স্বাভাবিক প্রসব ৯৮ শতাংশ, সেরার স্বীকৃতি পেল যে মা ও শিশু কেন্দ্র
· Prothom Alo

নোয়াখালীর মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র। নিরাপদ প্রসবসেবার জন্য গত ছয় মাসে এই কেন্দ্রে ভর্তি হন ১ হাজার ২৯৭ জন নারী। এর মধ্যে ১ হাজার ২৭৪ জনই স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে মাত্র ২৩ জনের। শতকরা হিসাবে ৯৮ ভাগ সেবাগ্রহীতারই কোনো ধরনের অস্ত্রোপচার ছাড়া মা হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে।
Visit tr-sport.click for more information.
নানা সংকটের মধ্যেও স্বাভাবিক প্রসবসেবায় এরই মধ্যে সুনাম কুড়িয়েছে নোয়াখালীর মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র। প্রসূতি ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবায় ঈর্ষণীয় সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্প্রতি দেশের ৬৪টি জেলা পর্যায়ের মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের মধ্যে ‘জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে নির্বাচিত হয় কেন্দ্রটি। ১২ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এক জমকালো অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির হাত থেকে সম্মাননা স্মারক ও সনদ গ্রহণ করেন মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটির দায়িত্বরত চিকিৎসক।
মুহাম্মদ জিহাদুল হক, চিকিৎসক, নোয়াখালী মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র।এখানে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। নিরাপদে স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে যাতে সন্তানের জন্ম হয়, সে চেষ্টাই বেশি থাকে। অপ্রয়োজনীয় কোনো সিজারিয়ান সেকশন করা হয় না।২০০৫ সালের ১৭ এপ্রিল নোয়াখালী সদরের মাইজদীর বার্লিংটন মোড় এলাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে এই মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র। তবে নানা সংকট, জনবল ও ব্যবস্থাপনার অভাবে একসময় মুখ থুবড়ে পড়ে এর কার্যক্রম। অবস্থা এতটাই বেগতিক ছিল যে ২০১৬ সালে এ প্রতিষ্ঠানে প্রসবের সংখ্যা নেমে আসে একবারে শূন্যে। ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পান চিকিৎসক মুহাম্মদ জিহাদুল হক। তাঁর প্রচেষ্টায় ওই বছরের শুরু থেকে আবারও নিরাপদ প্রসবসেবায় সুনাম ছড়াতে শুরু করে মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটি।
যেসব সেবা মেলে
প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে প্রসবপূর্ব, প্রসবকালীন ও প্রসব–পরবর্তী সেবার পাশাপাশি পরিবার পরিকল্পনা এবং শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের বয়ঃসন্ধিকালীন সেবা দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসক মুহাম্মদ জিহাদুল হকের পাশাপাশি কেন্দ্রটিতে রয়েছেন ছয়জন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা, একজন ল্যাব টেকনোলজিস্ট, একজন ফার্মাসিস্ট, একজন মিডওয়াইফ, একজন অ্যাম্বুলেন্স চালক ও পাঁচজন আয়া। কেবল নোয়াখালী নয়, পাশের লক্ষ্মীপুর জেলা থেকেও রোগীরা ছুটে আসেন এ কেন্দ্রে।
স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া এক শিশুকে কোলে নিয়েছেন তার দাদি। গত মঙ্গলবার নোয়াখালীর মা ও শিশু কেন্দ্রেবাড়ছে নিরাপদ প্রসব
২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে কেন্দ্রটিতে স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে ৩১৪ জনের। একই সময়ে ১৪ জন নারী অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দিয়েছেন। প্রসবসেবা নিতে আসা নারীর সংখ্যা ছিল আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি।
২০২১-২২ সালে স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে ৭৭৫ জনের, অস্ত্রোপচার হয়েছে ২০টি। ২০২২-২৩ সালে স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে ১ হাজার ৪২৩ জনের এবং অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দিয়েছেন ২৮ জন। ২০২৩-২৪ সালে ২ হাজার ৯৮ জনের স্বাভাবিক প্রসব এবং ৯৮ জনের অস্ত্রোপচার হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৬ মাসে ১ হাজার ২৭৪টি স্বাভাবিক প্রসব এবং ২৩টি অস্ত্রোপচার হয়। চলতি জুলাই মাসের প্রথম ১৫ দিনে ১৬০ জন নারীর স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দিয়েছেন পাঁচজন।
সেবাগ্রহীতারা যা বলছেন
নোয়াখালী সদর উপজেলার নলপুর গ্রামের বাসিন্দা শাহদাত হোসেন। তাঁর স্ত্রী, বোন ও ভাগনি প্রসবসেবা নিয়েছেন নোয়াখালীর মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র। সবাই স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন।
শাহাদাত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘শহরের ব্যবসা করলেও এই মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র সম্পর্কে জানতাম না। পরিচিত একজন বলেছিলেন, বিনা মূল্যে মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটিতে নরমাল ডেলিভারি হয়। অস্ত্রোপচার হলেও খুব একটা খরচ হয় না। এসব কথা শুনে নিজের স্ত্রীকে প্রথম মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে নিয়ে গিয়েছিলাম। তাদের সেবার মান খুবই ভালো।’ তিনি আরও বলেন, ‘স্ত্রীর পরে আমার বোন, ভাগনিসহ অনেকেই এখানে সেবা নিয়েছেন। সবাই সেবা নিয়ে সন্তুষ্ট।’
সদর উপজেলার আরেক বাসিন্দা সালমা আক্তারের পুত্রবধূ এই কেন্দ্রে সেবা নিয়েছেন। সালমা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, প্রয়োজন ছাড়াই অস্ত্রোপচার করা হবে—এমন শঙ্কায় এখন অনেক নারী স্থানীয় বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় ভর্তি হতে চান না। তিনি নিজের পুত্রবধূকেও তাই মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে নিয়ে যান। সেখানে স্বাভাবিকভাবে তাঁর পুত্রবধূ সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। বর্তমানে মা ও সন্তান দুজনই সুস্থ রয়েছেন।
রয়েছে জনবলসংকট
স্বাভাবিক সন্তান প্রসবে দেশসেরার স্বীকৃতি মিললেও প্রতিষ্ঠানটির নিয়মিত জনবল নেই বললেই চলে। কেন্দ্রের মেডিক্যাল অফিসার (ক্লিনিক) পদটি শূন্য। ওই পদে মেডিক্যাল অফিসার (অ্যানেসথেসিয়া) মুহাম্মদ জিহাদুল হক চলতি দায়িত্ব পালন করছেন। বাকি পদগুলোর মধ্যেও স্থায়ীভাবে কর্মরত কেবল অ্যাম্বুলেন্সচালক। অন্য পদগুলোয় থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও প্রেষণে দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রতিষ্ঠানটিতে একটি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও জ্বালানি খাতে বাজেট বা বরাদ্দ নেই; যার কারণে জরুরি ক্ষেত্রে রোগী আনা-নেওয়া করা যাচ্ছে না। একইভাবে পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহের ঘাটতি রয়েছে। তাই বাধ্য হয়ে রোগীদের অনেক জরুরি ওষুধ বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়। কেন্দ্রটিতে একজন প্রসূতিবিশেষজ্ঞ থাকলে সেবার মান আরও বাড়ানো যেত বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে ক্রেস্ট ও সনদ নিচ্ছেন চিকিৎসক মুহাম্মদ জিহাদুল হকনোয়াখালী মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের চিকিৎসক মুহাম্মদ জিহাদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখানে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। নিরাপদে স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে যাতে সন্তানের জন্ম হয়, সে চেষ্টাই বেশি থাকে। অপ্রয়োজনীয় কোনো সিজারিয়ান সেকশন করা হয় না।’
মুহাম্মদ জিহাদুল হক আরও বলেন, ‘এই মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র দেশসেরার স্বীকৃতি পেয়েছে—এটি আমাদের জন্য উৎসাহের। তবে সীমিত সামর্থ্যের কারণে এখন সেবা দিতে গিয়ে অনেকটা হিমশিম খেতে হচ্ছে। এসব সীমাবদ্ধতা দূর করা গেলে আরও বেশি মা ও শিশুকে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।’
জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক আবুল কাশেম মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আর্থিক অক্ষমতার কারণে দরিদ্র মানুষ হাসপাতালে যেতে চান না। অদক্ষ ধাত্রীদের মাধ্যমে প্রসব করিয়ে মা ও শিশুর জীবন ঝুঁকিতে ফেলেন। তাঁরা যাতে বিনা মূল্যে নোয়াখালী মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে সেবা নেন, এটিই তাঁর চাওয়া।
আবুল কাশেম মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, ‘সরকারের মূল লক্ষ্য হলো প্রাতিষ্ঠানিক স্বাভাবিক প্রসবসেবা নিশ্চিত করা এবং ঘরবাড়িতে ঝুঁকিপূর্ণ প্রসব বন্ধ করা। চিকিৎসক জিহাদুল হক এবং তাঁর টিমের সদস্যরা এই লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। জাতীয় পর্যায়ে তাঁদের পুরস্কৃত হওয়া নোয়াখালীবাসীর জন্যই গর্বের।’