ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ২০ হাজারে মীমাংসার চেষ্টা, ওলামা দল নেতার সালিস, পরে সংঘর্ষ
· Prothom Alo

শত শত মানুষের উৎসুক চোখ। অনেকে ভিডিও করছেন। সালিসে আপসরফার চেষ্টা হচ্ছে একটি শিশুর ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা। সেখানে সাক্ষ্য নেওয়া হয় আট বছর বয়সী ভুক্তভোগী শিশুরও। জানতে চাওয়া হয় ঘটনার বর্ণনা। এরপর অভিযুক্তের কাছেও জানতে চাওয়া হয় ঘটনা। প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে স্বীকার করেন। পা জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চান সালিসদারের। এরই মধ্যে বিচার নিয়ে সংঘর্ষ বেধে যায়। পণ্ড হয় সালিস।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এমন একটি ভিডিও এখন ঘুরপাক খাচ্ছে। ভিডিওটি গত মঙ্গলবার সন্ধ্যার। বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার একটি ইউনিয়নের। সামাজিক মাধ্যম ও স্থানীয় লোকজনের ফোনে ফোনে থাকা এ ভিডিওর সঙ্গে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী লোকজনের বর্ণনা মিলে যায়। সেখানে সালিস পরিচালনা করেন জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্য ও জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মানফুজুর রহমান। প্রকাশ্যে শত শত মানুষের মধ্যে শিশুটির কাছে ঘটনার বর্ণনা শুনতে চান তিনি।
Visit newssport.cv for more information.
চকলেটের প্রলোভনে ধর্ষণচেষ্টা
ভুক্তভোগীর পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত শনিবার মাদ্রাসার টিফিনের বিরতিতে পাশের একটি দোকানে খাবার কিনতে গিয়েছিল শিশুটি। তখন দোকানদার হাকিম সরদার তাকে কৌশলে চকলেট খুলে দেওয়ার কথা বলে দোকানের ভেতরে নিয়ে যান। শিশুটি দোকানিকে ‘দাদা’ বলে ডাকত। সেখানে কেউ না থাকার সুযোগে হাকিম সরদার শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। তবে এরই মধ্যে আরও দুটি শিশু দোকানে চলে আসায় শিশুটি রক্ষা পায়।
পরে বাড়িতে ফিরে শিশুটি তার মাকে সব খুলে বলে। এরপর তার মা তাৎক্ষণিকভাবে মাদ্রাসার বড় হুজুরকে ঘটনাটি জানান। সন্ধ্যায় তিনি তাঁদের বাড়িতে এসে ঘটনার বিস্তারিত শোনেন এবং ন্যায্য বিচার করার আশ্বাস দেন।
ঘটনা আপসের চেষ্টা
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, স্বজন ও প্রতিবেশীর মাধ্যমে ঘটনার খবর পান স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক সদস্য মো. আরিফ হুসাইন। তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। প্রস্তুতি নিচ্ছেন ইউপি নির্বাচনের। তিনি উপজেলা বিএনপির নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে স্থানীয় আরও কয়েকজনকে নিয়ে সালিসের মাধ্যমে আপস মীমাংসার চেষ্টা শুরু করেন। এ জন্য অভিযুক্তের কাছ থেকে জরিমানা হিসেবে টাকা নিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারকে দেওয়ার প্রস্তাবও দেন তিনি।
জানতে চাইলে আরিফ হুসাইন বলেন, ‘পরিবারটি মামলা করলে ১০ বছর ঘুরতে হবে। পরে ওই লোকের হয়তো ৫ বছর জেল হবে। কিন্তু তাতে কী কোনো লাভ হবে? আরও লোকজন জানবে, মেয়েটি বড় হচ্ছে—ওর বিয়েশাদি দিতে হবে। তাই ঝামেলা না করে এভাবে ফয়সালা করে ফেলাই ভালো। পরিবারটি আর্থিক সহযোগিতা পেল, ভবিষ্যতে সুবিধা-অসুবিধা দেখা যাবে।’
‘এখানে সব তাঁর নিয়ন্ত্রণে’
সরদার জাহিদ কচুয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি। স্থানীয়ভাবে গুঞ্জন আছে, সাবেক ইউপি সদস্য আরিফসহ কয়েকজনকে ঘটনাটি দেখার দায়িত্ব দেন তিনি। যদিও তিনি সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। জানতে চাইলে আরিফ হুসাইন বলেন, ‘এখানে সব তাঁর (জাহিদ) নিয়ন্ত্রণে। জাহিদ ভাই এখন শুধু উপজেলার সভাপতি না, তিনি বড় শিল্পপতি। তাঁর সাহায্য পায়নি এমন ঘর নেই।’
এ ঘটনায় রাজনীতি ঢুকে গেছে দাবি করে আরিফ বলেন, ‘এর মধ্যে শুধু শুধু আমাদের নেতা জাহিদ ভাইকে জড়ানো হচ্ছে। তিনি উপজেলা নির্বাচন করবেন। শত্রু-বিরোধীপক্ষ তো আছেই।’ সালিস বসানোর জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন তিনি। টাকা নিয়ে মীমাংসার বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি উত্তেজিত হন। তিনি বলেন, ‘আপনাদের কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তি লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়ে এখানে পাঠাইছে তাঁর (সরদার জাহিদ) বিরুদ্ধে লেখার জন্য। সাংবাদিক আমাদেরও আছে।’
যোগাযোগ করলে কচুয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি সরদার জাহিদ বলেন, সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। তাঁর নাম ব্যবহার করে কেউ কেউ সুবিধা নেওয়া চেষ্টা করেছেন। ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মব করার চেষ্টা করেছে এবং তাঁকে হেয়প্রতিপন্ন করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘ওই মাদ্রাসাটি আমরা পরিচালনা করি। একটি এতিমখানা ও মসজিদ আছে। এসব করে কি সামাজিকভাবে আমরা অপরাধ করেছি। এতে নিয়ন্ত্রণের কী আছে?’
কী হয়েছিল সালিসে
মঙ্গলবার সন্ধ্যার সালিসের খবর আগেই ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের গ্রামে। অনেকে পুলিশকেও জানান। ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় সালিস ডাকার বিষয়ে আগে ও সালিস শুরুর পর স্থানীয় লোকজন ছাড়াও বাগেরহাটের অন্তত তিনজন সাংবাদিক পুলিশকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু অজানা কারণে পুলিশ সালিস বন্ধের উদ্যোগ নেয়নি। এ নিয়ে তখন পুলিশের ভাষ্য ছিল, পরিবার অভিযোগ করেনি।
এদিকে সালিস দেখতে আশপাশের কয়েকটি গ্রামের শত শত মানুষ জড়ো হন। বৃহস্পতিবার কয়েকটি গ্রাম ঘুরে অন্তত ১০ জন নারী-পুরুষের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তাঁদের সবাই ঘটনা জানেন। অনেকে সালিসে উপস্থিতও ছিলেন। কিন্তু অজানা শঙ্কায় অধিকাংশই মুখ খুলতে চাননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুজন বলেন, তাঁরা মোবাইলে সালিসের বিষয়টি জানতে পেরে কী হয় দেখতে গিয়েছিলেন। এলাকার লোক ছাড়াও আশপাশের অনেকে গিয়েছিলেন। শুরুতে সেখানে সবাইকে ভিডিও করতে বাধা দেওয়া হয়। পরে কথোপকথনের এক পর্যায়ে ভিডিও করতে দেওয়া হয়।
শিশুটির সাক্ষ্য নেওয়ার পর যখন অভিযুক্ত হাকিম সরদারের সাক্ষ্য নেওয়া হচ্ছিল, তখন তাঁর ছেলে হাসিব সরদার বাধা দিতে আসেন। সালিসে মাতব্বরদের জেরার মুখে এক পর্যায়ে হাকিম সরদার অপরাধ স্বীকার করলে তাঁর ছেলেসহ এক পক্ষ উত্তেজিত হয়ে পড়েন। সালিস দেখতে আসা কয়েকজন তখন হাকিম সরদারকে জুতার মালা পরিয়ে দিতে বলেন। তখন তাঁদের লাঠি দিয়ে আঘাত করেন একদল লোক। এতে হট্টগোল বেধে যায়। পরে সালিস শেষ না করেই সবাই চলে যান। মারামারির শেষ দিকে পুলিশ এসে বাঁশি দিলে সবাই চলে যায়।
সালিসের ভিডিও মুছে ফেলতে হুমকি
এদিকে সালিস বৈঠক ও পরবর্তী সংঘর্ষের ঘটনা মুঠোফোনে ভিডিও করেন অনেকে। যাদের কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন সেই ভিডিও, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ভিডিও মুছে ফেলতে চাপ ও হুমকি পাওয়ার কথা বলেছেন কয়েকজন। হুমকি পেয়েছেন এমন তিনজনের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়েছে। তাঁদের কল করে ও বার্তা পাঠিয়ে ভিডিও মুছতে বলা হয়। কেউ কেউ মেসেঞ্জারে পাঠানো হুমকির বার্তা দেখান। এ ঘটনার পর ভয়ে মুখ খুলছেন না স্থানীয় লোকজন।
মাদ্রাসায় যাওয়া বন্ধ শিশুটির
ঘটনার পর থেকে শিশুটির মাদ্রাসায় যাওয়া বন্ধ আছে। ভয় ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ায় কারও সঙ্গে তেমন কথাও বলছে না সে। পরিবার বলছে, তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। নানাজন নানা কথা বলছেন। কী করবেন কিছু বুঝে উঠতে পারছেন না। পরিবারের এক সদস্য বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। কী করব, কোথায় যাব? মামলা করতে চাচ্ছি; কিন্তু কী করব বুঝতেছি না। আরিফ মেম্বারসহ কয়েকজন ২০ হাজার টাকা নিয়ে প্রতিনিয়ত মিটিয়ে ফেলার প্রস্তাব দিচ্ছে।’
শিশুটির মাদ্রাসার পরিচালক ইমরান হোসাইনও নিশ্চিত করছেন, গত শনিবারের পর থেকে ওই ছাত্রী আর মাদ্রাসায় আসেনি। সালিসের বিষয়টি তাঁদের জানা ছিল না।
ঘটনার পর অভিযুক্ত হাকিম সরদারের দোকানটি বন্ধ থাকলেও তিনি এলাকাতেই আছেন। দোকান খুলে দিতে তিনি সাবেক ইউপি সদস্য আরিফ হুসাইনকে বৃহস্পতিবারও অনুরোধ করেছেন। তবে চেষ্টা করেও হাকিম সরদারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সালিস পরিচালনা করা ওলামা দলের নেতা মানফুজুর রহমানের বাড়ি পাশের গ্রামে। মঙ্গলবারের সালিসের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি এলাকা ছেড়ে ঢাকায় চলে গেছেন। বৃহস্পতিবার বিকেলে তাঁকে কল করে সালিসের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি ‘পরে কথা বলি’ বলে ফোন কেটে দেন। এরপর একাধিকবার কল দিলেও আর সাড়া দেননি।
কী বলছে পুলিশ
কচুয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হারুন অর রাশিদ বলেন, এ ঘটনায় এখনো কোনো অভিযোগ দেয়নি পরিবার। পুলিশ তাঁদের থানায় মামলা করতে আসতে বলেছে। কিন্তু তাঁরা আসেননি। কেন আসছেন না, কোনো ভয় বা শঙ্কা আছে কি না—প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘ওদের আত্মীয়স্বজনের মধ্যে মনে হয় দোটানা ভাব আছে। মামলা করবে, কি করবে না। আমি তো ডেকে নিয়ে আসতে পারি না জোর করে।’
সালিসের বিষয়ে জানার পরও ঠেকানো গেল না কেন জানতে চাইলে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘সালিস কোথায়? এই বিষয়টা তো আমরা জানি না।’ পুলিশ গিয়ে সংঘর্ষ থামিয়েছে, শত শত মানুষ জড়ো হয়, সামাজিক মাধ্যমের ভিডিও তুলে ধরে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘ওসি স্যার হয়তো জানেন। তিনি তো আজ চলে গেছেন বদলি হয়ে।’ তিনি বলেন, এ ঘটনায় তো সালিস করার কোনো সুযোগ নেই।