সন্তান জন্মের পর বাবার মস্তিষ্কেও পরিবর্তন ঘটে

· Prothom Alo

সন্তান জন্ম দিয়ে একজন নারী মা হয়ে ওঠেন। মা হলে নারীর শরীর ও মস্তিষ্কে বিপুল পরিবর্তন ঘটে। এ বিষয়ে বহু গবেষণা হয়েছে। কিন্তু বাবা হলে একজন পুরুষের মস্তিষ্কে কী ঘটে, তা নিয়ে গবেষণা হয়েছে তুলনামূলকভাবে অনেক কম। মনে হতে পারে, বাবা হওয়া মানে শুধু জীবনের নতুন এক অধ্যায়ের শুরু হওয়া। কিন্তু আসলে বাবা হওয়া এর চেয়েও বেশি কিছু। সন্তানের জন্ম হলে একজন বাবার মস্তিষ্কেও পরিবর্তন ঘটে। 

Visit afrikasportnews.co.za for more information.

কয়েকটি সাম্প্রতিক গবেষণা দেখিয়েছে, বাবা হলে মস্তিষ্কে  উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন মায়েদের মস্তিষ্কের পরিবর্তনের সঙ্গে মিলে যায়।

এ বিষয়ে কাজ করেন জনস্বাস্থ্যবিষয়ক চিকিৎসক এবং স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের সহযোগী শিক্ষক দেবিকা ভূষণ। দীর্ঘদিন ধরে তিনি লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক ভূমিকা ও অভিভাবকত্ব নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর মতে, বাবা হওয়ার পর পুরুষের মস্তিষ্কে আমাদের ধারণার চেয়েও বেশি গভীর পরিবর্তন ঘটে।

নতুন বাবা হওয়ার আনন্দ যে কারণে বিষাদে পরিণত হয়
মায়েদের ক্ষেত্রে আবেগ-প্রক্রিয়াকরণ নেটওয়ার্ক বেশি সক্রিয় দেখা যায়। অন্যদিকে সহায়ক পরিচর্যাকারী বাবাদের ক্ষেত্রে মেন্টালাইজিং নেটওয়ার্ক বেশি সক্রিয় ছিল।

‘ড্যাড ব্রেইন’ বলে সত্যিই একটি বিষয় আছে

সন্তানের জন্ম হলে স্বাভাবিকভাবে সন্তানের অভিভাবক হন দুইজন। মা এবং বাবা। সন্তান জন্ম দিলে বা অভিভাবকত্বের কারণে মায়ের মস্তিষ্কে পরিবর্তন আসে। এ বিষয়ে অধিকাংশ গবেষণা হয়েছে মাতৃত্বকে কেন্দ্র করে। বেশিরভাগ গবেষণায় অনুসন্ধান করা হয়েছে গর্ভাবস্থায় মায়ের মস্তিষ্কের পরিবর্তন যাচাই করা জন্য। কিন্তু বাবাদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক বদলে যাওয়ার প্রমাণ ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে।

২০১৪ সালের একটি গবেষণায় প্রধান পরিচর্যাকারী মা, সহায়ক পরিচর্যাকারী বাবাকে পরীক্ষা করে দেখা হয়েছিল। গবেষকেরা দেখেন, মা-বাবা দুইজনেরই একটি বিশেষ ‘প্যারেন্টাল কেয়ারগিভিং নেটওয়ার্ক’-এ পরিবর্তন আসে। এই নেটওয়ার্কের একটি অংশ হলো মস্তিষ্কের কর্টেক্সে অবস্থিত ‘মেন্টালাইজিং নেটওয়ার্ক’। যা অন্যের অনুভূতি বোঝা, সহানুভূতি প্রকাশ এবং সামাজিক আচরণে ভূমিকা রাখে। নেটওয়ার্কের আরেকটি অংশ হলো আবেগ প্রক্রিয়াকরণ নেটওয়ার্ক, যা সতর্কতা ও পুরস্কার-সংক্রান্ত অনুভূতির সঙ্গে জড়িত।

মায়েদের ক্ষেত্রে আবেগ-প্রক্রিয়াকরণ নেটওয়ার্ক বেশি সক্রিয় দেখা যায়। অন্যদিকে সহায়ক পরিচর্যাকারী বাবাদের ক্ষেত্রে মেন্টালাইজিং নেটওয়ার্ক বেশি সক্রিয় ছিল। গবেষকদের মতে, এই ফলাফল দেখায়, অভিভাবক হিসেবে শিশুর যত্ন নেওয়াটাই মস্তিষ্কের পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ।

আমরা কেন বাবা-মায়ের মতো
গবেষকেরা দেখেন, মা-বাবা দুইজনেরই একটি বিশেষ প্যারেন্টাল কেয়ারগিভিং নেটওয়ার্ক-এ পরিবর্তন আসে। এই নেটওয়ার্কের একটি অংশ হলো মস্তিষ্কের কর্টেক্সে অবস্থিত মেন্টালাইজিং নেটওয়ার্ক।

মস্তিষ্কের কিছু অংশ ছোট হয়

২০২৩ সালে স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার একদল নতুন বাবার ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, সন্তান জন্মের পর তাঁদের মস্তিষ্কের ধূসর পদার্থ বা গ্রে ম্যাটারের পরিমাণ কিছুটা কমে যায়।

শুনতে উদ্বেগজনক মনে হলেও এটি আসলে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা হ্রাসের লক্ষণ নয়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এটি এক ধরনের ‘প্রুনিং’ বা ছাঁটাই প্রক্রিয়া। এ সময় অপ্রয়োজনীয় স্নায়বিক সংযোগ কমে যায় এবং মস্তিষ্ক আরও দক্ষভাবে কাজ করতে শেখে।

প্রথমবার মা হওয়া নারীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। ফলে গবেষকেরা মনে করছেন, সন্তান লালন-পালনের অভিজ্ঞতাই এই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অর্থাৎ শুধু গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান বা বুকের দুধ খাওয়ানোর মতো জৈবিক প্রক্রিয়া না, শিশুর যত্ন নেওয়ার অভিজ্ঞতাও মস্তিষ্ককে নতুনভাবে গড়ে তোলে।

বাবারাও প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতায় ভুগতে পারেন

সাধারণত প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা বা পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনের কথা বললে মায়েদের কথাই বেশি শোনা যায়। সেটাই স্বাভাবিক। কারণ গর্ভধারণ, প্রসব এবং প্রসব পরবর্তী শিশুর নিবিড় পরিচর্যা মায়েরাই করেন। তবে বাবারাও একই ধরনের মানসিক সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন। গবেষণা বলছে, প্রতি ১০ জন বাবার মধ্যে প্রায় ১ জন পিতৃত্ব-পরবর্তী বিষণ্নতা বা উদ্বেগে আক্রান্ত হন।

তবে পুরুষদের ক্ষেত্রে এর লক্ষণ অনেক সময় ভিন্নভাবে প্রকাশ পায়। যেমন, হঠাৎ রেগে যাওয়া, বিরক্তিভাব, আক্রমণাত্মক আচরণ কিংবা মাদকাসক্তির প্রবণতা বৃদ্ধি। এই মানসিক সমস্যার প্রভাব শুধু বাবার ওপরই পড়ে না, এটি মায়ের মানসিক সুস্থতা এবং শিশুর বিকাশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

কিছু পরিবারে কেন ছেলে সন্তান বেশি হয়
বিশেষ করে মায়েরা কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করলে বাবাদের দায়িত্ব বেড়ে যায়। সহায়ক আত্মীয়রাও জন্মের কিছুদিন পর নিজেদের বাসায় ফিরে যান। এই সময়ে বাবাদের মানসিক চাপ বাড়তে পারে।

কেন বাবাদের সমস্যা পরে দেখা দেয়?

মায়েদের ক্ষেত্রে প্রসবের পরপরই বিষণ্নতা বা উদ্বেগের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। কিন্তু বাবাদের ক্ষেত্রে এসব সমস্যা সাধারণত সন্তানের জন্মের তিন থেকে ছয় মাস পর বেশি দেখা যায়। এর একটি সম্ভাব্য কারণ হলো কর্মজীবন। আমাদের দেশের অধিকাংশ বাবা সন্তানের জন্মের এক বা দুই সপ্তাহের মধ্যেই কাজে ফিরে যান। অন্যদিকে মায়েরা তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় বাড়িতে থাকেন। ফলে শিশুর জন্মের পর প্রথম কয়েক সপ্তাহে যত্নের বড় অংশ মায়েরা সামলান। কিন্তু পরে, বিশেষ করে মায়েরা কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করলে বাবাদের দায়িত্ব বেড়ে যায়। সহায়ক আত্মীয়রাও জন্মের কিছুদিন পর নিজেদের বাসায় ফিরে যান। এই সময়ে বাবাদের মানসিক চাপ বাড়তে পারে।

বাবাদেরও সহায়তা দরকার

বর্তমান সময়ে বাবারা আগের তুলনায় সন্তানের যত্নে অনেক বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। এর সঙ্গে বেড়েছে তাঁদের দায়িত্ব, মানসিক চাপ এবং আবেগগত চ্যালেঞ্জ।

দেবিকা ভূষণের মতে, সন্তান জন্মের পর যে সহায়তা ব্যবস্থা মায়েদের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে, সেটিকে শুধু ‘মাতৃত্বকেন্দ্রিক’। এটিকে ‘অভিভাবককেন্দ্রিক’ করা উচিত। মানে মা ও বাবা উভয়ের মানসিক স্বাস্থ্য, আবেগগত চাহিদা এবং সামাজিক সহায়তার বিষয়টি সমান গুরুত্ব পাওয়া দরকার।

বিজ্ঞানীরা এখন বুঝতে শুরু করেছেন, সন্তান জন্মের পর শিশুর পাশাপাশি মা-বাবার মস্তিষ্কও বদলে যায়। এই পরিবর্তন তাঁদেরকে নতুন দায়িত্বের জন্য প্রস্তুত করে। তাই ‘ড্যাড ব্রেইন’ কোনো মজার কথা না। এটি বাস্তব। পিতৃত্বের অভিজ্ঞতা একজন মানুষের মস্তিষ্ককে সত্যিই নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, কিশোর আলোসূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকানমহাকাশে কি সত্যিই সন্তান জন্ম দেওয়া সম্ভব

Read full story at source