খিচুড়ি, শিঙাড়া, ফুচকা থেকে শুরু করে গুলবাহার যেভাবে জাপানে পৌঁছে গেল
· Prothom Alo
জাপানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকতেই যদি চোখে পড়ে ক্যাম্পাসজুড়ে উড়ছে কেবল বাংলাদেশের পতাকা, অবাক হবেন নিশ্চয়? তাহলে আরেকটু অবাক করি। একটু ভেতরে ঢুকলেই দেখতে পাবেন বিশাল এক তাঁবুর ভেতর বিক্রি হচ্ছে খিচুড়ি, শিঙাড়া, ফুচকা, লাড্ডু, সেমাই বরফি আর চা। আর সেখানে বিশাল লম্বা লাইনে শাড়ি-পাঞ্জাবি পরে দাঁড়িয়ে আছেন নানা দেশের শিক্ষার্থীরা। খাবারের বুথের পাশেই মেহেদির বুথ। সেখানকার লাইন সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছিলেন পাঁচ-ছয়জন স্বেচ্ছাসেবক। ৬ থেকে ১০ জুলাই জাপানের রিতসুমেইকান এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটিতে (এপিইউ) অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ উইক ২০২৬’-এ দেখা গেল এই দৃশ্য।
Visit saltysenoritaaz.org for more information.
গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি মাথায় বাংলাদেশি নাচ ও গানের মাধ্যমে সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো হয় সপ্তাহব্যাপী আয়োজনেপাহাড় আর সাগর দিয়ে ঘেরা বেপ্পু শহরের এক পাহাড়ের ওপরে এই বিশ্ববিদ্যালয়। মেঘের ওপর বিশাল বড় এই ক্যাম্পাসে পড়াশোনা করতে আসেন ১০০টিরও বেশি দেশের শিক্ষার্থী। এত এত দেশের মানুষ যেখানে আছে, সেখানকার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য চোখে পড়ার মতো হওয়াটাই স্বাভাবিক। সেই সুবাদে বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা প্রতিবছর আয়োজন করেন ‘মাল্টিকালচারাল উইক’। ‘বাংলাদেশ উইক’-এর আয়োজনটাও তারই অংশ। সপ্তাহের প্রথম দিন থেকে শুরু করে শুক্রবার অবধি, পুরো ক্যাম্পাস হয়ে উঠেছিল ছোট্ট এক বাংলাদেশ। সপ্তাহজুড়ে কী কী হলো, সেই গল্পটা আপনাদের শোনাই।
টেইলর সুইফটের বিয়ের ‘আবর্জনা’ বিক্রি হচ্ছে অনলাইনে, ১০০ ডলার দিয়েও কিনছে ভক্তরাবাংলাদেশের মানুষের শিল্প-সংস্কৃতি কিংবা জীবনযাপনের বড় একটা অংশজুড়ে আছে বৃষ্টি। ‘বাংলাদেশ উইক’–এর এবারের থিম তাই বেছে নেওয়া হয়েছিল বৃষ্টি। ৬ জুলাই ‘ওপেনিং প্যারেড’ দিয়ে শুরু হয় আয়োজন। দুই পিরিয়ডের মাঝখানের ১৫ মিনিট বিরতিতে সবাই যখন ক্যাম্পাসের এক মাথা থেকে আরেক মাথায় যান, ঠিক সে সময়টাতে ‘এপিইউ ফাউন্টেনের’ সামনে শুরু হয় পরিবেশনা। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি মাথায় বাংলাদেশি নাচ ও গানের মাধ্যমে সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো হয় সপ্তাহব্যাপী আয়োজনে। ফাউন্টেনের সামনে বসেছিল বায়োস্কোপ, সঙ্গে বিশাল এক রিকশা—এ বছরের আইকন।
এ বছরের আইকন ছিল রিকশাবেলা পড়তেই বেরিয়ে আসে রোদ। ক্যাম্পাসে বসে ফুড বুথ। চিকেন খিচুড়ি আর শিঙাড়া কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়েন বিদেশি শিক্ষার্থীরা। বাংলাদেশি খাবারের স্বাদ এই শহরের শিক্ষার্থীদের কাছে খুব একটা অচেনা নয়। বাংলাদেশি বন্ধু আছে, কিন্তু বাংলাদেশি খাবারের স্বাদ নেওয়া হয়নি—এমন বিদেশি শিক্ষার্থী নেই বললেই চলে। তাই চেখে দেখার সুযোগ ছাড়তে চাইছিলেন না কেউ। ইউরোপীয় অধ্যাপক থেকে শুরু করে মা-বাবার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরতে আসা জাপানি শিশুটিও চপস্টিক (পড়ুন আঙুল) চেটে খাচ্ছিল বাংলাদেশি খিচুড়ি।
খিচুড়ি, শিঙাড়া, ফুচকা, নানা খাবার ছিল অতিথিদের জন্যপরদিনও সকাল থেকে চা আর সেমাই বরফির জন্য লাইন লেগে ছিল। তবে তার চেয়ে লম্বা লাইন ছিল পাশের মেহেদি বুথে। বিনা মূল্যে হাত রাঙিয়ে নেওয়ার সুযোগ কি কেউ ছাড়ে? বিকেল অবধি চলল মেহেদি রাঙানো। সন্ধ্যা নামতেই স্টুডেন্ট হলে শুরু হয় ‘ছায়াছবি’। নব্বইয়ের দশকের বাংলা ছায়াছবির থিমে আয়োজন করা হয় মিউজিক্যাল শো। ‘গুলবাহার’, ‘প্রেমী ও প্রেমী’, ‘মন শুধু মন ছুঁয়েছে’সহ নানা বাংলা গানে নাচতে দেখা যায় দেশি-বিদেশি শিক্ষার্থীদের। জাপানি এক শিক্ষার্থী পরিবেশন করেন ‘সাদা কালো প্রেম’ গানটি। হলভর্তি মানুষে গমগম করছিল পুরো শো।
নাচে–গানে মেতেছিলেন শিক্ষার্থীরাবৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ছিল ‘দেশি মুভি নাইট’। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ উইকে ছিল সিনেমা দেখার আয়োজন। গ্যালারি আকৃতির ওপেন স্পেসে বসে সবাই উপভোগ করেন নুহাশ হুমায়ূনের পেট কাটা ষ। ভয়ে চোখমুখ কুঁচকে বসে থাকা দর্শকদের দেখে জাপানি সাবটাইটেলের অভাব একদমই টের পাওয়া যায়নি।
সপ্তাহের শেষ দিন, শুক্রবার ছিল সবচেয়ে বড় আয়োজন ‘গ্র্যান্ড শো’। বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলনায়তন ‘মিলেনিয়াম হলে’ সন্ধ্যায় শুরু হয় ‘বাংলাদেশ উইক’–এর শেষ আয়োজন। রবীন্দ্রনাথের ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে’ গানে কয়ারের মাধ্যমে শুরু হয় গ্র্যান্ড শো। বাংলাদেশের রূপকথা ও পৌরাণিক চরিত্রগুলো ছিল গ্র্যান্ড শোর মূল চরিত্র। ফ্যাশন শোতে দেখা যায় বনবিবি, দক্ষিণ রায়, জলপরি, বেহুলা-লখিন্দর, মনসা, বেদের মেয়ে ও শাকচুন্নির মতো রূপকথার চরিত্রদের। ফ্যাশন শো শেষে শুরু হয় মঞ্চনাটক ‘ওয়ানা নো আ সিক্রেট?’। এক রাতে হঠাৎ ছোট্ট মুনিয়ার মা অসুস্থ হয়ে পড়ে। মুনিয়াকে বাসায় একা রেখে সবাই মাকে নিয়ে চলে যায় হাসপাতালে। মন খারাপ করে মুনিয়া একাই বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়, মায়ের খোঁজে। একে একে দেখায় হয় কানাভুলা, ডাইনি বুড়ি, কাপ্পা, স্প্রাইট ও খোক্ষসের সঙ্গে। ঘটতে থাকে একের পর ঘটনা। সবাই যাচ্ছে ভালেতে, সঙ্গে যোগ হয় মুনিয়া। কিশোর আলোয় প্রকাশিত গোলাম মমীতের ‘একটা গোপন কথা’ গল্পের আলোকে মঞ্চস্থ হয় এই নাটক। দর্শকের চিৎকার ও হাসিই বলে দিচ্ছিল কতটা উপভোগ্য ছিল এই শো।
ভিনদেশি শিক্ষার্থীরাও অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন পরিবেশনায়বাংলাদেশ উইকের আমন্ত্রণে গ্র্যান্ড শোতে উপস্থিত ছিলেন জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলী। তিনি এই আয়োজনের পেছনে থাকা সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে এমন আয়োজনের পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচের ভেন্যুতে শোভা পাচ্ছে জিহানের আঁকা দেয়ালচিত্র