পুলিশের তদন্তে বিলম্ব কেন হয়, সমাধান কী

· Prothom Alo

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার অন্যতম বড় সংকট হলো বিচারাধীন ও তদন্তাধীন মামলার ক্রমবর্ধমান সংখ্যা। প্রতিবছর নতুন নতুন মামলা যুক্ত হচ্ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে মামলার নিষ্পত্তি হচ্ছে না। ফলে আদালতে বছরের পর বছর ধরে লাখো মামলা বিচারাধীন থেকে যাচ্ছে। এই বাস্তবতা শুধু বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগই বাড়াচ্ছে না, বরং বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন করছে।

সাধারণভাবে তদন্তে বিলম্বের জন্য পুলিশের সমালোচনা করা হলেও বাস্তবে সমস্যাটি অনেক বেশি কাঠামোগত। তদন্তকারী কর্মকর্তার দক্ষতা বা আন্তরিকতার বাইরে এমন বহু প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যেগুলো দূর না করলে তদন্তের সময় কমানো সম্ভব নয়। তাই পুলিশের ওপর এককভাবে দায় চাপিয়ে না দিয়ে তদন্ত বিলম্বের প্রকৃত কারণগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়াই সময়ের দাবি।

Visit playerbros.org for more information.

আইন অনুযায়ী সম্ভব হলে মামলার তদন্ত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন করার নির্দেশনা রয়েছে। এমনকি কিছু মামলায় ২৪ ঘণ্টা থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই তদন্ত শেষ করা সম্ভব, যদি প্রয়োজনীয় প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন সময়মতো পাওয়া যায়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক মামলা মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর তদন্তাধীন থাকে। এর ফলে বাদী যেমন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন, তেমনি অভিযুক্ত ব্যক্তিও দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন। বিচার বিলম্বিত হওয়া মানেই এক অর্থে বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়া—এই বহুল প্রচলিত কথাটি আজও সমানভাবে সত্য।

বর্তমানে বাংলাদেশে পুলিশের তদন্তাধীন মামলার একটি বড় অংশই মাদকসংক্রান্ত। এসব মামলায় মাদকদ্রব্যের রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের আগে এই প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই পরীক্ষার জন্য নমুনা সাধারণত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বা সিআইডির পরীক্ষাগারে পাঠাতে হয়।

কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বিপুলসংখ্যক নমুনা জমা হওয়ায় একটি প্রতিবেদনের জন্য অনেক সময় এক সপ্তাহ, দুই সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়। এই বিলম্বের কারণে তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় সব তথ্য হাতে থাকা সত্ত্বেও অভিযোগপত্র জমা দিতে পারেন না। ফলে মামলার জট অকারণেই বাড়তে থাকে।

তদন্ত বিলম্বের জন্য শুধু পুলিশকে দোষারোপ করলে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি, সেবার বিকেন্দ্রীকরণ ও প্রযুক্তিনির্ভর সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলেই মামলার তদন্তের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। এতে একদিকে আদালতের মামলার জট কমবে, অন্যদিকে বিচারপ্রার্থী মানুষ দ্রুত ন্যায়বিচার পাবেন।

একই ধরনের সমস্যা দেখা যায় মেডিক্যাল সার্টিফিকেট বা এমসি সংগ্রহের ক্ষেত্রেও। মারামারি, গুরুতর আহত কিংবা নারী ও শিশু নির্যাতনসংক্রান্ত বহু মামলায় চিকিৎসকের প্রতিবেদন তদন্তের অপরিহার্য অংশ। স্থানীয় হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক মেডিক্যাল রিপোর্ট অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত পাওয়া গেলেও যেসব রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা অন্য বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠানো হয়, সেসব ক্ষেত্রে চূড়ান্ত মেডিক্যাল সার্টিফিকেট পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।

অনেক তদন্তকারী কর্মকর্তাকে বা মামলার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দূর-দূরান্ত থেকে ঢাকায় এসে বারবার যোগাযোগ করে এই প্রতিবেদন সংগ্রহ করতে হয়। এতে যেমন সময় নষ্ট হয়, তেমনি প্রশাসনিক ব্যয়ও বেড়ে যায়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, মেডিক্যাল সার্টিফিকেট না পাওয়া পর্যন্ত তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া সম্ভব হয় না।

আত্মহত্যা, হত্যাসহ গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে ভিসেরা পরীক্ষার রিপোর্ট আরেকটি বড় প্রতিবন্ধকতা। পোস্টমর্টেমের পর নমুনা পরীক্ষার জন্য নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোয় (যেমন সিআইডি) পাঠানো হয়। কিন্তু সীমিত জনবল ও অবকাঠামোর কারণে এসব প্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক নমুনা জমে থাকে। ফলে একটি রিপোর্ট পেতে কয়েক মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এই সময়ে তদন্ত কার্যত স্থবির হয়ে থাকে। এতে মামলার অগ্রগতি থেমে যায় এবং বিচারপ্রক্রিয়া অযথা দীর্ঘায়িত হয়।

পল্লবীর শিশুহত্যার রায় যেভাবে বিচারজট কাটাতে সহায়ক হবে

আসামির পরিচয় ও ঠিকানা যাচাইয়ের বিষয়টিও তদন্ত বিলম্বের আরেকটি কারণ। তদন্তকারী কর্মকর্তাকে বিভিন্ন জেলা বা থানায় ইনকোয়ারি স্লিপ পাঠিয়ে আসামির পরিচয় নিশ্চিত করতে হয়। যদিও বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার কিছুটা বেড়েছে, তবু অনেক ক্ষেত্রে এই যাচাইপ্রক্রিয়া এখনো ধীর গতির। স্থানীয় পর্যায় থেকে দ্রুত উত্তর না এলে তদন্তও আটকে যায়। এই প্রক্রিয়াকে আরও আধুনিক ও সমন্বিত করা গেলে উল্লেখযোগ্য সময় সাশ্রয় সম্ভব।

মূল সমস্যা হলো, আমাদের তদন্তব্যবস্থার অনেক গুরুত্বপূর্ণ সেবা এখনো অতিমাত্রায় ঢাকাকেন্দ্রিক। রাসায়নিক পরীক্ষা, ভিসেরা পরীক্ষা কিংবা বিশেষায়িত মেডিক্যাল রিপোর্ট—সবকিছুর জন্য রাজধানীর প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে।

ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক নমুনা ও কাগজপত্র এক জায়গায় জমা হচ্ছে, যা স্বাভাবিকভাবেই জট সৃষ্টি করছে। এই বাস্তবতায় শুধু জনবল বাড়ালেই হবে না; সেবাগুলোকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। জেলা ও মহানগর পর্যায়ে আধুনিক পরীক্ষাগার, প্রশিক্ষিত জনবল ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি নিশ্চিত করা গেলে অনেক মামলার তদন্ত অল্প সময়েই সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশে ন্যায়বিচার প্রাপ্তির বাধাগুলো কী

একই সঙ্গে হাসপাতাল, পরীক্ষাগার ও পুলিশের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা জরুরি। এখনো অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাগজপত্র হাতে হাতে আদান-প্রদান হয়। অথচ একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করা গেলে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল বা পরীক্ষাগার থেকে প্রতিবেদন অনলাইনে আপলোড করা সম্ভব। তদন্তকারী কর্মকর্তা নির্ধারিত নিরাপদ লগইনের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে সেই প্রতিবেদন সংগ্রহ করতে পারবেন। এতে সময় যেমন বাঁচবে, তেমনি কাগজপত্র হারিয়ে যাওয়া বা অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগের সুযোগও কমে আসবে।

এ ছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট সেবা প্রদানের সময়সীমা নির্ধারণ করাও জরুরি। যেমন রাসায়নিক পরীক্ষার রিপোর্ট, মেডিক্যাল সার্টিফিকেট ও ভিসেরা রিপোর্ট কত দিনের মধ্যে দিতে হবে, সে বিষয়ে বাধ্যতামূলক মানদণ্ড নির্ধারণ করা যেতে পারে।

একই সঙ্গে নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকলে সেবার গতি আরও বাড়বে। তদন্তকে শুধু পুলিশের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া, যেখানে হাসপাতাল, পরীক্ষাগার, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ এবং অন্যান্য সরকারি সংস্থার সমান ভূমিকা রয়েছে।

পুলিশ কখন নাগরিকের প্রতিষ্ঠান হবে

পুলিশকে আরও দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করতে হলে তাদের প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা, আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন যদি নির্ধারিত সময়ে পাওয়া না যায়, তাহলে তদন্তকারী কর্মকর্তার পক্ষে দ্রুত অভিযোগপত্র দাখিল করা সম্ভব নয়। তাই বাস্তব সমস্যাগুলো বিবেচনায় এনে নীতিনির্ধারকদের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু সমালোচনা নয়, সমস্যা সমাধানের দিকেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

বিচারব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু তদন্তপর্যায়েই যদি দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি হয়, তাহলে পুরো বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়াই স্বাভাবিক। এই অবস্থার পরিবর্তনে রাসায়নিক পরীক্ষার রিপোর্ট, মেডিক্যাল সার্টিফিকেট ও ভিসেরা রিপোর্ট প্রদানের ব্যবস্থাকে জেলাপর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারণ, অনলাইনভিত্তিক সমন্বিত রিপোর্টিং ব্যবস্থা চালু, আন্তপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় বৃদ্ধি এবং তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।

সর্বোপরি, তদন্ত বিলম্বের জন্য শুধু পুলিশকে দোষারোপ করলে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি, সেবার বিকেন্দ্রীকরণ ও প্রযুক্তিনির্ভর সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলেই মামলার তদন্তের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। এতে একদিকে আদালতের মামলার জট কমবে, অন্যদিকে বিচারপ্রার্থী মানুষ দ্রুত ন্যায়বিচার পাবেন। একটি কার্যকর ও আধুনিক তদন্তব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাই হতে পারে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

  • মো. ইমরান আহম্মেদ লেখক ও গবেষক

    ই–মেইল: [email protected]

    *মতামত লেখকের নিজস্ব।

Read full story at source