প্রযুক্তিনির্ভর মানব পাচার প্রতিরোধে দরকার সমন্বিত উদ্যোগ
· Prothom Alo

‘প্রযুক্তির ফাঁদে প্রতারণা ও মানব পাচার: করণীয় কী?’ গোলটেবিল যৌথভাবে আয়োজন করে ইউএনওডিসি, উইনরক ইন্টারন্যাশনাল, ব্র্যাক ও প্রথম আলো।
Visit freshyourfeel.com for more information.
অবৈধ পথে বিদেশযাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে; আর তাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণা। এই সংকট মোকাবিলা একক কোনো সংস্থার পক্ষে সম্ভব নয়; বরং দরকার সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বেসরকারি সংস্থা, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের সমন্বিত উদ্যোগ। পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।
গতকাল বুধবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এ কথা বলেন। ‘প্রযুক্তির ফাঁদে প্রতারণা ও মানব পাচার: করণীয় কী?’ শীর্ষক এই গোলটেবিল যৌথভাবে আয়োজন করে ইউএনওডিসি, উইনরক ইন্টারন্যাশনাল, ব্র্যাক ও প্রথম আলো।
এতে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, সরকারের নীতিনির্ধারক ও মানব পাচারের বিরুদ্ধে কাজ করা দেশি-বিদেশি সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বৈঠকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক আলী আকবর খান বলেন, অবৈধ ও অনিয়মিত অভিবাসন ঠেকাতে শুধু দালাল বা দেশের ভেতরের অপরাধীদের ধরলে হবে না। এই অপরাধের মূল চালিকা শক্তি দেশের বাইরেও সক্রিয়। তাই সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, কূটনৈতিক মিশন, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে বৈধ অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানো এবং মানুষকে অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা তৈরির ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
আলী আকবর খান, ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক, সিআইডিঅবৈধ ও অনিয়মিত অভিবাসন ঠেকাতে শুধু দালাল ধরলে হবে না। এই অপরাধের মূল চালিকাশক্তি দেশের বাইরেও সক্রিয়।আলী আকবর খান বলেন, বর্তমানে মানব পাচারের সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণার যোগসূত্র ক্রমে বাড়ছে। কম্বোডিয়াসহ বিভিন্ন দেশের স্ক্যাম সেন্টারে (সংঘবদ্ধ অপরাধের গোপন ঘাঁটি) বাংলাদেশিদের ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেকেই প্রথমে প্রতারণার শিকার হলেও পরে একই চক্রের অংশ হয়ে অন্যদের পাচার ও প্রতারণায় জড়িয়ে পড়ছেন। এ ধরনের আন্তদেশীয় অপরাধ মোকাবিলায় আধুনিক তদন্ত প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব রেবেকা খান বলেন, মানব পাচার ও অভিবাসন–সংক্রান্ত অপরাধ এখন আন্তদেশীয় রূপ নিয়েছে। তাই শুধু একটি দেশের সরকার বা সংস্থার পক্ষে এটি প্রতিরোধ সম্ভব নয়। এ জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বেসরকারি সংস্থা ও গণমাধ্যমের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সরকার প্রযুক্তিনির্ভর মানব পাচার ও অভিবাসন–সংক্রান্ত প্রতারণা মোকাবিলায় আইন, প্রযুক্তি ও আন্তসংস্থাগত সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বলেও বৈঠকে উল্লেখ করেন রেবেকা খান। তিনি বলেন, জাতীয় রেফারেল–ব্যবস্থা চালু, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে তথ্যবিনিময় জোরদার এবং বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন–ব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজনের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রতারণা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিপফেক, ক্রিপ্টোকারেন্সি, ভিপিএন ও এনক্রিপটেড যোগাযোগমাধ্যমের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাচারকারীরা আগের চেয়ে অনেক বেশি কৌশলী হয়ে উঠেছে। ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রতারণা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে।
বি এম মইনুল হোসেন, পরিচালক ও অধ্যাপক, তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিপফেক, ক্রিপ্টোকারেন্সি, ভিপিএনের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাচারকারীরা অনেক বেশি কৌশলী হয়ে উঠেছে।এই প্রযুক্তি–বিশেষজ্ঞ মনে করেন, সামাজিক মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং যেখান থেকে বেশি মানুষ বিদেশে যাওয়ার প্রলোভনে পড়ে, সেখানে লক্ষ্যভিত্তিক প্রচারণা চালাতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ পরিচালনাকারী বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার পরামর্শ দেন তিনি।
‘পুলিশের ক্ষমতায়ন’
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা মনে করেন, মাঠপর্যায়ের পুলিশের ক্ষমতায়ন করলে পুলিশ দ্রুত ফল দিতে পারে। তিনি বলেন, অবৈধভাবে বিদেশ যাত্রা ঠেকাতে দেশে ‘অ্যান্টি-হিউম্যান ট্রাফিকিং ইন্টেলিজেন্স প্ল্যাটফর্ম’ দরকার।
জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির উপদেষ্টা সালমা আলী বলেন, পাচার প্রতিরোধে ভালো আইন ও নীতিমালা থাকলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে। দক্ষ পাবলিক প্রসিকিউটর ও বিচারকের অভাবে মামলা দীর্ঘসূত্রতায় পড়ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
কাউন্টার প্রচারণা
কম্বোডিয়ার স্ক্যাম সেন্টার থেকে ফেরত আসা ৪৭৩ জনের মধ্যে ৮০ শতাংশই রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে নিয়মিত মাইগ্রেশন প্রক্রিয়ায় গিয়েছিলেন বলে বৈঠকে জানান উইনরক ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ দীপ্তা রক্ষিত। তিনি বলেন, যে মাধ্যমে মানুষ প্রতারিত হচ্ছে, সেই মাধ্যমেই কাউন্টার ক্যাম্পেইন চালাতে হবে।
অপরাধীদের দমনে প্রথাগত তদন্তের পরিবর্তে ডিজিটাল ফরেনসিক ও ক্রিপ্টোকারেন্সি ট্র্যাকিংয়ের মতো উন্নত প্রযুক্তির ওপর গুরুত্বারোপ করেন জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের (ইউএনওডিসি) দক্ষিণ এশিয়া কার্যালয়ের ন্যাশনাল প্রোগ্রাম কো–অর্ডিনেটর তাসনীম বিনতে করিম। তিনি বলেন, কার্যকর সমাধানের জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং মাঠপর্যায়ের পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ায় সচেতনতা বাড়াতে কাজ করতে হবে।
বৈঠকে কম্বোডিয়ায় প্রতারণার শিকার হওয়া মন্নান ছৈয়াল তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, যাদের মাধ্যমে তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করার পর উল্টো আসামিপক্ষই পাল্টা মামলা দেয়। এখন টাকা নিয়ে মামলা তুলে নিতে প্রতারকেরা চাপ দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
পাচার বাড়ছে
বৈঠকে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান। ধারণাপত্রে বলা হয়, মানব পাচারকারীরা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন ও বিদেশে সফলভাবে পৌঁছানোর পোস্ট ছড়িয়ে মানুষকে প্রলুব্ধ করছে। একই সঙ্গে কম্বোডিয়া ও মিয়ানমার সীমান্তে সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের পাচারের ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৮০০ বাংলাদেশি এ ধরনের প্রতারণার শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন।
বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের চেয়ারপারসন শাকিরুল ইসলাম, রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের লিগ্যাল কো–অর্ডিনেটর মাহমুদুল হাসান, অনির্বাণ সারভাইভার্স ভয়েসের সভাপতি আল–আমিন নয়ন ও প্রতারণার শিকার হয়ে মালয়েশিয়া ফেরত নাজনীন আক্তার।
বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।