এই স্পেন না জিতলে অবিচার হতো
· Prothom Alo
ফুটবল তাহলে এভাবেও খেলা যায়! পাসের পর পাস আর প্রেসিংয়ের পর প্রেসিংয়ে প্রতিপক্ষের দম আটকে শেষ দিকে গোল করে ম্যাচটা নিজের নামে করে নেওয়া। ফাইনালসহ বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে স্পেন ঠিক এই একই ছকে হারিয়েছে পরপর তিনটি প্রতিপক্ষকে। শুধু ম্যাচের চূড়ান্ত স্কোরলাইন দেখলে বোঝা কঠিন, কতটা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে ফুটবলটা খেলেছে তারা।
একটি পরিসংখ্যানই সেই আধিপত্য বোঝাতে যথেষ্ট। পুরো টুর্নামেন্টের আট ম্যাচে স্পেনের বিপক্ষে প্রতিপক্ষরা সব মিলিয়ে তৈরি করতে পেরেছে মাত্র ২.২ এক্সপেক্টেড গোল (xG)! সহজ কথায়, প্রতিপক্ষ দলগুলো কোনো বিপজ্জনক সুযোগই তৈরি করতে পারেনি। রক্ষণাত্মক কাঠামোয় এমন অভূতপূর্ব দাপট ফুটবলেই বিরল।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
ফাইনালেও চিত্রটা বদলায়নি একটুও। লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা ১২০ মিনিটের লড়াইয়ে প্রতিপক্ষের গোলমুখে একটি শটও রাখতে পারেনি। সত্যি বলতে, স্পেন তাদের সেই জায়গাটুকু দেয়নি। মেসির সঙ্গে সতীর্থদের সংযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে, মাঝমাঠ ও রক্ষণে নিখুঁত প্রেসিংয়ের জাঁতাকলে পিষে আর্জেন্টিনাকে নিজেদের চেনা ফুটবলটা খেলতেই দেয়নি তারা। বলের দখল, আক্রমণ কিংবা গোলের সম্ভাবনা—সবকিছুতেই স্পেনের স্পষ্ট আধিপত্য। কেবল কাঙ্ক্ষিত গোলটাই আসছিল না।
১৬ বছর পর আবার বিশ্বসেরা স্পেনএমিলিয়ানো মার্তিনেজ যদি একের পর এক দুর্দান্ত সেভ না করতেন, তবে নির্ধারিত ৯০ মিনিটেই স্পেনের জয় নিশ্চিত হয়ে যেত। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে ফেরান তোরেসের সেই সোনালি মুহূর্তের গোলেই স্পেনের মাথায় ওঠে ইতিহাসের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ মুকুট। ২০১০ সালের সেই মধুর স্মৃতি ফিরিয়ে এনে এবারও ইউরো চ্যাম্পিয়নের তকমা গায়ে নিয়েই বিশ্বজয়ের মঞ্চে শেষ হাসি হাসল তারা।
২০১০ সালের মতো এবারও বিশ্বকাপের যাত্রা শুরু হয়েছিল একটু হোঁচট খেয়ে। সেবার সুইজারল্যান্ডের কাছে হার দিয়ে শুরু হয়েছিল, আর এবার কেপ ভার্দের সঙ্গে ড্র দিয়ে। তবে সেই সাময়িক টালমাটাল পর্বের পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বিজয়ের পতাকা উড়িয়ে ট্রফি হাতেই শেষ হলো তাদের এই অবিস্মরণীয় যাত্রা।
ইয়ামালের উদ্যাপনটুর্নামেন্ট যত গড়িয়েছে, স্পেনের দৃঢ়তা ও পরিপক্বতা যেন ততই রূপ মেলে ধরেছে। সেমিফাইনালে অন্যতম ফেবারিট ফ্রান্সকে নিশ্বাস ফেলার সুযোগটুকু না দিয়ে ম্যাচটা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল তারা। এই নীরব বিপ্লবের কারিগর ছিলেন শান্ত ও সংযত কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। ২০২৪ সালের ইউরোর সাফল্যের পর এবারও মহাদেশীয় কিংবা বিশ্বমঞ্চ—দুই জায়গার প্রচণ্ড চাপের মধ্যেও দলকে রেখেছিলেন একদম শান্ত ও অবিচল। ফাইনালের চড়া মেজাজ আর উত্তেজনার মুখেও স্পেনের তরুণ দল ধীরস্থির থেকেছে।
সেবার ইনিয়েস্তা, এবার তোরেসএনজো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড পেয়ে মাঠ ছাড়ার পর একজন খেলোয়াড় বেশি থাকার সুবিধা নিখুঁতভাবে কাজে লাগিয়ে ম্যাচের লাগাম আরও শক্ত করে ধরে তারা। বদলি হিসেবে নেমে নিকো উইলিয়ামস স্পেনের আক্রমণে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেন, আর সেই আক্রমণের তোড় থেকেই অবশেষে আসে কাঙ্ক্ষিত জয়সূচক গোল।
তবে ফাইনালে আলাদা করে বলতেই হবে রদ্রির কথা। মাঝমাঠের অধিনায়ক হিসেবে রদ্রির পারফরম্যান্স ছিল এককথায় অনবদ্য। ২০২৫ সালের মারাত্মক হাঁটুর চোটের দুঃসময় কাটিয়ে তিনি যেন ফিরে পেয়েছেন নিজের চেনা রাজকীয় ছন্দ।
ফেরান তোরেসের গোল উদ্যাপনবল ছিনিয়ে নেওয়া থেকে শুরু করে ম্যাচের গতি নির্ধারণ—সব জায়গায় তিনি ছিলেন একাই এক এক শ। আর্জেন্টিনা তাঁকে থামানোর পথ খুঁজে পেয়েছিল কেবল দুজন দিয়ে ঘেরাও করে কিংবা ফাউল করে। টুর্নামেন্টজুড়ে তাঁর এই অবিশ্বাস্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁর হাতেই উঠেছে কাঙ্ক্ষিত গোল্ডেন বল।
রদ্রি গোল্ডেন বল জিতলেও স্পেনের এই বিশ্বকাপ জয়ের আসল রহস্য লুকিয়ে ছিল তাদের নিখুঁত দলগত শক্তিতে। কিলিয়ান এমবাপ্পে, লিওনেল মেসি, জুড বেলিংহাম কিংবা আর্লিং হলান্ডদের ঘিরে তৈরি হওয়া একক ব্যক্তিকেন্দ্রিক যে আলো, সেখান থেকে স্পেন ছিল অনেক দূরে।
রদ্রি পেলেন গোল্ডেন বল, এমবাপ্পে গোল্ডেন বুট: আর কার হাতে কোন পুরস্কারতারা নীরবে-নিভৃতে কেবল নিজেদের ফুটবলটাই খেলে গেছে। দিন শেষে সেই নিয়মানুবর্তিতা, শৃঙ্খলিত ভাব আর সামষ্টিক ফুটবলের পরম পুরস্কার হিসেবেই দ্বিতীয়বারের মতো স্পেনের হাতে শোভা পেল বিশ্বকাপের ট্রফি। তাই এই জয় কেবল একটি দলের জয় নয়; এ জয় আক্রমণাত্মক, ইতিবাচক ও নান্দনিক ফুটবলের এক অপূর্ব উদ্ভাস।
নিউ জার্সির এই ফাইনালে স্পেন যেভাবে নিজেদের মেলে ধরেছিল, ট্রফিটা তাদের হাতে না উঠলে তা এক পরম অবিচার হতো। স্বস্তির বিষয়, ফুটবল অন্তত সেই অবিচারটা হতে দেয়নি।