কম্পিউটারে না লিখে হাতে লিখলে কেন বেশি দিন পড়া মনে থাকে
· Prothom Alo
ক্লাসে স্যার যখন একটানা লেকচার দিয়ে যান, তখন তুমি কী করো? নিশ্চয়ই খাতায় নোট করো। কেউ হয়তো খুব দ্রুত ল্যাপটপ, ট্যাব বা মুঠোফোনের স্ক্রিনে কথাগুলো টাইপ করে নেয়। খাতায় নোট করলে যেভাবে পড়া মনে থাকে, মুঠোফোনে নোট করলে কি সেভাবে মনে থাকে?
স্মার্টফোন ও ল্যাপটপের এই যুগে খাতা–কলম নিয়ে বসে নোট করা তোমার কাছে সেকেলে মনে হতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে অন্য কথা। কোনো কিছু ভালোভাবে শিখতে ও স্মৃতিতে ধরে রাখতে ওই খাতা–কলমই এখনো সেরা। কেন? বিজ্ঞানীরা অবশেষে সেই রহস্যের নিখুঁত উত্তর খুঁজে পেয়েছেন।
Visit librea.one for more information.
ফ্রন্টিয়ারস ইন সাইকোলজি জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা হাতে নোট নেন, তাঁদের মস্তিষ্কে বিদ্যুৎ তরঙ্গের চলাচল অনেক বেশি থাকে। নরওয়েজিয়ান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির দুই গবেষক অড্রে ফন ডার মেয়ার ও রুড ফন ডার ওয়েল সম্প্রতি দারুণ একটা পরীক্ষা চালিয়েছেন। তাঁরা ৩৬ শিক্ষার্থীর মাথায় ২৫৬টি সেন্সর বসানো বিশেষ একধরনের টুপি পরিয়ে দেন। এরপর তাদের সামনে স্ক্রিনে পিকশনারি গেমের ১৫টি শব্দ দিয়ে বলা হয়, এগুলোকে হয় কিবোর্ডে টাইপ করতে হবে, না হয় খাতায় হাতে লিখতে হবে।
অস্ট্রেলিয়ার সমুদ্রসৈকতে ভেসে এল রহস্যময় ধাতব গোলকফলাফল ছিল চমকে দেওয়ার মতো। বিজ্ঞানীরা দেখলেন, শিক্ষার্থীরা যখন হাতে লিখছিল, তখন তাদের মস্তিষ্কের অনেকগুলো অংশ একসঙ্গে জেগে উঠেছিল। বিশেষ করে নড়াচড়া, দৃষ্টি ও স্মৃতি ধরে রাখার সঙ্গে যুক্ত অংশগুলোর মধ্যে দারুণ এক যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল। অন্যদিকে যারা টাইপ করছিল, তাদের মস্তিষ্কে এ ধরনের কোনো স্ফুলিঙ্গ দেখা যায়নি।
টাইপ করলে আসলে কী সমস্যা হয়? প্রফেসর অড্রে ফন ডার মেয়ার একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তুমি যখন কিবোর্ডে টাইপ করো, তখন স্যারের কথাগুলো এক কান দিয়ে ঢোকে আর আঙুলের ডগা দিয়ে বেরিয়ে যায়। তুমি হয়তো প্রতিটি কথা হুবহু লিখে ফেলছ, কিন্তু তোমার মস্তিষ্ক সেই তথ্যগুলো নিয়ে একটুও ভাবার বা বিশ্লেষণ করার সময় পাচ্ছে না।
অন্যদিকে হাতে লেখার সময় স্যারের প্রতিটি কথা হুবহু খাতায় তোলা প্রায় অসম্ভব। তখন বাধ্য হয়েই তোমাকে মন দিয়ে লেকচার শুনতে হয়। তুমি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো বেছে নাও এবং নিজের মতো করে খাতায় লেখো। এই যে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো বেছে নেওয়ার জন্য তুমি মস্তিষ্ককে কাজে লাগাচ্ছ, এটাই নতুন কিছু শেখার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
আরেকটি মজার ব্যাপার হলো পেশির নড়াচড়া। তুমি কিবোর্ডে যখন ‘ক’ টাইপ করো, আবার ‘খ’ টাইপ করো, তোমার আঙুলের নড়াচড়া কিন্তু একদম একই থাকে। শুধু আলাদা দুটি বোতামে চাপ দিচ্ছ তুমি। কিন্তু খাতায় ‘ক’ লেখার অনুভূতি ও ‘খ’ লেখার অনুভূতি কি এক? মোটেও নয়! হাতে লেখার সময় প্রতিটি অক্ষরের জন্য তোমার আঙুল ও কবজিকে আলাদাভাবে নড়াচড়া করতে হয়। ফন ডার মেয়ার জানান, যেসব শিশু প্রথম থেকেই ট্যাবে বা মুঠোফোনে টাইপ করে বড় হয়, তারা প্রায়ই ‘b’, ‘d’ বা ‘p’, ‘q’–এর মতো কাছাকাছি দেখতে অক্ষরগুলো গুলিয়ে ফেলে। কারণ, তাদের মস্তিষ্ক এই অক্ষরগুলোর নিজস্ব আকার পেশির সাহায্যে কখনো আলাদাভাবে অনুভব করেনি।
চীনে বন্যার পানিতে ভেসে গেছে ৯০০ বিষধর সাপভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটির এডুকেশনাল নিউরোসায়েন্সের অধ্যাপক সোফিয়া ভিঞ্চি–বুহের বিষয়টিকে আরও চমৎকারভাবে বুঝিয়েছেন। তুমি যখন হাতে কোনো শব্দ লেখো বা আঁকো, তখন তোমার চোখ যা দেখছে, তোমার হাত ঠিক সেটাই তৈরি করছে। চোখের দেখা আর হাতের এই নড়াচড়ার কারণে তোমার মস্তিষ্কে একধরনের স্থায়ী ছাপ তৈরি হয়। এটা অনেকটা কল্পনার কোনো ছবিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার মতো। তুমি যখন তোমার ভাবনাকে নিজ হাতে খাতার পাতায় ফুটিয়ে তোলো, তখন সেটা স্মৃতির পাতায় একেবারে গেঁথে যায়।
সঠিক অভ্যাসের মাধ্যমে হাতের লেখা সুন্দর করার চেষ্টা করতে হবে ছোটবেলাতেইকানাডার ইউনিভার্সিটি অব ওয়াটারলুর গবেষক যাদুর্শনা শিবশঙ্কর এখানে আরেকটি ভয়ংকর বিপদের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। আজকাল আমরা সবকিছুই যন্ত্রের ওপর ছেড়ে দিচ্ছি। রাস্তা খোঁজার জন্য জিপিএস, কিছু মনে রাখার জন্য রিমাইন্ডার, ক্লাসের স্লাইড মনে রাখার জন্য ছবি তোলা—এই যে নিজের মস্তিষ্কের কাজগুলো যন্ত্রকে দিয়ে করানো, একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে কগনিটিভ অফলোডিং। এটি হয়তো তোমার সময় বাঁচায়, কিন্তু এতে তোমার মস্তিষ্ক অলস হয়ে পড়ছে। কাজ না করার কারণে তোমার স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।
তাহলে কি ল্যাপটপ বা মুঠোফোন একদম ছুড়ে ফেলবে? বিজ্ঞানীরা কিন্তু তা বলছেন না। বড় কোনো প্রবন্ধ লেখা বা ইন্টারনেট ঘেঁটে তথ্য খোঁজার জন্য এগুলো অবশ্যই দরকার। প্রযুক্তি শিক্ষাকে আরও সহজ ও সাবলীল করে তুলেছে। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন আমরা প্রযুক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ি।
তাই আধুনিক যুগে প্রযুক্তির সুবিধা তুমি নিশ্চয়ই নেবে, কিন্তু নিজের মস্তিষ্ককে সচল রাখতে খাতা–কলমের সঙ্গে বন্ধুত্বটা কোনোভাবেই ছিন্ন করা যাবে না।
সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকানপ্রায় ভুলে যাওয়া এক ফলের নাম পুতিজাম