতে অনবরত কাঁপছেন। ভয় আর আতঙ্কে তাঁর কণ্ঠ যেন–বা স্থবির হয়ে আসছে। ওস্তাদ দেবদাস চৌধুরী অভয় দিলেন। নিজেকে সামলে নিয়ে হাসান ধরলেন জালাল উদ্দীন খাঁর সেই বহুলপ্রচলিত গান: ‘আমি অজানা এক নদীর স্রোতে হারাইয়াছি, সাথি রে, মালা কার লাগিয়া গাঁথি...’

কার গান শুনতেন পাগল হাসান? সেটা তাঁর বয়ানেই জানা গেল। আর মঞ্চে তিনি নিজের লেখা ও সুর করা গান তো গাইতেনই; অন্য মহাজনের গানও গাইতেন। শ্রোতারা জালাল উদ্দীন খাঁ, শাহ আবদুল করিম, শাহ নূরজালালসহ অনেক গীতিকারের গান তাঁর কণ্ঠে শুনেছেন।

পাগল হাসান বলতেন, বৃহত্তর সিলেটের বাতাসে বাউলগান উড়ে বেড়ায়। যাঁরা খোঁজেন, তাঁরা পান। সিলেটে জন্ম নিয়ে গান ভালোবাসে না, এমন ব্যক্তি নেই!

আগেই বলেছি, শৈশবেই বাবাকে হারান পাগল হাসান।

হাসানের ভাষায়, ‘ভাঙন দিয়েই জীবন শুরু’ তাঁর। বাবার মৃত্যুর পরই বুঝে ফেলেন ‘শেল’ কী জিনিস!

বাবাকে হারিয়ে পদে পদে দারিদ্র্যের কষাঘাতে ‘শূলবিদ্ধ’ হয়ে মা আর তিন বোনকে নিয়ে শুরু হয় হাসানের ‘টানাটুনির সংসার...’ সে সময়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলতেন, ‘হি সময়ই দুঃখ বুঝিলাইছি।’ পাগলের এ বয়ানও ছিল, ‘অর্থের অভাবে আমি নিরর্থক, এটা বলতে পারেন।’

বালক বয়সে দুঃখ বুঝে ফেলা পাগল হাসান তাঁর বাবা মারা যাওয়ার আগে পুলিশ হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর অভাব-অনটনে সে ইচ্ছাও উবে যায়। মাত্র অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। বয়স কিছুটা বাড়লে যোগ দেন সরকারি চাকরিতে, নৈশপ্রহরী পদে; সুনামগঞ্জের ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে। একসময় চাঁদপুরে বদলি হন। কিন্তু মা, বাড়িঘরবন্ধুবান্ধব ছেড়ে ‘এত দূরের’ জেলায় তারঁ মন টেকেনি। চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে চলে আসেন। এরপরই পুরোপুরি মন দেন গানে।

যদিও গানে হাসানের যাত্রা শুরু হয়েছিল শৈশবেই। ২০০৫-০৬ সালের দিকে সুনামগঞ্জে সংগীতশিল্পী ও প্রশিক্ষক দেবদাস চৌধুরীকে ‘ওস্তাদ’ মেনে তালিম নেন এবং স্পন্দন সংগীত বিদ্যালয়ে যুক্ত হন। ২০০৭ সালে গান লেখা শুরু করেন। দেবদাস চৌধুরী ক্রমাগত উৎসাহ দেন। কণ্ঠ, সুর আর রচনাশৈলীর ত্রিবন্ধন ভর করে পাগল হাসানের মধ্যে। সুনামগঞ্জ আর হাওরাঞ্চলের স্বর পাগল হাসানের কণ্ঠে দারুণভাবে উঠে আসত। কয়েক বছরের মধ্যেই নিজের জাত চেনান তিনি। গড়ে তোলেন ‘পাগল এক্সপ্রেস’ নামে একটি ব্যান্ড গানের দল। একের পর এক জনপ্রিয় হতে থাকে পাগল হাসানের গান। বয়স যখন ২৩ কিংবা ২৫, তখনই স্বনামে খ্যাতি অর্জন করে নেন; সুনামগঞ্জ, সিলেটসহ ধীরে ধীরে পুরো বাংলাদেশে। পরে বাংলাভাষী অঞ্চলে।

জীবদ্দশাতেই খ্যাতির চূড়া দেখে ফেলা পাগল হাসান প্রথম মঞ্চে গান গেয়েছেন ২০০৭ সালে। সুনামগঞ্জের জেলা শিল্পকলা একাডেমির এক অনুষ্ঠানে দুরুদুরু বুকে মঞ্চে উঠে মাইক্রোফোন হাতে অনবরত কাঁপছেন। ভয় আর আতঙ্কে তাঁর কণ্ঠ যেন–বা স্থবির হয়ে আসছে। ওস্তাদ দেবদাস চৌধুরী অভয় দিলেন। নিজেকে সামলে নিয়ে হাসান ধরলেন জালাল উদ্দীন খাঁর সেই বহুলপ্রচলিত গান: ‘আমি অজানা এক নদীর স্রোতে হারাইয়াছি, সাথি রে, মালা কার লাগিয়া গাঁথি...’

পাগলের গান শেষ হতে না হতেই হলভর্তি মানুষের মুহুর্মুহু করতালি। প্রথম গানেই বাজিমাত। এরপর পুরো সুনামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর সুকণ্ঠের সুখ্যাতি। ধীরে ধীরে হাওরপারের পাগল হাসানের সুর আর কণ্ঠের ঢেউ তোলপাড় তোলে; ২০০৮ সালের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে তাঁর রচিত গান জনপ্রিয়তার বিপুল স্রোতে গা এলিয়ে ভাসতে থাকে মানুষের হৃদয়ে, মগজে।

আসিফ আকবর, ডলি সায়ন্তনী, সালমা, আশিক, কাজী শুভ, গামছা পলাশ, কিশোর পলাশসহ অনেক শিল্পীই পাগল হাসানের জীবদ্দশায় তাঁর লেখা গান গেয়েছেন। লালন ব্যান্ডও গেয়েছে তাঁর গান। ২০০৮ সাল থেকে হাসানের লেখা গান শিল্পীরা গেয়ে এলেও পাগল হাসান নিজে তাঁর গান প্রথম রেকর্ড করেন ২০১২ সালে। এর পর থেকে তিনি নিয়মিত নিজের গান মঞ্চে গাওয়া শুরু করেন।

মঞ্চে নিয়মিত নিজের লেখা গান গাইলেও পাগল হাসান নিজের সৃষ্টি প্রসঙ্গে বলতেন, ‘যত দিন আমার ভালা কথার গান বাঁইচা থাকব, তত দিন আমি কেউর না কেউর কাছে বাঁইচা থাকমু। আর যদি এই ধরনের কোনো সৃষ্টি আমার দ্বারা সম্ভব না হয়, তাহলে তো এই সবের (গান কালোত্তীর্ণ হওয়ার) প্রশ্নই আসে না।’ তিনি আরও বলতেন, ‘আমার আগের মহাজনদের গানকে ক্রস করে যাওয়ার ইচ্ছে নেই। তাঁরার উপরে মাতব্বরি করতে চাই না। তবে লেইখ্যা যাইমু। মইরা সারলে যা হয়, অইব!’

নিজের গান নিয়ে পাগল হাসান এমন বিনয় প্রকাশ করলেও জীবদ্দশায়ই তিনি তাঁর গানের জনপ্রিয়তা টের পেয়েছিলেন। যখন মঞ্চে গাইতেন তাঁর লেখা গান কিংবা অন্য শিল্পীরাও গাইতেন; তখন শ্রোতাদের সাড়া দেওয়ার ঘটনা হতো অভিনব। জলসায় থাকা সবাই শিল্পীর কণ্ঠে কণ্ঠ মেলাতেন। এমন সৌভাগ্য কম গীতিকারের জীবনেই জোটে!

পাগল হাসান কখনো ভাইরাল হতে চাননি। গণহারে সবাই তাঁর গানকে ভালো বলবে, সে আশাও তিনি করতেন না। কিন্তু ঘটেছে ঠিক উল্টো। ভাইরাল তো বটেই, গণহারে তাঁর গানও ঠাঁই নিয়েছে জনপ্রিয়তার কাতারে। তাঁর গান মানেই লাখো-কোটি ভিউ। লাইকি, টিকটক ছেয়ে আছে পাগল হাসানের গানে। শুধু শ্রোতা নয়, তাঁর গানের ভক্ত-আশেকানও তৈরি হয়েছিল। যে কারণে যেখানেই গান গাইতে যেতেন, সেখানেই তাঁকে ঘিরে তৈরি হতো উন্মাদনা, উচ্ছ্বাস।

আর মৃত্যুর পর তো পাগল হাসানের গান কণ্ঠে তুলে নিয়েছেন খ্যাত-অখ্যাত কতশত শিল্পী। অন্যদিকে টিকটকার, রিলস ক্রিয়েটররা তাঁর গানের আংশিক ব্যবহার করে কতশত-সহস্র কনটেন্ট তৈরি করেছেন, এর হিসাব মেলানোও কঠিন! পাগল হাসানের গানের জনপ্রিয়তার এমনই ঢেউ উঠেছিল যে মহান জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যও তাঁকে স্মরণ করেছিলেন বুকভরা আবেগ আর ভালোবাসায়।

পাগল হাসানের গানের জনপ্রিয়তা বাড়তেই থাকে। তাঁর অনেক গানই তখন শ্রোতাদের বুঁদ করে রাখে।
পরবর্তীকালে পাগল হাসানের গানের জনপ্রিয়তা বাড়তেই থাকে। একে একে তাঁর অনেক গানই তখন শ্রোতাদের বুঁদ করে রাখে। যদিও পাগল বলতেন, ‘আমি এক নগণ্য জন, অজ্ঞ জন। আমার আসলে কোনো সম্বল নাই। আমি নিজে প্রচারবিমুখ, এটা বলব না। তাই বলে প্রচারের জন্য হামাগুড়ি দিয়ে লুটোপুটো খেতে হবে, তা-ও না। এসব পছন্দও করি না।’ আসলে পাগল হাসান প্রচার চাননি। কিন্তু কর্মই তাঁকে আলো থেকে ক্রমাগত আরও আলোয় নিয়ে এসেছে।


পাগল হাসানের গানের উত্থান হয়েছিল ‘জীবনখাতা’ গানটি দিয়ে। গানটি ছিল এমন:
‘জীবনখাতায় প্রেমকলঙ্কের দাগ দাগাইয়া
জীবনখাতায় প্রেমকলঙ্কের দাগ দাগাইয়া
ছাড়িয়া যাইও না বন্ধু, মায়া লাগাইয়া
ছাড়িয়া যাইও না বন্ধু, মায়া লাগাইয়া
ছাড়িয়া যাইও না বন্ধু, মায়া লাগাইয়া
ছাড়িয়া যাইও না বন্ধু, মায়া লাগাইয়া
ছাড়িয়া যাইও না বন্ধু, মায়া লাগাইয়া।

জড়াইয়া মায়ারও ডোরে, পিরিতে বান্ধিয়া মোরে
খেলাইও না হৃদয়টারে লইয়া
জড়াইয়া মায়ারও ডোরে, পিরিতে বান্ধিয়া মোরে
খেলাইও না হৃদয়টারে লইয়া
হাতে ধইরা ছাইড়ো না হাত, সামনে আগাইয়া
এগো, হাতে ধইরা ছাইড়ো না হাত, সামনে আগাইয়া
হাতে ধইরা ছাইড়ো না হাত, সামনে আগাইয়া
ছাড়িয়া যাইও না বন্ধু, মায়া লাগাইয়া
ছাড়িয়া যাইও না বন্ধু, মায়া লাগাইয়া।

মিছা সুখে না হাসাইও, দুঃখ দিয়া বুক ভাসাইও
যাইও না গো মনভোলারে থইয়া
মিছা সুখে না হাসাইও, দুঃখ দিয়া বুক ভাসাইও
যাইও না গো মনভোলারে থইয়া
বেহায়ারে লাত্থি মাইরা দিস না ভাগাইয়া
ও তোর বেহায়ারে লাত্থি মাইরা দিস না ভাগাইয়া
ও তোর বেহায়ারে লাত্থি মাইরা দিস না ভাগাইয়া
ছাড়িয়া যাইও না বন্ধু, মায়া লাগাইয়া
ছাড়িয়া যাইও না বন্ধু, মায়া লাগাইয়া।

কত ধনী–গুণী–মানী, করতে পারো পাগলিনী
মরছি তোমার প্রেমে পাগল হইয়া
কত ধনী–গুণী–মানী, করতে পারো পাগলিনী
মরছি তোমার প্রেমে পাগল হইয়া
প্রেমভাবে পাগল হাসানের ভাব জাগাইয়া
এগো, প্রেমভাবে পাগল হাসানের ভাব জাগাইয়া
প্রেমভাবে পাগল হাসানের ভাব জাগাইয়া
ছাড়িয়া যাইও না গো বন্ধু মায়া লাগাইয়া
তুমি ছাড়িয়া যাইও না বন্ধু, মায়া লাগাইয়া
জীবনখাতায় প্রেমকলঙ্কের দাগ দাগাইয়া
ছাড়িয়া যাইও না বন্ধু, মায়া লাগাইয়া
এগো, ছাড়িয়া যাইও না বন্ধু, মায়া লাগাইয়া
এগো, ছাড়িয়া যাইও না বন্ধু, মায়া লাগাইয়া
ছাড়িয়া যাইও না বন্ধু, মায়া লাগাইয়া
ছাড়িয়া যাইও না গো বন্ধু মায়া লাগাইয়া।’

পরবর্তীকালে নিয়মিত বিরতিতে পাগল হাসানের গানের জনপ্রিয়তা বাড়তেই থাকে। একে একে তাঁর অনেক গানই তখন শ্রোতাদের বুঁদ করে রাখে। যদিও পাগল বলতেন, ‘আমি এক নগণ্য জন, অজ্ঞ জন। আমার আসলে কোনো সম্বল নাই। আমি নিজে প্রচারবিমুখ, এটা বলব না। তাই বলে প্রচারের জন্য হামাগুড়ি দিয়ে লুটোপুটো খেতে হবে, তা-ও না। এসব পছন্দও করি না।’

আসলে পাগল হাসান প্রচার চাননি। কিন্তু কর্মই তাঁকে আলো থেকে ক্রমাগত আরও আলোয় নিয়ে এসেছে।

আলোর পথে পাগল হাসানের চলার শুরুটা কিন্তু মনে রাখার মতো। শৈশবে তিনি একবার সপরিবার নানাবাড়িতে গিয়েছিলেন। সেখানে ‘ফিতার টেপে’ (টেপ রেকর্ডার) শোনেন সে সময়কার হিট গান: ‘বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়েছে...’

গান শুনে অনেকটাই মুখস্থ করে নেন হাসান। বাবা ছিলেন ঘুমে। তাঁকে জাগিয়ে তোলেন। এরপর বলেন, ‘আমি একটা গান শিখছি।’

‘শুনাও দেখি’, বলেন হাসানের আব্বা।

পাগল হাসান গাইতে শুরু করেন, ‘বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়েছে...’

গান শুরু করতেই হাসানের গালে তাঁর আব্বা কষে চড় বসান। গালে আব্বার পাঁচ আঙুলের দাগ। রাগী কণ্ঠে হাসানের বাবা বলেন, ‘ইতা কী গান? গাইবায় দেশের গান, দশের গান। গাইবায়, “এই পদ্মা, এই মেঘনা/ এই যমুনা-সুরমা নদী তটে,/ আমার রাখাল মন, গান গেয়ে যায়/ এ আমার দেশ, এ আমার প্রেম/ আনন্দ-বেদনায়, মিলন-বিরহ সংকটে...” এমন গান গাইবায়।’

পরে যখন হাসান শিল্পী হিসেবে জীবনযাত্রা শুরু করেন, তখন বাবার ওই উপদেশ ভোলেননি। প্রায়ই দেশের গান গাইতেন, মানবপ্রেমের গান গাইতেন। বিরহ-বিচ্ছেদের গানের পাশাপাশি সম্প্রীতি আর ভালোবাসার গানও তাঁর কণ্ঠে নিয়মিত উচ্চারিত হতো।

প্রেমের যে গান পাগল হাসান গাইতেন, তা মানুষের জীবনের সঙ্গে এত বেশি মিলে যেত, যে কারণে তাঁর গানগুলো ফেসবুক, ইউটিউবে দ্রুতই ভাইরাল হয়ে পড়ত। আর নিজ জীবনের যাবতীয় অভিজ্ঞতার নির্যাস তিনি ঢেলে দিতেন তাঁর গানের শরীরে। অবশ্য এ তথ্য উপস্থাপন করলে এ প্রশ্ন আসাও স্বাভাবিক, কেমন ছিল তাঁর প্রেমের অভিজ্ঞতা? কেমন ছিল তাঁর বিচ্ছেদ-অনুভূতি?

জীবনে একটা সময় বেশি বেশি প্রেমে পড়তেন পাগল হাসান; নারীর প্রেমে, মানুষের প্রেমে। একাধিক নারীকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছেন, পেয়েছেনও। প্রথম যখন প্রেমে পড়েন, তা জানানোর আগেই সেই তরুণীর বিয়ে হয়ে যায়। আত্মযন্ত্রণায় ভুগতে থাকা হাসান সে প্রেমের কথা ওই তরুণীকে কোনো দিন বলতেই পারেননি। পরে দ্বিতীয়বার প্রেম তাঁর ওপরে পড়েছে। দুজন-দুজনকে ভালোও বাসেন। এ সময়েই প্রেমিকার বাবাকে গিয়ে সরাসরি অনেকটা হুমকির স্বরেই বলেন হাসান, ‘পুরি (মেয়ে) বিয়া দিতে অইলে আমার কাছেই দিতে অইব।’

এমন হুমকি দেওয়ার কিছুদিন পর হাসান ঢাকায় যান। এই ফাঁকে প্রেমিকার বাবা তাঁর মেয়েকে জোর করে আরেক জায়গায় বিয়ে দিয়ে দেন। হাসান এলাকায় ফিরে এ কথা জানতে পারেন। তখন আর তাঁর কিছুই করার থাকে না। একবুক বিরহযন্ত্রণায় তিনি সময় কাটাতে শুরু করেন। পরে সংসারে নানা টানাপোড়েন সামলাতে গিয়ে তাঁর আর সে অর্থে প্রেমে পড়া হয়ে ওঠেনি। পরে অবশ্য আরও কয়েক দফা তাঁর জীবনে প্রেম এসেছে। তবে স্ত্রী, সন্তান আর সংসারের প্রেমেই তখন তিনি পুরোপুরি মশগুল ছিলেন। তখন নীরবতাই পালন করতেন বেশি। কারণ, তিনি বুঝে গিয়েছিলেন যে নীরবতাই জীবনপথের মূল সাধনা।

গানের প্রসঙ্গ যখন এলই, তখন হাসানের আরও কিছু জনপ্রিয় গানের কথা বলে নেওয়া যেতে পারে। যেমন: ‘দুই দিনের সংসারী’, ‘কইরো ঘৃণা, যায়-আসে না’, ‘কার আসমানে উড়ো রে আমার মনপিঞ্জিরার পাখি’, ‘আমার বাড়ি রইল নিমন্ত্রণ’, ‘জীবন আমার রেলগাড়ির ইঞ্জিন’, ‘মন আমার মরা নদী’, ‘কুপির তেল, কুপির তেল ফুরাইয়া গেলে জ্বলবে না আর বাত্তি’, ‘ও পাখি রে, কে দিল রে তোর পায়ে শিকল’, ‘তোরে গলার মাদুলি বানাইমু...’

এই প্রেমে পড়া, না পড়া আর নীরবতাই ছিল পাগল হাসানের যাবতীয় গান লেখার মূল ভিত্তি। জীবন তাঁকে এতটাই শিখিয়েছে, এতটাই অভিজ্ঞ করেছে, যে কারণে যে গানই তিনি রচনা করেছেন, তা–ই হয়েছে নন্দিত। প্রাসঙ্গিক হয়, একটা গানের উদাহরণ টানলে:
‘আরে ও বন্ধু রে...
দূর আকাশে চান্দের পাশে ঝলমল করে তারা
আমার কেউ আর নাই রে বন্ধু, কেবল তুমি ছাড়া, তুমি-ই
দাগা দিবায় চাইও রে বন্ধু, দাগা দিবায় চাইও
অন্তরে অন্তর মিশাইয়া পিরিতের গান গাইও।

আসমানে যাইও না রে বন্ধু, ধরতে পারব না, তোমায়
পাতালে যাইও না রে বন্ধু, ছুঁইতে পারব না, তোমায়
আসমানে যাইও না রে বন্ধু, ধরতে পারব না, তোমায়
পাতালে যাইও না রে বন্ধু, ছুঁইতে পারব না, তোমায়
বুকের ভিতর রইও রে বন্ধু, বুকের ভিতর রইও
অন্তরে অন্তর মিশাইয়া পিরিতের গান গাইও
তুমি বুকের ভিতর রইও রে বন্ধু, বুকের ভিতর রইও
অন্তরে অন্তর মিশাইয়া পিরিতের গান গাইও।

আরে ও বন্ধু রে
সতী নারীর পতি যেমন পর্বতেরই চূড়া
অসৎ নারীর পতি তেমন ভাঙা নায়ের গোড়া
আরে ও বন্ধু রে
সতী নারীর পতি যেমন পর্বতেরই চূড়া
অসৎ নারীর পতি তেমন ভাঙা নায়ের গোড়া
তুমি নায়ের গলুই হইও রে বন্ধু, নায়ের গলুই হইও
অন্তরে অন্তর মিশাইয়া পিরিতের গান গাইও, তুমি
বুকের ভিতর রইও রে বন্ধু, বুকের ভিতর রইও
অন্তরে অন্তর মিশাইয়া পিরিতের গান গাইও, তুমি।

আরে ও বন্ধু রে
একজনমে ভালো যদি পিরিতের বন্ধন
সাকুল্যে পাগল হাসানে সার হইব কান্দন।

আরে ও বন্ধু রে
এক জনমে ভালো যদি পিরিতের বন্ধন
সাকুল্যে পাগল হাসানে সার হইব কান্দন।
তুমি দাগা দিবায় চাইও রে বন্ধু, দাগা দিবায় চাইও
অন্তরে অন্তর মিশাইয়া পিরিতের গান গাইও, তুমি
বুকের ভিতর রইও রে বন্ধু, বুকের ভিতর রইও
অন্তরে অন্তর মিশাইয়া পিরিতের গান গাইও, তুমি
আসমানে যাইও না রে বন্ধু, ধরতে পারব না, তোমায়
পাতালে যাইও না রে বন্ধু, ছুঁইতে পারব না, তোমায়
আসমানে যাইও না রে বন্ধু, ধরতে পারব না, তোমায়
পাতালে যাইও না রে বন্ধু, ছুঁইতে পারব না, তোমায়
বুকের ভিতর রইও রে বন্ধু, বুকের ভিতর রইও
অন্তরে অন্তর মিশাইয়া পিরিতের গান গাইও, তুমি
বুকের ভিতর রইও রে বন্ধু, বুকের ভিতর রইও
অন্তরে অন্তর মিশাইয়া পিরিতের গান গাইও, তুমি।’
এ গানের সুরকার এস এ সুমন। আর মূল শিল্পী ছিলেন শায়লা। শিল্পী কিশোর পলাশের মাধ্যমে শায়লার সঙ্গে পাগল হাসানের পরিচয় ঘটে। পরে অবশ্য পাগল হাসানের কণ্ঠে গানটি অনন্যতা পায়।

গানের প্রসঙ্গ যখন এলই, তখন হাসানের আরও কিছু জনপ্রিয় গানের কথা বলে নেওয়া যেতে পারে। যেমন: ‘দুই দিনের সংসারী’, ‘কইরো ঘৃণা, যায়-আসে না’, ‘কার আসমানে উড়ো রে আমার মনপিঞ্জিরার পাখি’, ‘আমার বাড়ি রইল নিমন্ত্রণ’, ‘জীবন আমার রেলগাড়ির ইঞ্জিন’, ‘মন আমার মরা নদী’, ‘কুপির তেল, কুপির তেল ফুরাইয়া গেলে জ্বলবে না আর বাত্তি’, ‘ও পাখি রে, কে দিল রে তোর পায়ে শিকল’, ‘তোরে গলার মাদুলি বানাইমু...’

ওহ, কত জ্বালা লইয়া পাগল মন মজাইলা সুরেমাথা ঝুলে হেলেদুলে পুড়ছে হৃদয়পুরে রে মানুষ, পুড়ছে হৃদয়পুরে।ওহ, কত জ্বালা লইয়া পাগল মন মজাইলা সুরেমাথা ঝুলে হেলেদুলে পুড়ছে হৃদয়পুরে রে মানুষ, পুড়ছে হৃদয়পুরে।গেলে পাগল আর কি ফিরে, পরে কান্দে হায় রে হায়গেলে পাগল আর কি ফিরে, পরে কান্দে হায় রে হায়ও মানুষ, মইরা গেলে কদর বাইড়া যায়।

আরও একটা গানের কথা উল্লেখ করা উচিত। বিশেষত হাসানের মৃত্যুর পর গানটি মানুষের মুখে মুখে চাউর হয়। যদিও হাসান রচিত ও সুরারোপিত এ গান তাঁর জীবদ্দশায়ই অনেক শিল্পী গেয়েছেন। ভালো প্রচারও পেয়েছে গানটি। যদিও তাঁর মৃত্যুর পর এ গান অন্য আবেদন পায় শ্রোতাদের কাছে। গানটির মূল শিল্পী ছিলেন আসিফ আকবর। তবে এ গানের দুটি পাঠ পাওয়া যায়। একটি পাঠ এমন:
‘বাঁইচা থাকতে নিকৃষ্ট কয়
মরলে শ্রেষ্ঠ পদক পায়।
ও মানুষ, মইরা গেলে কদর বাইড়া যায়।
ও মানুষ, মইরা গেলে কদর বাইড়া যায়।
বাঁইচা থাকতে নিকৃষ্ট কয়
মরলে শ্রেষ্ঠ পদক পায়।
বাঁইচা থাকতে নিকৃষ্ট কয়
মরলে শ্রেষ্ঠ পদক পায়।
ও মানুষ, মইরা গেলে কদর বাইড়া যায়।
ও মানুষ, মইরা গেলে কদর বাইড়া যায়।

ও, যেদিন হইতে এই ভুবনের দিয়া গেল ইতি
কী কইছিল কী চাইছিল, চারণ করবে স্মৃতি রে মানুষ, চারণ করে স্মৃতি
ও, যেদিন হইতে এই ভুবনের দিয়া গেল ইতি।

কী কইছিল কী চাইছিল, চারণ করবে স্মৃতি রে মানুষ, চারণ করে স্মৃতি
গুণকীর্তন আর স্বজনপ্রীতি, গুণকীর্তন আর স্বজনপ্রীতি, দুশমনেও কষ্ট পায়
ও মানুষ, মইরা গেলে কদর বাইড়া যায়।
ও মানুষ, মইরা গেলে কদর বাইড়া যায়।

ও, যেদিন হইতে এই ভুবনের দিয়া গেল ইতি
কী কইছিল কী চাইছিল, চারণ করবে স্মৃতি রে মানুষ, চারণ করে স্মৃতি
ও, যেদিন হইতে এই ভুবনের দিয়া গেল ইতি
কী কইছিল কী চাইছিল, চারণ করবে স্মৃতি রে মানুষ, চারণ করে স্মৃতি
গুণকীর্তন আর স্বজনপ্রীতি, গুণকীর্তন আর স্বজনপ্রীতি, দুষমনেও কষ্ট পায়
ও মানুষ, মইরা গেলে কদর বাইড়া যায়।
ও মানুষ, মইরা গেলে কদর বাইড়া যায়।
ও মানুষ, মইরা গেলে কদর বাইড়া যায়।
ও মানুষ, মইরা গেলে কদর বাইড়া যায়।’

আরেকটি পাঠ এ রকম:
‘মানুষ মইরা গেলে কদর বাইড়া যায়
ও মানুষ, মইরা গেলে কদর বাইড়া যায়।
বাঁইচা থাকতে নিকৃষ্ট কয়
মরলে শ্রেষ্ঠ পদক পায়।
ভবে বাঁইচা থাকতে নিকৃষ্ট কয়
মরলে শ্রেষ্ঠ পদক পায়
ও মানুষ, মইরা গেলে কদর বাইড়া যায়।

ওহ, কত জ্বালা লইয়া পাগল মন মজাইলা সুরে
মাথা ঝুলে হেলেদুলে পুড়ছে হৃদয়পুরে রে মানুষ, পুড়ছে হৃদয়পুরে।
ওহ, কত জ্বালা লইয়া পাগল মন মজাইলা সুরে
মাথা ঝুলে হেলেদুলে পুড়ছে হৃদয়পুরে রে মানুষ, পুড়ছে হৃদয়পুরে।
গেলে পাগল আর কি ফিরে, পরে কান্দে হায় রে হায়
গেলে পাগল আর কি ফিরে, পরে কান্দে হায় রে হায়
ও মানুষ, মইরা গেলে কদর বাইড়া যায়।

যেদিন হইতে এই ভুবনের দিয়া যায় গো ইতি
কী কইছিল কী চাইছিল, চারণ করে স্মৃতি রে মানুষ, চারণ করে স্মৃতি।
ওহ, যেদিন হইতে এই ভুবনের দিয়া যায় গো ইতি
জ্ঞাতি, গোষ্ঠী, ভাই, বান্ধবে চারণ করে স্মৃতি রে মানুষ, চারণ করে স্মৃতি।
গুণকীর্তন আর স্বজনপ্রীতি, দুশমনেও কষ্ট পায়
গুণকীর্তন আর স্বজনপ্রীতি, দুশমনেও কষ্ট পায়
মানুষ মইরা গেলে কদর বাইড়া যায়।

জাতপাতে নাই কত চান্দের প্রাসাদসম বাড়ি
ঠেকছে পাগল ভবসাগরে লইয়া ভাঙা তরি রে মানুষ, লইয়া ভাঙা তরি।
ও জাতপাতে নাই কত চান্দের প্রাসাদসম বাড়ি
ঠেকছে পাগল ভবসাগরে লইয়া ভাঙা তরি রে মানুষ, লইয়া ভাঙা তরি।
দয়াল চান হয় যার কান্ডারি, ভয় কী তার নিদানবেলায়
দয়াল চান হয় যার কান্ডারি, ভয় কী তার নিদানবেলায়
ও মানুষ, মইরা গেলে কদর বাইড়া যায়।

ও, বুক জুড়াইলাম দধি খইয়া, মুখ পুড়াইলাম চুনে
কলুর বলদ মইরা গেলে তারেও ভাসায় গুণে রে মানুষ, তারেও ভাসায় গুণে
ও, বুক জুড়াইলাম দধি খইয়া, মুখ পুড়াইলাম চুনে
কলুর বলদ মইরা গেলে তারেও ভাসায় গুণে রে মানুষ, তারেও ভাসায় গুণে
ভেবে কয় পাগল হাসানে, দেখছি আল্লার দুনিয়ায়
ভেবে কয় পাগল হাসানে, দেখছি আল্লার দুনিয়ায়
ও মানুষ, মইরা গেলে কদর বাইড়া যায়।
মানুষ মইরা গেলে কদর বাইড়া যায়।
বাঁইচা থাকতে নিকৃষ্ট কয়
মরলে শ্রেষ্ঠ পদক পায়।
ভবে বাঁইচা থাকতে নিকৃষ্ট কয়
মরলে শ্রেষ্ঠ পদক পায়।
ও মানুষ, মইরা গেলে কদর বাইড়া যায়।
মানুষ মইরা গেলে কদর বাইড়া যায়
ও মানুষ, মইরা গেলে কদর বাইড়া যায়।
ও মানুষ, মইরা গেলে কদর বাইড়া যায়।’

যেসব বাচ্চার সঙ্গে পাগল ঝগড়া করতেন, সেসব বাচ্চার অভিভাবকদের পাগলের মা আক্ষেপ করে বলতেন, ‘কিতা করবায় রে, বা! ইগু আমার পাগল রে, বা! বাদ দিলাও।’ ওই যে ছোটবেলায়ই হাসানকে মা অন্যদের কাছে ‘পাগল’ অভিধায় পরিচয় দিতেন, সেটা পরবর্তী সময়ে নিজের নামের সঙ্গেই যুক্ত করে নেন হাসান। একই সঙ্গে গানের ভনিতায়ও ঠাঁই নেয় ‘পাগল হাসান...’

শাহ আবদুল করিমকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করতেন পাগল হাসান। তাঁর গানের ভক্তও ছিলেন তিনি। সেই শাহ করিমের প্রয়াণের পর পাগল হাসান লিখেছিলেন এ গান। পরে গানটি তাঁর নিজ জীবনের সঙ্গেই অনেকটা প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। হয়তো আরও আরও গুণীর জন্যও এ গান প্রাসঙ্গিক।

এ তো গেল পাগল হাসানের গান নিয়ে অল্পবিস্তর শ্রবণ-অভিজ্ঞতার কথা। এর বাইরে নামের সঙ্গে ‘পাগল’ অভিধা যুক্ত হওয়ার একটা মজাদার তথ্য জানা যায় তাঁর এক সাক্ষাৎকারে। এটা এমন; শৈশবেই বাবাকে হারিয়েছেন পাগল হাসান। নিয়ম-শাসনের বালাইও তাই তেমন নেই। ফলে ছোটবেলায় সারা দিন ঝগড়া-বিবাদ করে বেড়াতেন। বাড়িতে মা আমিনা বেগমের কাছে তাঁকে নিয়ে সব সময়ই বিচার আসত। এ কারণে নিয়মিত মায়ের পিটুনিও খেতেন। যেসব বাচ্চার সঙ্গে পাগল ঝগড়া করতেন, সেসব বাচ্চার অভিভাবকদের পাগলের মা আক্ষেপ করে বলতেন, ‘কিতা করবায় রে, বা! ইগু আমার পাগল রে, বা! বাদ দিলাও।’

ওই যে ছোটবেলায়ই হাসানকে মা অন্যদের কাছে ‘পাগল’ অভিধায় পরিচয় দিতেন, সেটা পরবর্তী সময়ে নিজের নামের সঙ্গেই যুক্ত করে নেন হাসান। একই সঙ্গে গানের ভনিতায়ও ঠাঁই নেয় ‘পাগল হাসান...’

পাগল হাসানের লেখা গান যখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে, সে সময় তাঁর নামের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। কিন্তু ঘনিষ্ঠতা হয়নি।

মৃত্যুর কয়েক বছর আগে, সুনির্দিষ্ট করে বললে, ২০২১ সালে প্রথমবারের মতো পাগল হাসানের সঙ্গে টেলিকনফারেন্সে আলাপ হয়। সুনামগঞ্জে জন্ম নেওয়া কবি-অধ্যাপক সাব্রী সাবেরীনের বদৌলতে ‘সুরে-কথায় সুনামগঞ্জ’ শিরোনামের এক ফেসবুক গ্রুপে একই সঙ্গে সংযুক্ত থাকার সুবাদে হাসানের সঙ্গে সেবার যোগাযোগ ঘটে। এ গ্রুপে সংযুক্ত সুনামগঞ্জের বেশ কয়েকজন কবি-গীতিকার তখন একাধিক টেলিকনফারেন্সে সুনামগঞ্জের গীতিকবিদের নিয়ে সম্মিলিতভাবে কিছু উদ্যোগের পরিকল্পনা নেন। যদিও পরে আর সেসব বাস্তবায়িত হয়নি। মূলত এ সূত্র ধরেই পাগল হাসানের সঙ্গে চেনাজানা।

চেনাজানার পর হাসানের সঙ্গে এক-দুবার গানের মজমায় স্বল্প সময়ের দেখা, হাত-চোখের ইশারায় কুশলবিনিময় আর এক-আধবার মুঠোফোনে আলাপও হয়েছে। সময় নিয়ে একদিন তাঁর সঙ্গে বসব, তাঁর গান আর জীবনের গল্প শুনব, মনে–মনে এমন পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু কালবৈশাখী ঝড়ের মতোই হঠাৎ আসে তাঁর মৃত্যুর খবর।

হুট করেই পাগল হাসানের আবির্ভাব! হুট করেই মৃত্যু। মাঝখানে কিছুটা সময়! একেবারেই স্বল্পসময়ের পরিভ্রমণ তাঁর। মাত্র ৩৯ বছর। স্বল্পসময়ই তো!

২০২৪ সালের ১৮ এপ্রিল, সকাল ছয়টা। পাশের দোয়ারাবাজার উপজেলায় রাতভর গান গেয়ে বাড়িতে ফেরার পথে ছাতকের সুরমা সেতু এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় পাগল হাসানের অকালমৃত্যু হয়।

রক্তজবা ফুলের মতোই অল্প আয়ু নিয়ে যেন জন্মেছিলেন পাগল! ভুল বললাম কি? নাকি স্বল্পজীবনে নক্ষত্রে পরিণত হওয়া এক শিল্পী-গীতিকার খসে পড়লেন বাংলার বাউল-আকাশ থেকে?

হাসানের মৃত্যুর পর কেউ কেউ এ-ও বলেছেন, বেঁচে থাকলে জনপ্রিয়তায় শাহ আবদুল করিমকেও ডিঙিয়ে যেতেন পাগল হাসান।

এটা কি আবেগের বয়ান? বাড়াবাড়ি মন্তব্য? নাকি যথাযথই?

হিসাব মেলাতে পারি না। অবশ্য সব হিসাব সব সময় মেলাতেও নেই!

তথ্যঋণ
১. ‘শিল্পী পাগল হাসানের ইন্টারভিউ’, সাক্ষাৎকার গ্রহীতা: এম এস খালেদ, ৮ জুন ২০২১, ‘সিলেট তথ্যানুসন্ধান’;
২. পাগল হাসানের সাক্ষাৎকার, সাক্ষাৎকার গ্রহীতা: রাসেল হামিদ, ‘কাট্টুশ আলী শো’, এপিসোড ২, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ‘বিঅনটিভি ইউকে’;
৩. ‘বহু গান জনপ্রিয় হলেও অভাবের সংসার গায়ক পাগল হাসানের’, তথ্য-ছবি: হোসাইন আহমদ সুজাদ, রিপোর্ট: মৌসুমী রহমান, ১৪ অক্টোবর ২০২১, ‘আরটিভি’;
৪. দেবদাস চৌধুরী, সংগীতশিল্পী ও প্রশিক্ষক, ২০২৬।

Read full story at source