মেসির হ্যাটট্রিকে আরও উজ্জ্বল হলো চতুর্থ শিরোপার স্বপ্ন
· Prothom Alo
কখনো কেম্পেসের উচ্ছ্বাস, কখনো ম্যারাডোনার জাদু, কখনোবা মেসির দীর্ঘ অপেক্ষার শেষে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপযাত্রা শুধু ফুটবলের গল্প নয়; বরং কয়েক প্রজন্মের আবেগের ইতিহাস। তিনবার বিশ্বকাপ জেতা দলটি গত কয়েক বছরে নিজেদের আবারও বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ বিশ্বকাপ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকা জয়ের পর এবার তাদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ—শিরোপা ধরে রাখা এবং বিশ্বকাপ ইতিহাসে যোগ করা নতুন এক অধ্যায়। সেই লক্ষ্য নিয়েই আকাশি-সাদা জার্সিধারীরা জয় দিয়ে শুরু করেছে তাদের চতুর্থ বিশ্বকাপ ঘরে তোলার মিশন।
Visit somethingsdifferent.biz for more information.
আর্জেন্টিনা কি পারবে ২০২৬ বিশ্বকাপ জিতে চতুর্থ তারকা যোগ করতে
আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ইতিহাস যে খুব বেশি বড় তা নয়। তবু বিশ্বকাপ এলেই আর্জেন্টিনা থেকে যায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ১৯৭৮ সালে প্রথম বিশ্বকাপ জয়, ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার হাত ধরে দ্বিতীয় শিরোপা। এরপর দীর্ঘ অপেক্ষা। মাঝে ১৯৯০ ও ২০১৪ সালে ফাইনালে উঠেও শিরোপা ধরা দেয়নি। বিশেষ করে ২০১৪ সালের হার যেন একটা প্রজন্মের বুকের ভেতর জমে থাকা আফসোস হয়ে ছিল। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে ২০২২ সালে।
কাতার বিশ্বকাপের গল্প এখন ফুটবল ইতিহাসের অংশ
সৌদি আরবের বিপক্ষে অপ্রত্যাশিত হার দিয়ে শুরু। সমালোচনা, হতাশা, শঙ্কা—সবকিছু ঘিরে ধরে দলকে। এরপরই দেখা যায় এক ভিন্ন আর্জেন্টিনাকে। মেক্সিকোর বিপক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো, পোল্যান্ডের বিপক্ষে নিয়ন্ত্রণ, নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে স্নায়ুর পরীক্ষা, ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে আধিপত্য এবং সবশেষে ফ্রান্সের সঙ্গে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ফাইনাল। সেই ফাইনালে মেসি ছিলেন নায়ক; কিন্তু আর্জেন্টিনার জয়টা ছিল পুরো দলের। দিবু মার্তিনেজের সেভ, এনজোর পরিণত খেলা, ম্যাক অ্যালিস্টারের ছন্দ, আলভারেজের গতি—সব মিলিয়ে জন্ম নেয় নতুন এক চ্যাম্পিয়ন দল।
আলবিসেলেস্তেদের গল্প ২০২২–এ শেষ হয়নি
২০২৪ সালে আবারও কোপা আমেরিকা জিতে তারা নিজেদের সাফল্যের ধারাবাহিকতাকে আরও শক্ত ভিত্তি দেয়। এর আগে ২০২২ সালে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে হারিয়ে জিতেছিল ফিনালিসিমা। এরপর কলম্বিয়াকে হারিয়ে রেকর্ড ১৬তম কোপা আমেরিকা জয়ের মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজেদের আন্তর্জাতিক আধিপত্য আরও দৃঢ় করে। ২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ ফিনালিসিমা, ২০২২ বিশ্বকাপ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকা টানা বড় আসরগুলোতে সাফল্য আন্তর্জাতিক ফুটবলে দলটিকে দিয়েছে আলাদা উচ্চতা।
আধুনিক আন্তর্জাতিক ফুটবলে এমন ধারাবাহিকতা খুব কম দলই দেখাতে পেরেছে। টানা কয়েকটি আন্তর্জাতিক আসরে সাফল্যের পর এবার বিশ্বকাপে শিরোপাধারী হিসেবেই যাত্রা শুরু করেছে আর্জেন্টিনা। সেই শুরুটা হয়েছে এমনভাবে, যা নতুন করে আবারও আলোচনায় নিয়ে এসেছে আলবিসেলেস্তেদের।
এবারও বিশ্বকাপ জিতলে ইতিহাসের কোথায় থাকবেন মেসিহ্যাটট্রিক করায় স্বাভাবিকভাবে ম্যাচসেরার পুরস্কারও জিতেছেন মেসিনতুন করে ইতিহাস লেখার পথচলা
আলজেরিয়ার বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ম্যাচে ৩–০ গোলের জয় দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেছে আর্জেন্টিনা। ম্যাচটির সবচেয়ে বড় তারকা লিওনেল মেসি। তিনি হ্যাটট্রিক করেন, যেটি ছিল তাঁর পুরো বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের প্রথম হ্যাটট্রিক। শুধু তা–ই নয়, এই তিন গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে তাঁর মোট গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬–তে, যা তাঁকে যৌথভাবে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতায় পরিণত করেছে। স্পর্শ করেছেন জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার দীর্ঘদিনের রেকর্ড।
এই ম্যাচটি মেসির জন্য আরও কয়েকটি কারণে বিশেষ। এটি ছিল জাতীয় দলের হয়ে তাঁর ২০০তম ম্যাচ এবং বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে ষষ্ঠবার বিশ্বকাপ খেলার রেকর্ডও গড়েছেন তিনি। প্রায় ৩৯ বছর বয়সে এসেও বড় মঞ্চে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ক্ষমতা যে এখনো হারিয়ে যায়নি, সেটার বড় প্রমাণ ছিল এই ম্যাচ।
তবে জয়টা শুধু মেসির ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের গল্প নয়। পুরো দল হিসেবেও আর্জেন্টিনা ছিল বেশ সংগঠিত। মাঝমাঠে এনজো ফার্নান্দেজ বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার পাশাপাশি আক্রমণ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার আক্রমণভাগের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করেন এবং রদ্রিগো দি পল তাঁর পরিচিত কর্মক্ষমতা দিয়ে ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণে রাখেন। আক্রমণে হুলিয়ান আলভারেজ সরাসরি গোল না পেলেও অফ–দ্য–বল মুভমেন্ট ও জায়গা তৈরির মাধ্যমে দলের আক্রমণকে আরও কার্যকর করেন। নতুনদের মধ্যেও নজর কেড়েছেন থিয়াগো আলমাদা। সুযোগ পেয়ে তিনি আক্রমণে গতি, পজিশন বদল এবং বল নিয়ে আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতির ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ম্যাচের ৮০ মিনিটের সময় মেসিকে তুলে নিকো পাজকে নামান স্কালোনিস্কালোনির দলে তরুণদের ধীরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় আনার যে পরিকল্পনা, এই ম্যাচে তারও কিছুটা প্রতিফলন দেখা গেছে। ফলে এই জয় শুধু ৩ পয়েন্ট নয়, শিরোপা ধরে রাখার পথে আত্মবিশ্বাসী শুরুর বার্তাও হয়ে থাকতে পারে আর্জেন্টিনার জন্য।
শেষবার কোনো দল বিশ্বকাপ শিরোপা ধরে রাখতে পেরেছিল ১৯৬২ সালে, যখন ব্রাজিল টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। সেই হিসাবে ইতিহাস এবার আর্জেন্টিনার পক্ষেও নয়। এর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আছে স্পেন, ফ্রান্স, ব্রাজিল ও ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দল। তাই শিরোপা ধরে রাখার পথ মোটেও সহজ হবে না। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করেছে আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেও আত্মবিশ্বাসী শুরু করেছে দলটি। অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সঙ্গে নতুন মুখদের উপস্থিতি এবং কয়েক বছরের গড়ে ওঠা দলীয় সমন্বয় তাদের আবারও আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছে।
আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের পরের পথচলায় নিজেদের এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারে কি না, তা–ই এখন দেখার বিষয়। পারলে চতুর্থ বিশ্বকাপের স্বপ্নটা বাস্তবও হয়ে উঠতে পারে।
বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা