স্বর্ণালংকার-টাকা লুট হয়নি, তাহলে কেন খুন

· Prothom Alo

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মা ও তিন মেয়েকে বাসায় ঢুকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা কী কারণে হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। বাসাটিতে থাকা স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা যেভাবে ছিল, সেভাবেই পাওয়া গেছে। তবে নিহত দুজনের ব্যবহৃত দুটি মুঠোফোন ভবনটির বাইরে পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

Visit afrikasportnews.co.za for more information.

গতকাল রোববার বিকেলে তদন্তের অংশ হিসেবে পুলিশ বাসাটিতে তল্লাশি চালায়। এ সময় ঘরের ভেতর থেকে স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা লুট না হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হন পুলিশ কর্মকর্তারা। একই দিনে ভবনের বাইরে থেকে নিহত শাহিনুর বেগম (৪০) ও তাঁর এক মেয়ের ব্যবহৃত দুটি মুঠোফোন উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, পাশাপাশি থাকা দুটি ভবনের মাঝখানের সরু জায়গা থেকে মুঠোফোন দুটি উদ্ধার হয়েছে।

পুলিশের ধারণা, উদ্ধার হওয়া মুঠোফোন দুটি মা ও তিন মেয়েকে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার (২৮) সঙ্গে নিয়ে পালাচ্ছিলেন। তবে তিনি ধরা পড়ার পর গণপিটুনির সময় মুঠোফোন দুটি ওই স্থানে পড়ে যায়।

শাহীন মিয়া, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), রায়পুর থানা।নিহত শাহিনুর বেগমের পরিবারের এবং অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারের ব্যবহৃত সব মুঠোফোনের কল রেকর্ড ও অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেখানেও খুনে অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে পরিবারটির যোগাযোগের কোনো তথ্য মেলেনি।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা বাসায় থাকায় কেবল লুটপাটের উদ্দেশ্যে যে ঘটনাটি ঘটেনি, সে বিষয়ে অনেকটাই নিশ্চিত পুলিশ। তবে মুঠোফোন দুটি নিয়ে অন্তর কেন পালাচ্ছিলেন, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। অভিযুক্ত অন্তরসহ নিহত ব্যক্তিদের ব্যবহৃত সব মুঠোফোন নম্বরের কল রেকর্ড এরই মধ্যে যাচাই করে দেখেছে পুলিশ। সেখানে অভিযুক্ত অন্তরের সঙ্গে পরিবারটির সদস্যদের কথোপকথন বা পূর্বে যোগাযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, ঘটনাস্থলেই মা ও তিন মেয়ে এবং অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারের মৃত্যু হওয়ায় ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটনে বেগ পেতে হচ্ছে পুলিশকে। তবে শিগগিরই হত্যার কারণের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে আশাবাদী পুলিশ।

গত বৃহস্পতিবার রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা এলাকার নদীর পাড়ের একটি ভাড়া বাসায় মা ও তিন মেয়েকে হত্যার ঘটনাটিতে ঘটে। এতে নিহত হন শাহিনুর বেগম (৪০) এবং তাঁর তিন মেয়ে সাইমা আক্তার (২১), নাফিসা আক্তার ইকরা (১৭) ও ফাতেমা আক্তার সিপা (১০)।

নিহত শাহিনুর ও তাঁর তিন মেয়ে

খুনের ঘটনার পর পালানোর সময় অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারকেও স্থানীয় লোকজন আটক করে পিটুনি দেন। পরে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। অন্তরের বাড়ি নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায়। তাঁর বাবার নাম কার্তিক মজুমদার।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শাহিনুর বেগমের শ্বশুরবাড়ি কুমিল্লার হোমনা উপজেলার লটিয়া গ্রামে। জীবিকার সন্ধানে পরিবার নিয়ে সেখান থেকে রায়পুরে এসে বসবাস শুরু করেন তাঁর স্বামী কামাল হোসেন। ২০১৯ সালে রায়পুরেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান কামাল। সেই থেকে শাহিনুর বেগমই সংসারের খরচ চালিয়ে আসছিলেন। তিন মেয়ে ছাড়াও এক ছেলে রয়েছে শাহিনুরের। তার নাম জুনায়েদ ইসলাম ওরফে সিফাত (১৬)। সে একটি একটি রড-সিমেন্ট বিক্রির দোকানে চাকরি করে। খুনের ঘটনার সময় সে কর্মস্থলে ছিল।

শাহিনুর বেগমের নিহত তিন মেয়ের মধ্যে ইকরা দ্বাদশ শ্রেণির ও সিপা চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। নিহত সায়মা আক্তার ঢাকার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছেন।

তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, ঘটনাস্থলেই মা ও তিন মেয়ে এবং অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারের মৃত্যু হওয়ায় ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটনে বেগ পেতে হচ্ছে পুলিশকে। তবে শিগগিরই হত্যার কারণের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে আশাবাদী পুলিশ।

রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, শুরুতে ধারণা করা হচ্ছিল, লুটপাটের উদ্দেশ্যে বাসাটিতে গিয়েছিলেন অন্তর মজুমদার। তবে স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা বাসাটিতে পাওয়ার কারণে লুটপাট যে উদ্দেশ্য ছিল না, তা অনেকটা নিশ্চিত।

ওসি বলেন, নিহত শাহিনুর বেগমের পরিবারের এবং অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারের ব্যবহৃত সব মুঠোফোনের কল রেকর্ড ও অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেখানেও খুনে অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে পরিবারটির যোগাযোগের কোনো তথ্য মেলেনি। এতে অন্তর মজুমদারের সঙ্গে পূর্বঘনিষ্ঠতা যে ছিল না, সে বিষয়েও পুলিশ অনেকটা নিশ্চিত হয়েছে।

ঘটনাস্থলে পাঁচজনের মৃত্যু তদন্তের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ওসি শাহীন মিয়া বলেন, ‘খুনের সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন, এমন কোনো জীবিত সাক্ষী নেই। এ কারণে ঘটনাস্থলে পাওয়া আলামত, ফরেনসিক তথ্য ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ওপর নির্ভর করেই তদন্ত এগিয়ে নিতে হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো সম্ভাবনাকেই উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।’

‘হত্যার ঘটনায় অন্তরের নাম শুনে বিশ্বাসই করতে পারিনি,’ বলল সিফাত

বিচারের দাবি এলাকাবাসীর

খুনের ঘটনার সঙ্গে অন্তর মজুমদারের বাইরে আর কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি এলাকার মানুষের। গতকাল বিকেলে রায়পুর পৌর শহরের শহীদ ওসমান চত্বরে এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি চেয়ে এক মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

‘রায়পুরের সাধারণ ছাত্র সমাজ’-এর ব্যানারে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। মানববন্ধনে অংশ নিয়ে নাফিসা আক্তার ইকরার সহপাঠী হাফসা কবির বলেন, ঘটনার চার দিন পার হলেও হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এতে মানুষের মধ্যে নানা ধরনের প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ করা হলে সব ধরনের গুঞ্জন ও ধোঁয়াশার অবসান হবে।

সায়মার সহপাঠী রাকিব হোসেন বলেন, একটি অসহায় পরিবারের চার সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। পরে গণপিটুনিতে অভিযুক্ত হিসেবে ধরা পড়া ব্যক্তিরও মৃত্যু হয়েছে। এত বড় একটি ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন না হলে মানুষের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। তাই তদন্তে কোনো ধরনের গাফিলতি না করে নিরপেক্ষভাবে সব দিক খতিয়ে দেখতে হবে।

Read full story at source