লাইফ সাইকেল
· Prothom Alo

শিক্ষিত-সুদর্শন শরীফ আদনান বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী। ঢাকায় অ্যাপার্টমেন্টে ভাড়া থাকেন পরিবার নিয়ে। বেশ সকালে ঘুম থেকে উঠে দৈনিক পত্রিকা পড়ার অভ্যাস অনেক দিনের। পত্রিকা পড়া শেষে অফিসে যাওয়ার আগে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার করেন প্রতিদিন। ঠিক এমন সময় ক্লাস টুতে পড়া ছোট ছেলে শোভন দৌড়ে এসে বলে—‘বাবা বলতো দেখি—মুরগি আমাদের ডিম দেয়, মৌমাছি মধু দেয়—তাহলে টিচাররা আমাদের কী দেয়?’
—তোমাদের নতুন নতুন জিনিস শেখায়।
Visit moryak.biz for more information.
—না বাবা তুমি ঠিক বলোনি, টিচাররা আমাদের হোমওয়ার্ক দেয়!
—শরীফ সাহেব কিছু বলার আগেই ক্লাস সেভেনপড়ুয়া বড় ছেলে শাওন এসে বলে—বাবা, আমি আমার বন্ধুকে বলেছি আমি বড় হয়ে করোনাভাইরাসের সঠিক ভ্যাকসিন বের করব। আমার কথা শুনে বন্ধু বলেছে—যে ভাইরাস তোকে রাত জেগে, কষ্ট করে পড়াশোনা না করার সুযোগ দিয়েছে, এমন কি কঠিন বার্ষিক পরীক্ষা দিতে দেয়নি, বরং নতুন বছরে নতুন ক্লাসে অটো প্রমোশন দিয়েছে, তার বিরুদ্ধে কাজ করবি, তা ঠিক হবে না, এটা বিশ্বাসঘাতকতার শামিল, এতটা সেলফিশ হওয়া যাবে না!
হতবাক, বাক্রুদ্ধ হলেও নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে শরীফ সাহেব বাচ্চাদের বলেন—তোমরা মনোযোগ দিয়ে নিয়মিত পড়াশোনা করো তাহলে জীবনে উন্নতি করতে পারবে। এই বলে বাজারের দিকে পা বাড়ালেন।
এ বছরে পকেটের অবস্থা বিগত বছরের মতোই। বাজারে গিয়েও সেই একই চিত্র। মাছের, সবজির, মুরগির অস্বাভাবিক দাম—কোনো কিছুতেই নতুনত্ব নেই। কোনো রকমে দরদাম করে কিছু সবজি আর একটা মাঝারি সাইজের মৃগেল মাছ কিনে সকালের নাশতার জন্য ডিম কিনতে দোকানিকে শরীফ সাহেব জিজ্ঞাসা করেন—
—মুরগির ডিমের হালি কত?
—পঞ্চাশ টাকা।
—এত ছোট ডিম, দেখতে তো কোয়েলের ডিম মনে হচ্ছে, তার এত দাম কেন?
—আপনি তো লম্বা মানুষ, অত উঁচু থেকে দেখলে তো ডিম দেখতে ছোটই লাগবে, বসে দেখেন— ডিমের সাইজ ঠিকই আছে!
বাসায় ফিরে বাজারের ব্যাগটা সহধর্মিণী শায়লাকে ধরিয়ে দিয়ে দ্রুত অফিসের দিকে ছোটেন শরীফ সাহেব।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
অফিসে এসেও নতুনত্বের সন্ধান পেলেন না। সেই পুরাতন ফাইল, সহকর্মীদের ঈর্ষা, বাঁকা চোখের চাহুনি, বসের দুর্ব্যবহার। অফিসে থেকে বেরিয়ে সেই ভয়াবহ পুরাতন চিত্র—ফুটপাথ হকারদের দখলে, যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনার স্তূপ, রিকশা, টেম্পো, গাড়ি নিয়ম না মেনে চলায় যথারীতি, বাসের এলোপাথাড়ি বেপরোয়া চলাচলে সর্বত্রই যানজট। এ রকম একঘেয়েমি ‘লাইফ সাইকেল’ আর ভালো লাগে না শরীফ সাহেবের। মনে হয় ইমিগ্র্যান্ট হয়ে কোনো দেশে যেতে পারলে ভালো হতো। শরীফ সাহেব ঠিক মনে মনে করেন—অস্ট্রেলিয়াতে স্কিলড মাইগ্রেশনের জন্যে এপ্লাই করবেন। কিন্তু এপ্লিকেশন করার জন্য অনেক প্রস্তুতির প্রয়োজন—যেমন অস্ট্রেলিয়া সম্পর্কে পড়াশোনা করা, সঠিক কাগজপত্র জোগাড় করা, ব্রিটিশ কাউন্সিলে গিয়ে আইইএলটিএস পরীক্ষা দেওয়া, এপ্লিকেশন ফর্ম যথাযথভাবে পূরণ করা, ইত্যাদি। তার ওপর বেশ মোটা অংকের এপ্লিকেশন ফি জমা দেওয়া। সব মিলিয়ে অনেক সময় আর টাকার ইনভেস্টমেন্ট। হঠাৎ শরীফ সাহেবের মনে হলো এত ইনভেস্টমেন্টের আগে একজন জ্যোতিষী, হস্তরেখা-বিদ ও বাস্তু বিশেষজ্ঞের সঙ্গে দেখা করে আগত দিনগুলো কেমন যাবে এবং কীভাবে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া যায়, তা জানতে পারলে কেমন হয়? যেই ভাবা সেই কাজ। ঠেলাঠেলি করে লোকাল বাস থেকে কোনো রকমে শরীফ সাহেব ঢাকা শহরের ফার্মগেট বাস স্টপেজে দ্রুত নেমে পড়েন। বাস থেকে নামার সময়ে ভিড়ের মধ্যে একটু অতিরিক্ত চাপ অনুভব করলেও শরীফ সাহেব বেশ অনেকটা ফুরফুরে আমেজে ভাবছেন—সময়োপযোগী ইনোভেটিভ আইডিয়াতে বাস থেকে অন্তত ঠিক জায়গায় নামতে পেরেছেন, আর মাত্র দুই মিনিটের হাঁটার পথে বিশিষ্ট অকাল্ট সাধকের চেম্বার।
অ্যাপয়ন্টমেন্ট না করে আসার জন্য ঘণ্টা দুয়েক অপেক্ষা করে সবার শেষে সাধকের দেখা পেলেন শরীফ সাহেব। ভক্তির সঙ্গে কুশলাদি বিনিময় শেষে, সাধক বলেন—‘এই বছরে ক্রিয়েটিভ আইডিয়া মনের ভেতর উঁকিঝুঁকি দেবে, কখনো কখনো আনমনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর এই সুযোগে পকেটমারের শিকার হতে পারেন। বছরজুড়ে অফিসে একটা প্রমোশন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তবে না হওয়া পর্যন্ত নেটওয়ার্কিং এবং লবিং অব্যাহত রাখুন, মনোবল ধরে রাখুন। ‘স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল’, তাই ডায়েট কন্ট্রোল ও পর্যাপ্ত ঘুমের দিকে মনোযোগ দিন। বিশেষ করে বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডাক্তার দিয়ে প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন নেবেন, আর তা না হলে প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। পাওনাদারের মুখোমুখি না হওয়ার জন্য বছরজুড়ে মাস্ক পরতে ভুলবেন না। ইনকাম ট্যাক্স ফাঁকি দিতে গিয়ে বিপদে পড়তে পারেন এবং মোটা অঙ্কের অর্থদণ্ডের আশঙ্কা আছে। ফেসবুকের আইডি হ্যাকারদের কবলে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে আর তাই বিড়াম্বনা এড়াতে অবাক না হয়ে ঘন ঘন পাসওয়ার্ড বদল করুন। বছরের শেষ দিকে দেশান্তরি হওয়া কিংবা দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগ আসতে পারে। যাত্রা মোটামুটি শুভ। তবে আন্তর্জাতিক গন্তব্যে বিভিন্ন ফ্লাইটের চলাচল, ভিসা–সংক্রান্ত কাগজপত্র ও বর্ডার সিকিউরিটি জটিলতার ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখুন। বছরজুড়ে বিনোদন ও রোমান্স শুভ।’
বিশিষ্ট সাধকের পরামর্শ শরীফ সাহেবের বেশ পছন্দ হয়েছে। নিজেকে নিজেই বাহবা দিয়ে রিসিপশন ডেস্কে গিয়ে সাধকের পরামর্শ ফি ৫০০ টাকা দেয়ার জন্যে প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে দেখেন মানিব্যাগ উধাও। তন্ন তন্ন করেও খুঁজেও পাওয়া গেল না মানিব্যাগ—সম্পূর্ণ লাপাত্তা। শরীফ সাহেবের মনে পড়ে - ঠেলাঠেলি করে বাস থেকে নামার সময় অতিরিক্ত চাপের অনুভূতি আর অকাল্ট সাধকের বাণী ‘পকেটমারের শিকার হতে পারেন’!
আচমকা মিষ্টি কণ্ঠের শব্দে শরীফ সাহেব চোখ খুলে দেখেন—শায়লা দাঁড়িয়ে বলছে—‘জানালা থেকে দেখো আজকের সূর্যোদয়টা কী সুন্দর, চলো আমরা আমাদের ব্যালকনিতে বসে সিডনির ব্রাইটন বিচ আর বোটানি বে এর সকালটা উপভোগ করি’।
শরীফ সাহেব ভাবছেন—তাহলে এতক্ষণ যা বলেছি, দেখেছি কিংবা শুনেছি, তা কি শুধুই স্বপ্ন ছিল, সত্যিই কি তা–ই!
(প্রিয় পাঠক/পাঠিকা - আজকের গল্প নিতান্তই কাল্পনিক। বাস্তবের সঙ্গে নামের, চরিত্রের কিংবা ঘটনার মিল নিছক কাকতালীয়।)