ভালোবাসা, অসহায়তা আর আশার গল্প—কেন পড়বেন ‘এপিটাফ’

· Prothom Alo

পরিবার একটা শক্ত জায়গা। পরিবারের কোনো একজন সদস্যের ভালো কিছু হলে যেমন আনন্দ হয়, আবার অসুস্থ হলেও কষ্ট পায় বাকি সদস্যরা। সামাজিক প্রেক্ষাপটে আর্থিক দিক বিবেচনায় হয়তো ধনী, মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত, দ্ররিদ্র কিংবা আরও অনেক নামে বিভিন্নভাবে বিভক্ত করা যায় পারিবারিক অবস্থা। দিনশেষে পারিবারিক বন্ধন সবার ক্ষেত্রেই এক ও অভিন্ন। জীবনে চলার পথে পারিবারিক সুখ ও সুন্দর পরিবেশ প্রতিটি ব্যক্তির জন্য অনেক বড় প্রভাব পড়ে সব সমস্যার সমাধান ও সামনে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে।

Visit michezonews.co.za for more information.

পার্থক্যভেদে পারিবারিক সমস্যাও একেক জনের একেক রকম হয়। ধনীর যা সামান্য সমস্যা, মধ্যবিত্ত কিংবা দ্ররিদ্রের জন্য সেটা মহা সমস্যা। তাই মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারে তাদের সদস্যদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হলে, আর সেটা যদি বড় কোনো রোগ হয়, তাহলে বিষয়টি সে পরিবারে কঠিন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। তবু পারিবারিক সদস্যদের বিশ্বাস আর একসঙ্গে চলার সাহস নিয়ে তারা ভরসা রাখে, যেভাবেই হোক এই রোগ থেকে মুক্তি মিলবে এবং পরিবারের সদস্যটি সুস্থ হবে। এই ভরসা কিংবা আশাই মানুষকে বাঁচতে শেখায়। নানা সমস্যায় ভয় না পেয়ে ঠান্ডা মাথায় সমস্যা মোকাবিলা করতে পথ দেখায়।

প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের লেখা ‘এপিটাফ’ উপন্যাসও সে রকম গল্পের একটি বই। কঠিন রোগে আক্রান্ত মেয়েকে বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা করে যায় তার পরিবারের সদস্যরা। সম্ভাব্য সব রকম পথে হেঁটে সুস্থ হওয়ার শেষ উপায়টুকুও বের করতে চায় তারা। সেসব পরিস্থিতির বর্ণনা লিখতে লিখতেই লেখক এগিয়ে নিয়ে যান গল্পটি।

গল্পের মূল চরিত্রের মেয়েটির নাম নাতাশা, ডাক নাম টিয়া। সে একটি কঠিন রোগে আক্রান্ত, রোগটির নাম হলো মেনিনজিওমা। সে সারা দিনই বিছানায় শুয়ে থাকে। পোকার মতো দেখতে লাগে তাকে, রোগের জন্য সে অনেকটা শুকিয়ে যায়। বিষয়টি এমন হয়ে গেছে যে হঠাৎ তাকে কেউ দেখলে ভয় পেয়ে শিউরে উঠতে পারে। নাতাশার মা দিলশাদ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। বাবা সাজ্জাদ, কাঠের ব্যবসায়ী। আগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন, চাকরি ভালো লাগে না ওনার, তাই ছেড়ে ব্যবসা করছেন। বাসায় নাতাশা ও তার মা-বাবা ছাড়া আরেকজন কাজের লোক থাকে, তাকে বাসার সবাই ফুলির মা বলে ডাকে।

দিলশাদ তার মেয়ে নাতাশাকে পিজি হাসপাতালের সার্জন প্রফেসর ডা. ওসমানের কাছে নিয়ে গেলেন। তিনি তাকে ভালো করে দেখে কিছু পরীক্ষা দিলেন এবং পরীক্ষার রিপোর্টগুলো বিদেশের একজন নামকরা ডাক্তারের কাছে পাঠাবেন বললেন। সে রিপোর্ট দেখে নাতাশাকে বিদেশ যাওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে। বেশ কয়েক দিন বাদে রিপোর্ট আসার পর জানা গেল যত দ্রুত সম্ভব নাতাশাকে নিয়ে আমেরিকায় গিয়ে অপারেশন করাতে পারলে ভালো হয়। কিন্তু চিকিৎসার জন্য এতগুলো টাকা ম্যানেজ করা পরিবারের জন্য কষ্টকর ব্যাপার। নাতাশার বাবা উদাসীন, তবে মা দিলশাদ খুব সিরিয়াস সব বিষয়ে। তিনি যে করেই হোক মেয়ের চিকিৎসার জন্য টাকা ম্যানেজ করবেন, এটা নাতাশা জানে।

শব্দ ও নৈশব্দের মেলবন্ধন, ‘সাহিত্য পথের জলছবি’

দিলশাদের বাবা হাদিউজ্জামান রিটায়ার্ড করেছেন। স্বভাবে তিনি অনেক কৃপণ, তবে দয়ালু এবং সবকিছুর ব্যাপারে সচেতন। তিনি কাউকে উপহার দেন না, এবং কারও কাছ থেকে কিছু নেনও না। দিলশাদ একবার তার বাবাকে পাঞ্জাবি ও মায়ের জন্য শাড়ি নিয়েছিল; কিন্তু বাবা ওইসব গ্রহণ করেনি। দিলশাদ জানে তার বাবার কাছ থেকে সাহায্য পাওয়া কঠিন, তবু সে আশা ছাড়েনি। নিজের মেয়ের জন্য তিনি সবকিছু করতে রাজি। দিলশাদকে অবাক করে দিয়ে তার বাবা হাদিউজ্জামান ২ লাখ টাকার একটা চেক দিলশাদের হাতে তুলে দিলেন।

শুধু বাবা নয়, দিলশাদ তার মেয়ের চিকিৎসার খরচ ম্যানেজ করার জন্য পরিচিত-অপরিচিত সবার কাছে গেলেন। কোথাও টাকা পেলেন, কোথাও পেলেন না, আবার কোথাও এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন যে সারা জীবন মনে থাকবে। যেমন পড়াশোনা জীবনের এক বান্ধবীর কাছেও দিলশাদ গিয়েছিলেন সাহায্যের আশায়। বান্ধবীর নাম আনুশকা, অনেক ধনী পরিবারের মেয়ে ও বউ। দিলশাদের সব কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে হালকা নাশতা করিয়ে সে তাকে একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিয়েছিল। দিলশাদ রিকশায় উঠে প্যাকেট খুলে দেখেন, সেখানে ৫০০ টাকার একটা চকচকে নোট। তার খুব কান্না পেয়েছিল সেই মুহূর্তে।

নাতাশাদের বাসার ওপরতলার এক ভাড়াটিয়া আন্টি তাকে একটি ডায়েরি উপহার দিয়েছিল। গল্পে নাতাশার সঙ্গে এ ডায়েরিটা অন্য এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দৃশ্যমান হয়। নাতাশা সে ডায়েরিতে অনেক কিছু লিখে রাখে। নাশাতা জানে মা তার জন্য যতই চেষ্টা করুক না কেন, আমেরিকা থেকে চিকিৎসা করালেও সে সুস্থ হবে না, হয়তো সে মারা যাবে। তাই সে আমেরিকা যাওয়ার আগে সবার জন্য একটা করে চিঠি লিখে যাবে, নিজের মনের কথাগুলো লিখে। নানাকে, নানুকে, বাবাকে, মাকে, ও ফুলির মাকে।

ফুলির মার প্রতি নাতাশা অনেক কৃতজ্ঞ। কারণ, সে যখন অনেক ছোট, তখন থেকেই ফুলির মা তাকে যত্ন করে বড় করেছে। নাতাশার যখন শরীরের অবস্থা ভয়াবহ রকম খারাপ হয়, তখন এই ফুলির মা-ই পাশে থাকে, সব সময় মা-বাবা থাকে না। দুপুরের সময় মাঝেমধ্যে এমন কঠিন পরিস্থিতিও হয় যে বেশির ভাগ সময় কেউ বাসায় থাকে না, একমাত্র ফুলির মা থাকে। সে ভয় পেয়ে কোরান শরীফ নিয়ে নাতাশার মাথায় রাখেন আর আল্লাহ আল্লাহ করতে থাকেন। একবার মা–বাবা মেয়ের এই অবস্থা দেখে, ভয় পেয়ে রুম ছেড়ে বাইরে চলে যান।

নাতাশার চিকিৎসার জন্য দিলশাদের মা মনোয়ারা বেগম ১ লাখ টাকা দিবেন বলে কথা দিয়েছেন। মনোয়ারা বেগম খুব হাসিখুশি আর সরল মনের মানুষ। কথায়–কথায় গল্পের ছলে তিনি হাসেন। নাতাশা তাকে খুব পছন্দ করে।
দিলশাদ তার দুই বোনের কাছেও গিয়েছিল টাকা ধার চাইতে। মেজ বোন তেমন কোনো সহায়তা করল না। যদিও অর্থসম্পদ ভালো আছে, কিন্তু কৃপণ আর মন ছোট। বড় বোনের জামাই ওয়াদুদুর রহমান লাখখানেক টাকা দিবেন বলেছিলেন, সে জন্য দিলশাদকে নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস বিসর্জন দিতে হয়েছে।

অবশেষে নাতাশার আমেরিকা যাওয়ার ভিসা পাওয়া যায়। দিলশাদ প্রথমে ২ জনের পাসপোর্ট করার সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু পরে সাজ্জাদও জোর করে তারটাও যেন করানো হয়। পাসপোর্ট করিয়ে তিনজনের জন্য ভিসার আবেদন করলে ভিসা খুব দ্রুত পাওয়া যায়। কিন্তু শেষে দিলশাদ নিজে না গিয়ে মেয়ে নাতাশার সঙ্গে বাবা সাজ্জাদকে পাঠায়। প্রথমে অবাক হলেও সাজ্জাদ অবশ্য এতে খুব খুশি হয়েছিল।

নাতাশা আমেরিকা যাচ্ছে উন্নত চিকিৎসা করার জন্য, সঙ্গে তার বাবা। হয়তো সে ফিরবে, হয়তো ফিরবে না, তবু তার স্মৃতিগুলো থাকবে তার ঘরময়, বাসাময়, মা-বাবা আর ফুলির মায়ের মনের কোণে। তার চলে যাওয়াতে সবাই কষ্ট না পেলেও এই তিনজন ব্যক্তি অবশ্যই পাবে। কারণ, তারা খুব কাছ থেকে নাতাশার কষ্ট দেখেছে। আরেকজন হয়তো কষ্ট পাবে, তিনি উপরতলার সেই ভাড়াটিয়া আন্টিটা। মা দিলশাদের বারণ সত্বেও যে মানুষটা চুপি চুপি এসে নাতাশাকে দেখে যেত।

অসম্ভব একটা কষ্ট বুকে নিয়ে নাতাশা এই শহর, দেশ ছেড়ে অন্য দেশ ও শহরে যাচ্ছে। তার ফিরে আসার পথেই হয়তো মা দিলশাদ অপেক্ষা করবে। নাতাশার কষ্টের বিবরণ লিখে যা লেখক প্রকাশ করেছেন বইয়ের পাতায় পাতায়, তা আলোচনায় আনা কঠিন। কঠিন কিংবা সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা নেই এমন রোগে যারা আক্রান্ত, তাদের কষ্টের বিবরণ দেওয়া সত্যিই কঠিন, অসম্ভবও হয় মাঝেমধ্যে।

একনজরে-
প্রকাশক: ফজলুর রহমান
প্রকাশনী: বর্ণবিচিত্রা
প্রচ্ছদ: সমর মজুমদার
মুদ্রণ: আল ফয়সল প্রিন্টার্স
কম্পোজ: নূশা কম্পিউটার্স
প্রথম প্রকাশ: জুন ১৯৯৫
গ্রন্থস্বত্ব: গুলকেতিন আহমেদ
মূল্য: ১২০.০০ টাকা

হাজীপুর, নরসিংদী

Read full story at source