দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো বড় ইবাদত

· Prothom Alo

শরীরের একটা আঙুলে কাঁটা ফুটলে সারা শরীর টের পায়—ঘুম নষ্ট হয়, জ্বর আসে, মনোযোগ সরে যায় সেই একটা বিন্দুতে। নবীজি (সা.) মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্ককে ঠিক এই উপমা দিয়েই বুঝিয়েছেন।

Visit saltysenoritaaz.org for more information.

তিনি বলেছেন, ‘মুমিনদের পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সহানুভূতির উদাহরণ একটা দেহের মতো। দেহের কোনো একটা অঙ্গ আক্রান্ত হলে সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অনিদ্রা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে তার সঙ্গে সাড়া দেয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১১)

এই একটা উপমাই আসলে ইসলামে দুর্যোগের মুহূর্তের নীতিশাস্ত্রের ভিত্তি। বন্যা, ভূমিকম্প, দুর্ভিক্ষ, মহামারি—যুগে যুগে যে নামেই বিপর্যয় আসুক, প্রশ্নটা সব সময় একই থাকে: শরীরের বাকি অংশ কি সাড়া দেবে, নাকি অসাড় থেকে যাবে?

অন্যের সুখে সুখী হওয়া যত সহজ, দুঃখ ভাগ নেওয়া ঠিক তত কঠিন। আর এই কঠিন কাজটিই নবীজি মুমিনের সংজ্ঞার অংশ করে দিয়েছেন।

একটি হাদিসের তিনটি স্তর

হাদিসবিশারদগণ এই একটি হাদিসের মধ্যেই কাছাকাছি অর্থের তিনটি শব্দ খুঁজে পেয়েছেন: ‘তারাহুম’, ‘তাওয়াদ’ ও ‘তাআতুফ’।

  • ‘তারাহুম’ হলো ইমানি ভ্রাতৃত্বের টানে সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে একে অন্যের প্রতি দয়া-মায়ার আচরণ।

  • ‘তাওয়াদ’ হলো এমন আচরণ, যা অন্তরে স্থায়ী ভালোবাসা সঞ্চার করে। যেমন খোঁজখবর নেওয়া, বিপদে পাশে দাঁড়ানো, উপহার বিনিময়।

  • ‘তাআতুফ’ মানে গভীর মায়ার সঙ্গে বৈষয়িক সাহায্য করা, বিপদের সময় পরম আশ্রয় হওয়া। (ইবনে হাজার আল-আসকালানি, ফাতহুল বারি ফি শারহি সহিহিল বুখারি, ১০/৫৪০, দারুস সালাম, রিয়াদ, ২০০০)

সংসারের টানাপোড়েনে নবীজির ভালোবাসার শিক্ষা

তিনটি শব্দ মিলে যে চিত্র আঁকে, তা হলো, সমবেদনা কেবল অনুভূতির স্তরে থেমে থাকে না, তা রূপান্তরিত হয় বাস্তব সহযোগিতায়। অন্যের সুখে সুখী হওয়া যত সহজ, দুঃখ ভাগ নেওয়া ঠিক তত কঠিন। আর এই কঠিন কাজটিই নবীজি মুমিনের সংজ্ঞার অংশ করে দিয়েছেন।

যে দান সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ সফলকাম ও পুণ্যবানদের পরিচয় দিতে গিয়ে নির্দিষ্ট করে বলেছেন, ‘অথবা দুর্ভিক্ষের দিনে অন্নদান করা এতিম নিকটাত্মীয়কে, অথবা ধূলি-ধূসরিত মিসকিনকে।’ (সুরা বালাদ, আয়াত: ১৪-১৬)

এখানে সাধারণ দানের কথা নয়, বলা হয়েছে ‘দুর্ভিক্ষের দিনে’ দানের কথা। যখন নিজের হাতেও টান পড়ে, তখনকার দানকেই বিশেষভাবে মূল্য দেওয়া হয়েছে। প্রাচুর্যের সময়ের দান আর সংকটের সময়ের দান এক ওজনের নয়।

সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১১মুমিনদের পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সহানুভূতির উদাহরণ একটা দেহের মতো। দেহের কোনো একটা অঙ্গ আক্রান্ত হলে সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অনিদ্রা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে তার সঙ্গে সাড়া দেয়।

এই নীতিরই সম্প্রসারণ রয়েছে নবীজির (সা.) আরেকটি বাণীতে, ‘দয়াশীলদের প্রতি পরম দয়াময় আল্লাহ দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীর অধিবাসীদের প্রতি দয়া করো, আসমানের অধিপতি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৪১)

এই হাদিসটি তাফসিরকারগণ সুরা বালাদের ওই আয়াতগুলোর ব্যাখ্যাতেও উদ্ধৃত করে থাকেন।

সংকটে শত্রুকে নবীজির সহায়তা

এই নীতির সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছিলেন নবীজি নিজেই। হোদাইবিয়ার সন্ধির পর মক্কায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এ সময় মানুষ খাদ্যের অভাবে চামড়া আর হাড় চিবিয়ে খাচ্ছিল।

মক্কার নেতা আবু সুফিয়ান, যিনি তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি এবং যাঁর নেতৃত্বে মুসলিমরা বছরের পর বছর নির্যাতিত হয়েছিল, তিনি মদিনায় এসে নবীজির (সা.) কাছে সাহায্যের আবেদন জানান।

হোদাইবিয়া: আল্লাহর পরিকল্পনা যেভাবে বাস্তবায়িত হয়

নবীজি (সা.) পুরোনো সব শত্রুতা ভুলে মক্কার অভুক্ত মানুষের জন্য খাদ্যসামগ্রী ও খেজুরের ত্রাণ পাঠান, যা আবু সুফিয়ান ও সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার মাধ্যমে মক্কার দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করা হয়। জানা যায়, এই ত্রাণের পরিমাণ ছিল পাঁচশত দিনার (স্বর্ণমুদ্রা)।

তখন এক দিনারে একটি বকরি কেনা যেত। (কুরতুবি, আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন, ১৮/২৩৩, দারুল কুতুব আল-মিসরিয়্যাহ, কায়রো)

দেখা যাচ্ছে এখানে সাহায্যপ্রাপ্ত মানুষেরা মিত্র ছিলেন না, আত্মীয় ছিলেন না, এমনকি সহধর্মেরও ছিলেন না। তাঁরা ছিলেন সেই মানুষ, যাঁদের হাতে মুসলিমরা বছরের পর বছর নিপীড়িত হয়েছে।

‘এক দেহ’-এর উপমাটা তাই এখানে তার সর্বোচ্চ সীমায় পরীক্ষিত হয়। সমবেদনা যদি শুধু নিজের গোষ্ঠীর ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তা নীতি নয়, নিছক গোত্রপ্রীতি হয়। নবীজির এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে, ইসলামে মানবিক সাহায্যের ভিত্তি ধর্ম-পরিচয় নয়, বরং মানুষের কষ্ট।

আমাদের প্রত্যেকের এই সাড়া হয়তো ছোট, কিন্তু ‘এক দেহ’-এর উপমায় কোনো অংশই ‘ছোট’ থাকে না। জ্বরটা পুরো শরীরেই ছড়ায়, শুধু আক্রান্ত অঙ্গে নয়।

শেষ কথা

এই একই পরীক্ষা প্রতিটি প্রজন্মের সামনে নতুন রূপে হাজির হয় কখনো বন্যা, কখনো ভূমিকম্প, কখনো মহামারি বা দুর্ভিক্ষ রূপে। শরীরের বাকি অংশ কি সাড়া দেয় এখন? আমরা কি একটি শুকনো খাবারের প্যাকেট, এক বোতল বিশুদ্ধ পানি, সামর্থ্য অনুযায়ী সামান্য অর্থ নিয়েও এগিয়ে যাচ্ছি?

আমাদের প্রত্যেকের এই সাড়া হয়তো ছোট, কিন্তু ‘এক দেহ’-এর উপমায় কোনো অংশই ‘ছোট’ থাকে না। জ্বরটা পুরো শরীরেই ছড়ায়, শুধু আক্রান্ত অঙ্গে নয়।

এই বোঝাপড়া থেকেই বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে আসা আমাদের অপরিহার্য কর্তব্য। আমাদের চেষ্টা আল্লাহর রহমত ও সন্তুষ্টি অর্জনের এক অনন্য মাধ্যম হবে নিশ্চয়ই।

মাহমুদ হাসান ফাহিম : শিক্ষক, বাইতুল আকরাম মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্স, টঙ্গী

অতিবৃষ্টি–অনাবৃষ্টির খোদায়ি রহস্য ও মুমিনের করণীয়

Read full story at source