ফিতরাত: অস্তিত্ব, উদ্দেশ্য ও নেজামের দার্শনিক ভিত্তি
· Prothom Alo

ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার দৃষ্টিতে ফিতরাত কোনো ধর্মীয় বা নৈতিক ধারণায় সীমিত নয়। সাধারণত ইসলামি আলোচনায় ফিতরাতকে মানুষের সহজাত ইমানপ্রবণতা, নৈতিকবোধ বা স্বাভাবিক ধর্মপ্রকৃতি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
এই ব্যাখ্যা সত্য, যথার্থ। ব্যাখ্যাটি মূলত মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক মাত্রাকে কেন্দ্র বানায়।
Visit moryak.biz for more information.
কিন্তু ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা ফিতরাতের ধারণাকে সমগ্র অস্তিত্বের মৌলিক গঠননীতিতে উন্নীত করে। তার মতে, ফিতরাত হলো প্রত্যেক সত্তায় আল্লাহপ্রদত্ত অস্তিত্বগত প্রকৃতি, যার মাধ্যমে তার পরিচয়, সীমা, কার্যকারিতা, সম্পর্ক, বিকাশের দিক ও চূড়ান্ত উদ্দেশ্য নির্ধারিত হয়।
এই অর্থে ফিতরাত কোনো আরোপিত বৈশিষ্ট্য নয়; সে সত্তার অস্তিত্বের অন্তর্নিহিত রূপ। আল্লাহ যখন কাউকে অস্তিত্ব দান করেন, তখন সেই অস্তিত্বের মধ্যেই তার ফিতরাত অঙ্কিত করে দেন।
তাই ফিতরাতকে বলা যায় অস্তিত্বের অন্তর্লিখিত বিধান। এটি এমন এক নীরব নিয়ম, যা প্রতিটি সত্তাকে বলে দেয়—সে কী, কী হতে পারে, কী হতে পারে না এবং বৃহত্তর সৃষ্টিব্যবস্থায় তার ভূমিকা কী?
এই দৃষ্টিকোণ থেকে ফিতরাত কেবল মানুষের বিষয় নয়; বরং সমগ্র কায়েনাতের একটি সর্বজনীন নীতি। পানি, আগুন, আলো, হাওয়া নিজেদের অস্তিত্বগত প্রকৃতি অনুসারেই কাজ করে।
বস্তুবাদ অস্তিত্বকে পদার্থের বিন্যাসে সীমাবদ্ধ করেছে, আর অস্তিত্ববাদ অনেক ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যকে মানুষের ব্যক্তিগত নির্মাণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। কিন্তু ফিতরাততত্ত্ব বলে, কোনো সত্তা উদ্দেশ্যহীনভাবে অস্তিত্ব লাভ করে না।
তাই কোরআন যখন বলে যে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সবকিছু আল্লাহর তসবিহ পাঠ করে, তখন তার একটি গভীর অন্ততাত্ত্বিক অর্থও রয়েছে। প্রতিটি সত্তা নিজের ফিতরাত অনুযায়ী পরিচালিত হয়ে তার স্রষ্টার নির্ধারিত আইনের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করছে।
এখানে ফিতরাতকে অস্তিত্বের ব্যাকরণ (গ্রামার অব বিং) হিসেবে বোঝা যেতে পারে। ব্যাকরণ লিখিত-অলিখিত স্বভাবে একটি ভাষার শব্দগুলোকে অর্থপূর্ণ বাক্যে রূপ দেয়। তেমনি ফিতরাত প্রতিটি সত্তার শক্তি, প্রবণতা ও সম্ভাবনাকে একটি সুশৃঙ্খল অস্তিত্বে আকার দেয়।
ব্যাকরণ ভেঙে গেলে ভাষাগত বিপর্যয় ঘটে; তেমনি ফিতরাত থেকে বিচ্যুতি ঘটলে সত্তা তার অস্তিত্বগত সামঞ্জস্য হারায়। মানুষ যখন তার ফিতরাতবিরোধী জীবনযাপন করে, তখন তার মানসিক অস্থিরতা, নৈতিক বিভ্রান্তি ও সামাজিক সংকট জন্ম নেয়।
আবার যখন একটি সমাজ প্রকৃতির ফিতরাত অস্বীকার করে, তখন পরিবেশগত বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে ওঠে। অতএব ফিতরাত কেবল ব্যক্তিগত নৈতিকতার ভিত্তি নয়; সে মহাবিশ্বের অস্তিত্বগত সামঞ্জস্যেরও বনিয়াদ।
ফিতরাত–তত্ত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সে সত্তা ও উদ্দেশ্যের (বিং অ্যান্ড পারপাস) মধ্যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে। আধুনিক দর্শনের একটি বড় অংশ অস্তিত্বকে উদ্দেশ্য থেকে আলাদা করে দেখেছে।
বস্তুবাদ অস্তিত্বকে পদার্থের বিন্যাসে সীমাবদ্ধ করেছে, আর অস্তিত্ববাদ অনেক ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যকে মানুষের ব্যক্তিগত নির্মাণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। কিন্তু ফিতরাততত্ত্ব বলে, কোনো সত্তা উদ্দেশ্যহীনভাবে অস্তিত্ব লাভ করে না। তার অস্তিত্বের মধ্যেই তার উদ্দেশ্যের বীজ নিহিত থাকে।
একটি বীজের মধ্যে যেমন একটি বৃক্ষের সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে, তেমনি মানুষের মধ্যেও নৈতিকতা, জ্ঞান, সৌন্দর্য, ইবাদত ও খেলাফতের সম্ভাবনা নিহিত থাকে। এই সম্ভাবনাগুলো বাইরের সমাজ তৈরি করে না; সমাজ কেবল সেগুলোর বিকাশ বা বিকৃতি ঘটাতে পারে।
ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার অস্তিত্বতত্ত্ব: ওজুদ, মিজান ও তাওহিদের স্থাপত্যফিতরাত তাই একটি টেলিওলজিক্যাল নীতিও বটে। প্রতিটি সত্তা একটি নির্দিষ্ট পরিণতির দিকে গতিমান। তবে এই গতি যান্ত্রিক নয়; অস্তিত্বগত। একটি নদী সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত হয়, একটি বীজ পূর্ণাঙ্গ বৃক্ষে পরিণত হতে চায়, একজন মানুষ সত্য, ন্যায়, সৌন্দর্য ও তার স্রষ্টার দিকে অগ্রসর হওয়ার অন্তর্নিহিত গরজ বহন করে।
মানুষ এই গতি থেকে বিচ্যুত হতে পারে, কারণ তার স্বাধীন ইচ্ছা রয়েছে; কিন্তু সেই বিচ্যুতি কখনো তার প্রকৃত ফিতরাতকে পরিবর্তন করে না। বরং বিচ্যুতি তার ফিতরাতের সঙ্গে সংঘাত সৃষ্টি করে।
এই সংঘাত এড়ানোর ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক স্তরেও নিহিত।
ফিতরাততত্ত্ব তাই সম্পর্কতাত্ত্বিক (রিলেশনাল)। কেননা কোনো সত্তা একা নিজের মধ্যে সম্পূর্ণ নয়। একটি বৃক্ষ মাটি, পানি, সূর্যালোক, বায়ু ও অণুজীবের সঙ্গে সম্পর্ক ছাড়া বাঁচতে পারে না।
একটি নদী পাহাড়, মেঘ, বৃষ্টি ও সাগরের সঙ্গে যুক্ত। মানুষ পরিবার, সমাজ, প্রকৃতি ও সর্বোপরি আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যেই নিজেকে খুঁজে পায়। তাই ফিতরাত ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে অস্বীকার করে না, কিন্তু তাকে সম্পর্কহীন স্বাতন্ত্র্যেও পরিণত করে না। বরং প্রতিটি সত্তাকে একটি বৃহত্তর অস্তিত্বগত জালের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করে সে।
একটি নদী দূষিত করা মানে কেবল পানির গুণগত অবনতি নয়; বরং সেই নদীর অস্তিত্বগত ভূমিকার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। ফলে পরিবেশনীতি এখানে নৈতিকতারই সম্প্রসারিত রূপ।
এই সম্পর্কতাত্ত্বিক ধারণা ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এতে পরিবেশ সংরক্ষণ কেবল সম্পদ ব্যবস্থাপনার বিষয় থাকে না; বরং সে অস্তিত্বগত বিশ্বস্ততার মামলায় পরিণত হয়। তখন একটি বন ধ্বংস করা মানে শুধু গাছ কাটা নয়; বরং বহু সত্তার পারস্পরিক ফিতরাতভিত্তিক সম্পর্ককে ছিন্ন করা।
একটি নদী দূষিত করা মানে কেবল পানির গুণগত অবনতি নয়; বরং সেই নদীর অস্তিত্বগত ভূমিকার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। ফলে পরিবেশনীতি এখানে নৈতিকতারই সম্প্রসারিত রূপ।
ফিতরাততত্ত্ব একই সঙ্গে মূল্যতাত্ত্বিক তাৎপর্যও বহন করে। কোনো সত্তার মূল্য কেবল মানুষের উপযোগিতায় নির্ধারিত হয় না। একটি বন্য প্রাণী, একটি মরুভূমি, একটি পাহাড় কিংবা একটি ক্ষুদ্র কীটপতঙ্গেরও নিজস্ব অস্তিত্বগত মর্যাদা আছে। কারণ, তাদের প্রত্যেকেই আল্লাহর নির্ধারিত ফিতরাত বহন করে।
এই ধারণা মানুষকেন্দ্রিক (অ্যানথ্রোপসেন্ট্রিক) পরিবেশচিন্তার পরিবর্তে একটি ফিতরাতকেন্দ্রিক বিশ্বদৃষ্টির ভিত্তি স্থাপন করে, যেখানে মানুষ সম্মানিত হলেও একমাত্র মূল্যবান সত্তা নয়।
ফিতরাততত্ত্বের অন্ততাত্ত্বিক বিশেষ তাৎপর্য হলো সে তওহিদ ও অস্তিত্বের ঐক্যকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে। যেহেতু সব সত্তা একই স্রষ্টার কাছ থেকে তাদের ফিতরাত লাভ করে, তাই তাদের মধ্যে বৈচিত্র্য থাকলেও তাদের অস্তিত্বগত উৎস এক।
ফলে মহাবিশ্ব কোনো বিচ্ছিন্ন সত্তার সমষ্টি নয়। সে সমন্বিত, অর্থপূর্ণ ও উদ্দেশ্যমুখী জগৎ। এই জগতের প্রতিটি অংশ তার নিজস্ব ফিতরাত অনুযায়ী কাজ করে, আর মানুষের দায়িত্ব হলো নিজের ফিতরাতকে চিনে নেওয়া এবং অন্য সব সত্তার ফিতরাতকে সম্মান করা।
অস্তিত্বদর্শনের পাঠ ও বিচারে তাই ফিতরাতের তত্ত্ব মৌলিক অর্থ উৎপাদন করে।
মানুষ যখন অস্তিত্ব সম্পর্কে চিন্তা করে, প্রথমে তার সওয়াল জাগে —‘কী আছে?’ দর্শনের ইতিহাসে এই প্রশ্ন থেকেই অস্তিত্বতত্ত্বের জন্ম। কোনো কিছু বাস্তব কি না, তার প্রকৃতি কী, পদার্থ ও চেতনার সম্পর্ক কী, সত্তা এক না অনেক, এ রকম সওয়ালকে কেন্দ্র করেই প্রাচীন গ্রিস থেকে আধুনিক ইউরোপ পর্যন্ত দীর্ঘ দার্শনিক ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে।
কিন্তু ফিতরাততত্ত্ব মনে করে, প্রশ্নটি যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, সে আজও অসম্পূর্ণ। কারণ, কোনো কিছুর অস্তিত্ব জানলেই প্রকৃত হাকিকত জানা হয়ে যায় না। একটি অরণ্য যে আছে, এটি এক তথ্য।
কিন্তু সে কেন আছে, তার সৃষ্টিগত প্রকৃতি কী, তার অস্তিত্বের অন্তর্নিহিত অভিমুখ কী এবং সে কী হওয়ার জন্য সৃষ্টি হয়েছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পেলে তার অস্তিত্বের পূর্ণ অর্থ জাহির হয় না।
এখানেই ফিতরাততত্ত্ব প্রচলিত অস্তিত্বদর্শনে আপন মোড় নেয়। সে কেবল অস্তিত্বের তালিকা তৈরি করে না। সে প্রতিটি সত্তার অন্তর্নিহিত স্বভাব (ফিতরাহ), তার উদ্দেশ্য (গায়াত), তার সম্পর্ক এবং বৃহত্তর নেজামের মধ্যে তার অবস্থানকে ব্যাখ্যা করে।
মহাবিশ্বে মানুষের অবস্থান: ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার দৃষ্টিকোণঅর্থাৎ ফিতরাততত্ত্বের কাছে অস্তিত্ব কোনো নিষ্ক্রিয় বাস্তবতা নয়। তাতে আছে অর্থবাহী, উদ্দেশ্যমুখী ও বিধিসম্মত বাস্তবতা। ফলে সে জানতে চায় —‘কী আছে?’ তারপর জানতে চায় ‘যা আছে, তা কী হওয়ার জন্য সৃষ্টি হয়েছে?’
এই পরিবর্তন ছোট নয়। এর দার্শনিক তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। কারণ, সে অস্তিত্বকে নিছক বস্তুর উপস্থিতি থেকে উন্নীত করে সৃষ্টিগত অর্থের পর্যায়ে নিয়ে যায়।
ফিতরাত–তত্ত্বের ঘোষণা হলো—কোনো শূন্য, নিরপেক্ষ বা অর্থহীন অবস্থা নিয়ে কোনো সত্তা অস্তিত্বে আসে না। বরং প্রতিটি সত্তা তার সৃষ্টিগত সারসত্তা (এসেনশিয়াল নেচার), অন্তর্নিহিত প্রবণতা ফিতরাত এবং নির্ধারিত গন্তব্যসহই অস্তিত্ব লাভ করে।
অর্থাৎ অস্তিত্ব ও সারসত্তা এখানে পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। তারা একই সৃষ্টিকর্মের অবিচ্ছেদ্য দুই দিক। আল্লাহ যখন কোনো সত্তাকে সৃষ্টি করেন, তখন তিনি তাকে শুধু অস্তিত্ব দান করেন না; বরং তার পরিচয়, স্বভাব, সীমা, সামর্থ্য এবং উদ্দেশ্যও নির্ধারণ করে দেন।
এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক অস্তিত্ববাদের অন্যতম মৌলিক দাবির বিপরীতে দাঁড়ায়। বিশেষত জ্যঁ-পল সার্ত্রের মতে, মানুষ প্রথমে অস্তিত্ব লাভ করে; তারপর নিজের পরিচয় ও অর্থ নিজেই নির্মাণ করে। মানুষ যেন একটি অনির্ধারিত প্রকল্প, যার কোনো পূর্বনির্ধারিত স্বভাব নেই।
কিন্তু ফিতরাত–তত্ত্ব মনে করে, এই ধারণা মানুষকে স্বাধীনতা দিলেও তাকে অস্তিত্বগত অনিশ্চয়তার মধ্যে নিক্ষেপ করে। যদি মানুষের কোনো সৃষ্টিগত স্বভাব না থাকে, তবে মানুষ কে—এই প্রশ্নের কোনো বস্তুনিষ্ঠ উত্তর থাকে না; নৈতিকতারও কোনো স্থায়ী ভিত্তি থাকে না; জীবনের উদ্দেশ্যও ব্যক্তিগত পছন্দের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
সভ্যতার পুনর্গঠনও কেবল আইন, অর্থনীতি বা প্রযুক্তির সংস্কারের মাধ্যমে সম্ভব নয়; তার জন্য প্রয়োজন মানুষের ফিতরাতের পুনরাবিষ্কার এবং সেই ফিতরাতের ভিত্তিতে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করা।
ফিতরাত–তত্ত্ব এই সংকটের উজানে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ দেখায়। তার মতে, মানুষ পৃথিবীতে নিক্ষিপ্ত কোনো অর্থহীন সত্তা নয়; বরং একটি ফিতরাতপ্রাপ্ত সত্তা। তার অস্তিত্বের সঙ্গে সঙ্গে একটি অন্তর্নিহিত পরিচয়ও জন্ম নেয়। সে কী হতে পারে, কী হতে পারে না; কোন দিকে তার বিকাশ স্বাভাবিক, কোন দিকে তার পতন—এসব প্রশ্নের উত্তর তার ফিতরাতের মধ্যে নিহিত।
ফলে মানুষের পরিচয় সমাজ, রাষ্ট্র, সংস্কৃতি কিংবা ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা দ্বারা সম্পূর্ণ নির্মিত নয়; এগুলোর আগেই তার একটি সৃষ্টিগত পরিচয় বিদ্যমান।
এই কারণেই ফিতরাততত্ত্ব কেবল ব্যক্তির নৈতিকতা নয়, সভ্যতার ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও একটি মৌলিক দাবি উত্থাপন করে। তার মতে, সভ্যতার স্থায়িত্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ কিংবা রাজনৈতিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে সে সভ্যতা মানুষের, প্রকৃতির ও সমগ্র সৃষ্টির ফিতরাতকে কতটা সম্মান করে তার ওপর।
প্রযুক্তি মানুষকে শক্তি দিতে পারে, কিন্তু সেই শক্তি কোন দিকে পরিচালিত হবে, তার নৈতিক ও অস্তিত্বগত দিকনির্দেশনা দেয় ফিতরাত। ফিতরাতহীন প্রযুক্তি শেষ পর্যন্ত শোষণের যন্ত্রে পরিণত হয়; ফিতরাতনির্দেশিত প্রযুক্তি কল্যাণের উপকরণে পরিণত হয়।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে পরিবেশ ধ্বংস, নৈতিক অবক্ষয়, পারিবারিক ভাঙন, মানসিক অস্থিরতা কিংবা রাজনৈতিক সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন সংকট নয়। এগুলো একটি গভীরতর বাস্তবতার লক্ষণ। বাস্তবতাটি হলো: মানুষ তার সৃষ্টিগত ফিতরাত থেকে বিচ্যুত হয়েছে।
তাই সভ্যতার পুনর্গঠনও কেবল আইন, অর্থনীতি বা প্রযুক্তির সংস্কারের মাধ্যমে সম্ভব নয়; তার জন্য প্রয়োজন মানুষের ফিতরাতের পুনরাবিষ্কার এবং সেই ফিতরাতের ভিত্তিতে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করা।
অতএব ফিতরাততত্ত্বের বার্তা হলো—অস্তিত্বের পূর্ণতা নিজের ফিতরাতে, নৈতিকতার ভিত্তি ফিতরাতের প্রতি বিশ্বস্ততায়, পরিবেশের ভারসাম্য ফিতরাতসমূহের পারস্পরিক সামঞ্জস্যে এবং সভ্যতার স্থায়িত্ব ফিতরাতভিত্তিক নেযামের প্রতিষ্ঠায় নিহিত।
কায়েনাতের নেজাম ও অস্তিত্বগত সংহতি: তাওহিদের দার্শনিক ভিত্তি