আব্বু আমার শুকতারা
· Prothom Alo

বাবা দিবস এসে গেল। যা দেখি তাতেই মনে হয়, ইশ্ যদি আর একটিবার বলতে পারতাম ভালোবাসি। বাবাকে নিয়ে কত আয়োজন চারদিকে। তবে আমি জানি আব্বু, আপনি জানতেন আমি আপনাকে কত ভালোবাসি।
আব্বুর হার্ট অ্যাটাক হয় আমি যখন ছোট, স্কুলে পড়ি। তাঁর বয়স ৪১ হবে তখন। ডাক্তার চাচা বাসায় এসে চিকিৎসা দিলেন। বেশ কিছুদিন আব্বু বাসায় ছিলেন। ফুটবল খেলা আব্বু, পুলে সাঁতার করা আব্বু বাসায় ধীরে ধীরে সুস্থ হলেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া বা ওপেন হার্ট সার্জারি বহু বছর পরের কথা। মেডিক্যাল ম্যানেজমেন্ট করা হয়েছিল। সে সময়ে আম্মি চিন্তা করলেন সংসারের হাল ধরা উচিত আব্বুর সঙ্গে। তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দিলেন, পোস্টিং ফেনী মহিলা কলেজ। আম্মি চলে গেলেন।
Visit arroznegro.club for more information.
বাবা দিবসে বিশেষ লেখা
আমি আর আমার ভাই রয়ে গেলাম খুলনা। আব্বু মোটামুটি একা মানুষ করলেন স্কুল–কলেজের ওই সময়টা আমাদের। আম্মি চেষ্টা করতেন ছুটি হলেই খুলনা চলে আসতে; কিন্তু আমরা মোটামুটি আব্বুর সঙ্গেই ছিলাম। আম্মির পোস্টিং খুলনা মহিলা কলেজে হয়েছিল আমি এইচএসসি দেওয়ার আগে–আগে বোধ হয়। ক্লাস এইটে সেকেন্ড গ্রেডে স্কলারশিপ পাওয়ার পর আব্বুর মুখ হাঁড়ি কেন বা ইন্টার স্কুল ডিবেটে ঢাকা/বাড়বকুন্ড যেতে আব্বু এত বিরক্ত কেন তখন বুঝিনি। হাই জাম্পে ইন্টার স্কুল কম্পিটিশনে যখন অন্য স্কুলে আমি এবং বিরক্ত হয়ে আমাকে নিয়ে আসা হয়েছিল বাসায়, তখনো আমি বুঝিনি কেন। আমি বুঝতাম না আমি মেয়েসন্তান এবং পড়াশোনা করাটা কতটা জরুরি সবার জন্য জীবনে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে চাইলে। কলোনির রাস্তায় সাইকেল চালানো বা পুলে শুধু মেয়েদের সময়ে সাঁতার কাটার কোনো বাধা ছিল না। বাধা ছিল না স্কুলের সব এক্সট্রা কারিকুলামে থাকতে। কারণ, আব্বু নিশ্চিত করতেন আমি নিরাপদ। কিন্তু পড়াশোনা করার ব্যাপারে কোনো ছাড় ছিল না। বলতেন, ‘মা, দুনিয়ার সবকিছু সবাই নিয়ে যেতে পারবে; কিন্তু তোমার বিদ্যাটুকু কেউ নিতে পারবে না। নিজের পায়ে তোমাকে দাঁড়াতেই হবে।’
আর এশিয়ান বাবাদের কত রকম বাহানা শুনি। এটা খেতে পারেন না তো ওটা করে দিতে হয়। আমার আব্বু আম্মি চাকরিতে চলে যাওয়ার পর খুকির মার রান্না করা খাবার মাসের পর মাস খেয়েছেন, নিজের কাজ নিজে করেছেন, আমাদের একটা নিরাপদ জায়গায় মানুষ করেছেন। কোনো অভিযোগ শুনিনি। মেডিক্যালে পড়ার সময় আগে আগে টাকা শেষ করে কতবার আব্বুকে চট্টগ্রাম আনিয়েছি টাকা দিয়ে যাওয়ার জন্য। বিকাশ চালু হওয়ার আগের সময় তখন। শুধু শুনতাম, আমার পাগলটা। এক জেনারেশন আগের আব্বু যতটা ধৈর্য নিয়ে, সাহস নিয়ে জীবন পার করেছেন, সেটা আমার কল্পনায়ও আসে না, কীভাবে সম্ভব। আব্বু চলে গেছেন গত ডিসেম্বরে। আমার বোনের আফসোস, আম্মি একটু কম রিজিড হলে এটা করা যেত, তাঁর জন্য আরও কত কিছু করা যেত। কিন্তু আমি জানি, আমার আম্মি পৃথিবীতে আমার আব্বুর সবচেয়ে পছন্দের মানুষ ছিলেন। তাঁর হাতে খেয়ে, তাঁর হাতে সেবা পেয়ে জীবনের শেষ মুহূর্ত কাটিয়েছেন তিনি। পৃথিবীর কোনো হাসপাতাল বা কোনো নার্স বা কোনো সেবা এই শান্তি তাঁকে দিতে পারত না।
আমার বাচ্চারা বড় হয়েছে একটু, তবু গত সাত বছরে বহুবার মনে হয়েছে সিঙ্গেল প্যারেন্টিং এত কঠিন কেন? আমি পারছি তো? পারব? তারপর শুকতারাটা দেখি কাজ শেষ করে বাসায় ফেরার পথে আর বলি, ‘আব্বু, কত বছর আগে আপনি সব প্রতিকূলতাকে তুচ্ছ করে যা শিখিয়ে গেছেন, আমি এ সময়ে আপনার মেয়ে হয়ে কেন সেটা কাজে লাগাতে পারব না?’
পৃথিবীর সব ভালো বাবাদের বাবা দিবসের শুভেচ্ছা। বাচ্চারা হয়তো বলতে পারছে না; কিন্তু সব ভালোবাসা ওদের হৃদয়ে ধারণ করে ওরা। আমার মতো। আল্লাহ আমার আব্বুকে আপনি বেহেশত নসিব করুন। ওনার সৎ জীবনযাপনের উত্তম প্রতিদান দিন। আমিন।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]