অসম্মানের জবাব মাঠেই দিয়েছেন রোনালদো
· Prothom Alo

প্রথম ম্যাচে যখন নিষ্প্রভ ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো গোল করতে পারলেন না, চারদিকে কত কথা! সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ ট্রল করেছেন, মিম বানিয়েছেন। কেউ কেউ তো বলেই দিয়েছিলেন, ৪১ বছর বয়স হয়ে গেছে, রোনালদো শেষ। আর খেলতে পারবেন না!
কিন্তু বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক হিসেবে একজন খেলোয়াড়ের বা অধিনায়কের মাঠের ভেতরের মানসিকতা আমি বুঝি। রোনালদোর মতো কিংবদন্তির মানসিকতা তো আরও শক্ত। অনেকে তাঁকে অসম্মান করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু রোনালদো তাঁর আসল চারিত্রিক দৃঢ়তা তুলে ধরেই এর উপযুক্ত জবাব দিয়েছেন।
Visit goldparty.lat for more information.
আমি মনে করি, এই সমালোচনাগুলো তাঁর জন্য জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছে এবং তা শাপেবর হয়েছে। রোনালদো নিজেকে আরও সচেতন করেছেন, আরও বেশি গোলের জন্য ক্ষুধার্ত হয়ে উঠেছেন। এসবেরই যোগফল তাঁর রাজসিক প্রত্যাবর্তন।
উজবেকিস্তানের বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচে আমরা যে রোনালদোকে দেখেছি, তা ছিল এককথায় ‘পারফেক্ট কামব্যাক’। মাঠে তাঁর মুভমেন্ট এবং ফিনিশিংগুলো ছিল এককথায় অসাধারণ। রোনালদোর খেলা খুবই ভালো লেগেছে আমার। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে খেললে তিনি কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারেন, তা এই ম্যাচেই প্রমাণিত। রোনালদো এমন একজন খেলোয়াড়, যিনি বক্সে পাঁচটা বল পেলে অন্তত দুটি জালে পাঠাবেনই। এই ম্যাচে তো নিজেও সুযোগ তৈরি করেছেন—টু গুড রোনালদো!
পুরো ম্যাচে তিনি ৭টি শট নিয়েছেন উজবেকিস্তানের পোস্টে, যার মধ্যে ৬টিই ছিল অন টার্গেট। এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের জন্য যোগ্যতর খেলোয়াড় হিসেবেই ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ হয়েছেন। অসম্মান আর সমালোচনার জবাব দিয়ে দুটি গোল করেছেন। শুধু হ্যাটট্রিক না হওয়ার আফসোসটা থাকছে।
ক্যারিয়ারে এক হাজার গোলের মাইলফলক ছুঁতে তাঁর আর মাত্র ২৫টি গোল প্রয়োজন। রোনালদোও ছুটছেন এই লক্ষ্যের দিকে। ম্যাচ শেষে তিনি যখন দুবার বললেন, ‘আই অ্যাম ব্যাক, আই অ্যাম ব্যাক’, তখন সেটি ছিল বিশ্বের কাছে একটি জোরালো বার্তা। রোনালদো সবাইকে মনে করিয়ে দিয়েছেন—এখনো ফুরিয়ে যাননি তিনি। বার্তাটা যেন এভাবে দিলেন, ‘তোমরা ভুলে গেছ, আমি কোন খেলোয়াড়। আমার বয়স ৪১, কিন্তু কোনো সমস্যা নেই, আমি রোনালদো।’
পর্তুগাল দল নিয়ে যদি বলি, আমার মতে এটি রোনালদোর খেলা ছয়টি বিশ্বকাপের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী দল। উজবেক ম্যাচে খুব ভালো শুরু করেছে রবার্তো মার্তিনেজের দল। মাত্র ৬ মিনিটে গোল পেয়েছেন রোনালদো, তারপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি।
গোল করার পর রোনালদোর উদ্যাপনসবচেয়ে ভালো লেগেছে, এই ম্যাচে রোনালদো অনেক বল পেয়েছেন। প্রথম ম্যাচ শেষে আমরা শুনেছিলাম দলের দু–একজন খেলোয়াড় নাকি বলেছেন, শুধু রোনালদোকেই কেন পাস দিতে হবে, সুবিধাজনক জায়গায় যে থাকে তাকেই দিতে হবে। পর্তুগালের খেলোয়াড়েরা মনে হয় মিডিয়ায় এসব দেখে একটু রাগ করেছেন। নইলে দ্বিতীয় ম্যাচটা কেন ঠিক প্রথম ম্যাচের উল্টো হবে!
যেমন প্রত্যাশা করেছিলাম দ্বিতীয় ম্যাচে তেমনই খেলেছে পর্তুগাল আর রোনালদো। ম্যাচ দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, রোনালদো তারুণ্যের ঝলক দেখাচ্ছেন। মেসি-এমবাপ্পে-হলান্ড-কেইনরা গোল করেছেন। এবার রোনালদোও করলেন। এখন শুধু নেইমার বাকি। নেইমার যদি স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম নেমেই গোল করতে পারেন তাহলে তারাদের সবার গোল করার চক্রটা পূর্ণ হয়।
আমার বিশ্বাস, রোনালদো পরের ম্যাচেও গোল করবেন। দিন দিন আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠবেন সিআর সেভেন। রোনালদোর ফর্মে ফেরা বা আত্মবিশ্বাসী থাকা মানে প্রতিপক্ষের জন্য এক চরম বিপৎসংকেত। টুর্নামেন্ট যত এগোবে, রোনালদো নিশ্চয়ই আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবেন।
অনেকে বলতে পারেন উজবেকিস্তান দুর্বল প্রতিপক্ষ ছিল। বিশ্বকাপে আসলে কোনো ম্যাচই সহজ নয়। যেমন স্পেন, পর্তুগাল প্রথম ম্যাচে ড্র করেছে। ইংল্যান্ড দ্বিতীয় ম্যাচে ড্র করেছে ঘানার সঙ্গে। অথচ ইংল্যান্ডের সব খেলোয়াড় প্রিমিয়ার লিগে খেলে। স্পেন, ইংল্যান্ডের মতো বড় দলগুলোও যখন ড্র করে, তখন বোঝা যায় প্রতিটি ম্যাচেই কতটা লড়াই করতে হয়।
এখন পর্তুগালের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়া, যার জন্য পরের ম্যাচেও তাদের কলম্বিয়ার বিপক্ষে জিততে হবে। আর যদি টুর্নামেন্টের সমীকরণ এমন হয় যে কোয়ার্টার ফাইনালে পর্তুগাল আর আর্জেন্টিনার দেখা হয়ে যায়, তবে ফুটবল–বিশ্ব আবারও সেই রোমাঞ্চকর মেসি বনাম রোনালদো দ্বৈরথ দেখার সুযোগ পাবে। তবে পর্তুগাল যে আর্জেন্টিনাকে এড়াতে চাইবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
লেখক: বাংলাদেশ ফুটবল দলের অধিনায়ক
নেইমারকে কতক্ষণ খেলানো হবে, আনচেলত্তি কী বললেন